• ই-পেপার

সরকারি কর্মচারী আইন

নিষ্পাপ শৈশবের রক্তাক্ত মানচিত্র

ড. আলা উদ্দিন

নিষ্পাপ শৈশবের রক্তাক্ত মানচিত্র

শিরোনামের নিষ্ঠুর সংখ্যাগুলো যখন খবরের কাগজের পাতায় ভেসে ওঠে তখন এক মুহূর্তের জন্য বুকটা কেঁপে ওঠে। চার মাসে ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার, খুন হয়েছে ১৭ জন। মিরপুরে সাত বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা, সিলেটে চার বছরের শিশু, ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছরের শিশু এবং মুন্সীগঞ্জে ১০ বছরের আরেকটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। কী ভয়ংকর!

এখানেই শেষ নয়, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরো ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু ক্ষোভে ও অপমানে আত্মহত্যা করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে।

নিষ্পাপ শৈশবের রক্তাক্ত মানচিত্রসবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, গণমাধ্যমে আমরা যে চিত্রটা দেখি তা মূল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। লোকলজ্জা, সামাজিক চাপ আর প্রভাবশালীদের হুমকির মুখে অসংখ্য ঘটনা অন্ধকারেই থেকে যায়, কোনো দিন আলোর মুখ দেখে না। যে সমাজ নিজের সবচেয়ে অবোধ, নিষ্পাপ আর চার থেকে ১০ বছরের কোমল শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই সমাজের সামগ্রিক সুস্থতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে গেছে। আমাদের চারপাশের চেনা জগত্টা শিশুদের জন্য এক অবর্ণনীয় আতঙ্কের উপত্যকা হয়ে উঠছে।

এখানে একটা জিনিস আমাদের বুঝতে হবে। এই যে মিরপুর, সিলেট বা ঠাকুরগাঁওয়ের ঘটনাগুলোএগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে একটি নির্মম ও অস্বস্তিকর সত্য সামনে চলে আসে। সাম্প্রতিক সময়ের এই ঘটনাগুলোর সব কয়টিতেই দেখা গেছে, শিশুরা কোনো অপরিচিত লোকের হাতে নিগৃহীত হয়নি। তারা শিকার হয়েছে প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা কোনো না কোনো ঘনিষ্ঠজনের। যাকে বিশ্বাস করে শিশুটি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, যার কাছে পরিবার নিশ্চিন্তে সন্তানকে রেখে গিয়েছিল, সেই পরিচিত মানুষটিই রূপ নিয়েছে হিংস্র পশুর। এই চেনা মানুষের অবয়বে লুকিয়ে থাকা অপরাধীরা প্রমাণ করে যে সংকট শুধু বাইরের অজানা রাস্তায় নয়, সংকট আমাদের ঘরের খুব কাছে, আমাদের প্রাত্যহিক চেনা বৃত্তের ভেতরেই।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে শুধু কোনো ব্যক্তির তাৎক্ষণিক অপরাধপ্রবণতাকে দায়ী করলে ভুল হবে। এর শিকড় অনেক গভীরে, যা আমাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের সঙ্গে যুক্ত। একটি সমাজ যখন ভেতর থেকে পচতে শুরু করে, তখন তার প্রথম আঘাতটা আসে তার সবচেয়ে দুর্বল ও অরক্ষিত অংশের ওপর। আমাদের চারপাশে মাদকাসক্তির যে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে, তা মানুষের স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি ও বিবেককে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে যেকোনো বিকৃত ও পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট এখন হাতের মুঠোয়। এই অনিয়ন্ত্রিত বিকৃতি মানুষের মনস্তত্ত্বকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তারা নিজের আদিম ও পাশবিক প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।

একই সঙ্গে আমাদের পরিবার ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার চরম ঘাটতি দৃশ্যমান। জিপিএ ফাইভ আর জাঁকজমকপূর্ণ ক্যারিয়ার গড়ার ইঁদুরদৌড়ে আমরা শিশুদের মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা আর অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছি। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেখানে হওয়ার কথা ছিল একজন সংবেদনশীল মানুষ তৈরি করা, সেখানে তা শুধুই তথ্য মুখস্থ করার যন্ত্র বানানোর কারখানায় পরিণত হয়েছে। যখন সমাজ থেকে যৌথ দায়বদ্ধতা উঠে যায় এবং শুধু ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন এ ধরনের বিকৃতির বিস্তার পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিচারহীনতা আর অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা। আমাদের দেশে এ ধরনের স্পর্শকাতর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া এতটাই দীর্ঘ এবং জটিল যে বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও অপরাধীরা শাস্তি পায় না। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ কিংবা তদন্তের গাফিলতির কারণে দোষীরা পার পেয়ে যায়। অপরাধের যখন দৃষ্টান্তমূলক এবং দ্রুত শাস্তি হয় না, তখন অপরাধীরা উৎসাহিত হয়। তারা ধরে নেয় যে অপরাধ করলেও কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব। এই দায়মুক্তির নিশ্চয়তাই সমাজকে আরো বেশি সহিংস ও বিপজ্জনক করে তুলছে।

আরো বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই অসভ্য ও নির্মম সমাজে ধর্ষণের শিকার হওয়া শিশু এবং তাদের পরিবারকে যে সামাজিক লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা বেঁচে থাকাকে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন করে তোলে। আমাদের সমাজ এতটাই বিকৃত যে অপরাধীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে সমাজচ্যুত বা হেয় প্রতিপন্ন করতে বেশি উৎসাহী থাকে। লোকলজ্জা আর অপবাদের আঙুলগুলো ঘুরে যায় সেই ক্ষতবিশেষ মানুষগুলোর দিকেই, যেন অপরাধটা তারা নিজেরা করেছেন। এই বৈরী পরিবেশে সন্তান হারিয়ে কিংবা সন্তানের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার চাইতে গিয়ে মা-বাবাকে যে গ্লানি ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়, তাতে মনে হয় এই অসভ্য সমাজে সন্তানদের সামনে মুখ দেখিয়ে বেঁচে থাকাই যেন সবচেয়ে বড় দায়।

আমরা প্রায়শ পরিকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর আধুনিকতার গল্প বলি। কিন্তু যে রাষ্ট্র তার চার বছরের একটা শিশুকে নিরাপদ বিকেল উপহার দিতে পারে না, সেখানে সমস্ত উন্নয়নই অর্থহীন ঠেকে। শিশুদের ওপর চলা এই ধারাবাহিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর এক চূড়ান্ত ব্যর্থতার দলিল। আমরা যদি এখনই এই পচন রোধ করতে না পারি, তবে আগামী দিনে আমাদের পুরো প্রজন্ম এক চরম ট্রমা আর অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে বড় হবে।

এই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে হলে আমাদের একযোগে কাজ করতে হবে। শুধু আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মানুষের প্রতি সম্মান এবং নৈতিকতার পাঠ বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিকৃত কনটেন্ট এবং মাদকের বিরুদ্ধে নিতে হবে শূন্য সহনশীলতার নীতি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক মানসিকতা তৈরি করতে হবে, যাতে অপরাধী সমাজকে ভয় পায়, সমাজ যেন অপরাধীকে ভয় না পায়।

লেখক : অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আইয়ামে জাহেলিয়াতের পর্যটকের ডায়েরি!

গোলাম মাওলা রনি

আইয়ামে জাহেলিয়াতের পর্যটকের ডায়েরি!

সে বহুকাল আগের কথা। মধ্যপ্রাচ্যে তখন আইয়ামে জাহেলিয়াতের রাজত্ব চলছিল। নজদ, হাইল ও ইয়েমেন ছাড়াও বালাদে শামের অন্যান্য অঞ্চলে জাহেলিয়াতের অত্যাচার চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। সামর্থ্যবান লোকেরা জাহেলিয়াতের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য অহরহ হিজরত করতেন। কেউ কেউ সপরিবারে আবার কেউ কেউ পরিবার-পরিজন হারিয়ে একাকী নিরুদ্দেশ হতেন অজানার উদ্দেশে। ফলে জাহেলি যুগে অনেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য দেশত্যাগ করতে গিয়ে পথেঘাটে চোর-ডাকাতদের হাতে যেমন বেঘোরে প্রাণ হারাতেন তেমনি কেউ কেউ আবার এক জাহেলিয়াত থেকে বাঁচতে গিয়ে আরো বড় জাহেলের কবলে পড়ে মারাত্মক মুসিবতে আবর্তিত হতে হতে ইহলীলা সাঙ্গ করতেন। হিজরত করা মজলুমদের মধ্যে কেউ কেউ নামকরা পর্যটকে পরিণত হতেন আবার কেউ কেউ সেই পর্যটনের বাস্তব অভিজ্ঞতা লিখে মানবেতিহাসে অমরত্ব লাভ করতেন। আমাদের আজকের নিবন্ধের নায়ক, যিনি একসময় আরবের মরু অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন এবং জাহেলদের কবলে পড়ে স্ত্রী-পুত্র, দাস-দাসী ও সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ইয়ামেনের সানা বন্দরে পৌঁছেন। তারপর জাহাজে চড়ে তিনি কোথায় গিয়ে পৌঁছালেন সেই কাহিনি তাঁর নিজের মুখ থেকেই শোনা যাক।

আইয়ামে জাহেলিয়াতের পর্যটকের ডায়েরি!লোকজন আমাকে ইবনে আইমান হিসেবেই চিনত। সূদূর চীন দেশ থেকে পারস্য হয়ে যে বাণিজ্য কাফেলাগুলো ইয়েমেন দেশে যেত সেই বাণিজ্য পথের নাম ছিল সিল্ক রুট বা রেশমি পথ। দক্ষিণ আরবের স্বপ্নপুরী বলে খ্যাত মরূদ্যান আল জাহরার পাশ দিয়ে সিল্ক রুটের কাফেলা যখন চলাচল করত, তখন আমি অন্যান্য বেদুইন বালক-বালিকার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে কাফেলা যাত্রীদের স্বাগত জানিয়ে ঐতিহ্যবাহী আরবি গানের তালে তালে নাচতে থাকতাম। আমাদের উচ্ছ্বাস দেখে কাফেলা থেমে যেত এবং কাফেলার সর্দার এগিয়ে এসে আমাদের আদর করতেন এবং দেশ-বিদেশের মিঠাই দিয়ে ছেলে-মেয়েদের খুশি করতেন। ঐতিহাসিক সিল্ক রুটের সম্মানিত কাফেলা ঘিরে আল জাহরার অধিবাসীদের এই ঐতিহ্য শত বছর ধরে চলে আসছিল। কাফেলার সদস্যরা আমাদের মরূদ্যানে যাত্রাবিরতি করতেন এবং আমাদের সঙ্গে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক লেনদেন করতেন, তাতে আমাদের সারা বছর বেশ ভালোভাবেই কেটে যেত।

আমাদের এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে দারবিশ গোত্র কর্তৃক শাসিত হচ্ছিল, যারা মূলত পারস্য সম্রাটদের প্রতি আনুগত্য দেখাত। আমি সে সময়টির কথা বলছি, যেটি ছিল খ্রিস্টীয় চার শ অব্দ যখন পুরো জাজিরাতুল আরব মূলত দুটি বৃহৎ পরাশক্তির তাঁবেদারি করত। উত্তর আরব ছিল রোমান সম্রাটদের অধীন এবং দক্ষিণ আরব পারস্য সম্রাটদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকত। রোমানশাসিত অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে আইন-শৃঙ্খলা ভালো ছিল এবং সেই সব অঞ্চলে অনেক নামকরা সভ্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। অন্যদিকে দক্ষিণ আরবের বিশাল অংশ ছিল দুর্গম, অনুর্বর এবং মরু ও শিলাময় পাহাড়-পর্বতবেষ্টিত। এসব অঞ্চলে কোনো আইন-কানুনের বালাই ছিল না। মূলত গোত্র শাসন এবং গোত্রপতির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরই সংশ্লিষ্ট এলাকার সব কিছু নির্ভর করত। কোনো গোত্রপতি যদি যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা ডাকাতি লুটতরাজের মাধ্যমে অঢেল অর্থকড়ি ও মাল-সামানার মালিক বনে যেত, তখন তারা মরুভূমির দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে নিকটস্থ পারস্য সম্রাটের গভর্নরদের সঙ্গে দেখা করে আসতেন নিজেদের মান-মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। দারবিশ গোত্র এমনিতেই বনি গোত্র হিসেবে পুরো দক্ষিণ আরবে পরিচিত ছিল। অধিকন্তু আল জাহরা মরূদ্যানের মালিকানার কারণে এই গোত্রের লোকদের সভ্যতা-ভব্যতা অন্য বেদুইনদের মতো ছিল না। আমাদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত লোকজন ছিলেন এবং আমরা সবচেয়ে ভালো মানুষ এবং যোগ্যতম মানুষকেই বংশপরম্পরায় নিজেদের গোত্রপতি গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত করে আসছিলাম। ফলে আইয়ামে জাহেলিয়াতের অনেক অসভ্যতা আমাদের মধ্যে ছিল না। কিন্তু আমাদের শত বছরের সেই ঐতিহ্য হঠাৎ করে ধূলিসাৎ হয়ে গেল আমাদের গোত্রপতির অসভ্য এবং চরিত্রহীনা কন্যা উজায়নার কারণে। উজায়নার সঙ্গে কুখ্যাত মরু ডাকাত আবুল হোজ্জার অবৈধ সম্পর্ক ছিল, যা নিয়ে গোত্রপতির সঙ্গে তাঁর মেয়ে এবং মেয়ের নাগরের বিবাদ চরমে পৌঁছে। এ অবস্থায় ডাকাত আবুল হোজ্জা তাঁর দলবল নিয়ে হঠাৎ এক রাতে আমাদের গোত্রে আক্রমণ চালিয়ে সর্দার ও তাঁর পুত্রদের হত্যা করে এবং নিজের প্রেমিকা উজায়নাকে আমাদের রানি বানিয়ে দেয়। ফলে পুরো জাহেলি জামানার কয়েক শ বছরের কুখ্যাত ইতিহাসে সবচেয়ে সুসভ্য গোত্রটি একজন অসভ্য চরিত্রহীনা মহিলার খপ্পরে পড়ে যায়।

উজায়না ও তার প্রেমিক আবুল হোজ্জার কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের মরূদ্যানটি জাহান্নামে পরিণত হয়ে যায়। চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, লুটতরাজ, জুলুম, অত্যাচার এবং খুন-জখম ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। আবুল হোজ্জার দলবল কয়েকটি বাণিজ্য কাফেলার ওপর আক্রমণ চালায়, যা কিনা পারস্য সম্রাটকে খেপিয়ে তোলে। এ অবস্থায় পারসিক সৈন্যরা এসে আমাদের গোত্রকে মরূদ্যান থেকে বের করে দেয়। উজায়না তার নাগরের সঙ্গে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং দ্বিগুণ উৎসাহে অপকর্ম চালিয়ে যেতে থাকে। আমরা যারা সাধারণ মানুষ ছিলাম, তারা উজায়না-আবুল বাহিনী এবং পারস্য বাহিনীর জাঁতাকলে পড়ে সর্বস্ব হারাতে থাকলাম। উজায়না যেদিন ক্ষমতা লাভ করল তখন আমি বালক বয়সী ছিলাম। আবার যে সময় সে মরূদ্যান থেকে উচ্ছেদ হলো, তখন আমি রীতিমতো যুবক এবং বিয়ে-থা করে পুত্র-কন্যার পিতা হয়ে সংসারধর্ম পালন করছিলাম। একজন ভদ্রলোক হিসেবে আমি আমার এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্য ছিলাম এবং এই কারণে আমাদের অঞ্চলে পারস্য সেনাপতি মাঝেমধ্যে তাঁর তাঁবুতে আমাকে ডেকে নিতেন। উজায়নার কানে যখন আমার ব্যাপারে খবর পৌঁছাল তখন সে সুযোগ বুঝে একদিন আমার পুরো পরিবারের ওপর আক্রমণ চালিয়ে সবাইকে মেরে ফেলল। শুধু আমি প্রাণ নিয়ে কোনোমতে পালাতে পারলাম।

আমি ইয়েমেনের সানা বন্দরে গিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই ভারতবর্ষগামী একটি জাহাজে চড়ে বসলাম এবং অনেক দিন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে অদ্ভুত এক রাজ্যে এসে পৌঁছালাম। রাজ্যটি ছিল সমুদ্রের উপকূলে। পাহাড়, নদ-নদী ও ঘন বনজঙ্গলে ঘেরা রাজ্যটিতে আমি বহুকাল ছিলাম। সেখানে আমি প্রায় প্রতিদিনই অদ্ভুত এবং অতি আশ্চর্য ঘটনাবলি দেখতাম। এমন সব কাহিনি শুনতাম, যা বিশ্বাস করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তার পরও আমি সেসব ভৌতিক কাহিনি আমার ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে যাব, যাতে আগামী প্রজন্ম তাদের পৃথিবীর একটি অদ্ভুত ভূখণ্ড সম্পর্কে জানতে পারে। আমি খুব অবাক হয়ে লক্ষ করলাম যে আরব দেশের দুর্গম মরুভূমি, দুর্ধর্ষ বেদুইন এবং বহুবিধ অপকর্মের জন্য যে কুখ্যাতি রয়েছে তার চেয়েও অধিকমাত্রার কুখ্যাতি গিজগিজ করছিল সুবর্ণপুর নামক রাজ্যটিতে। আরবভূমি তথা জাজিরাতুল আরবের আইয়ামে জাহেলিয়াতের সঙ্গে যদি সুবর্ণপুরের জাহেলিয়াতের তুলনা করি, তবে আমার বিবেচনায় সুবর্ণপুরের তুলনায় আরবকে রীতিমতো জান্নাত আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। আমি যদি দুটি দেশের লোকজন-পশুপাখি এবং রীতিনীতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করি, তবে আপনারা খুব সহজেই দুই অঞ্চলের জাহেলিয়াতের মিল-অমিল এবং জঘন্যতার মাপকাঠি নিরূপণ করতে পারবেন।

আরবভূমিতে রাজা-বাদশাহ বা গোত্রপতিরা সাধারণত মিথ্যা কথা বলেন না। কিন্তু সুবর্ণপুরের রাজা-বাদশাহ মিথ্যাচার ছাড়া বাঁচতে পারেন না। তাঁরা দৈনিক কয়েক শ মিথ্যা না বললে এবং মিথ্যা না শুনলে তাঁদের পেটের ভাত হজম হয় না, ঠিকমতো প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদিত হয় না এবং রাতে বা দিনে কোনো নিদ্রা হয় না। আরব দেশে মিথ্যাবাদীদের কাজ্জাব বলা হয়। কোনো লোকের নামের সঙ্গে যদি একবার কাজ্জাব শব্দটি যুক্ত হয়ে যায়, তবে সে এবং তার পরিবার সমাজ থেকে এক ধরনের ঘৃণা-অসহযোগিতা এবং অভিশাপ পেতে থাকে যুগ যুগ ধরে। বেদুইনরা কোনো কাজ্জাবকে তাদের তাঁবুতে ঢোকায় না এবং কাজ্জাবদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না। অন্যদিকে সুবর্ণপুরে এসে দেখলাম কাজ্জাবদের জয়জয়কার। সবচেয়ে বড় কাজ্জাবটি সিংহাসনে বসে এবং লোকজনদের মধ্যে যাদের রক্ত-মাংস কাজ্জাবীয় চরিত্র বেশি মাত্রায় প্রবল তারাই-উজির-নাজির-কোতোয়াল-সেনাপতি ইত্যাদি পদ-পদবি পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

আইয়ামে জাহেলিয়াতের সমাজে মোনাফেক শব্দটি অত্যন্ত ঘৃণিত। অন্যদিকে সুবর্ণপুরের ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে মোনাফেক শব্দের সমার্থক বা পরিপূরক শব্দ নেই। সুবর্ণপুরের লোকজন বাহাত্তুরি-চুয়াত্তুরি-চোগলখোর-প্রতারক ইত্যাদি শব্দ অহরহ ব্যবহার করে বটে, কিন্তু ওই সব শব্দের দ্বারা মোনাফেকির আসল বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে না। আমি যখন মোনাফেক ও মোনাফেকির বিষয়ে লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করলাম, তখন তারা আমার কথা শুনে হেসে গড়াগড়ি দেওয়ার মতো অবস্থা করল। তারা আমাকে জানাল যে মোনাফেকি কর্ম হলো সুবর্ণপুরের জাতীয় চরিত্র। যে লোক যত বড় মোনাফেক সেই লোকই সুবর্ণপুরের ব্যবসা-বাণিজ্য-রাজকার্য এবং সামাজিক কর্মে তত বেশি উন্নয়ন করতে পারে। সুবর্ণপুরের মানুষের হাঁটাচলা-কথাবার্তা-লেনদেন, পোশাক-পরিচ্ছদ, প্রেম-ভালোবাসা, আহার-নিদ্রা এবং বিনোদনের মতো কর্মে মোনাফেকির মূল্য হলো হীরে-মণি-মাণিক্য এবং জহরতের মতো। সুবর্ণপুরের রাজারা জনগণকে বলে এক কথা এবং করে অন্যটি। আবার জনগণও রাজাকে কলা দেখিয়ে মুলা ঢুকিয়ে দেয়। মোনাফেকির প্রকোপ সুবর্ণপুরের সর্বত্র এতটাই ব্যাপক যে ভাষাবিজ্ঞানীরা এটিকে কোনো ক্ষুদ্রতম অর্থের মধ্যে বন্দি করতে চাননি। ফলে শব্দটি এই দেশের কোনো ডিকশনারি বা ব্যাকরণে আলাদাভাবে নিবন্ধিত হয়নি।

আইয়ামে জাহেলিয়াতের সমাজে একটি শব্দ রয়েছে, যা সুবর্ণপুরে নেই, আর সেটি হলো হামিম। আরবিতে হামিম শব্দের অর্থ এমন বন্ধু, যে কিনা বিপদের দিনে তার বন্ধু বা সঙ্গী-সাথিকে ছেড়ে যায় না। হামিম ছাড়াও আরব দেশে মাহবুব বা মেহবুবা শব্দেরও যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। মাহবুব ও মেহবুবা শব্দের অর্থও বন্ধু এবং সেই রকম বন্ধু, যারা পার্থিব কোনো লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা-স্বার্থ অথবা অর্থকড়ির জন্য একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে না। আমাদের জাহেলিয়াত সমাজে অনেক মন্দ জিনিসের আধিক্য রয়েছে। কিন্তু তার পরও সেখানে অসংখ্য হামিম এবং মাহবুব-মেহবুবার দেখা পাওয়া যায়। আপনি যদি আইয়ামে জাহেলিয়ার বাসিন্দা হন এবং সুবর্ণপুরে এসে পরবর্তী সময়ে বসতি গড়েন, তবে আমি লাত-মানাত-উজ্জার কসম কেটে বলতে পারি যে আপনি আপনার সব সাহায্যকারীকে নিয়ে শত বছর অনুসন্ধান করেও সুবর্ণপুরের কোনো অঞ্চল থেকে একজন হামিম অথবা মাহবুব খুঁজে পাবেন না।

সুবর্ণপুরের লোকজন ধান্দা ছাড়া কারো সঙ্গে সম্পর্ক করে না। যত দিন স্বার্থ আছে তত দিন সম্পর্ক রাখে এবং স্বার্থ শেষে এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যা দেখে আপনার মনে হবে যে ওরা হয়তো একে অপরকে কোনো দিন চিনতই না। সুবর্ণপুরের জ্ঞানীরা কথা বলে না এবং গর্দভ প্রকৃতির লোকেরা সারাক্ষণ উচ্চ স্বরে কথা বলতে থাকে। এই সমাজের শক্তিশালীরা সাধারণত অত্যাচারী এবং দুর্বলরা সন্দেহপ্রবণ ও কুৎসিত মনের অধিকারী হয়। অতিভোজন মাত্রাতিরিক্ত রঙ্গ-তামাশা এবং বিলাসিতা সুবর্ণপুরের ধনীদের সাধারণ রোগ। অন্যদিকে দরিদ্ররা খুবই হিংসুটে এবং ঝগড়াটে প্রকৃতির হয়ে থাকে। তাদের নৈতিক চরিত্রও খুবই নিম্নমানের হয়ে থাকে। ধোঁকাবাজি, দুর্নীতি ও প্রতিপক্ষকে অহেতুক দুর্ভোগ-দুর্দশার মধ্যে ফেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সুবর্ণপুরের রাজকর্মচারীদের তুলনাআইয়ামে জাহেলিয়াতের শিয়াল বা শকুনের চেয়েও নির্মম ও ভয়ংকর। এখানকার রাজকর্মচারীদের স্বভাব-চরিত্র কেমন এবং রাজা বাদশাহদের রুচি ও অভিরুচি ও সাহস-শক্তি কেমন তা নিম্নের কাহিনিটি পড়লেও বুঝতে পারবেন।

রাজামশাইয়ের শখ হলো বনের সব বাঘ মেরে ফেলবেন। তিনি তাঁর পাইক-পেয়াদাদের হুকুম করলেন, বনে আক্রমণ করে প্রতিদিন এক শ বাঘ মারতে হবে এবং একটা বাঘকে গ্রেপ্তার করে রাজপ্রাসাদে আনতে হবে, যেটিকে রাজামশাই পাত্র-মিত্রদের সামনে মহাবিক্রমে হত্যা করে নিজের বীরত্ব জাহির করবেন। রাজার পাইক-পেয়াদারা ঢোল-বাদ্য-ঢাল-সড়কি-তীর এবং বড় বড় মাছ ধরার জাল নিয়ে বনে আক্রমণের জন্য রওনা দিল। তারা যখন বনের মধ্যে ঢুকছিল তখন কয়েকটি গাধা, রামছাগল এবং বনবিড়াল প্রাণভয়ে বন থেকে বের হয়ে এক কৃষকের গোয়ালঘরে আশ্রয় নিল। কৃষক প্রাণীগুলোকে তার গোয়ালে দেখে ভারি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন তোমরা বনভূমি থেকে পালিয়ে লোকালয়ে এসেছ? প্রাণীগুলো বলল, রাজার লোকেরা বাঘ মারার জন্য বনে ঢুকেছে। তারা বাঘ তো দূরের কথা, বাঘের পশমও ছুঁতে পারবে না। উল্টো বাঘ যাতে নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারে এ জন্য বাদ্যযন্ত্র বাজাতে বাজাতে বনে ঢুকেছে। তারা আমাদের মতো প্রাণীদের মারবে এবং রাজার কাছে বনবিড়াল বা বাগডাশ ধরে নিয়ে বলবে, এটাই বাঘ! আমরা রাজার লোকদের মতিগতি ও স্বভাব-চরিত্র খুব ভালো করে জানি বলেই কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বনভূমি থেকে পালিয়ে আপনার গোয়ালে আশ্রয় নিয়েছি।

লেখক : রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক

ফুটবলের গল্প অনেক বেশি নাটকীয় ও অদ্ভুত

ইকরামউজ্জমান

ফুটবলের গল্প অনেক বেশি নাটকীয় ও অদ্ভুত

দুনিয়াজুড়ে বিশ্বকাপ ফুটবল উৎসবকে বরণ করে নেওয়ার সব প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। হাতে গোনা আর মাত্র কয়েকটি দিনের অপেক্ষা। দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও বয়স নির্বিশেষে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর খেলার আগমনী সুর এখন হৃদতন্ত্রে বাজছে, যা বিশ্ব মানবসমাজকে চঞ্চল করে তুলেছে। ফুটবল তো শুধু মাঠের একটি খেলা নয়, এটি ব্যক্তি, পরিবার ও বৃহত্তর সমাজের জীবনের খেলা। এটি একমাত্র খেলা, যার মাদকতায় আচ্ছন্ন হয়ে গা ভাসাতে কারো আপত্তি বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। এই খেলার সৌন্দর্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মানবিক গুণাবলি মানবসমাজকে চুম্বকের মতো টানে। সত্যি ফুটবল খেলার জগতে রাজা। এই রাজাকে রাজস্ব দেওয়ার জন্য সারা বিশ্ব অস্থির হয়ে ওঠে। কাপ্তাই লেকের ট্রলারের মাঝি হাজি রহমতকে বলতে শুনলাম—‘সব খেলা যাক, শুধু ফুটবল থাক। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা উভয় দলের পতাকা লাগিয়েছেন রহমত। তাঁর কথা হলোআমাদের সব আনন্দ তো এই দুই দলকে ঘিরে। আর তাই কারো মনে দুঃখ দিতে চাই না। সবাই মিলে আনন্দ তো অন্য রকম। কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হয়েছে ফুটবলজগৎ এখনো অনেক গ্রাস থেকে মুক্ত। ফুটবল এখনো সহজ-সরল খেলা হিসেবে পরিচিত থেকে গেছে।

ফুটবল একক বিশ্বে বিশ্বাসী। বিশ্বাসী গণতন্ত্র এবং সমতায়। এই চত্বরে জোরাজুরির সুযোগ নেই। সবার সমান অধিকার। সবার সহাবস্থান একই লক্ষ্যেএক কাতারে। আসন্ন বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে আবার সুস্থ জীবনবোধ, আর এই খেলার কল্যাণময়ী আবেদনের জয় দেখল পুরো বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি, বিরোধিতা, আর অসুস্থ মানসিকতার বিপক্ষে জয় দেখল পুরো বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ। ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক চেষ্টা করেও এশিয়ার অন্যতম প্রতিনিধি ইরানকে তাঁর দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে পারেননি। এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়, আর সুস্থ ফুটবল বিবেকের জয়। ইরান তো অধিকার নিশ্চিত করেই খেলবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের একনায়কসুলভ আচরণ ও অগণতান্ত্রিক চর্চার এটি পরাজয়। ইরান সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই প্রথম রাউন্ডের খেলায় অংশ নেবে। ইরান বেইস ক্যাম্প করেছে মেক্সিকোতে। প্রতিটি খেলা শেষে তারা ফিরে যাবে মেক্সিকোতে।

ফুটবলের গল্প অনেক বেশি নাটকীয় ও অদ্ভুতইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রথম রাউন্ডের কঠিন বেড়া অতিক্রম করতে পারে, তাহলে সম্ভবত উভয় দেশ পরস্পরের মুখোমুখি হবে দ্বিতীয় রাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। বিষয়টি অনেক দূরেরএর পরও প্রচুর জল্পনাকল্পনা চলছে। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে প্রবল উৎসাহ নিয়ে অনেকেই টিকিট কেটেছেন। যদি উভয় দেশ মাঠে মুখোমুখি হয়সেই আবেগ কেমন হবে বলতে পারছি না। তবে ফুটবল যে যুদ্ধ, হিংসা, বিদ্বেষকে দূরে ঠেলে রেখে মানুষকে একই চত্বরে একত্র করতে পারে, এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণের সাক্ষী বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানবসমাজ হতে পারবে। ফুটবলজীবনের প্রতি বাঁকেই থাকে নানা চমক আর আশ্চর্য করে দেওয়ার মতো গল্প, যা অনেক বেশি নাটকীয় ও অদ্ভুত। ফুটবল সব সময় বৃহত্তর ঐক্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। ফুটবল একনায়কতন্ত্র আর জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ২১০ দেশের বিশ্ব ফুটবল প্ল্যাটফর্ম ফিফা এখনো নতজানু হয়নি বিশ্বের পরাশক্তিদের লাল চোখ প্রদর্শনের কাছে। এটি এখন পর্যন্ত বড় সান্ত্বনা।

কলকাতা ক্লাবের সন্ধ্যার আড্ডায় ফুটবলের সম্রাট পেলেকে নিয়ে কথা বলছিলেন বন্ধু অলক মুখার্জি। পেলে বিশ্ব ফুটবলের প্রথম আন্তর্জাতিক নায়ক, আইকন আর কিংবদন্তি। বিশ্বজুড়ে যারা কোনো দিন ফুটবলের খবর রাখেনি, তারাও পেলেকে চিনেছে, আর চিনেছে পেলের ব্রাজিলকে। পেলে বিশ্বের সব ফুটবল মহাতারকার কাছে আইডল। ১৯৬৭ সালে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত নাইজেরিয়ায় যখন পেলে সান্তোসের হয়ে খেলতে যান, তাঁর খেলা দেখার জন্য দুই দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছিল। ফুটবল সব সময় ঘটনার জন্ম দিয়েছে এবং দেবে।

১৯৭১ সালে এক ফরাসি সাংবাদিক লিখেছিলেন, পেলে একজন অত্যুচ্চ ব্যক্তিত্ব সম্ভবত তদানীন্তন বিশ্বে পঞ্চম পোপ, নিক্সন, মাও ও দ্য গলের পরেই। খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে পৃথিবীজুড়ে এমন প্রভাব, খ্যাতি ও ভাবমূর্তি পেলের আগে কেউ তৈরি করতে পারেননি। পেলের জাতীয় নায়ক থেকে আন্তর্জাতিক আইকন হয়ে ওঠার মধ্যেই কোথাও যেন লুকিয়ে আছে ফুটবলের বিশ্বায়ন, বাণিজ্যিকীকরণ ও মিডিয়াকরণের বীজ। পেলেই বিশ্ব ফুটবলের প্রথম সফল আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড।

২০০২ সালে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের যৌথ উদ্যোগে এশিয়ায় প্রথম বিশ্বকাপ। যুদ্ধ, বৈরিতা, শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব ও অতীতের দুঃখজনক কালো অধ্যায়ের দিনগুলোকে ভুলে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যৌথ উদ্যোগে একটি সফল বিশ্বকাপ উৎসব বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছে। সারা বিশ্ব দেখেছে, ফুটবল কিভাবে এই দুটি দেশকে একই মঞ্চে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সাংগঠনিক টিমের মিডিয়ার একজন সদস্য হিসেবে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তৎকালীন ফিফার সিনিয়র সহসভাপতি এবং দক্ষিণ কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও অর্গানাইজিং কমিটির দ্বিতীয় ব্যক্তি ড. চুংসুন-জুনের অধীনে আমরা প্রায় ৩০০ ফ্রিল্যান্স ও পেশাদার ফুটবল লেখক ও সাংবাদিক কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা ভীষণ আবেগময় এবং অসাধারণ। ফুটবল দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মানুষকে একত্র করেছে অনেক অনেক বছর পর। তাদের মিলন ঘটিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান একসঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে হাসিমুখে হেঁটেছে। সত্যি ফুটবল নামের খেলাটি কী না পারে! বাতাসভর্তি গোলকপিণ্ড পুরো বিশ্বকে তার জাদুর খেলায় সহজেই বশ করে ফেলতে পারে। এই খেলার প্রেমে না পড়ে তো উপায় নেই। সবুজ মাঠে বল নিয়ে ২২ জন ফুটবল নায়কের কাড়াকাড়িবিষয়টি ভীষণ রোমাঞ্চকর। দুই পায়ের সাহায্যে মাঠের নায়করা যে অসাধারণ কবিতা লেখেন, সেগুলো শুধু খেলাকে মহিমান্বিত করে না, মানুষকে খেলার প্রতি আকৃষ্ট করে। খেলার প্রতি ভালোবাসা ও উন্মাদনা বাড়িয়ে দিচ্ছে সব সময়। তারকাদের পায়ের কারুকাজের প্রভাব যে কত বেশি হতে পারে, বিশ্বকাপ উৎসব এলে সেটি টের পাওয়া যায়আমাদের পিছিয়ে থাকা গ্রামবাংলার সমাজেও।

আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসী ফুটবল দেশে দেশে প্রাচীর মানে না। হাজার হাজার মাইল দূরে খেলার ভেনু্যু, আর সেই ফুটবলের জ্বরে আমরা ভুগি। এই জ্বর সারানোর কোনো পথ্য নেই। বিশ্বকাপ ফুটবল সাঙ্গ হলেই জ্বর ছেড়ে যাবে।

চমক, অবাক, বিস্ময় ও অভাবনীয় কিছু ঘটাই বিশ্বকাপের বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রে শুরুর আগে কেউ বলতে পারবে না তার সব হিসাব মিলবে! একটি আসরের সঙ্গে আরেকটির কোনো মিল নেই। এই চত্বর আলো ও আঁধারের লুকোচুরি খেলতে ভালোবাসে। মানুষের সৃষ্টি ফুটবল নিয়ে কত হৈচৈ। আর এই হৈচৈ যে সবাই পছন্দ করে। প্রখ্যাত কথাশিল্পী আলবের কাম্যুর কথা হলো, মানুষের দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতা সম্পর্কে সবকিছু জেনেছি, তার জন্য ঋণী ফুটবলের কাছে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া

ছবি কথা বলে—

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর-উত্তম

ছবি কথা বলে—

পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক। সেদিন রেললাইন পার হতে গিয়ে নরসিংদীতে একজন মহিলা ও বাচ্চা ট্রেনের ধাক্কায় মারা যায়। ইদানীং মানুষের জীবনের প্রতি মায়া কমে গেছে। কমে গেছে কি, বলতে গেলে না বললেই চলে। লাখো কোটি সাধনার পর যে মানবজাতি আশরাফুল মাখলুকাত, সে ব্যাপারে আমরা যে কত উদাসীন, তা বলার মতো না। গরিব মা-বাবার ছেলেরা মা-বাবার কাছে বায়না ধরে, মোটরসাইকেল কিনে দাও। কয়েক দিন বায়না ধরে ধরে হয়তো রেগেমেগে বলে, মোটরসাইকেল না দিলে আমি গলায় দড়ি দেব, ফাঁসি নেব। গরিব মা-বাবা অনেক কষ্ট করে মোটরসাইকেল কিনে দেন। তাদের অনেককে আর গলায় ফাঁসি দিয়ে মরতে হয় না, মোটরসাইকেলই পরপারে নিয়ে যায়। রেলে কাটা স্ত্রীকে কাঁধে এবং মেয়েকে কোলে, আরেক মেয়ের হাত ধরে থাকা ছবিটি দেখে আমার মন-প্রাণ-দেহ কেঁপে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় হানাদারদের এক আচমকা আক্রমণে ঠিক এমন করেই দুজন যোদ্ধাহত সাথিকে অস্ত্রসহ কাঁধে তুলে প্রায় দেড় কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছিলাম। কিভাবে পাড়ি দিয়েছিলাম সেদিনও বুঝিনি, আজও বুঝি না। তাই ট্রেনে কাটা ছবিটি কয়েক মুহূর্তের জন্য আমাকে মুক্তিযুদ্ধে ফিরিয়ে নিয়েছিল। কী হবে ঠিক জানি না। মুক্তিযুদ্ধ আমরা শুধু অস্ত্রবলেই জিতিনি, জিতেছিলাম মানবতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিলাম, নৈতিকতার কঠিন আবরণে আবদ্ধ হয়েছিলাম বলে। জীবনের প্রতি অসীম মায়ার সৃষ্টি হয়েছিল। দেশপ্রেম ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি। তাই জয় আমাদের পদচুম্বন করেছিল। আজ নীতি নেই, নৈতিকতা নেই, অন্যের জীবনের প্রতি মায়া তো দূরের কথা, নিজের প্রতিও তেমন মায়া নেই। অন্যকে ছোট করতে পারলেই যেন কেউ বড় হয়ে যায়। কাউকে ছোট করে বড় হতে অবচেতনভাবেও কখনো ভাবিনি। কাউকে ছোট করা তো দূরের কথা, কাউকে কিছু না করেও বড় হওয়ার কথা ভাবিনি, চিন্তা করিনি। অন্যকে বড় করতে, অন্যকে নিরাপদ করতে আজীবন চেষ্টা করেছি। আজ আমার দেশে মানবিক চরম অবক্ষয়ে বড় কষ্ট হয়। ছেলেবেলায় আমার কাছে সত্য-মিথ্যার যেমন কোনো পার্থক্য ছিল না, এখন সারা দেশে অনেকের মধ্যে সেই চিন্তাই কেন যেন খুঁজে পাই। তা না হলে বাচ্চা মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী একটি রেললাইন পার হচ্ছে আর তার মধ্যে কোনো সতর্কতা থাকবে না? জীবন এতই ঠুনকো? লাখো বছর সাধনা করেও আবার নতুন জীবন, সর্বোপরি মানবজীবন পাওয়া যাবে কি না, সে তো একমাত্র দয়ালু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই জানেন। ছবিটি দেখে বড় বিচলিত হয়েছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন সবাইকে ধৈর্য দেন। যা কিছু হোক, এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না।

ছবি কথা বলে—ঈদের কয়েক দিন আগে এক ধর্ষক সাত-আট বছরের রামিসাকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের ভালোবাসার দেশে এও সম্ভব? সরকার সোহেল নামের এক পাপীকে তড়িঘড়ি শাস্তি দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। প্রথম শুনলাম ওই দিনই শাস্তি হয়ে যায়। এখন শুনছি, ছয়-সাত দিনের মধ্যেই শাস্তি হবে। অপরাধীকে অপরাধ প্রমাণ করে দ্রুত শাস্তি দেওয়া এটি সমাজের কর্তব্য, রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বেশি তাড়াতাড়ি কাউকে কোনো শাস্তি দেওয়া বিচারের নামে অবিচার। রামিসার ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে শাস্তি না হলে সেটি যেমন অন্যায়, ঠিক এই শাস্তির প্রভাব সমাজে ফেলতে না পারলে সেটিও তেমনি অন্যায়। মৃত্যুদণ্ড সব অপরাধের দণ্ড হতে পারে না। যে সোহেল এই অপরাধ করেছে, তাকে ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে কারো যেমন অপরাধ উপলব্ধি হবে না, সমাজেও তেমন প্রভাব পড়বে না। আর এই অপরাধের জন্য সারা জীবন জেলে থাকলে যত নির্বোধই হোক, বেঁচে থাকলে মানুষ তাকে ঘৃণা করবে। আর কিছু না হোক, তিলে তিলে পলে পলে এই জঘন্য অন্যায়ের কথা তার মনে পড়বে এবং তাকে দেখে অন্যদেরও সংশোধন হওয়ার সাধ জাগবে।

অনেক বছর আগের কথা, সাগর-রুনি হত্যার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন সাহারা খাতুন। তিনি বলেছিলেন, সাত দিনের মধ্যে এই হত্যার বিচার করবেন। সাত দিন না, দেড় যুগেও সাগর-রুনির হত্যার বিচার হয়নি। ৭০ বছরেও হবে কি না, এ নিয়েও অনেকের মধ্যে গভীর সন্দেহ আছে। সময় লাগুক, সেটি স্বাভাবিক সময়। বিক্ষুব্ধ হয়ে বিচার নয়। পৃথিবীতে অনেক কাজ আছে, কিন্তু বিচারকের কাজ স্রষ্টার, যিনি সৃষ্টি করেছেন। আর এই দুনিয়ায় সেই স্রষ্টার যিনি প্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁকে বড় বেশি ভেবেচিন্তে কাজ করা উচিত। যিনি তেমন ভাববেন না, পরকালে তিনিও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যক্তিগত মালিকানা নয়। রাষ্ট্র জনগণের সম্পদ। জনগণের চাওয়া-পাওয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে যেমন রাষ্ট্র চালাতে হয়, বিচার-পরবর্তী সমাজে বিচারের কী প্রভাব পড়বে, কেমন প্রভাব পড়বে, কতটা প্রভাব পড়বে, আল্লাহর প্রতিনিধি বিচারককে তা ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

এই দুই-আড়াই বছরে বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশ যাঁরা সৃষ্টি করেছেন, যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, ঘাম ঝরিয়েছেন, তাঁরা অনেকেই দিশাহারা। যারা বাংলাদেশ চায়নি, বাংলাদেশ সৃষ্টিতে যাদের কোনো অবদান নেই, বরং বিরোধিতা আছে, তারা অনেকেই এখন দেশের দণ্ডমুণ্ডের মালিক। দলীয়ভাবে জামায়াত মুসলিম লীগ ও অন্যান্য দলের মতো যদি পাকিস্তানকে রাজনৈতিক সমর্থন দিত, কিছুই বলার ছিল না। কিন্তু তারা তা করেনি। আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন ব্রিটিশের হাত থেকে পাকিস্তান সৃষ্টিতে জান কোরবান করেছিলেন, তখন মওদুদীর নেতৃত্বে জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে নয়, ব্রিটিশের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। আবার ঠিক তেমনি পাকিস্তানের হাত থেকে আমরা রক্ত দিয়ে যখন বাংলাদেশ অর্জন করেছি, ঠিক তখন জামায়াত বাংলাদেশের পক্ষে নয়, পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু রাজাকার, আলবদর, আলশামস গঠনের মধ্য দিয়ে শত্রুকে পথ দেখিয়ে বাড়িঘর জ্বালানো-পোড়ানো, মা-বোনদের পাকিস্তানিদের দ্বারা মান-সম্মান, সম্ভ্রম লুণ্ঠন, মানুষ হত্যাএসব কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না। কয়েক দিন আগে একটি প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছে বাঙালি জাতি, বাংলাদেশের মানুষ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের পতন হয়েছে। যে যুবসমাজ, যে ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে, তাদের এই কৃতিত্বের হাজার বছর মূল্য থাকার কথা ছিল। কোটাবিরোধী বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-যুবকদের সংগ্রামের ফসল শেখ হাসিনা সরকারের পতন নয়। সেখানে অন্য সবার শেখ হাসিনার পতনে ভূমিকা ছিল। আমি যেমন হৃদয় দিয়ে অন্তরের সব কামনা-বাসনায় পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে মুক্তি চেয়েছি, লড়াই করেছি, ঠিক তেমনি শেখ হাসিনার শাসন থেকে মুক্তি কামনা করেছি। সেখানে বিএনপির লাখো কর্মী শরিক ছিলেন। বরং জামায়াত এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জড়িত, এটি আগে থেকে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারলে চব্বিশের আন্দোলন কোনোমতেই সফল হতো না। আন্দোলন সফলের কৃতিত্বই এখানে। আমরা যা ভাবিনি, তা-ই হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের কৃতিত্ব শত শত বছর স্থায়ী হবে। কিন্তু আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই সবাইকে পেঁচিয়ে অবমাননাকর অশালীন বক্তব্য দেওয়ায় মানুষ বড় হতাশ ও বিক্ষুব্ধ হয়েছে। তাদের সম্পর্কে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অন্যান্য দুষ্কর্মের কথাও খুব একটা কম নয়। যে যা-ই বলুন, যে শূন্য জনপ্রিয়তা নিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়েছিলেন, এখন তেমন নেই। যাতে করে ভবিষ্যতে কোনো সরকার যখন মানুষের কথা শুনবে না, স্বৈরাচারী হবে, তখন সাধারণ মানুষ অত সহজে ঝাঁপিয়ে পড়বে নাএটি লাভের চেয়ে অনেক ক্ষতি।

শেখ হাসিনার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে জড়ানো আন্দোলনকারীদের ঠিক হয়নি। সিলেটের ভয়াবহ বন্যায় অর্থ সংগ্রহ করে তা সঠিকভাবে ব্যয় না করে আত্মসাৎ করায় ভালো প্রভাব পড়েনি। দিনাজপুরে নাহিদের শতেক-দেড় শ গাড়ি নিয়ে প্রচার এবং দাদার সম্পত্তিতেই তাঁর ওসব চলতে পারে, যদিও দাদার দেড়-দুই বিঘার বেশি জমি নেই, দালালি করে খাওয়া ছাড়া পথ নেই তাঁরএমন বলা ঠিক হয়নি। ওদিক থেকে আব্দুল্লাহ এখনো ভালো। গরিব মানুষের ছেলে বড় হওয়া যাবে নাএটি কে বলে? অন্যদিকে সাতচল্লিশ আর চব্বিশ, মাঝে কিছু নেই। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ১১ দফা, ৭ জুনএসব পায়ে দললে থাকে কী? অতীতের শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে না পারলে বর্তমান যেমন নড়বড়ে, ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। তাই বিষয়গুলো ভেবে দেখা উচিত। মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা, বঙ্গবন্ধুর স্ট্যাচু ভেঙে ফেলা, তাঁর মাথায় প্রস্রাব করা। মুক্তিযুদ্ধ যখন হয়েছে, তখন নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর কথায় আমি যুদ্ধ করেছি, বীর-উত্তম জিয়াউর রহমানও করেছেন। বঙ্গবন্ধুর মাথায় প্রস্রাব করলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জিয়াউর রহমানের মাথায় প্রস্রাব করা হয় না? সেই প্রস্রাব থেকে আমার মাথা কি বাদ থাকে? বিষয়গুলো ভেবে দেখা দরকার। তীব্র আন্দোলনের সময় ধানমণ্ডি ৩২-এর বাড়ি ছোটখাটো ভাঙচুর কিছুটা মেনে নেওয়া গেলেও পরে সরকারি বুলডোজার দিয়ে জাতির হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করা কোনোক্রমেই মেনে নেওয়া যাবে না, মেনে নেওয়া হবেও না। চেঙ্গিস খান বাগদাদ ধ্বংস করে পৃথিবীর চোখে প্রশংসা পাননি। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতা অধ্যাপক ইউনূসের জামানায় বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ধ্বংস ইতিহাসের পাতায় কলঙ্কের এক জঘন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। আজ হোক আর কাল, বাংলাদেশের মানুষ এটি মেনে নেবে না। শুধু এরই জন্য অধ্যাপক ইউনূসকে ভাবীকালে সবচেয়ে বড় কলঙ্কের মালা পরতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ না থাকলে বাংলাদেশ থাকে না, বাংলাদেশ না থাকলে ইদানীং গজিয়ে ওঠা নেতৃত্ব থাকে না। তাই বাংলাদেশের সমৃদ্ধি আমাদের সবার সমৃদ্ধি। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু যেমন, তেমনি জিয়াউর রহমানও। তাই আজ সবকিছুকে বাদ দিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে গেলে তা কখনো মানুষ গ্রহণ করবে না। চন্দ্র-সূর্য যেমন মোছা যাবে না, তেমনি বঙ্গবন্ধু, জিয়াউর রহমান ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাকে কোনোক্রমেই মোছা যাবে না। যাঁরা অস্বীকার করবেন, তাঁরা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত থাকুন। একদিন বিচার হবেই হবে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে ২৩ আগস্ট ১৯৭১ তুরার সাত মাইলে রওশন আরা ক্যাম্পে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। সেই থেকে সুসম্পর্ক ছিল আজীবন। তাঁর ছেলে তারেক রহমানকে অনেক আগে থেকেই চিনি, জানি। একসময় কোলে বসেছেন। তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী। সেদিন ১৬ এপ্রিল ওসমানী মিলনায়তনে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া উপলক্ষে প্রথম বক্তৃতা শুনেছি। রেডিও-টেলিভিশনে অনেক শুনেছি তারেক রহমানকে। কিন্তু সামনাসামনি সেই প্রথম। হাওয়া ভবন থাকতে তারেক রহমানের কর্মকাণ্ড যেমন একেবারেই পছন্দ হতো না, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই অপছন্দ করতে পারছি না। সেদিন স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানকালে ১ থেকে ২০ নম্বর পর্যন্ত পদক দেওয়ার সময় একনাগাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, তারপর একটি চমৎকার সাবলীল বক্তব্য পেশ, সর্বোপরি অনুষ্ঠান শেষে আমাদের সবার সঙ্গে হাত মেলানোএই সবকিছু এক দারুণ সুন্দর ভালো লক্ষণ। তারেক রহমান যদি নিজেকে সবার প্রধানমন্ত্রী বানাতে পারেন, ভাবতে পারেন, তাহলে নিশ্চয়ই তাঁর প্রাতঃস্মরণীয় হওয়ার অনেক বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

লেখক : রাজনীতিক