kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ফাইভজি আইফোন ১২

একটি দুটি নয়, চার-চারটি নতুন আইফোন উন্মোচন করেছে অ্যাপল। দুটি মডেলের দাম রাখা হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম আর বাকি দুটি এখনকার চালু মডেলগুলোর সমান। বিস্তারিত এস এম তাহমিদের কাছে

১৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ফাইভজি আইফোন ১২

কভিড-১৯-এর প্রভাবে এ বছর অ্যাপল আর জনসমক্ষে অনুষ্ঠান করে আইফোন উন্মোচন করেনি। বরং একটি নজরকাড়া অনলাইন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘোষণা করেছে নতুন সব পণ্য। এবার আইফোন ১২-এর ইভেন্টের আমন্ত্রণপত্রে অ্যাপল লিখেছিল ‘হাই, স্পিড’। অর্থাৎ ফাইভজির গতিকে স্বাগত জানাচ্ছে তারা। এবারই প্রথমবারের মতো ফাইভজি নেটওয়ার্ক সমর্থন করবে আইফোন। তাই ইভেন্টের নামের সঙ্গে স্পিড শব্দটি জুড়ে দিয়েছে অ্যাপল। শুধু তা-ই নয়, এবারের নতুন আইফোনগুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে প্রথমবারের মতো আইফোনে নতুন ধরনের চিপ ব্যবহার করা হয়েছে।

 

আইফোন ১২ সিরিজের ফোনগুলোতে যা থাকছে

এ বছরের আইফোনের মূল মডেল ‘আইফোন ১২’। এটির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়েছে ‘১২ মিনি’ ও ‘১২ প্রো’ সিরিজ। সাধারণত অ্যাপল প্রতি দুই বছরে আইফোনের মডেল নম্বর বদলে থাকে। এই সময়ের মধ্যে ফোনের বডির ডিজাইন না বদলে ভেতরের হার্ডওয়্যারেই আনা হয় পরিবর্তন। এবার সে ধারা বদলে তারা ১১এস সিরিজ না এনে সরাসরি আইফোন ১২ সিরিজ বাজারে আনল।

 

ডিজাইন

‘আইফোন ১২’-তে বাদ দেওয়া হয়েছে কার্ভ গ্লাস। ওটার বদলে সামনে ও পেছনে পুরোপুরি সমতল গ্লাস ব্যবহার করেছে তারা। ঠিক যেমনটি আইফোন ৪ ও ৫ সিরিজে ছিল। বডি ডিজাইনেও আনা হয়েছে পরিবর্তন। আইফোন ১১ সিরিজের মতো গোলগাল না করে ১২ সিরিজে আইফোন ৪ ও ৫ সিরিজের মতো ফ্ল্যাট ফ্রেম ব্যবহার করা হয়েছে। পেছনের ডিজাইন আছে আইফোন ১১ সিরিজের মতোই। বডি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে স্টেইনলেস স্টিল। আর গ্লাসের নিরাপত্তায় আছে সিরামিক কোটিং, যা সর্বশেষ গরিলা গ্লাসের চেয়েও কিছুটা শক্তিশালী।

 

প্রসেসর

নতুন হার্ডওয়্যারের তালিকায় প্রথমেই আছে নতুন ‘এ১৪ প্রসেসর’। হেক্সাকোর প্রসেসরটিতে থাকছে চারটি ব্যাটারি সাশ্রয়ী কোর এবং দুটি শক্তিশালী কোর, চারটি অ্যাপল জিপিউ কোর, চারটি নতুন মেশিন লার্নিং কোর এবং নতুন ইমেজ প্রসেসর। প্রসেসরটি বিশ্বের প্রথম ৫ ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে তৈরি স্মার্টফোন প্রসেসর, তেমনটাই দাবি অ্যাপলের। প্রসেসরটির ডিজাইন অ্যাপলের হলেও তৈরি কিন্তু করেছে নির্মাতা টিএসএমসি। আগের ‘অ্যাপল এ১৩’-র চেয়ে দ্বিগুণ প্রসেসিং ক্ষমতা, দ্বিগুণ গ্রাফিকস পারফরম্যান্স এবং ৬০ শতাংশ বেশি মেশিন লার্নিং বা এআই ক্ষমতার অধিকারী এই চিপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মোবাইল প্রসেসর, যার মধ্যে আছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ট্রানজিস্টর।

এ১৪ প্রসেসর ব্যবহারের আরেকটি অন্যতম বড় ফিচার, ৫জি নেটওয়ার্ক সমর্থন। অ্যাপলের দাবি, আইফোন ১২ সিরিজ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ফ্রিকোয়েন্সির ৫জি নেটওয়ার্ক সমর্থন করে। সঙ্গে বোনাস হিসেবে থাকছে, প্রয়োজন না হলে ব্যাটারি বাঁচাতে নিজ থেকেই ৪জি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করবে আইফোন ১২।

 

ক্যামেরা

প্রসেসরের পর বড় পরিবর্তন এসেছে ক্যামেরায়। মূল সেন্সর রাখা হয়েছে ১২ মেগাপিক্সেল, যার অ্যাপার্চার এফ/১.৬, ফোকাল লেংথ ২৬ মিলিমিটার, আছে ৭ এলিমেন্ট লেন্স ও অপটিক্যাল স্ট্যাবিলাইজেশন। পুরো সেন্সরই অটো ফোকাসে ব্যবহার করা হবে। ফলে ফোকাসে কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। তার পাশাপাশি থাকছে ১২ মেগাপিক্সেল, এফ/২.৪ অ্যাপার্চার, ১৩ মিলিমিটার ফোকাল লেংথ, ৫ এলিমেন্ট লেন্সের ১২০ ডিগ্রি আল্ট্রাওয়াইড অ্যাংগল ক্যামেরা। মূল ক্যামেরার পাশাপাশি এবার আল্ট্রাওয়াইড ও সেলফি ক্যামেরায়ও থাকছে নাইট মোড। ক্যামেরার ডাটা দ্রুত বিশ্লেষণ করে সেরা ছবি তোলার জন্য থাকছে মেশিন লার্নিং। এর ফলে আগের সব আইফোনের চেয়ে এবারের আইফোনের ছবিতে পাওয়া যাবে আরো বেশি ডিটেইল। আল্ট্রাওয়াইড ক্যামেরার ডিস্টর্শন থাকছে না, আর রাতে তোলা ছবিতেও ডিটেইল থাকবে দুর্দান্ত। প্রায় অন্ধকারে সেলফি তুললেও বোঝা যাবে না যে আলোর এক ফোঁটাও ঘাটতি ছিল কোথাও।

 

 

চার্জিং

তারবিহীন চার্জারের সবচেয়ে বড় সমস্যা, ফোনটি চার্জিং প্যাডের ওপর ঠিকভাবে বসানো, যাতে ফোন ও প্যাডে থাকা চার্জিং কয়েল সঠিকভাবে সংযুক্ত হয়। তার পরের চ্যালেঞ্জ, ফোনকে সে জায়গা থেকে একেবারেই না নাড়িয়ে ব্যবহার করা, যাতে কয়েল সরে না যায়। এই দুটি সমস্যার সমাধান করা হয়েছে নতুন ম্যাগসেফের (আইফোনের নতুন তারহীন চার্জিং সিস্টেম) মাধ্যমে। চার্জিং কয়েলযুক্ত ম্যাগসেফ চার্জিং প্যাড ফোনে থাকা চুম্বকের মাধ্যমে সঠিক অবস্থানে লেগে থাকবে, যাতে ফোন ব্যবহারের সময় তা সরে না যায়। এই ডিজাইন প্রথম অ্যাপল ওয়াচে ব্যবহার করেছিল অ্যাপল। নতুন একটি ম্যাগসেফ চার্জিং ডুয়োও অ্যাপল বাজারে এনেছে, যার মাধ্যমে ফোন ও ওয়াচ একত্রে চার্জ করা যাবে।

 

মডেলের ভেদাভেদ

আইফোন ১২ মিনি পাচ্ছে ৫.৪ ইঞ্চি, সুপার রেটিনা এক্সিআর ওলেড ডিসপ্লে, যার রেজল্যুশন ২৩৪০ী১০৮০ পিক্সেল, ঘনত্ব ৪৭৬ পিপিআই, ১২০০ নিট ব্রাইটনেস, ডলবি ভিশন ১০ বিট এইচডিআর সমর্থন এবং ২০ লাখ : ১ কন্ট্রাস্ট রেশিও। রিফ্রেশ রেট থাকছে আগের মতোই ৬০ হার্জ। মূল ১২ এবং আল্ট্রাওয়াইড ১২ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা, এ১৪ প্রসেসর, ম্যাগসেফ চার্জিং এবং ৫জিও পাচ্ছে আইফোন ১২ মিনি। আইপি ৬৮ ওয়াটারপ্রুফিং, ১৫ ওয়াট তারবিহীন, ২০ ওয়াট তারসহ চার্জিং সুবিধাও থাকছে এতে। ব্যাটারির আকৃতি জানা যায়নি, বলা হচ্ছে, টানা ১০ ঘণ্টা ভিডিও স্ট্রিম করতে পারবে এটি। স্টোরেজ ৬৪ থেকে ২৫৬ গিগাবাইট পর্যন্ত থাকছে, ফেস আইডি এবং অ্যাপল পেও বাদ যাচ্ছে না। পাওয়া যাবে পাঁচ রঙে—সাদা, কালো, লাল, সবুজ ও নীল। আর মূল্য শুরু হচ্ছে ৭২৯ ডলার থেকে, তবে ক্যারিয়ারের থেকে কিনলে পাওয়া যাবে ৬৯৯ ডলারে।

আইফোন ১২-র সঙ্গে মিনির পার্থক্য সামান্যই। ডিসপ্লের আকৃতি বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৬.১ ইঞ্চি, যার রেজল্যুশন ২৫৩২ী১১৭০ পিক্সেল, ৪৬০ পিপিআই ঘনত্ব। আর ব্যাটারি লাইফ ১১ ঘণ্টা ভিডিও স্ট্রিম বলে দাবি করেছে অ্যাপল। বাকি সব কিছু স্পেসিফিকেশন ১২ মিনির মতো। মূল্য শুরু ৭৯৯ ডলার থেকে।

আইফোন ১২ প্রোতে থাকছে আইফোন ১২-এর মতো একই ওলেড ডিসপ্লে, আকৃতি ৬.১ ইঞ্চি, রেজল্যুশন ২৫৩২ী১১৭০ পিক্সেল, আর ৪৬০ পিপিআই ঘনত্ব। ব্রাইটনেস পাওয়া যাবে ১২০০ নিট পর্যন্ত, ১০ বিট ডলবি ভিশন এইচডিআর কালার দেখাতে পারবে এটি। রিফ্রেশ রেট থাকছে ৬০ হার্জ। মূল ও আল্ট্রাওয়াইডের পাশাপাশি থাকছে ২.৫এক্স অপটিক্যাল জুমসমৃদ্ধ টেলিফটো লেন্স, যার রেজল্যুশন ১২ মেগাপিক্সেল, অ্যাপার্চার এফ/২.০। এই ক্যামেরার সঙ্গে মূল সেন্সর ও ওয়াইড মিলিয়ে ৫এক্স অপটিক্যাল এবং ১০এক্স ডিজিটাল জুম পাওয়া যাবে। আর ক্যামেরার ফোকাস ও অগমেন্টেড রিয়ালিটির জন্য থাকছে লাইডার সেন্সর। রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্যামেরার সামনে থাকা সব বস্তু ঠিক কত দূরে আছে তা শনাক্ত করতে পারবে আইফোন ১২ প্রো। স্টোরেজ শুরু হচ্ছে ১২৮ গিগাবাইট থেকে, সর্বোচ্চ ৫১২ গিগাবাইট। সফটওয়্যারের দিক থেকে অ্যাপল ১০ বিট ডলবি ভিশন এইচডিআর প্রো ভিডিও পাওয়া যাবে আইফোন ১২ প্রোতে, সঙ্গে থাকছে অ্যাপলের এআই জাদু মিশ্রিত ‘র’ ছবি তোলার সুবিধা, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অ্যাপল প্রোর’। ব্যাটারি লাইফ বলা হচ্ছে, ১১ ঘণ্টা টানা ভিডিও স্ট্রিম করা যাবে। এ ছাড়া বাকি সব ফিচার আইফোন ১২-র মতোই। মূল্য শুরু হচ্ছে ৯৯৯ ডলার থেকে।

আইফোন ১২ প্রো ম্যাক্সে আইফোন ১২ প্রোর সব কিছু থাকছে, বাড়তি থাকছে ডিসপ্লে সাইজ-৬.৭ ইঞ্চি, ২৭৭৮ী১২৮৪ পিক্সেল রেজল্যুশনের ওলেড প্যানেল। এইচডিআর, ডিসপ্লে ব্রাইটনেস বাকি আইফোন ১২ সিরিজের মতোই। ক্যামেরার টেলিফটো সর্বোচ্চ ১২এক্স ডিজিটাল, আর ব্যাটারি লাইফ ১২ ঘণ্টা স্ট্রিম করা ভিডিও। বাকি সব স্পেসিফিকেশন আইফোন ১২ প্রোর মতোই। মূল্য শুরু হচ্ছে ১০৯৯ ডলার থেকে।

 

অর্ডার ও ডেলিভারি

আইফোন ১২ ও ১২ প্রোর প্রি-অর্ডার শুরু হচ্ছে ১৬ অক্টোবর থেকে। পাওয়া যাবে অক্টোবর ২৩ থেকে। আইফোন ১২ মিনি ও আইফোন ১২ প্রো ম্যাক্সের প্রি-অর্ডার শুরু নভেম্বর ৬ থেকে, পাওয়া যাবে ১৩ নভেম্বর ২০২০ থেকে।

মজার বিষয় হচ্ছে, এবারের আইফোনের সঙ্গে থাকছে না চার্জার বা হেডফোন। শুধু লাইটেনিং টু ইউএসবি সি কেবল থাকছে ফোনের বক্সে। অ্যাপলের দাবি, তারা এ কাজটি করেছে শুধু পরিবেশের কথা মাথায় রেখে। কেননা বেশির ভাগ ব্যবহারকারীর বাসায় এর মধ্যেই চার্জার বা কম্পিউটার আছে। তবে ব্যবহারকারীরা এ সিদ্ধান্তে এর মধ্যেই হতাশ। আইফোনে তেমন নতুনত্ব না থাকায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বেগে ভুগছেন, যার প্রমাণ এক দিনেই অ্যাপলের স্টকের মূল্য কমেছে ২.৫ শতাংশ বা ৫৫ বিলিয়ন ডলার।

শুধু আইফোন ১২ সিরিজ নয়, বর্তমানে বাজারে থাকা আইফোন এসই, ১০আর এবং ১১-র বক্সেও আর পাওয়া যাবে না চার্জার ও ইয়ারপড।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা