শিশুদের মধ্যে গ্লকোমা বিরল এক রোগ। ১০ হাজারে একজন শিশুর ক্ষেত্রে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় বা জন্মের কিছু সময় পার হলে এই রোগ দেখা দিতে পারে। নবজাতকের চোখের সমস্যা শনাক্ত করা দুরূহ, তাই সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন। দ্রুত চিকিৎসা করা না হলে চোখের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। এমনকি চিরতরে অন্ধও হয়ে যেতে পারে শিশু। তাই অভিভাবকদের এ বিষয়ে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
কেন হয় জন্মগত গ্লকোমা
চোখের অভ্যন্তরীণ তরল সঠিকভাবে নিষ্কাশিত না হলে দেখা দেয় জন্মগত গ্লকোমা। এমনটা হওয়ার প্রধান কারণ হলো চোখের কোণের অস্বাভাবিক গঠন। চোখের কোণের আকৃতি স্বাভাবিক হলে চোখের ভেতরের তরল সহজেই বের হতে পারে। কিন্তু জন্মগত গ্লকোমা আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে এই কোণ ঠিকভাবে গঠিত হয় না, ফলে তরল সঠিকভাবে নিষ্কাশিত হতে পারে না এবং চোখের চাপ বৃদ্ধি পায়।
বংশগত কারণে হয় এ রোগ। পিতা-মাতা যদি বংশগতভাবে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে সন্তানও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া কিছু জিনগত মিউটেশন জন্মগত গ্লকোমার সঙ্গে সম্পর্কিত।
উপসর্গ
শিশুর বয়স অনুসারে পরিবর্তিত হতে পারে জন্মগত গ্লকোমার লক্ষণ। সাধারণ কিছু উপসর্গের মধ্যে আছে—
♦ চোখের আকৃতি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি
পাওয়া : শিশু জন্মের পর বা কয়েক মাসের মধ্যে চোখ বড় হয়ে কোটর থেকে বেরিয়ে পড়লে সেটি গ্লকোমার লক্ষণ।
♦ পানি ঝরা : কিছু সময় পর পর চোখে পানি ঝরে।
♦ আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা : কড়া আলোর দিকে তাকাতে অস্বস্তি বোধ করে শিশু, জ্বালা দেখা দিতে পারে।
♦ চোখ বেঁকে যাওয়া : চোখের আকৃতি বদলে যেতে পারে বা কোটরের স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সরে যেতে পারে চোখ।
নির্ণয়
গ্লকোমার উপসর্গ দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত চক্ষু চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। চক্ষু পরীক্ষার মাধ্যমে গ্লকোমার উপস্থিতি নির্ণয় করবেন চিকিৎসক। বয়স অনুসারে নির্ণয় পদ্ধতি আলাদা হতে পারে, যেমন—
♦ চোখের চাপ পরিমাপ করা।
♦ কর্নিয়ার পরিধি পরিমাপ
♦ গোনিওস্কোপি
♦ আলট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য ইমেজিং টেস্ট
জন্মগত গ্লকোমার প্রকোপ দ্রুত বাড়ে, তাই চিকিৎসায় অল্প বিলম্ব হলেও স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা রয়ে যায়। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় হলে চিকিৎসার সাফল্যের হার বাড়ে।
চিকিৎসা
জন্মগত গ্লকোমার চিকিৎসার মূল লক্ষ্য চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং দৃষ্টিশক্তি সংরক্ষণ। এর মধ্যে রয়েছে—
♦ শল্যচিকিৎসা : গোনিওটোমি করে চোখের কোণে ফুটো করে চোখের তরল নিষ্কাশন করা, ট্রাবেকুলেকটোমি করে চোখের ভেতরের অতিরিক্ত চাপ কমাতে তরল বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করা, গ্লকোমা ড্রেনেজ ইমপ্লান্টের মাধ্যমে চোখে একটি ছোট ডিভাইস স্থাপন করে ভেতরের তরল বের করার ব্যবস্থা তৈরি ইত্যাদি।
♦ ওষুধ : শিশুর বয়স অনুযায়ী চোখে টপিক্যাল ড্রপ বা ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ওষুধ প্রয়োগ না করে সার্জারি করলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়।
চিকিৎসা শেষে শিশুর চোখ নিয়মিত পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
জটিলতা
জন্মগত গ্লকোমার চিকিৎসা সময়মতো না করলে যেসব জটিলতা তৈরি করতে পারে—
♦ স্থায়ী চোখের ক্ষতি ও অন্ধত্ব।
♦ চোখের আকৃতি বদলে যাওয়া বা ডিফর্মেশন।
♦ অন্যান্য চক্ষু সমস্যা, যেমন—চোখ বেঁকে যাওয়া বা কর্নিয়ার ক্ষতি।
যেহেতু জন্মগত গ্লকোমা বংশগতভাবে ছড়ায়, তাই গর্ভধারণের আগে পরিবারের ইতিহাস জানা গুরুত্বপূর্ণ। জিনেটিক কাউন্সেলিং করলে জন্মগত গ্লকোমার পাশাপাশি অন্যান্য বংশগত রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। পারিবারিক ইতিহাস না থাকলেও জন্মের পর শিশুর চোখের স্বাস্থ্য নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। মনে রাখা জরুরি, জন্মগত গ্লকোমা একটি গুরুতর রোগ হলেও এটি চিকিৎসাযোগ্য। দ্রুত নির্ণয় ও সার্জারি চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুকে অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করা যায়। অভিভাবক ও পরিবারের সচেতনতাই পারে শিশুকে এর থেকে রক্ষা করতে।
লেখক : কনসালট্যান্ট (চক্ষু)
দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল
সোবাহানবাগ, ঢাকা




