kalerkantho


গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম

আবদুল মান্নান

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম

স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। থমাস জেফারসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল রচনাটিও তিনি করেছিলেন। জেফারসন ছিলেন গণতান্ত্রিকব্যবস্থাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন প্রবাদপুরুষ। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি এই বিকল্পটি দেওয়া হয় যে তুমি কি সংবাদপত্রবিহীন সরকার চাও, না সরকারবিহীন সংবাদপত্র চাও? তখন আমি পরেরটা বেছে নেব।’ জেফারসন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও সংবাদপত্রের কথা বলেছিলেন। ঠিক তাঁর প্রায় ৫০ বছর পর ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সংবাদপত্র সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, চারটি আক্রমণাত্মক সংবাদপত্র হাজারটা বেয়নেটের চেয়েও ক্ষতিকর।’ অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, কোনো দেশে স্বাধীন গণমাধ্যম থাকলে সে দেশে দুর্ভিক্ষ হানা দিতে পারে না। যুগ যুগ ধরে মানুষ সংবাদ, সংবাদপত্র, স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, আবার এটিও উপলব্ধি করেছে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা না হয় অথবা সংবাদমাধ্যম যদি কোনো দুরভিসন্ধি নিয়ে অসত্য বা অর্ধসত্য সংবাদ প্রচার করে, তা দেশ, জাতি ও সমাজের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশে সেই ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমল পর্যন্ত সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ঠিক; তবে সব সময় দায়িত্বশীল ছিল—তা বলা যাবে না। বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে সরকারের অনেক কর্মকর্তা ও নেতানেত্রীর বেশ কিছু অপকর্ম আমাদের সংবাদমাধ্যম তুলে ধরেছে। এর ফলে জনগণ উপকৃত হয়েছে এবং সরকারও তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করেনি। তবে কখনো কখনো দু-একটি সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশ্যমূলক  সংবাদ পরিবেশনা দেশের ক্ষতি করেছে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন তার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক যখন এক ডলারও অর্থায়ন করেনি, তখন তারা ঘোষণা দিল যে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক যে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাতে তারা দুর্নীতির গন্ধ পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশের দু-তিনটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র বিষয়টিকে রং মাখিয়ে এমন মাত্রায় নিয়ে গেল যে শেষ পর্যন্ত তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পর্যন্ত জড়িয়ে ফেলা হলো। এতেও ক্ষান্ত না হয়ে তারা তাদের পক্ষে বাঁশি বাজানোর জন্য বেশ কয়েকজন পণ্ডিত ব্যক্তিও জোগাড় করে ফেলল। এই পণ্ডিতরা আবার রাতে কোনো কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় গিয়ে গলা ফাটিয়ে জনগণকে  বোঝালেন যে শেখ হাসিনা দেশের এমন সর্বনাশ না করলেও পারতেন। আবার যখন শেখ হাসিনা ঘোষণা দিলেন যে পদ্মা সেতু বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নেই হবে, তখন এই সংবাদমাধ্যমগুলো ও পণ্ডিতজনরা বললেন, শেখ হাসিনা বাঁশের সাঁকো আর পদ্মার ওপর সেতুর মধ্যে তফাত বুঝলেন না। আর এসব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য যিনি দিচ্ছেন বা লিখছেন, তাঁদের নেতৃত্বের দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন এমন একজন সাংবাদিক, বর্তমানে প্রয়াত, যিনি নানাভাবে বঙ্গবন্ধুর কৃপাধন্য। পুরো বিষয়টি তদন্তপূর্বক যখন কানাডার আদালত দুর্নীতির অভিযোগ বাতিল করে দিল তখন এই সংবাদমাধ্যমগুলো বা উল্লিখিত পণ্ডিতরা এ বিষয় নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকলেন। পদ্মা সেতু নিয়ে যেসব সংবাদমাধ্যম বা পণ্ডিতজন এমন নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁরা কিন্তু জেনেশুনেই তা করেছিলেন। ১৯৯০ সালে ভারতের উগ্রবাদী হিন্দুরা যখন ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস করল তখন বাংলাদেশের একটি সংবাদপত্র ও বিদেশি একটি প্রচারমাধ্যমের এ দেশীয় সংবাদদাতা এই সংবাদ পরিবেশন করলেন যে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ায় বাংলাদেশের হিন্দুরা নাকি খুশি হয়ে মিষ্টি বিতরণ করেছে। এমন একটি মিথ্যা সংবাদের কারণে এই দেশের নিরীহ হিন্দুরা উগ্র ধর্মব্যবসায়ীদের  আক্রমণের শিকার হলো। ঠিক একই অবস্থা হয়েছিল ২০১৩ সালের মে মাসে, যখন হেফাজত ঢাকা দখল করে ভয়াবহ তাণ্ডব চালাল। দুটি টিভি চ্যানেল ও তিনটি পত্রিকা হেফাজতের এই তাণ্ডবের পক্ষে ও সরকারের বিপক্ষে এমন প্রচার শুরু করল যে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হলো। অথচ সেদিন যদি সরকার হেফাজতের দুর্বৃত্তদের ঢাকার কেন্দ্রবিন্দু থেকে উচ্ছেদের জন্য সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা না নিত, তাহলে ঘটে যেতে পারত ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনা।

গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের পাঠকের কাছে নিউ ইয়র্ক টাইমস আর ওয়াশিংটন পোস্টের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। এ দুটি পত্রিকা যে দলের বা ব্যক্তির পক্ষে অবস্থান নেয় সেই দলের বা ব্যক্তির যেকোনো নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যায়। সিএনএনের বিশ্বাসযোগ্যতাও মানুষের কাছে যথেষ্ট ভালো। অন্যদিকে ফক্স টিভিকে মনে করা হয় রিপাবলিকান দলের অন্ধ মুখপত্র। ব্রিটেনে গার্ডিয়ানে কিছু প্রকাশিত হলে তা মানুষ বিশ্বাস করে। বিবিসি আর চ্যানেল ফোরের বিশ্বাসযোগ্যতা এখনো ভালো। পাঠকের ধারণা, এসব বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম নিজস্ব কোনো গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে না। তারা যা পরিবেশন করে তা বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দি হিন্দু, স্টেটসম্যান, ইন্ডিয়া টুডে, আউটলুক, এনডিটিভি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে বলে পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে। গণমাধ্যমের প্রতি পাঠক বা দর্শকরা আস্থা হারায়, যখন তারা দেখে একটি নির্দিষ্ট মিডিয়া তাদের কোনো গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে। যেমন—বাংলাদেশে এ বছরের শেষের দিকে একটি জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি গণমাধ্যম, বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়া বর্তমান সরকার যেন এই নির্বাচনে ভালো করতে না পারে সেদিকে লক্ষ রেখে এখন থেকেই কাজ শুরু করেছে। প্রতিদিন তাদের সংবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে গত চার বছরে এই সরকারের, তাদের ভাষায় ব্যর্থতার খতিয়ান তুলে ধরা। এই সরকারের অনেক ব্যর্থতা আছে ঠিক, কিন্তু যেসব সফলতা আছে তা তুলে ধরতে এই গণমাধ্যমগুলো কুণ্ঠিত। সফলতার কোনো খবর পরিবেশন করলেও তা থাকে ভেতরের পাতায়। ২০১৩-১৪ সালে জামায়াত-বিএনপি জোট দেশে যে পেট্রলবোমার যুদ্ধ করেছিল তার পেছনেও এসব সংবাদমাধ্যমের প্রচ্ছন্ন উসকানি ছিল। 

এ ধরনের সংবাদমাধ্যম সম্পর্কেই নেপোলিয়ন সতর্ক করেছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে খুব কঠিন সময়েও গণমাধ্যম সাহসী ভূমিকা রেখেছে। উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময় দৈনিক আজাদ (অধুনালুপ্ত), দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, এমনকি পাকিস্তান প্রেস ট্রাস্টের পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তানও বেশ সাহসী ভূমিকা রেখেছিল। কারণ সে সময় সাংবাদিকতা পেশাটা পেশাদার সাংবাদিকদের হাতেই ছিল, বর্তমানে তেমনটা খুব একট দেখা যায় না। দুর্ভাগ্য যে এখন আর তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, জহুর হোসেন, ফয়েজ আহ্মদ, কে জি মুস্তাফা, সন্তোষ গুপ্ত, আবদুস সালাম, তোয়াব খান, ওবায়দুল হক বা বজলুর রহমানদের মতো পেশাদার ও  সাহসী সংবাদিকের জন্ম হয় না। এর ফলে পুরো গণমাধ্যম বা সংবাদপত্র জগত্টাই ক্ষতিগ্রস্ত  হয়েছে বা হচ্ছে। সংবাদপত্র জগতের এমনতর টানাপড়েনের সময়ের সুযোগ নিয়ে বাজারে যেমন এসেছে অনেক ভুঁইফোড় সংবাদপত্র, তেমনি এসেছে সাংবাদিক নামধারী একধরনের ধান্দাবাজ ব্যক্তি, যারা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সুস্থ গণমাধ্যমকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই ভুঁইফোড় সংবাদপত্র বা ধান্দাবাজ সাংবাদিক ব্ল্যাকমেইল  থেকে শুরু করে চাঁদাবাজিসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা করতে পারে না। সরকার একটি ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার (Right to Information) নামের একটি আইন পাস করেছে। এসব ধান্দাবাজ সাংবাদিক নামধারী দুর্বৃত্ত নিয়মিত এই আইনের অপব্যবহার করে এবং সাংবাদিকতা পেশার মতো একটি মহৎ পেশার অপবাদ ঘটায়। এ প্রবণতা প্রতিরোধ করতে পারে শুধু এই পেশায় যাঁরা পেশাদার সংবাদমাধ্যম কর্মী আছেন তাঁরাই।

বাংলাদেশে অনেক পত্রিকা প্রচারের সংখ্যাকে তাদের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করে। এমন ধারণা সঠিক না-ও হতে পারে। ব্রিটেনে বেশ কিছু ট্যাবলয়েড পত্রিকা আছে, যাদের প্রচারসংখ্যা বেশ ভালো এবং এসবের প্রায়ই স্ক্যান্ডাল বা বানোয়াট (গসিপ) নির্ভর পত্রিকা, যা বিনা পয়সায় বিলি করা হয়। এদের প্রচারসংখ্যা বেশ ভালো; তবে গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে এগুলো কখনো গার্ডিয়ান বা ইনডিপেনডেটের ধারেকাছেও আসতে পারে না। প্রচারের সংখ্যা নয়, গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতাই হওয়া উচিত একটি ভালো মানের গণমাধ্যমের মানের মাপকাঠি।

গত এক দশকে বাংলাদেশে বেশ কিছু ভালো মানের সংবাদপত্র এসেছে, যাদের সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে  এখনো তেমন একটা সমস্যা হয়নি। এদের মধ্যে কালের কণ্ঠ নিঃসন্দেহে অন্যতম। এযাবৎ পত্রিকাটি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের চেষ্টা করেছে। উপসম্পাদকীয়গুলো বেশ সময়োপযোগী ও তথ্যনির্ভর। একজন পাঠক হিসেবে এটি মনে হয় না যে সংবাদের ওপর পত্রিকার মালিকপক্ষ তেমন কোনো হস্তক্ষেপ করে, যেমনটি কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে দেখা যায়। সংবাদমাধ্যমের ওপর মালিকপক্ষের হস্তক্ষেপ এই শিল্পে গত দুই দশকের সংযোজন, যখন থেকে সংবাদপত্র প্রকাশ করপোরেট হাউসের নিয়ন্ত্রণে গেছে। এতে দোষের কিছু নেই। এটি সারা বিশ্বে ঘটেছে। সমস্যাটা হয় তখন, যখন করপোরেট হাউসগুলো সংবাদমাধ্যমের যে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে তা স্বীকার না করে শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যকেই প্রাধান্য দেয়। দৈনিক কালের কণ্ঠ ও এর সহযোগী প্রকাশনাগুলোও এ প্রবণতা থেকে দূরে থাকতে পেরেছে বলে মনে হয়।

অষ্টম বর্ষপূর্তিতে কালের কণ্ঠ’র পাঠকদের অভিনন্দন। প্রত্যাশা করি, কালের কণ্ঠ আক্ষরিক অর্থেই কালের কণ্ঠকে ধারণ করবে।

এ বস্তুনিষ্ঠ স্বাধীন সংবাদমাধ্যমই হয়ে উঠতে পারে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ।

 

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক



মন্তব্য