আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার (ইউভিএ) চ্যাপেলের (গির্জা) বিশাল ঘণ্টা একদিন হঠাৎ অদ্ভুত সুরে বেজে উঠল। ঘড়ির কাঁটায় তখন কোনো এক ঘণ্টার ঠিক সাত মিনিট পার হয়েছে। অস্বাভাবিক সময়ে এভাবে ঘণ্টা বেজে ওঠা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। ঠিক সাত সেকেন্ড পর পর অদ্ভুত এক গম্ভীর সুরে টানা সাতবার বেজে স্তব্ধ হয়ে গেল ঘণ্টাটি। পুরো ক্যাম্পাসে মুহূর্তেই নেমে এল পিনপতন নীরবতা। শিক্ষার্থীরা থমকে দাঁড়িয়ে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। কারণ এই ঘণ্টা বাজার একটিই অর্থ—ক্যাম্পাসের কোনো একজন শিক্ষক, সাবেক শিক্ষার্থী বা কর্মকর্তা আজ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। তবে সেদিন যিনি মারা গেছেন, তিনি সাধারণ কেউ ছিলেন না। তিনি বেঁচে থাকতে নিজের বুকে লুকিয়ে রেখেছিলেন এক পরম রহস্য। তিনি ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং চরম গোপন সংগঠন ‘সেভেন সোসাইটি’র একজন সদস্য। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত কেউ জানতে পারেনি এই দলের সদস্যরা আসলে কারা। এই সোসাইটির কোনো দাপ্তরিক বা লিখিত প্রতিষ্ঠাতা দলিল নেই। তবে ক্যাম্পাসে এর উৎপত্তি নিয়ে দুটি দারুণ লোককথা প্রচলিত আছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি হলো তাসের টেবিল নিয়ে। ১৯০৫ সালের দিকে আটজন শিক্ষার্থীর একটি দল নিয়মিত ব্রিজ খেলার পরিকল্পনা করে; কিন্তু একদিন খেলার টেবিলে আটজনের মধ্যে মাত্র সাতজন উপস্থিত হন। অনুপস্থিত বন্ধুর ওপর কিছুটা শোধ নিতে আর নিজেদের এই ‘সাত’ সংখ্যাটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তাঁরা সেদিনই জন্ম দেন ‘সেভেন সোসাইটি’র। তবে দ্বিতীয় ইতিহাসটি কিছুটা ভিন্ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক। সে সময় ক্যাম্পাসের অন্য গোপন সংগঠনগুলোর উচ্ছৃঙ্খলতা ও মাত্রাতিরিক্ত হৈ-হুল্লোড়ে ক্ষিপ্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এডউইন অল্ডারম্যান একটি কল্যাণমুখী ও সুশৃঙ্খল সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষা এবং কিছু মেধাবী শিক্ষার্থীর উদ্যোগে মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণের ব্রত নিয়ে ১৯০৫ সালের দিকে এই দলের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। ওই বছরই বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ম্যাগাজিন ‘কর্কস অ্যান্ড কার্লস’-এ প্রথমবার গ্রিক বর্ণ আলফা, ওমেগা ও ইনফিনিটি চিহ্ন দিয়ে ঘেরা এই ‘৭’ লোগোটি দেখা যায়। সেভেন সোসাইটির সবচেয়ে কঠোর নিয়ম হলো কোনো সদস্য বেঁচে থাকতে কখনোই নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে পারবেন না। বন্ধু, পরিবার কিংবা জীবনসঙ্গী—সবার কাছেই এই পরিচয় থাকে সম্পূর্ণ গোপন। কিন্তু একজন সদস্যের মৃত্যুর পর তাঁর এই আজীবন গোপনীয়তার অবসান ঘটে এক রাজকীয় ও রহস্যময় বিদায়ের মাধ্যমে। কোনো সদস্য মারা গেলে তাঁর শেষকৃত্যের দিন কবরের ওপর অত্যন্ত গোপনে রেখে আসা হয় কালো ম্যাগনোলিয়া ফুল দিয়ে তৈরি বিশাল একটি ‘৭’ আকৃতির তোড়া। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাপেলের ঘণ্টাটি সাত সেকেন্ড পর পর বিশেষ এক সুরে সাতবার বাজানো হয়। ঠিক তখনই শুধু বাকি পৃথিবী জানতে পারে সদ্যঃপ্রয়াত এই মানুষটি আড়ালে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কাজ করে গেছেন। গোপন সংগঠন বললেই সাধারণ মানুষের মাথায় এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা চলে আসে; কিন্তু সেভেন সোসাইটির মূল লক্ষ্যই হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন। আর তাদের এই জনকল্যাণের পুরোটাতেই থাকে ‘৭’ সংখ্যার এক জাদুকরী খেলা। তারা যখনই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অনুদান বা স্কলারশিপ দেয়, সেই টাকার অঙ্কে ‘৭’ থাকা বাধ্যতামূলক। কখনো তারা দেয় ৭৭৭ ডলার, কখনো ১৭,৭৭৭ ডলার, আবার কখনো বা ৭,৭৭,৭৭৭.৭৭ ডলার! একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন গ্যালারির হাজারো দর্শককে অবাক করে দিয়ে আকাশ থেকে এক প্যারাশুট জাম্পার মাঠে নেমে এলেন। তিনি প্রশাসনের হাতে একটি খাম তুলে দিয়ে আবার হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন! খামটি খুলে দেখা গেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি তহবিলের জন্য সেভেন সোসাইটির পক্ষ থেকে ১৪,৭৭৭ ডলারের একটি চেক। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে চ্যাপেল বেল বা ঘণ্টা মৃত্যুর পর বাজানো হয়, সেটিও বিশ্ববিদ্যালয়কে উপহার হিসেবে দিয়েছিল এই সোসাইটি। আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আর তথ্য-প্রযুক্তির যুগেও এই দলের গোপনীয়তা ভাঙা সম্ভব হয়নি। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর বিশেষ কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয় এবং সে এই সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়; তাহলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রোটুন্ডা ভবনের ভেতরে থাকা আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা টমাস জেফারসনের মূর্তির পায়ে একটি চিঠি রেখে আসতে হয়। সেখান থেকেই রহস্যময় কোনো উপায়ে চিঠিটি পৌঁছে যায় সোসাইটির কারো হাতে। এরপর সোসাইটির সদস্যরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন।