১ জুলাই প্রিন্সেস ডায়ানার ৫৯তম জন্মদিনে ঘোষণা করা হয় ‘ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড-২০২০’ বিজয়ীদের নাম। এবার বিশ্বের ১০০ তরুণকে মনোনীত করা হয় এই পুরস্কারের জন্য। তাতে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ শেখ ইনজামামুজ্জামান। তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘স্টাডি বাডি’ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে। আর তাতে ব্যবহার করা হয় নানা রকম প্রযুক্তি। এই তরুণ উদ্যোক্তাকে নিয়ে লিখেছেন গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত ছোটবেলা থেকেই পাজল সমাধান করাটা ছিল তাঁর খুব পছন্দের বিষয়। একসময় স্বভাব তাঁর এমনই হয়ে গিয়েছিল যে এ ধরনের কোনো সমস্যা চোখে পড়লে সেটার সমাধান বের করতে জান-প্রাণ লাগিয়ে দিতেন শেখ ইনজামামুজ্জামান। পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি আসক্তি থাকায় সিদ্ধান্ত নেন হবেন কম্পিউটার প্রকৌশলী। পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল সব সময়। আর তাই একান্ত ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণা থেকেই শুরু করেন লার্নিং ডিস-এবিলিটি নিয়ে কাজ করা। তাঁর বড় বোন ছিলেন অটিজমে আক্রান্ত শিশু। তার জীবন যাপন প্রণালী এবং পরিবারের সবাই, বিশেষ করে মা-বাবার দুশ্চিন্তা তাঁকে ব্যাপকভাবে ভাবায়। ২০১৭ সালে ফুসফুসের প্রদাহজনিত কারণে বোনের মৃত্যু হয়। তখন থেকে ইনজামামুজ্জামানের মাঝে প্রবল ইচ্ছা জাগে প্রতিবন্ধী নিয়ে কাজ করার। স্টাডি বাডি স্টাডি বাডির যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে জার্মান দূতাবাস আয়োজিত একটি স্টার্টআপ প্রতিযোগিতায় জেতার মাধ্যমে। ২০১৮ সালের মে মাসে জার্মান দূতাবাসের ‘বেটারস্টোরিজ’-এর সঙ্গে ‘জাইটগাইস্ট’ নামে একটি স্টার্টআপ ইনকিউবেশন প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়। সেখানে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ওখানে পর্যায়ক্রমে ৪০টি দল সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নেয়। সেখান থেকে অনেক বাছাই শেষে ১০টি দল বিচারকদের সামনে নিজেদের উদ্যোগ উপস্থাপন করে। তাতে বিজয়ী হন ইনজামামুজ্জামান। আর ওখান থেকেই বলা যায় ‘স্টাডি বাডি’র শুরু। ‘স্টাডি বাডি’ মূলত তিন বছর থেকে ১২ বছর পর্যন্ত বিশেষ শিশুদের সেবা দিয়ে থাকে। প্রথমে ‘এক্সপার্ট হোমকেয়ার’ সার্ভিসের মাধ্যমে তাদের সেবা চালু হয়। ৬০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ যুক্ত রয়েছেন তাঁদের সঙ্গে। এদের মধ্যে আছেন স্পেশাল এডুকেটর, ফিজিওথেরাপিস্ট, ল্যাংগুয়েজথেরাপিস্ট। প্রথমত তারা বিশেষ সেই বাচ্চাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেন। তারপর উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত করে দেয় তারা। পরবর্তী সময়ে বাচ্চার অবস্থা ও সমস্যা যাচাই করে একটি ‘ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’ও তৈরি করে ‘স্টাডি বাডি’। ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানের মধ্যে বাচ্চার অবস্থাভেদে বিভিন্ন শিক্ষাপদ্ধতি এবং অ্যাক্টিভিটি বা থেরাপির উল্লেখ থাকে, যেগুলো অনুসরণ করলে শিশুটির ধীরে ধীরে পেশি সঞ্চালন দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এটা হচ্ছে প্রাথমিক পদ্ধতির পাশাপাশি তাদের টেকনোলজিক্যাল টুলস, যেমন—অগমেন্টেড রিয়ালিটি বুকস, আইওটি হার্ডওয়্যারের সহায়তা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া তাদের পছন্দ ও স্বচ্ছন্দে ব্যবহারের সাবলীলতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে স্টাডি বাডি। লার্নিং ডিস-এবিলিটি ‘লার্নিং ডিস-এবিলিটি’ বা ‘শেখার অক্ষমতা’কে সহজ করে বলতে গেলে বলা যায়, মূলত এটি মানব মস্তিষ্কের অংশবিশেষের অপরিপক্বতা ও দুর্বলতা। স্নায়ুতন্ত্রের ত্রুটিযুক্ত গঠন প্রণালীর কারণে এটা হয়ে থাকে, যা শেখার প্রবণতা ও সক্ষমতা খর্ব করার সঙ্গে সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত আয়ত্ত করা, প্রক্রিয়াজাত বা সারাংশ উপলব্ধি করা, একটা সময়ব্যাপী স্মরণশক্তিকে ধরে রাখাকে নষ্ট করে দেয়। কোনো সহজ বিষয় সহজে বুঝতে পারাকে বাধাগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্তও করে দেয় এটি। একসময় শিক্ষাজীবন থেকে শিক্ষার্থীকে বিমুখ করে তোলে। এ ধরনের শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে পদে পদে অবমূল্যায়িত ও লাঞ্ছিত হয়, যা কি না সন্তান ও মা-বাবা উভয় পক্ষের জীবনকে এককথায় দুর্বিষহ করে তোলে। স্কুল পর্যায়ের কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশব্যাপী এটাকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করে স্টাডি বাডি। প্রতিষ্ঠানটি ‘শেখার অক্ষমতা’র কারণ, সামগ্রিক জীবনে এর ভয়াবহ কুপ্রভাব ও যথাযথ প্রতিকারকল্পে প্রায়োগিক বিধি-বিধান তুলে ধরে নিজের কাজের মাধ্যমে। এর ফলে এ ধরনের রোগে আক্রান্ত শিশুর মা-বাবারা এটি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে নিজেদের বাচ্চাদের একটি সুখী-সুন্দর শিক্ষালোকিত স্বনির্ভর জীবন উপহার দিতে পারেন। আর সে জন্য লার্নিং ডিস-এবল বাচ্চাদের মনন ও মস্তিষ্কের সঙ্গে সামঞ্জস্য উপযোগী কনটেক্সচুয়ালাইজড টুলস ও রিসোর্স তৈরি করে থাকে স্টাডি বাডি। এসবের মধ্যে থাকে অগমেন্টেড রিয়ালিটি বুকস, আইওটি হার্ডওয়্যার এবং গেমস। যার যথোপযুক্ত প্রয়োগ ও ব্যবহারে তাদের মস্তিষ্কের ত্রুটিযুক্ত অংশে উদ্দীপনা সঞ্চারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাদের মস্তিষ্ককে পূর্ণ কর্মক্ষম করে তোলে। ধীরে ধীরে অন্য সুস্থ ও স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতো সাবলীলভাবে পড়াশোনায় অগ্রগতি অর্জনে সমর্থ হয়। যদিও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এগুলো সহজলভ্য নয়। এ ছাড়া লার্নিং ডিস-এবল শিক্ষার্থীদের বিশেষায়িত শিক্ষা ও সেবা প্রদানের জন্য দেশে হাতে গোনা যে কয়টি বিশেষ স্কুল রয়েছে সেগুলোর ভর্তি ফি ও মাসিক খরচও অনেক। এত খরচ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বহন করাও সম্ভব নয়। শেখ ইনজামামুজ্জামান বলেন, ‘সব মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য আমাদের সেবাগুলোকে সম্পূর্ণরূপে অনলাইনভিত্তিক করেছি। এখন পর্যন্ত বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছে এমন ১০টির বেশি স্কুলে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে স্টাডি বাডি।’ যেভাবে কাজ হয় নিজেদের কার্যক্রম সম্পর্কে শেখ ইনজামামুজ্জামান বলেন, ‘বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশু, তাদের মা-বাবা এবং শিক্ষ—এই তিনটি দলকে সমন্বিত ও সম্পৃক্ত করে আমাদের কার্যক্রম পরিচালিত করে থাকি। এসব শিশুকে উপভোগ্য ও সহজসাধ্য শিক্ষণ প্রণালী অবলম্বনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি অনুরাগী করে তোলা হয়। এখন পর্যন্ত সারা বাংলাদেশে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী এবং অভিভাবককে সেবা দিয়েছি।’ আছে অ্যাপও গুগল প্লেস্টোর থেকে একটি স্মার্ট ডিভাইসের সাহায্যে যেকোনো স্থান থেকে ‘স্টাডি বাডি’ অ্যাপ (https://urlzs.com/ MVs6L) ব্যবহার করা যায়। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবাগুলো পাওয়া যাবে তাদের এই অ্যাপে। অ্যাপটি হচ্ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য একটি বিকল্প রিসোর্স প্ল্যাটফর্ম। অ্যাপটির পাঁচটি বিভাগ রয়েছে, যথাক্রমে স্ক্রিনিং টেস্ট, এআর বুক, মিডিয়া ও গেমিং সেকশন। স্ক্রিনিং টেস্টের মাধ্যমে গুটিকয়েক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে লার্নিং ডিস-এবিলিটির নির্দিষ্ট ডিস-অর্ডারের সম্ভাব্যতা পাওয়া যায়। আর এআর বুক এবং গেমিং সেকশনের মাধ্যমে তাদের তৈরি করা এআর অ্যাপ বা গেম ডাউনলোড করা যাবে। পাশাপাশি সচেতনতামূলক আর্টিকল বা ভিডিও তৈরি করে থাকে তারা। আগামী দিনে স্পেশাল এডুকেশনের বাচ্চাদের জন্য একটি ‘ডিসট্যান্স লার্নিং প্ল্যাটফর্ম’ অ্যাপ নিয়ে আসতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানটি। এই প্ল্যাটফর্মটিতে মূলত বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে অফলাইন কোর্সের পাশাপাশি লাইভ ক্লাসের ব্যবস্থাও থাকবে। অভিভাবকনির্ভর প্রশিক্ষণ, বাচ্চাদের ডেভেলপমেন্ট হোম অ্যাক্টিভিটিস ও এক্সারসাইজ ইত্যাদি বিষয় হবে এসব কোর্সের বিষয়। কাজের স্বীকৃতি স্টাডি বাডি কাজের বয়স দুই বছর হলেও রয়েছে বেশ কিছু অর্জন। প্রথমত জ্যাইটগাইস্ট প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও বিজয়ীর মুকুট অর্জন করে। তারপর ধারাবাহিকতা অনুযায়ী তরুণ ইমপ্যাক্টর প্রগ্রামে শীর্ষ ১০-এ স্থান, আইসিটি ডিভিশনের প্রকল্প স্টার্টআপ বাংলাদেশ এবং ইউএনডিপির ইয়ুথ কো-ল্যাব অ্যাকসেলারেটর প্রগ্রামে অংশগ্রহণ। এ বছর নামের পাশে যুক্ত হয়েছে আরো দুটি অর্জন—কমনওয়েলথ যুব পুরস্কার এবং ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড। অর্জনের পেছনের গল্পটা জানতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার, যেটা মূলত মানবিক বা সামাজিক কাজের ওপর দেওয়া হয়ে থাকে। এখানে পেশাগতভাবে মনোনীত হতে হয়। আমি যেহেতু এক বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করি, তাই আমার কাজ সম্পর্কে একজন বিশিষ্ট শিক্ষক আগে থেকেই জানতেন। তিনিই আমাকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন। আর অর্জনের পর অনুভূতি অসাধারণ ছিল। এ বছর ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডের পাশাপাশি অন্যতম বড় অর্জন ছিল কমনওয়েলথ যুব পুরস্কারের তালিকায় জায়গা পাওয়া। এ বছরের কমনওয়েলথ যুব পুরস্কারের জন্য ১২টি দেশের ১৬ জন অসাধারণ উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও অধিকারকর্মীর সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই তালিকায় ‘স্টাডি বাডি’ প্রকল্পের জন্য আমার নামটিও স্থান পেয়েছিল।’