ফ্রান্স, ১৬২৩। ক্লেরমন্ট-ফেরান্ড শহরের এক বাড়িতে ১২ বছরের এক বালক মেঝের ওপর কয়লা দিয়ে অদ্ভুত সব আঁকিবুঁকি কাটছে। তার বাবা এতিয়েন প্যাসকেল একজন সরকারি কর কর্মকর্তা। তিনি গণিতের মারপ্যাঁচ বোঝেন বলেই ছেলেকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন—১৫ বছর বয়সের আগে কোনোভাবেই জ্যামিতি বা গণিত ছোঁয়া যাবে না। বাবার ভয় ছিল, গণিতের নেশায় ধরলে ছেলে হয়তো গ্রিক আর লাতিন ভাষা শিখতে ভুলে যাবে। কিন্তু মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিই হলো নিষিদ্ধের প্রতি টান। অঙ্কের যে ধুলাবালি থেকে বাবা তাঁকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন সেই ধুলায়ই তিনি খুঁজে নিলেন পরম সত্য। বাবার চোখের আড়ালে বালকটি একা একাই মেঝেতে দাগ টেনে আবিষ্কার করে ফেলল ইউক্লিডের জ্যামিতিক সূত্র। একদিন এতিয়েন ঘরে ঢুকে দেখলেন, তাঁর ছেলে নিজের মেধা খাটিয়ে প্রমাণ করে বসে আছে যে একটি ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণের সমান। যে সত্য শিখতে মানুষের বছরের পর বছর লেগে যায়, কোনো পাঠ্যবই ছাড়াই ১২ বছরের বালক তা আবিষ্কার করে ফেলেছে। ছেলের এই অসামান্য প্রতিভা দেখে আবেগাপ্লুত বাবা আর বাধা দিলেন না; বরং নিজের সংগ্রহ থেকে পরম যত্নে ছেলের হাতে তুলে দিলেন ইউক্লিডের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এলিমেন্টস’। জ্যামিতির এই বইটুকুই ছিল কিশোর প্যাসকেলের জন্য বিজ্ঞানের রাজভাণ্ডারের আসল চাবিকাঠি। প্যাসকেলের বড় হওয়াটা আর দশটা কিশোরের মতো ছিল না। ১৬ বছর বয়সে যখন অন্য ছেলেরা পাড়ার মোড়ে আড্ডায় মত্ত তখন তিনি কৌণিক ছেদ বা জ্যামিতিক কোণ নিয়ে লিখে ফেললেন এক অমর প্রবন্ধ—‘এসে অন কনিকস’। এই প্রবন্ধেই তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘প্যাসকেলস থিওরেম’ বা ‘মিস্টিক হেক্সাগ্রাম’ তত্ত্বটি তুলে ধরেন। সমকালীন বড় পণ্ডিতরা অবাক হয়ে ভাবছিলেন, এত অল্পবয়সী কারো মস্তিষ্ক থেকে কিভাবে বের হতে পারে এমন কালজয়ী তত্ত্ব! এমনকি বিখ্যাত দার্শনিক রনে দেকার্ত পর্যন্ত সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, এটি হয়তো প্যাসকেলের বাবারই লেখা। কিন্তু প্যাসকেল যে অন্য ধাতুতে গড়া, তার প্রমাণ মিলল কিছুকাল পরেই। বাবার কাজে সাহায্য করার জন্য তাঁর মন অস্থির হয়ে উঠল। প্যাসকেলের বাবা সারা দিন করের হিসাব মেলাতে মেলাতে রাত জাগতেন। ক্যালকুলেটরবিহীন সেই যুগে বিশাল বিশাল অঙ্কের হিসাব করা ছিল প্রচণ্ড খাটুনির কাজ। বাবার সেই কষ্ট দূর করতে ১৮ বছর বয়সী প্যাসকেল এক অদ্ভুত যন্ত্র বানানোর কথা ভাবলেন। চাকা আর গিয়ারের সমন্বয়ে তৈরি করলেন এক পিতলের বাক্স, যা নিজে নিজেই যোগ-বিয়োগ করতে পারে। আজকের দিনে আমরা যে আধুনিক কম্পিউটারের পেছনে ছুটছি তার আদি পিতা জন্মেছিল এক কিশোরের পিতৃভক্তির হাত ধরে। তখনকার দিনে একে বলা হতো ‘প্যাসকালাইন’। লোকে স্তম্ভিত হয়ে দেখত কিভাবে লোহার খাঁচায় বন্দি গিয়ারগুলো মানুষের মতো নির্ভুল হিসাব কষছে।
প্যাসকেলের জীবনটা যেন ছিল মেধা আর যন্ত্রণার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। ১৮ বছর বয়সের পর থেকে তাঁর শরীর খুব একটা সায় দেয়নি। প্রচণ্ড মাথাব্যথা আর পেটের অসুখ তাঁকে সারা জীবন তাড়া করে ফিরেছে। কিন্তু সেই জীর্ণ শরীর নিয়েও তিনি কখনো থেমে থাকেননি। ১৬৪৮ সালে তিনি তাঁর ভগ্নিপতি ফ্লোরিন পেরিয়ারকে দিয়ে পিউ-দ্য-ডোম পাহাড়ের ওপর একটি ঐতিহাসিক পরীক্ষা করান। পাহাড়ের পাদদেশে ও শিখরে পারদ স্তম্ভের উচ্চতা মেপে তিনি প্রমাণ করেন, বায়ুমণ্ডলের চাপ উচ্চতার সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। বিজ্ঞানের দুনিয়ায় চাপের একক আজও তাঁর নাম বহন করে চলেছে। জীবনের শেষ ভাগে প্যাসকেল গণিতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। জুয়াড়ি বন্ধু শ্যোভালিয়ের দ্য মেরের একটি প্রশ্নের সমাধান করতে গিয়ে তিনি পিয়েরে দ্য ফারম্যাটের সঙ্গে চিঠিপত্র আদান-প্রদান শুরু করেন। এই আলাপ থেকেই জন্ম নেয় আধুনিক ‘প্রোবাবিলিটি’ বা সম্ভাব্যতা তত্ত্ব। একই সময়ে তিনি তৈরি করেন ‘প্যাসকেলস ট্রায়াঙ্গল’, যা দ্বিপদী সহগ নির্ণয়ে বিপ্লব নিয়ে আসে। ১৬৬২ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে যখন এই প্রতিভা স্তব্ধ হয়ে যায় তখন তাঁর পকেট থেকে পাওয়া যায় ‘মেমোরিয়াল’ নামের এক টুকরা কাগজ। সেখানে লেখা ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির কথা। বিজ্ঞানের কঠিন যুক্তি থেকে বিশ্বাসের অতল গহ্বর—সবখানেই প্যাসকেল রেখে গেছেন তাঁর মৌলিকত্বের ছাপ। আধুনিক জলবিদ্যুৎ বিদ্যা থেকে শুরু করে ক্যালকুলেটর কিংবা বীমা গণিত—প্যাসকেলের সেই শৈশবকালীন কৌতূহলই আজও বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে।




