ভারতের উত্তর-পূর্বে, মেঘালয় রাজ্যের একটি ছোট্ট গ্রাম ‘মাওলিনং’। প্রায় ৬০০ মানুষের এই শান্ত গ্রামটি আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক নামে—‘এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম’। ২০০৩ সালে ‘ডিসকভার ইন্ডিয়া’ ম্যাগাজিন কর্তৃক এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই গ্রামটির ভাগ্য বদলে যায়। প্রতি শনিবার এখানে এক হাজারেরও বেশি পর্যটকের সমাগম ঘটে।
মাওলিনং গ্রামে পরিচ্ছন্নতা কোনো সাময়িক অভিযান নয়, বরং এটি এখানকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার অংশ। একদম ছোটবেলা থেকেই শিশুদের পরিচ্ছন্নতার পাঠ দেওয়া হয়। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুরা দল বেঁধে রাস্তায় নেমে শুকনো পাতা ঝাড়ু দেয় এবং বাঁশের তৈরি ময়লার ঝুড়িগুলো খালি করে। গ্রামবাসীরা প্রত্যেকে নিজেদের ঘরের পাশাপাশি সরকারি বাগান ও রাস্তার পরিচর্যা করেন। পচনশীল বর্জ্য দ্রুত অপসারণের বিষয়ে সবাই সমান সচেতন।
২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার জাতীয় ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’ শুরুর পর একটি রেডিও ভাষণে মাওলিনংয়ের প্রশংসা করে বলেছিলেন, এখানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা বাসিন্দাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই স্বীকৃতি গ্রামটিকে আরো জনপ্রিয় করে তোলে। কৃষিজীবী বাসিন্দারা ধীরে ধীরে পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত হন; গড়ে ওঠে হোমস্টে, রেস্তোরাঁ ও স্মারকচিহ্নের দোকান।
পর্যটনের হাত ধরে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসলেও, দুই দশক ধরে টানা দর্শনার্থীদের আনাগোনা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় গ্রামের চেনা শান্ত পরিবেশকে বিঘ্নিত করছিল। বিশেষ করে, পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতলের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর গ্রাম কমিটি ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদ অনুভব করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে প্রতি রবিবার দিনের বেলা বেড়াতে আসা পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গ্রাম কমিটির সদস্য প্রেসিয়াস খোংডুপ জানান, গ্রামটির সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং যে শৃঙ্খলার কারণে একসময় মাওলিনং সর্বাগ্রে স্বতন্ত্র ছিল, তা রক্ষা করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত।
মাওলিনংয়ের জনসংখ্যা শতভাগ খাসি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের। সপ্তাহের ছয় দিন পর্যটকদের সেবায় ব্যস্ত থাকার পর, রবিবার দিনটি তারা নিজেদের পরিবার ও ধর্মীয় উপাসনার জন্য তুলে রাখতে চান। স্থানীয় বাসিন্দা ফেস্টিভ্যাল খারিম্বা বলেন, আমরা গির্জায় যেতে, উপাসনা করতে সময় পাই। রবিবার পর্যটকরা এখানে থাকলে আমাদের সমস্যা হতো। অবশ্য যারা আগে থেকে গ্রামের গেস্টহাউস বুক করে থাকেন, তারা এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত। নিষেধাজ্ঞার দিনে মাওলিনংয়ের প্রবেশদ্বারে কালো ধাতব গেট বন্ধ থাকে। পর্যটকদের কোলাহলমুক্ত গ্রামে তখন কেবল শোনা যায় গির্জা থেকে ভেসে আসা স্তোত্রগানের সুর। ভারতের দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক পর্যটক এই নিয়মে শুরুতে কিছুটা অবাক হলেও, গ্রামবাসীর এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাচ্ছেন। অধ্যাপক বিজয়া দেবনাথ, যিনি মেঘালয়ে ছুটিতে এসে এই গ্রামের ফটক থেকে ফিরে যাচ্ছিলেন, তিনি বলেন, এই মানুষেরা প্রতিনিয়ত গ্রামটিকে এত পরিচ্ছন্ন রাখছে, আমরা সেটাই দেখতে চেয়েছিলাম। মাওলিনং আমাদের এই আশা দেখায় যে যৌথ প্রচেষ্টায় চারপাশ পরিষ্কার রাখা সম্ভব।
স্বচ্ছ ভারত মিশনের এক যুগ পরেও যেখানে ভারতের বহু অঞ্চলের স্যানিটেশন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে মাওলিনং এক অনন্য ব্যতিক্রম। এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের এই খেতাব শুধু পর্যটন আকর্ষণের জন্য নয়, বরং বাসিন্দাদের কঠোর শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের ফসল।









