kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

হুইলচেয়ারও আটকে রাখতে পারেনি অনিককে

জন্মগতভাবেই দুটি পা ছোট অনিক মাহমুদের। হুইলচেয়ারেই বেড়ে ওঠা তাঁঁর। তার পরও এই সীমাবদ্ধতাকে জয় করেছেন তিনি। তাঁর ডিজাইন করা টি-শার্ট বিশ্ববাজারে পেয়েছে খ্যাতি। তিনি ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্কে একজন টপরেটেড ফ্রিল্যান্সার। পেয়েছেন বেসিস সম্মাননাও। তৈরি করেছেন ১২ জন কর্মীর এক আইটি প্রতিষ্ঠানও। তাঁর সংগ্রামের কথা জানাচ্ছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

২২ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হুইলচেয়ারও আটকে রাখতে পারেনি অনিককে

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলকের কাছ থেকে বেসিস পুরস্কার নিচ্ছেন অনিক

শুরুটা যেভাবে

ছোটবেলা থেকেই অনিক মাহমুদের কম্পিউটারের প্রতি অনেক আগ্রহ। হুইলচেয়ারে করে কম্পিউটার শিখতে যেতেন। তা-ও বাসা থেকে আধাকিলোমিটার দূরে। সংসারে খানিকটা অর্থনৈতিক টানাপড়েন ছিল।

বিজ্ঞাপন

অনিক ভাবলেন, নিজে কিছু একটা করবেন। সে ভাবনা থেকেই পোড়াদহ বাজারে দেন অনিক বুকফেয়ার অ্যান্ড কম্পিউটারস। ২০১৮ সালের শুরুতে অনলাইনের মাধ্যমে গ্রাফিক ডিজাইনের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তখন মার্কেটপ্লেসের কাজ, কিভাবে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়, টাকা উত্তোলন করতে হয়, টাকা কিভাবে আয় করা যায়—এসব জানতে পারেন। অনিক বলেন, ‘স্বাভাবিক মানুষের মতো হাঁটাচলার ক্ষমতা নেই। ফ্রিল্যান্সিংয়ে ঘরে বসে আয় করা যায়, যা আমার জন্য সুবিধাজনক। ইউটিউবে প্রচুর ভিডিও দেখি। পেশা হিসেবে ফ্রিল্যান্সিংকেই বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ’

 

প্রথম কাজেই বাজিমাত

২০১৯ সালের ঘটনা। অনিক টি-শার্ট ডিজাইন করেছিলেন, যেটি এক বায়ার পছন্দ করেন। কাজটি ছিল ১০ ডলারের। কিন্তু কাজটি বায়ারের খুবই পছন্দ হয়েছিল। অনিক বলেন, ‘বায়ার ১০ ডলার তো দিলেনই, সঙ্গে টিপ দেন ১৫ ডলার। প্রথম কাজ থেকেই আয় হয় ২৫ ডলার। ’

 

কাজের ফিরিস্তি

টি-শার্ট ডিজাইন নিয়ে অনিকের কাজ। বর্তমানে আপওয়ার্কে একজন টপরেটেড ফ্রিল্যান্সার। ফাইবারে লেভেল ২ সেলার। নিজের কাজ সম্পর্কে বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার আলাদা প্রজেক্টে কাজ করেছি। ’ অনিক তাঁর কাজ মাইক্রোস্টক সাইটে রেখেছেন, যেখানে ক্রেতারা এসে পছন্দ করে কাজ নিতে পারেন। এ ছাড়া সাটারস্টক, অ্যাডোবস্টক, ক্রিয়েটিভ ফ্যাবরিকা, ডিজাইন বান্ডেলসহ আরো বেশ কিছু সাইটেও রয়েছে তাঁর কাজ। অনিক বলেন, ‘এখানে কাজ করার অনেক সুবিধা আছে। আমার একটি ডিজাইন সব সাইটে দিতে পারি। একটি ডিজাইন অনেকবার সেল হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। ’ বর্তমানে তিনি কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, পেরু, ব্রাজিল, মরক্কো, পোল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের কাজ করছেন। অনিকের ইউটিউব চ্যানেলের নাম T-Shirt Design By Anik এবং ফেসবুক পেজের নাম Freelancer Anik.

 

কোর্স করান

বর্তমানে তিনি প্রফেসর আইটি জোনে দুটি কোর্স করান, যার মধ্যে একটি হলো টি-শার্ট ডিজাইন রেকোডেড কোর্স। আরেকটি হলো টি-শার্ট ডিজাইন লাইভ কোর্স।

দুটি কোর্সে মোট ৫৪টি ক্লাস। রেকর্ড করা কোর্সে যাঁরা যুক্ত হন, তাঁদের একটি ব্যক্তিগত ফেসবুক গ্রুপে অ্যাড করে নেওয়া হয়। সেখানে সমস্যার সমাধান দেওয়ার পাশাপাশি প্রতি মাসে এক থেকে দুটি করে লাইভ ক্লাসও নেন তিনি। প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি ডিজাইন লাইভ রিভিউ করা হয়। টি-শার্ট ডিজাইন তো আছেই । পাশাপাশি অনিক ওন কনসেপ্টে ডিজাইন, কপিরাইট চেক, ্রপোর্টফোলিও সাইট, ফ্রিল্যান্সিং সাইট, মাইক্রোস্টক সাইট, কিভাবে বায়ারের সঙ্গে কাজ করতে হয় তা-ও শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে বলেন।

 

শিখতে হয়েছে ইংরেজি

বায়ারের সঙ্গে যোগাযোগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইংরেজি। অনিক নিজ থেকেই একটি উপায় বের করেন। অনিক বলেন, ‘প্রতিদিন পাঁচটি করে ইংরেজি শব্দ মুখস্থ করতে থাকি। সপ্তাহে ছয় দিনে ৩০টি করে ইংরেজি শব্দ মুখস্থ হতো। এভাবে দু-তিন মাসের মধ্যেই ইংরেজি অনেকটাই শিখে ফেলি। ’ এ ক্ষেত্রে সফলতা পেতে ইংরেজি না জানাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বলে জানান তিনি।

 

শারীরিক সীমাবদ্ধতা আছে যাঁদের

অনিকের মতো যাঁদের শারীরিক সীমাবদ্ধতা আছে, তাঁদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং একমাত্র স্বাধীন পেশা- এমনটাই মনে করেন অনিক। বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা আছে। বেসরকারি চাকরিও করেন অনেকে। কিন্তু তাঁদের যাতায়াতের জন্য সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক অফিসে লিফট থাকে না। প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতের সুব্যবস্থা নেই। এসব বিবেচনায় শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং ভালো। স্বাধীনভাবে কাজ করে ঘরে বসে আয় করা সম্ভব। ’ অনিক আরো জানান, শারীরিকভাবে সীমাবদ্ধতা আছে যাঁদের, তাঁরা অনিকের ‘প্রফেসর আই জোন’ থেকে কোনো কোর্স করতে চাইলে ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট দেওয়া হবে।

 

মনের জোরই আসল শক্তি

সফলতার পেছনে মনের জোরই আসল শক্তি। অনিক বলেন, ‘সব সময় বিশ্বাস করি মানুষের হাত তিনটি। ডান হাত, বাঁ হাত আর অজুহাত। আসলে অজুহাতটা দেখা যায় না, কিন্তু সেটা খুবই ভয়ংকর। ’

২০২০ সালের ঘটনা। দেশে প্রচণ্ড শক্তিশালী আম্ফান ঘূর্ণিঝড় হলো। বেশির ভাগ জায়গায় বিদ্যুত্সংযোগ ছিল না। তখন অনিকের হাতে ছিল আটটি অর্ডার। অর্ডারগুলো সময়মতো না দিলে অ্যাকাউন্টের ক্ষতি হবে। অনিকের চাচাতো ভাই থাকতেন পৌরসভা এলাকায়। সেখানে বিদ্যুৎ ছিল। তিনি চাচাতো ভাইয়ের বাসায় চলে যান। কাজগুলো শেষ করে বায়ারকে বুঝিয়ে দেন। কাজ সময়মতো সঠিকভাবে করতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেন না। সে কারণে বায়াররাও তাঁর কাজে খুশি। বর্তমানে অনিক দৈনিক ১৫-১৬ ঘণ্টা কাজ করেন। তাঁর এবং টিমের মাসিক গড় আয় দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ ডলারের মতো।

 

মা বড় অনুপ্রেরণা

অনিকের বাবা মোজাহের আলী হালসা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে মৃত্যুবরণ করেন। মা শিরিন আক্তার গৃহিণী। মা, স্ত্রী, বড় ভাই, ভাবিসহ পরিবার নিয়ে অনিক থাকেন কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহে। এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে অনিক বলেন, ‘এইচএসসিতে বিভিন্ন রুমে গিয়ে বিভিন্ন ক্লাস হওয়ার কারণে এইচএসসিতে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। ’ মা তাঁকে প্রচুর সাহায্য করেন। অনিক বলেন, ‘কাজ করার উৎসাহ পাই আমার মায়ের কাছ থেকে। তিনি চান আমি আরো ভালো কিছু করি। আমি যেন দেশের জন্য কিছু করতে পারি। ’

 

দক্ষতা সবার আগে

অনিক বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিং করে হাজার হাজার ডলার আয় করা সম্ভব। এটি মুদ্রার এক পিঠ। অপর পিঠ হলো হাজার হাজার ডলার আয়ের জন্য চাই প্রচুর দক্ষতা। সঠিক গাইডলাইনসহ ফ্রিল্যান্সিং শিখতে হবে। চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রতারিত হওয়া যাবে না। সব সময় বলি, ফ্রিল্যান্সিং শেখার আগে আপনার ট্রেইনার বা আপনি যেই প্রতিষ্ঠান থেকে কাজ শিখছেন, সেটি আগে যাচাই করুন। ’

 

টি-শার্ট ডিজাইনের চাহিদা প্রচুর

টি-শার্ট ডিজাইনের অনেক চাহিদা মার্কেটপ্লেসে। কারণ হিসেবে অনিক বলেন, ‘আমরা যেসব দেশের ক্লায়েন্টদের জন্য কাজ করি, তাঁরা একই ডিজাইনের টি-শার্ট খুব বেশিদিন পরেন না। কোথাও ঘুরতে যাবেন, তাঁদের চাই নতুন টি-শার্ট; কোনো প্রগ্রামে যাবেন, চাই নতুন টি-শার্ট। প্রগ্রাম কিংবা ভ্রমণের সঙ্গে যায় চট করে এ রকম ডিজাইনের টি-শার্ট বানিয়ে নেন তাঁরা। এ জন্য প্রচুর চাহিদা টি-শার্ট ডিজাইনের। ’ ২০১৯ সালের শেষের দিকে আপওয়ার্কে প্রায় পাঁচ হাজার ডলারের টি-শার্ট ডিজাইনের কাজ পান তিনি। এটি মার্কেটপ্লেসে তাঁর অন্যতম বড় কাজ। এই কাজ সফলভাবে করার জন্য কয়েকজনকে নিয়ে টিম গঠন করেন। টিমের সদস্যরা তাঁর কাছেই কাজ শিখে নিয়েছেন।

 

টি-শার্ট ডিজাইন নিয়ে অনিকের তিনটি টিপস

অনিক টি-শার্ট ডিজাইন করে পেয়েছেন প্রচুর খ্যাতি। এই কাজে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে। যাঁরা টি-শার্ট ডিজাইন নিয়ে কাজ করতে চান, অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি তাঁদের জন্য তিনটি টিপস দেন। এক. প্রচুর ধৈর্য থাকতে হবে। বায়ারের সঙ্গে কখনোই তর্ক করা যাবে না। দুই. সৎ হতে হবে। বায়ারের সঙ্গে অসততা করা যাবে না একেবারেই। তিন. অপরের কাজ কপি করে নিজের বলে চালানো যাবে না। এটি আসলেও খুব খারাপ একটি কাজ। অনেকেই নতুন অবস্থায় অপরের কাজ হুবহু কপি করে নিজের নামে চালিয়ে দেন। এটি অপরাধ। নিজের ডিজাইন আইডিয়া নিজেকে বের করতে হবে। ডিজাইন কনসেপ্ট মাথায় আসছে না। তাহলে বেশি বেশি করে ডিজাইন দেখেন। স্কেচ করার অনুশীলন করুন। কিন্তু অপরের কাজ নিজের বলে কখনোই চালাবেন না।

 

অনিকের যত অর্জন

২০২১ সালে বেসিস আয়োজিত বেসিস ফ্রিল্যান্সিং অ্যাওয়ার্ডে বিশেষভাবে সক্ষম বিভাগে বর্ষসেরা ফ্রিল্যান্সার হন তিনি। এ ছাড়া ২০২০ সালে সফল ফ্রিল্যান্সার ও তরুণ উদ্যোক্তা পুরস্কার পান। কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ বাজারে প্রফেসর আইটি জোন লিমিটেড নামে একটি কম্পানি চালু করেছেন। সেখানে কাজ করেন ১২ জন কর্মী। ভবিষ্যত পরিকল্পনা হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া।



সাতদিনের সেরা