kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

জাহিনের বায়োপলিমার

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জাহিনের বায়োপলিমার

গণিত ও পরিসংখ্যান বিষয়ে গ্লাসগো ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন জাহিন রোহান রাজিন। সম্প্রতি ‘ইউএন ইয়াং চ্যাম্পিয়ন অব দি আর্থ’ প্রতিযোগিতায় এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে চূড়ান্ত পর্বে মনোনীত হয়েছেন ২২ বছর বয়সী বাংলাদেশের এই তরুণ। বিস্তারিত জানাচ্ছেন

গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত

 

সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন পরিবেশসচেতন মেধাবী তরুণ উদ্যোক্তারা, যাঁরা নিজেদের পরিকল্পনা দিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব রেখে থাকেন। প্রতিবছর ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী এমন মেধাবী তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে সাতজনকে খুঁজে বের করে পুরস্কৃত করার প্রতিযোগিতা হচ্ছে ‘ইউএন ইয়াং চ্যাম্পিয়ন

অব দ্য আর্থ’। ২০১৫ সালে প্রথম এই প্রতিযোগিতার কথা জানতে পারেন জাহিন রোহান রাজিন।

চার বছর পর ২০১৯ সালে বন্ধুদের অনুপ্রেরণায় জাহিন অংশগ্রহণ করেন এই প্রতিযোগিতায়। প্রতিযোগিতার নিয়ম-কানুন ওয়েবসাইটেই ছিল। সব কিছু ঠিকঠাক পূরণ করে ফেলেন। প্রতিযোগিতার কর্তৃপক্ষের চাহিদা মোতাবেক নিজের প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রও দিলেন। তারপর অপেক্ষা।

নিজের জন্মদিনের দিন রাজিন জানতে পারেন ‘কোয়ান্টাম পলিকেমিকস বায়োটেকনোলজি’ প্রকল্পটি নিয়ে সেই প্রতিযোগিতার শীর্ষ ৩৫ প্রতিযোগীর সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।

 

প্লাস্টিকের বিকল্প

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষিজমির জন্য পলিথিন বিরাট এক হুমকি। জাহিনের মাথায় অনেক দিন ধরেই চিন্তাটা ছিল—প্লাস্টিকের বিকল্প কী হতে পারে? কোন পণ্য পরিবেশদূষণ রোধে কাজ করতে পারে? সেই চিন্তা থেকেই শুরু ‘কোয়ান্টাম পলিকেমিকস বায়োটেকনোলজি’ প্রকল্পের, যা প্লাস্টিক দূষণ রোধে কাজ করবে।

নিজের কাজ নিয়ে জাহিন বলেন, স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সময় গণিত ও পরিসংখ্যানের বাস্তবিক প্রয়োগ নিয়ে কাজ শুরু করি। সেখান থেকে চিন্তা আসে যে গণিত ও পরিসংখ্যান প্রয়োগ করে কিভাবে মানুষের জীবন-মানের উন্নয়ন করা যায়। পাশাপাশি কিভাবে আমাদের পৃথিবীর বিদ্যমান সমস্যা দূর করা যায়? সেই আগ্রহ থেকে প্লাস্টিকের বিকল্প প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করি। প্লাস্টিকদূষণ বিশ্বের অন্যতম বড় দূষণ, যা পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ‘কোয়ান্টাম পলিকেমিকস/নন-টক্সিক, অর্গানিক পলিহাইড্রক্সিয়ালকোনোট (পিএইচএ)-ভিত্তিক বায়োপলিমার উৎপাদন করছে, যা পুরোপুরি পরিবর্তনযোগ্য ও পরিবেশদূষণ রোধ করবে।’

তাঁর প্রকল্প অনুযায়ী পাটকলগুলো থেকে ফেলে দেওয়া জুট ডাস্ট দিয়ে বায়োরি-অ্যাক্টরের মাধ্যমে ন্যানো-ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে সিনথেটিক বায়োপ্লাস্টিক তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তৈরি পলিমার পণ্যগুলো মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে তরল পদার্থে আর এক মাসের মধ্যে মাটিতে মিশে যায়। প্লাস্টিক পলিব্যাগ এবং প্যাকেজিংয়ের বিকল্প হিসেবে এসব ব্যবহার করা যায়।

‘কোয়ান্টাম পলিকেমিকস বায়োটেকনোলজি’ প্রকল্পটি নিয়েই পরে ‘ইউএন ইয়াং চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন জাহিন।

 

পঁয়ত্রিশের একজন

এবারের ‘ইউএন ইয়াং চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ প্রতিযোগীদের বাছাই করা হয়েছে আফ্রিকা, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে। সেসব অঞ্চলের মধ্যে আফ্রিকা, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল, উত্তর আমেরিকা এবং পশ্চিম এশিয়া থেকে বাছাই করা হয়েছে পাঁচজন করে মোট ২৫ জন। অন্যদিকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে সর্বোচ্চ ১০ জনকে বাছাই করা হয়। সেখানেই জায়গা করে নিয়েছেন জাহিন রোহান রাজিন। এবারের প্রতিযোগিতার ৩৫ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি। জাহিনের কাছে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার স্বীকৃতি সব সময়ই আনন্দের, ‘একজন বাংলাদেশি হিসেবে এমন একটি প্রতিযোগিতায় স্থান করে নিতে পেরে বেশ রোমাঞ্চিত অনুভব করছি।’

ডিসেম্বরে এই ৩৫ জনের মধ্য থেকে সেরা সাতজনকে নির্বাচিত করবেন আয়োজকরা। সেই সাতজনের একজন হতে পারলে সেটা হবে জাহিনের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

 

আছে আরো কিছু স্বীকৃতি

জাহিনের আরো কিছু কাজের স্বীকৃতি রয়েছে। গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে পেয়েছেন ‘ফিউচার ওয়ার্ল্ড চেঞ্জার’ সম্মাননা। পেয়েছেন ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ও রেজল্যুশন থেকে ফেলোশিপ। বিজয়ী হতে না পারলেও ইউএন ইয়াং চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের স্বীকৃতি রাজিনকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে বেশ সাহায্য করবে।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এরই মধ্যে কিছু বহুজাতিক কম্পানি জাহিনের ‘কোয়ান্টাম পলিকেমিকস বায়োটেকনোলজি’ প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

‘কভেস্ত্রো’ নামের এক বহুজাতিক কম্পানি ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’-এর সহযোগী, এরা বায়োপলিমার নিয়ে কাজ করে থাকে। এই প্রকল্পের সঙ্গে তাদেরও সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশের কাছ থেকে বায়োপলিমার নেওয়ার পরিকল্পনা আছে তাদের। এর ফলে বায়োপলিমার রপ্তানি শুরু করা যাবে, যা বাংলাদেশের জন্য জৈবপ্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতির সূচনা করবে বলে আশা করেন জাহিন। তিনি বলেন, ‘পুরস্কার পাওয়ার চেয়ে আমার সব থেকে বড় অর্জন হবে মানুষের সমস্যা সমাধান করতে পারলে। প্রকল্পটি তখনই সফল হবে যখন এটি বিশ্বের দরবারে পরিবেশ সংরক্ষণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।’

এখন আরো বেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন জাহিন। প্রথমত, বাংলাদেশে ওয়াসার জন্য হাইড্রমেট্রিক ইনফরমেশন সিস্টেম তৈরি করছেন। এটি দিয়ে সরাসরি খুব সহজেই পানির গুণগত মান নির্ণয় করা যাবে। রাজিনের পরিকল্পনাটি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করে সফলতাও পেয়েছে ওয়াসা। কাজ করছেন এডুকেশন টেকনোলজি নিয়ে, যা ‘লিংউইং’ নামে পরিচিত। এটি একটি ভাষা শেখার অ্যাপ্লিকেশন, যা অনেক সহজে ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাষা শেখাতে পারে। ভবিষ্যতে এ সবের পাশাপাশি রোবটিকস ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নিয়ে কাজ করতে চান জাহিন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা