kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অন্য কোনোখানে

এক পার্কে সপ্তমাশ্চর্য

ফখরে আলম   

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এক পার্কে সপ্তমাশ্চর্য

মনোমুগ্ধকর গোলাপ বাগান

ছুটির দিন, রবিবার। জনপ্রতি ৩০ রুপি দিয়ে টিকিট কেটে বড় গেট দিয়ে প্রবেশ করে চক্ষু ছানাবড়া। এ যে রীতিমতো জনসমুদ্র। কলকাতার ইকোপার্কের কথা এত দিন বন্ধুদের কাছে শুনেছি। কলকাতার বন্ধুদের অভিমত হচ্ছে, নিউ টাউন এলাকার এই ইকোপার্ক বিশ্বের অন্যতম এক পার্ক। জনসমুদ্র ডিঙিয়ে পার্কের ভেতরে ঢুকে লেকের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। কোথা থেকে হঠাৎ নাকে ভেসে আসে চিকেন ললিপপের ম ম গন্ধ। তাকিয়ে দেখি ছোট একটি রেস্টুরেন্টে বিক্রি হচ্ছে আরো নানা পদ। দোতলা লঞ্চ, স্টিমার ভেঁপু বাজিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট নৌযানও আছে। চিকন ইট বিছানো পথে হাঁটা শুরু করি। সবুজ দূর্বা ঘাসে চাদর বিছিয়ে শত শত মানুষ বসে আছে। দেখেই বোঝা যায়, এরা একেকটি পরিবারের সদস্য। কেউ খাচ্ছে, কেউ গান করছে, কেউ শুয়ে আকাশ দেখছে। কেউ কেউ খেলা করছে। কিছু দূর হাঁটার পরই বড় একটি গোলাপ বাগান। নানা রঙের গোলাপ ফুটে রয়েছে। বাগানের সামনে বেঞ্চ পাতা। গোলাপের সৌন্দর্য আর খুশবু মনপ্রাণ ভরিয়ে দেয়।

কয়েক বিঘা আয়তনের গোলাপ বাগান পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাই। ছোট্ট একটি গোলাকার ঘর। সেখানে একজন মহিলা কর্মী ভ্রমণ পিয়াসীদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। তিনি জানালেন, ২০১২ সালে সীমিত আকারে পার্কটির যাত্রা শুরু হয়। ৪৮০ একর আয়তনের এই পার্কটির মূল উদ্যোক্তা হিটকো নামের একটি প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময় বন বিভাগ পার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়। ঝকঝকে রোদ। কিছু দূর এগোনোর পরই হঠাৎ বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনে আঁতকে উঠি। পা থেমে যায়। দেখি অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির ছোঁয়ায় ভিজে যাচ্ছে শাল, সেগুন, রেইন্ট্রি গাছের পাতা। সাইনবোর্ডে লেখা—রেইন ফরেস্ট। এই ফরেস্টে অতিবৃষ্টি অঞ্চলের নানা রকম গাছ লাগিয়ে অরণ্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সেখানেই থেমে থেমে বৃষ্টি হয়। এ বৃষ্টি প্রাকৃতিক নয়, কৃত্রিম। পার্ক কর্তৃপক্ষ এমন বৃষ্টির ব্যবস্থা করেছে।

আমরা রেইন ফরেস্টের পাশ দিয়ে হেঁটে আরেকটি গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করি। দেখি, ঝরা পাতার মধ্যে সাপ লুকিয়ে রয়েছে। কাছেই একটি মস্ত হাতি দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমরা ভয়ে ভয়ে এগোতে থাকি। ওমা, সেকি; এ সব কিছুই নকল! নকল হাতির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। আরো প্রায় হাজার গজ এগোনোর পর দেখি মানুষের ঢল। লেখা রয়েছে, সপ্তমাশ্চর্য। পার্কের নিরাপত্তাকর্মীরা মানুষের ঢল সামাল দেওয়ার জন্য হিমশিম খাচ্ছে। ফের ৩০ রুপি দিয়ে টিকিট কেটে সপ্তমাশ্চর্যের দুনিয়ায় প্রবেশ করলাম। আমরা প্রথমেই তরতর করে চীনের প্রাচীরে উঠে পড়ি। ১৩৬৮ থেকে ১৬৪৪ সালে সুরক্ষা ব্যবস্থাকে সংযুক্ত করে একক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এটি তৈরি করা হয়। ২১ হাজার ১৯৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চীনের সেই মহাপ্রাচীরের রেপ্লিকা পার্কে নির্মাণ করা হয়েছে। পাচিলের ওপর উঠে ছবি তুলি।

এর পর রোমান কলসিয়ামে ঢুকি। অপূর্ব স্থাপনাশৈলী, অনেক প্রাচীন স্থাপনা বোঝা যাচ্ছে। ৭০ থেকে ৮০ খ্রিস্টাব্দে এটি তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল, বিজয়ী রোমান সৈন্যদের পুরস্কৃত করা আর রোম সাম্রাজ্যের গৌরবগাথা তুলে ধরা।

এর পর আমরা তাজমহলে ঢুকি। বেগম মমতাজের সম্মানে মোগল সম্রাট শাজাহানের নির্মিত তাজমহলটি একেবারে আগ্রার তাজমহলের মতো। প্রেমের নিদর্শন দেখে ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। দেখি মাটি থেকে অনেক ওপরে সবুজ উদ্যান। একটি পিলারের মতো নির্মাণ করা হয়েছে। তার খোঁড়লে খোঁড়লে নানা প্রজাতির গাছ। ৬০০ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের প্রাচীন নগরী ব্যবিলিয়নের রাজা নেবু চাঁদনেজার ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ঝুলন্ত বাগান তৈরি করেছিলেন।

এর পর ঐতিহাসিক আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর, মিসরের পিরামিড, ব্রাজিলের ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার দেখি। সব স্থাপনার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। এরপর আমরা সপ্তমাশ্চর্য থেকে বের হয়ে এসে প্রজাপতি পার্কে ঢুকি। অনেক বড় প্রজাপতি পার্ক। সেখানে শত প্রজাতির রংবেরঙের প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। এসব দেখে ফলের বাগানে ঢুকি। হরেক রকম ফলের গাছ নিয়ে বাগানটি তৈরি করা হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আমার ছেলে একটি সাইকেল ভাড়া করে নিয়ে আসে। অভিনব সাইকেল। তিনজন একসঙ্গে চালানো যায়। সেই সাইকেল চালানোর মজাই আলাদা। সাইকেলে চেপে ডিআর পার্কে আসি। দেখি নানা প্রজাতির হরিণ। বিকেল গড়িয়ে পড়ছে। সকালে পার্কে ঢুকেছি, এখনো অনেক কিছু দেখার বাকি। আমরা লঞ্চে উঠে নৌবিহার সারি। এর পর আরো অনেক কিছু না দেখার বেদনা নিয়ে ইকোপার্ক ছেড়ে আসি। ছবি : লেখক

 

কিভাবে যাবেন

 ঢাকা থেকে বাসে, ট্রেনে কলকাতা। কলকাতা শহর থেকে নিউ টাউন ইকো পার্ক। ট্যাক্সিতে ভাড়া ২৫০ থেকে ৩০০ রুপি।

ব্রাজিলের ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার

চীনের প্রাচীর

তাজমহল

 

মন্তব্য