kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

কী এলো এবারের সিইএসে

প্রতিবছরের শুরুতেই আয়োজন করা হয় প্রাত্যহিক জীবনসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী ‘কনজ্যুমার ইলেকট্রনিকস শো (সিইএস)’। করোনার জন্য এবারের আয়োজনটি হয়েছে অনলাইনে। প্রদর্শনীতে নির্মাতারা নিজেদের পণ্য নিয়ে উপস্থিত থাকলেও ছিল না সাধারণ দর্শকের প্রবেশাধিকার। বিস্তারিত এস এম তাহমিদের কাছে

২৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কী এলো এবারের সিইএসে

করোনার কারণে স্বাভাবিকভাবেই এবারের সিইএসের প্রদর্শনীতে করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, ডিজিটাল স্বাস্থ্য এসবের হাজিরা ছিল। তবে স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফাইভজি, স্মার্ট শহর, যোগাযোগ, যানবাহন প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের সর্বশেষ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনই নজর কেড়েছে সবার।

 

৮কে টিভির জয়জয়কার

বাজারে সবেমাত্র ৪কে রেজল্যুশনের টিভি জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। উচ্চ রেজল্যুশনে মুক্তি পাচ্ছে নতুন টিভি অনুষ্ঠান, সিনেমা; এমনকি গেমিং কনসোলগুলোতেও মাত্রই ৪কে রেজল্যুশন মূলধারায় এসেছে। অথচ এবারের সিইএসে টিভি নির্মাতারা হাজির হয়েছেন ৮কে রেজল্যুশনের টেলিভিশন নিয়ে। শুনতে ৪কের দ্বিগুণ মনে হলেও, গাণিতিকভাবে ৮কে রেজল্যুশন তার থেকে চার গুণ বেশি। নতুন মডেলগুলোর মধ্যে আছে এলজি কিউএনইডি মিনি-এলইডি ৮কে, স্যামসাং কিউ৯০০০এ নিও কিউএলইডি, সনি জেড৯জে ব্রাভিয়া এক্সআর এবং টিসিএল ৬ সিরিজ ৮কে। প্রতিটি টিভিতেই ওএলইডি অথবা মিনি এলইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, আর টিভিগুলোর আকৃতি ৮৫ ইঞ্চিতে গিয়ে ঠেকেছে। শুধু রেজল্যুশনই বাড়েনি, টিভিগুলোর প্যানেলে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সেগুলোর কালার, ব্রাইটনেস ও কন্ট্রাস্টের মান বেড়েছে বহুগুণ। এলজি বরাবরের মতো কিছু অদ্ভুত প্রযুক্তিও দেখিয়েছে। যেমন স্বচ্ছ বা ভাঁজযোগ্য টিভি, যদিও সেগুলো বিশেষায়িত কাজের বাইরে ব্যবহারের উপায় নেই। মজার বিষয় হচ্ছে, টিভিগুলোর দাম গত বছরের চেয়ে প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। যদিও এখনো তা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালে আসেনি, কিন্তু ৮কে রেজল্যুশনের কনটেন্ট জনপ্রিয় হতে হতে সেটাও চলে আসবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।         

          

ভবিষ্যতের গাড়ি

জ্বালানি তেল ফুরিয়ে আসছে, বিশ্ব ঝুঁকছে বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে। গাড়ির এ আমূল পরিবর্তনকে ঘিরে প্রতিবারের মতো এবারও নির্মাতারা পরীক্ষামূলক বেশ কিছু মডেলের গাড়ি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন এবারের সিইএসে। এর মধ্যে আছে ক্যাডিল্যাকের মতো কল্পকাহিনির উড়ন্ত গাড়ি থেকে শুরু করে হারম্যান বা স্যামসাংয়ের মতো শুধু গাড়ির ভেতরের ডিজাইনে পরিবর্তনের প্রযুক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা ক্যাডিল্যাক হাজির হয়েছিল বেশ কিছু নতুন বাহন নিয়ে, তবে তাদের ই-ভিটিওএল (ভার্টিক্যাল টেক-অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং) উড়োজাহাজটি সবচাইতে চমকপ্রদ। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম এ বাহনটি যাত্রীদের নিয়ে রানওয়ে ছাড়াই উড়তে পারে। আর সেটি চলবেও বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহার করে। মূলত যেসব ব্যবহারকারীকে দ্রুত এক শহর থেকে অন্য শহরে চলাফেরা করতে হয়, তাঁদের জন্যই এটি তৈরি করার কথা ভাবছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। তবে এটির বাইরেও বেশ কিছু বৈদ্যুতিক গাড়ির দেখা মিলেছে সিইএসে। গাড়ির ভেতরটা কিভাবে প্রযুক্তির মাধ্যমে বদলে দেওয়া যায়, সেটা তুলে ধরেছে হারম্যান ও স্যামসাং। দুটি প্রতিষ্ঠানই নতুন ককপিট ডিজাইন দেখিয়েছে। মজার ব্যাপার, ডিজাইন দুটিতে মিল আছে বেশ। প্রতিষ্ঠান দুটিই ড্যাশবোর্ডে বড়সর ডিসপ্লে বসিয়েছে। গাড়ি চালানোর সময় যার বেশির ভাগটাই ড্যাশবোর্ডের ভেতরে অবস্থান করবে আর পার্কিং করার পর বেরিয়ে আসবে ৪৯ ইঞ্চি এই ওলেড ডিসপ্লে। শুধু সামনেই নয়, পেছনের আসনের যাত্রীদের জন্যও থাকছে আলাদা টাচ ডিসপ্লে, যার মাধ্যমে সামনের স্ক্রিনে চলমান ভিডিও বা গেম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। উচ্চমানের সংগীতের জন্য হারম্যান প্রতিটি আসনে আলাদা স্পিকারসহ উচ্চমানের সাউন্ড হার্ডওয়্যার বসানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ফলে আগামী দিনের গাড়িগুলো হয়ে উঠবে একেকটি মিনি গেমিং সেন্টার বা কনসার্ট হল।

    

নতুন সব ল্যাপটপ

প্রতিবছরের শুরুতেই নতুন মডেলের ল্যাপটপের দেখা মিলে থাকে সিইএসে, এবারও ব্যতিক্রম নয়। এবারের মূল আকর্ষণ ছিল ইন্টেল ও এএমডির সর্বশেষ প্রসেসর এবং এনভিডিয়ার নতুন ৩০০০ সিরিজের জিপিউসমৃদ্ধ ল্যাপটপগুলো। এসার, আসুস, লেনোভো থেকে শুরু করে ডেল, এলজি এবং রেজারও তাদের বর্তমান সিরিজগুলোতে নতুন হার্ডওয়্যারসমৃদ্ধ মডেল যুক্ত করেছে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে আলাদা বলা যায় আসুসের জেনবুক ডুয়ো, আরওজি ফ্লো এক্স১৩, এসার প্রেডিটর ট্রাইটন ৩০০ এসই এবং লেনোভো থিনংবুক প্লাস। এসারের ল্যাপটপটি শুধু অত্যাধুনিক ডিজাইনের নয়, বরং মাত্র ১৪০০ ডলারে ইন্টেলের ১১তম প্রজন্মের প্রসেসর এবং এনভিডিয়া ৩০৬০ জিপিউসমৃদ্ধ একমাত্র গেমিং ল্যাপটপও বটে। তার ওপর ল্যাপটপটি ১৪ ইঞ্চি এবং বেশ হালকা গড়নের। ফলে সেটি গেমারদের নজর কাড়তে বাধ্য। আরওজি ফ্লো এক্স১৩ আসুসের তৈরি হালকা-পাতলা গেমিং ল্যাপটপ, কিন্তু এটির মূল আকর্ষণ আলাদা জিপিউ। ফলে ভবিষ্যতে জিপিউ বদলানো কোনো সমস্যাই নয়। আলাদাভাবে ল্যাপটপে জিপিউ ব্যবহারের জন্য এনক্লোজার আগে বাজারে দেখা গেলেও এবারের ল্যাপটপে আসুস জিপিউ এনক্লোজার করেছে একটি পোর্টেবল হার্ড ডিস্কের সমান। তাই চাইলে ব্যাকপ্যাকে ল্যাপটপ ও জিপিউ দুটিই বহন করা যাবে। আসুস জেনবুক ডুয়ো ও লেনোভো থিংকবুক প্লাস—দুটি ল্যাপটপেই আছে দুটি ডিসপ্লে, কিন্তু সেসবের ব্যবহার সম্পূর্ণ আলাদা। আসুসের মডেলটি আগের জেফিরাস ডুয়ো বা জেনবুক ডুয়ো প্রোয়ের মতো, মূল ডিসপ্লের পাশাপাশি একটি চিকন টাচ স্ক্রিন দেওয়া হয়েছে কি-বোর্ডের ঠিক ওপরে। সেটি ব্যবহার করা যাবে বাড়তি মনিটর হিসেবে। জেনবুক ডুয়োর মূল্য জেফিরাস বা জেনবুক ডুয়ো প্রোয়ের প্রায় অর্ধেক; ফলে ব্যবহারকারীদের নাগালে আসছে ডুয়াল ডিসপ্লে ল্যাপটপ। আর লেনোভোর ক্ষেত্রে বাড়তি ডিসপ্লেটি ল্যাপটপের মূল ডিসপ্লের ঠিক পেছনে দেওয়া হয়েছে। ই-ইংক প্রযুক্তির ডিসপ্লেটি চাইলে বই বা ডকুমেন্ট পড়ার জন্য ব্যবহার করা যাবে মূল ডিসপ্লে চালু না করেই। এ প্রযুক্তিটি অফিসে বা ক্লাসরুমে কাজে আসবে বলে দাবি লেনোভোর।

 

কভিড ১৯ সম্পর্কিত প্রযুক্তিপণ্য

গেমিং পণ্য নির্মাতা রেজার একটি পরীক্ষামূলক মাস্ক হাজির করলেও সেটি বাজারে আসবে কি না তা জানা যায়নি। মাস্কটি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে স্বচ্ছ প্লাস্টিক, যাতে মাস্ক ব্যবহারে চেহারা ঢাকা না পড়ে। দুটি এন৯৫ মানের ফিল্টার থাকছে এতে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্যানিটাইজ করার প্রযুক্তি মাস্কের মধ্যেই দিয়েছে রেজার। সঙ্গে রেজারের ট্রেডমার্ক ক্রোমা আরজিবি লাইটিং। ব্যবহারকারীদের কথাবার্তা যাতে চাপা না পড়ে সে জন্য মাস্কে থাকছে স্পিকার। দর্শকরা মাস্কটিকে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানানোয় সেটি বাণিজ্যিকভাবে তৈরির চিন্তা করছে রেজার। এদিকে পাবলিক টয়লেট থেকে যাতে জীবাণু ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য নতুন টয়লেট নিয়ে হাজির হয়েছে কোহলার। তাদের টয়লেটে স্পর্শ না করেই ফ্লাশ করার প্রযুক্তি দেওয়া হয়েছে। যেহেতু টয়লেটের ফ্লাশ হ্যান্ডেল থেকে প্রচুর জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে সে জন্যই তারা প্রক্সিমিটি সেন্সর ব্যবহার করেছে বলে দাবি কোহলারের।

 

নতুন সব গৃহস্থালি রোবট

ঘরের নানা ধরনের কাজে সাহায্যের জন্য বট হ্যান্ডি নামের রোবট দেখিয়েছে স্যামসাং। ছোটখাটো কাজ, যেমন কাপড় ভাঁজ করা বা গ্লাসে পানি ঢেলে দেওয়া, টেবিলে খাবার দেওয়া বা রান্নার সময় উপকরণ এগিয়ে দেওয়ার মতো কাজগুলো এটি করবে। স্যামসাংয়ের দাবি, রোবটটি ভবিষ্যতে আরো অনেক কাজ করতে পারবে, কেননা সেটির সফটওয়্যার এখনো বেটা পর্যায় আছে আর প্রতিনিয়তই শিখছে নতুন সব কাজ। স্যামসাং চেষ্টা করছে রোবটটিকে বৃদ্ধ ও শিশুদের সাহায্যকারী হিসেবে তৈরি করার। মানবসাদৃশ্যের বদলে রোবটটিকে করা হয়েছে ছিমছাম গড়নের, যাতে সেটি সহজেই ঘরে চলাফেরা করতে পারে। তবে এই রোবট শিগগিরই বাজারে পাওয়া যাবে না। যেটা পাওয়া যাবে, সেটা হচ্ছে স্যামসাং জেটবট ৯০ এআই+। রোবটিক এ ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ঘরের ম্যাপ এআইর মাধ্যমে শিখে নেবে। ফলে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ঘরকে রাখবে পরিষ্কার।

 

এসেছে কিছু নতুন ফোনও

বেশ কিছু নতুন ফোনের দেখা মিলেছে সিইএসে, আর এ আয়োজন শেষের পরপরই স্যামসাং ঘোষণা করেছে নতুন ফ্ল্যাগশিপ সিরিজ ‘এস২১’। কিন্তু সিইএসে দেখা সবচেয়ে চমকপ্রদ ফোন প্রযুক্তি—রোলেবল ডিসপ্লে যুক্ত দুটি ফোন। এলজি ও টিসিএল দুটি কম্পানিই দেখিয়েছে তাদের পরীক্ষামূলক স্মার্টফোন, যেসবের ডিসপ্লে রোল করে ফোনের ভেতরে ঢুকে যেতে সক্ষম। এতে সুবিধা, ভাঁজ করার প্রয়োজন নেই; ফোনগুলো সাধারণ অবস্থায় আর দশটি ফোনের মতো ব্যবহার করা যাবে। প্রয়োজনে অপশন চালু করা মাত্র ডিসপ্লেগুলো রোল করে ছড়িয়ে ট্যাবলেট আকৃতি ধারণ করবে। এলজি ধারণা করছে ফোনটি এ বছরই বাজারে আনতে পারবে, তবে টিসিএল এ ব্যাপারে কিছু জানায়নি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা