kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

ধন্যবাদ টিম সুরক্ষা

মাত্র তিন সপ্তাহে কভিড ভ্যাকসিন রেজিস্ট্রেশনের জন্য সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেছেন এ দেশের পাঁচ প্রকৌশলী। একই সঙ্গে বাঁচিয়ে দিয়েছেন দেশের ১৫০ কোটি টাকাও। সুরক্ষায় প্রতি মিনিটে এখন এক লাখেরও বেশি মানুষ নিবন্ধন করতে পারছেন। এরই মধ্যে নিবন্ধন করেছেন এক কোটিরও বেশি মানুষ। বিস্তারিত জানাচ্ছেন নাদিম মজিদ

১ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ধন্যবাদ টিম সুরক্ষা

টিম সুরক্ষা, বাঁ দিক থেকে মো. গোলাম মাহবুব, মো. আব্দুল্লাহ বিন ছালাম, এ এস এম হোসনে মোবারক, মো. হারুন অর রশীদ ও আবদুল্লাহ আল রহমান

করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা কমাতে টিকা প্রদানের কাজ করছে বাংলাদেশ সরকার। পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ঝঞ্ঝাট করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে সুরক্ষা ওয়েব ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন। টিকার জন্য নিবন্ধন থেকে শুরু করে টিকা ও সনদ প্রদান এবং ভেরিফিকেশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের কাজ করেছে বাংলাদেশের আইসিটি ডিভিশনের পাঁচজন প্রকৌশলীর একটি দল।

 

সুরক্ষা অ্যাপ কিভাবে কাজ করছে?

এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেওয়ার দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে কারো ফলাফল বের করা এখনো বেশ কঠিন ব্যাপার। ফলাফলের জন্য সাইট ব্রাউজ করতে গেলে দেখা যায়, অতিরিক্ত চাপের কারণে সার্ভার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেখানে ১৮ থেকে ২০ লাখ শিক্ষার্থীর ফলাফল দেখতে গেলে সার্ভারে এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়, সেখানে সুরক্ষা অ্যাপ্লিকেশন শুরুতেই কমপক্ষে পাঁচ কোটি নাগরিকের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কোনো প্রকার সার্ভার জটিলতা ছাড়াই টিকা ব্যবস্থাপনার কাজ শুরু করে।  

সাদা চোখে সুরক্ষা অ্যাপ্লিকেশনের কাজ খুব সহজ মনে হলেও এটি এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। কেউ টিকার জন্য নিবন্ধন করতে চাইলে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা হয়। ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, শ্বাসকষ্টসহ টিকা জটিলতা সংক্রান্ত কিছু তথ্য, আবেদনকারীর বর্তমান ঠিকানা অনুসারে টিকাকেন্দ্র বাছাই করার সুযোগ দেওয়া হয়। ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড ভেরিফাই করে যেকোনো আবেদনকারীর আবেদন গ্রহণ করা হয়।

আবেদনকারীর আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট টিকাকেন্দ্রে পৌঁছে যায়। সেই টিকাকেন্দ্র নিজেদের টিকা দান করার ক্ষমতা অনুসারে ধারাবাহিকভাবে আবেদনকারীদের সময় ও বুথ নির্দিষ্ট করে সিস্টেম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেসেজ পাঠিয়ে থাকে।

নিবন্ধন-পরবর্তী যেকোনো সময় আবেদনকারী সুরক্ষা ওয়েব পোর্টাল বা অ্যাপ থেকে টিকা কার্ড ডাউনলোড করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে দুটি ডোজ সম্পন্ন করার পর ভ্যাকসিন সনদও গ্রহণ করতে পারেন।

নির্দিষ্ট দিনে আবেদনকারী টিকাকেন্দ্রে গিয়ে টিকা নেওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে সেই তথ্য টিকাদান কেন্দ্র থেকে সার্ভারে আপডেট দেওয়া সম্ভব হয়। কোন টিকা, কত তারিখ দেওয়া হলো—থাকে সেসব তথ্যও। আবেদনকারীর টিকা কার্ডের তথ্য সঠিক কি না, তা সুরক্ষা অ্যাপ থেকেও যাচাই করা যায়।

 

পাঁচ সদস্যের দল

সুরক্ষা অ্যাপ তৈরির শুরু থেকে কাজ করছেন আইসিটি ডিভিশনে কর্মরত পাঁচজন সরকারি প্রকৌশলী। তাঁরা হলেন মো. হারুন অর রশীদ, মো. আব্দুল্লাহ বিন ছালাম, আবদুল্লাহ আল রহমান, এ এস এম হোসনে মোবারক ও মো. গোলাম মাহবুব। শুরু থেকেই দলীয়ভাবে কাজ করছেন তাঁরা। সবাই কাজ করছেন সমান দায়িত্ব নিয়ে। নির্দিষ্টভাবে কাউকে দলনেতাও নির্বাচন করা হয়নি। মো. গোলাম মাহবুব বলেন, ‘আমরা সবাই সমানভাবে এই প্ল্যাটফর্মে কাজ করে যাচ্ছি। সবাই সমমনা হওয়ায় নির্দিষ্ট করে কাউকে দলনেতাও ঘোষণা করার প্রয়োজন হয়নি।’

 

সুরক্ষা তৈরির পেছনের গল্প

সুরক্ষা অ্যাপ্লিকেশন তৈরির পেছনে কাজ করা সবাই চাইছিলেন দেশের জন্য কিছু করার। নিজেদের প্রকৌশল শিক্ষা কাজে লাগানোর সুযোগ খুঁজছিলেন তাঁরা। গত বছর মহামারি শুরু হওয়ার সময় তাঁরা আইসিটি ডিভিশনের জেলা প্রগ্রামার হিসেবে বিভিন্ন জেলায় দায়িত্বরত ছিলেন। দলের এক সদস্য মো. হারুন অর রশীদ ছিলেন টাঙ্গাইল জেলায়। টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসককে ত্রাণ সহায়তা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাপনা সিস্টেম তৈরির পরিকল্পনা দেন বিভিন্ন জেলায় কর্মরত এই পাঁচজন আইসিটি কর্মকর্তা। সেই পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করে এবং তাঁদের কাজ শুরু করার জন্য সুযোগ দেয়।

 

আর এই দলটি যেন একসঙ্গে কাজ করতে পারে সে লক্ষ্যে তাঁদের সবাইকে আইসিটি ডিভিশনের প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। তাঁরা সফলভাবে কেন্দ্রীয় মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাপনা সিস্টেম তৈরি করেন। এই সিস্টেমের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে গত বছর ৫০ লাখ অসহায় পরিবারের মধ্যে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে প্রদান করা হয়। কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে দলটির আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এরপর তাঁরা টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা এবং উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জাতীয় টিকা কমিটির কাছে দেশি-বিদেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের টিকা ব্যবস্থাপনা সিস্টেম উপস্থাপন করে। জাতীয় টিকা কমিটির সদস্য এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সচিব এন এম জিয়াউল আলম পিএএ বলেন, ‘সেসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জাপানের সিস্টেমের বিক্রয়মূল্য চাওয়া হয় ১৫০ কোটি টাকা। তাদের প্রস্তাবের বিপরীতে আইসিটি ডিভিশনের কেন্দ্রীয় মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার তৈরি করা দলটিও নিজেদের প্রস্তাব উপস্থাপন করে। নিখরচায় তারা নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে তৈরি করে দেওয়ার কথা জানায়।’

কেন্দ্রীয় মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাপনা সিস্টেমটি সুন্দরভাবে কাজ করার কারণে তাদের সিস্টেমটি তৈরির সুযোগ দেয় ‘জাতীয় কভিড-১৯ ভ্যাকসিন কমিটি’। তাদের সময় দেওয়া হয় তিন সপ্তাহ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তারা সিস্টেমটি তৈরি করে দিতে সক্ষম হয়। ২৫ জানুয়ারি সুরক্ষা অ্যাপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

সুরক্ষাদলের সদস্য মো. হারুন অর রশীদ বলেন, ‘গত বছর করোনা শুরু হওয়ার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিয়ে আসার আহ্বান জানান। সেই আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা সেন্ট্রাল এইড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরির কাজ শুরু করি। কেন্দ্রীয় মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাপনা সিস্টেম এবং সুরক্ষা অ্যাপ তৈরির সুযোগ দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।’

ছিল বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও

সারা দেশে টিকার উপযোগী জনসংখ্যা ১২ কোটি। তাদের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে এসে একটি ব্যবস্থাপনা তৈরি করাটা ছিল দলটির জন্য বেশ কঠিন একটি কাজ। তাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল সময়ের সীমাবদ্ধতা। পুরো ব্যবস্থাটি তৈরি করার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল মাত্র তিন সপ্তাহ।

এ ছাড়া অন্যান্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিল আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা। এনআইডি সার্ভার থেকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে থাকে। সার্ভারের নির্দিষ্ট ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সুরক্ষা অ্যাপের জন্য তথ্য চাইতে গেলেও যেন এনআইডি সার্ভার ঠিক থাকে, সেটি মাথায় রাখাও ছিল দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক কাজ। একসঙ্গে সব মোবাইল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সংযোগ স্থাপন করে নাগরিকদের কাছে প্রতিটি এসএমএস বার্তা নিশ্চিত করেছে।

তাদের আরেকটি চ্যালেঞ্জ ছিল সার্ভারের চাপ। একসঙ্গে প্রচুর মানুষ একই ওয়েবসাইট থেকে নিবন্ধন করতে চাইলে সার্ভারে চাপ পড়ে। এতে সার্ভার ডাউন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান নিজেদের সার্ভার অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিস বা গুগল ক্লাউডে রেখে থাকে। এ ধরনের ক্লাউডে সার্ভার রাখার অসুবিধা হলো এতে তথ্য দেশের বাইরে চলে যায়। জনসাধারণের তথ্যের নিরাপত্তার জন্য সার্ভার এসব ক্লাউডে রাখে না বাংলাদেশ সরকার। এই চ্যালেঞ্জ উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য দলটি ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার ব্যবহার করছে।

তাদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ ছিল টিকা নিবন্ধন করতে গিয়ে যেন সবাই ভিড় না করেন। নিবন্ধন করার জন্য ভিড় করলে সেখান থেকেও করোনা ছড়ানোর সুযোগ থাকে। তাই নিবন্ধনপ্রক্রিয়াকে নির্বিঘ্ন করার জন্য ‘সেলফ রেজিস্ট্রেশন’-এর ব্যবস্থা রাখা হয়, যেন যে কেউ চাইলে ঘরে বসে নিবন্ধন করতে পারেন। ফলে টিকা নিবন্ধন করার জন্য লজিস্টিকস, জনশক্তিসহ পেছনের বিশাল পরিমাণের খরচও বাঁচিয়ে দিয়েছে দলটি।

টিকার অগ্রাধিকার বাছাইয়ের জন্যও প্রযুক্তিগত সমাধান করেছে সহজতর।

প্রথম দিকে সম্মুখসারির যোদ্ধাদের টিকা নিশ্চিত করার জন্য তাঁদের আলাদা প্রগ্রামিং করতে হয়েছিল। তাঁরা সাধারণ বয়সসীমার মধ্যে না থাকলেও তাঁদের এনআইডি নম্বর দিয়ে যেন রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হয়েছিল সুরক্ষা টিমকে। টিকাকেন্দ্রের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নিবন্ধন করেছে নিয়ন্ত্রিত। আবার বিদেশগামী ব্যক্তি এবং শিক্ষার্থীরা দেশ থেকে টিকা নিয়ে যেতে পারলে সে দেশে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হচ্ছে না। এতে তাঁদেরও বেশ অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে।

 

হচ্ছে একটি বিশাল ডাটাবেইস

করোনা টিকা নিবন্ধন করার সময় আবেদনকারীকে ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি দিতে হচ্ছে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, আগে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কি না সেসবেরও তথ্য। এতে সুরক্ষা অ্যাপে তৈরি হচ্ছে একটি বিশাল ডাটাবেইস।

 

ভবিষ্যৎ ব্যবহার

করোনা টিকা প্রদান করার জন্য সুরক্ষা অ্যাপ তৈরি করা হলেও ভবিষ্যতে এ ব্যবস্থার সুফল পাবে বাংলাদেশ। বিশাল এসব তথ্যভাণ্ডার ভবিষ্যতে নানা রকম পরিসংখ্যানে ব্যবহার করা যাবে। সুরক্ষা সিস্টেমের মাধ্যমে নিয়মিত শিশুদের টিকাসহ অন্যান্য টিকা অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে সহজ ইউজার ফ্রেন্ডলি এই সিস্টেম অন্যান্য দেশের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সরবরাহ করা যেতে পারে। 

ভবিষ্যতে সরকারি কর্মকর্তাদের এ ধরনের সিস্টেম উদ্ভাবনে সম্পৃক্ত করা গেলে সরকারি সেবার মান যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি সরকারের বিপুল অর্থেরও সাশ্রয় হবে এবং পাশাপাশি অনেক মেধাবী সফটওয়্যার প্রকৌশলী বিদেশমুখী না হয়ে সরকারি চাকরিতে নিজেদের নিয়োজিত করতে উৎসাহী হবেন।



সাতদিনের সেরা