নিজেদের বিশাল বিশাল ডাটা সেন্টার অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষার জন্য বেশ অর্থ খরচ করতে হয় টেক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। সেই খরচ কমানোর জন্য দুই বছর আগে মাইক্রোসফট পরীক্ষামূলকভাবে নিজেদের ডাটা সেন্টার সমুদ্রের নিচে রাখার ব্যবস্থা করে। সম্প্রতি সেই ডাটা সেন্টারগুলো পানি থেকে ওঠানো হয়। মাইক্রোসফটের এই পরীক্ষা থেকে কী প্রাপ্তি হলো সেটাই জানাচ্ছেন ইশতিয়াক খান স্কটল্যান্ডের উত্তরের দ্বীপ অর্কনি। এই দ্বীপের উপকূলে দুই বছর আগে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট শুরু করেছিল এক পরীক্ষা। আর সেটা বিশাল বিশাল ডাটা সেন্টার ঠাণ্ডা রাখতে যে খরচ হয়, তা কমিয়ে আনার এক চেষ্টা। এই ডাটা সেন্টারগুলোকে বলা যায় ‘ইন্টারনেটের মেরুদণ্ড’, যেখানে ক্লাউডে আপলোড করা তথ্য ও ছবিগুলো সেভ করে রাখা হয়। ক্লাউডে তথ্য সংরক্ষণের হার বাড়ছে অনেক দ্রুত এবং সেই সঙ্গে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডাটা সেন্টারগুলোর অপরিসীম শক্তির চাহিদা। ২০১৮ সালের মে মাসে দ্বীপটি থেকে আধা মাইল দূরে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ডাটা সেন্টারকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ডাটা সেন্টারটি ইস্পাতে ঘেরা একটি কনটেইনারের ভেতরে ছিল আর এটি পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে নবায়নযোগ্য শক্তি। দুই বছর ধরে দিব্যি এটি পানিতে ডুবে ডুবে কাজ করে গেছে। পুরো এক দিনের কঠিন পরিশ্রমের পর সাদা সিলিন্ডারটি পানি থেকে উঠিয়ে আনা হয়। এ সময় সিলিন্ডারটির গায়ে শেওলা, বার্নাকল (এক ধরনের শক্ত আবরণযুক্ত জলজ প্রাণী) এবং বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক ফুল লেপ্টে থাকতে দেখা যায়; কিন্তু ভেতরে ডাটা সেন্টারটি ভালোভাবেই কাজ করছিল। কনটেইনারের ভেতরে থাকা ৮৫৫টি সার্ভারের মধ্যে বিকল হয়েছে মাত্র আটটি। সাধারণ ডাটা সেন্টারের তুলনায় এই হার অনেক ভালো। ‘প্রজেক্ট ন্যাটিক’ নামে পরিচিত গবেষণা প্রকল্পটির দলনেতা বেন কাটলার বলেন, ‘পানিতে সার্ভার বিকল হয়ে যাওয়ার হার স্থলভূমির আট ভাগের এক ভাগের সমান।’ গবেষকরা এই সাফল্যের পেছনের দুটি কারণকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। প্রথমত সেখানে কোনো মানুষ ছিল না এবং দ্বিতীয়ত অক্সিজেনের পরিবর্তে ক্যাপসুলে প্রবাহিত করা হয়েছিল নাইট্রোজেন। এ প্রসঙ্গে কাটলার বলেন, ‘মূলত নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ পরিবেশের কারণে কনটেইনারের ভেতরের তাপমাত্রা ছিল কম এবং এতে যন্ত্রপাতি বেশির ভাগ সময়ই ঠাণ্ডা থেকেছে, নষ্টও হয়েছে কম। এ ছাড়া সার্ভারগুলোতে কোনো মানুষের ছোঁয়া না লাগার কারণেও সেগুলো ভালো থেকেছে।’ নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থাকায় পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পের জন্য অর্কনিকেই বেছে নিয়েছিল মাইক্রোসফট। এ ছাড়া সেখানকার আবহাওয়া বেশির ভাগ সময় নাতিশীতোষ্ণ থেকে ঠাণ্ডার মধ্যেই থাকে, যা কি না এই পরীক্ষার জন্য আরেকটি ভালো দিক। এই ধরনের ছোট ছোট ডাটা সেন্টারকে স্বল্পকালীন ব্যবহারের জন্য বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা যায় কি না, সেটার সম্ভাব্যতা যাচাইকরণও ছিল পরীক্ষাটির আরেক উদ্দেশ্য। অর্কনিতে বিদ্যুতের উৎস ছিল বাতাস ও সৌরশক্তি; কিন্তু পানিতে নিমজ্জিত ডাটা সেন্টারে শক্তি সরবরাহ করতে কোনো সমস্যা হয়নি। এ ধরনের ডাটা সেন্টারের চিন্তাধারাটি অনেকের কাছে পাগলের প্রলাপ বলে মনে হলেও ডাটা সেন্টার শিল্পের অন্যতম প্রতিথযশা কনসালট্যান্ট ডেভিড রস মনে করেন যে এই প্রকল্পের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। তাঁর মতে, যেসব প্রতিষ্ঠান প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলার আশঙ্কায় রয়েছে, তাদের জন্য এটি খুবই চমৎকার এক বিকল্প। তাঁর ভাষায়, ‘আপনি চাইলেই খুব সহজে এ ধরনের ডাটা সেন্টারকে সরিয়ে নিরাপদ কোনো জায়গায় নিয়ে যেতে পারবেন। এতে নতুন করে অবকাঠামো নির্মাণের বিপুল খরচ ও সময়ের প্রয়োজন হবে না। এটি সহজে পরিবর্তনযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প।’ মাইক্রোসফট এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না কবে থেকে পানিতে নিমজ্জিত ডাটা সেন্টারগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা হবে; কিন্তু তারা আত্মবিশ্বাসী যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। যেমনটা বেন কাটলার বলছেন, ‘এটি এখন আর শুধুই একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়; এখন প্রশ্ন হলো, আমরা এটাকে কিভাবে বানাতে চাই, এটি কি একটি ছোট প্রকল্প হবে, না এর পরিসর অনেক বড় হবে?’ অর্কনিতে এটির পরীক্ষা সমাপ্ত হয়েছে; কিন্তু সবার প্রত্যাশা হচ্ছে যে এই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অধিকতর পরিবেশবান্ধব ডাটা সেন্টার তৈরি করা যাবে, যা মাটি ও পানির নিচে—উভয় স্থানেই আরো দক্ষভাবে কাজ করতে পারবে।