kalerkantho

শিশুদের জন্য স্টেমন

জাপানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্টেমন-বিডি’ বাংলাদেশের দশ থেকে বারো বছরের শিশুদের রোবটিকস এবং প্রগ্রামিং বিষয়ক শিক্ষা দিয়ে থাকে। এটি তাদের ‘আফটার স্কুল’ প্রগ্রাম। খোঁজখবর নিয়েছেন আজরাফ আল মূতী

১০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিশুদের জন্য স্টেমন

নার্সারি থেকেই জাপানের শিশুদের খেলার ছলে রোবট তৈরি, সহজ উপায়ে প্রগ্রামিং শেখা আর জটিল জটিল গাণিতিক সমস্যা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়ে থাকে। এর পেছনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করার জন্য এখন থেকেই শিশুদের তৈরি করা। সে জন্য জাপানে রয়েছে আফটার স্কুল প্রগ্রাম ‘স্টেমন’। শিশুদের খুব সহজ পাঠ্যসূচিতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত সম্পর্কে ধারণা দিয়ে থাকে তারা।

বাংলাদেশের শিশুদেরও এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে স্টেমন হাজির হয়েছে এখানে। ২০১৮ সালের মে মাসে প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিমি (BiMEE) ও ভেঞ্চুরাসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যাত্রা শুরু করেছে ‘স্টেমন-বিডি’। জাপানের ৭০টি স্কুলের ৭০০ শিক্ষার্থীর মতো একই পাঠ্যসূচিতে বর্তমানে রোবটিকস, প্রগ্রামিং শিখছে বাংলাদেশি শিশুরাও।

আর এই দায়িত্বটি নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন বিমির সহপ্রতিষ্ঠাতা বিজয় জব্বার ও ভেঞ্চুরাসের প্রধান নির্বাহী ইউরেকো দেসান।

 

স্টেমন কী?

‘স্টেমন’ (STEMON) হচ্ছে জাপানিজ আফটার স্কুল প্রগ্রাম, যা শিশুদের স্টেমভিত্তিক (STEM) বিষয় বা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত সম্পর্কে ধারণা দিয়ে থাকে। আর এ কাজ করার জন্য স্টেমনের রয়েছে সহজ একটি পাঠ্যসূচি। এই পাঠ্যসূচির ৫০ শতাংশ প্রকৌশল, ২৫ শতাংশ প্রগ্রামিং, ১৫ শতাংশ গণিত ও ১০ শতাংশ রোবটিকস। স্টেমন বিশ্বাস করে, এ বিষয়গুলো শেখার মাধ্যমে শিশুদের প্রযুক্তির ভিত্তিটি যেমন শক্ত হয়, ঠিক সেভাবেই চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে, পাশাপাশি বিশ্লেষণধর্মী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। প্রগ্রামটির উদ্ভাবক হচ্ছেন কাজুকি নাকামুরা।

 ২০১৮ সালের মে মাসে স্টেমন-বিডি প্রতিষ্ঠিত হলেও এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম ব্যাচের ক্লাস শুরু হয়েছে চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে। আপাতত শুধু পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়েই নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে স্টেমন-বিডি। তবে পাঠ্যসূচি এমনভাবে সাজানো যে চাইলে, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও যোগ দিতে পারবে।

 

শিশুদের জন্য কি বিষয়গুলো কঠিন হয়ে যায়?

না, আদতে বিষয়গুলো মোটেও শিশুদের জন্য কঠিন নয়। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে, শিশুদের শেখানোর জন্য যে পাঠ্যসূচি এবং উপকরণগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো কোনো দিক থেকেই কঠিন বা ভীতিকর কিছু নয়। পাঠ্যসূচি তো সহজ বটেই, শিক্ষার উপকরণগুলোও মজার।

এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিশুরা রোবটিকস শেখার জন্য যে উপকরণগুলো ব্যবহার করছে, সেগুলো দেখতে অনেকটাই বড় লেগোর ব্লকের মতো। ওই ব্লকগুলোর একটির সঙ্গে আরেকটি জুড়ে দিয়ে শিশুরা রোবটের আদল তৈরি করে থাকে। ফলে শিশুরা কিন্তু অনেকটা খেলার ছলেই রোবটিকস শিখছে। রোবটিকস-সংক্রান্ত এই কিটগুলো শিশুদের জন্য জাপান থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।

এ ব্যাপারে ভেঞ্চুরাসের প্রধান নির্বাহী ইউরেকো দেসান বলেন, ‘শিশুরা বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতে পছন্দ করে। আমরা চেষ্টা করছি, শিশুদের সেই আগ্রহটুকু কাজে লাগিয়ে এবং সহজ একটি পাঠ্যসূচি ব্যবহার করে ওদের ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করে তুলতে। আগামী প্রজন্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করবে এবং বড়জোর আর ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যেই এই সময়টি চলে আসবে।’

এদিকে জাভা, পাইথনের মতো কঠিন প্রগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের পরিবর্তে শিশুদের শেখানো হচ্ছে সহজ শিক্ষামূলক প্রগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ স্ক্র্যাচ। বলে নেওয়া ভালো, একেবারে সহজ ইন্টারফেসের এই শিক্ষামূলক প্রগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজটি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধীনে ডেভেলপ করেছে লাইফলং কিন্ডারগার্টেন গ্রুপ। ফলে মানের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলার কোনো জায়গা নেই।    

এ ছাড়া কোনো কিছু সহজ নাকি কঠিন হবে, বিষয়টি বেশির ভাগ নির্ভর করে শিক্ষাদানের ওপর।

 

শেখানোর প্রক্রিয়া

শেখার সময় কোনোভাবেই যাতে শিশুদের মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে দৃঢ় নজর রাখা হয়। শিক্ষার্থীরা প্রতি সপ্তাহে স্টেমন-বিডিতে একটি করে ক্লাস করে থাকে। ক্লাসের শুরুতে বোর্ডে শুধু সেদিনটির জন্য একটি নির্ধারিত লক্ষ্য দিয়ে দেওয়া হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা নিজেরাই রোবটিক কিট ও স্ক্র্যাচ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে ওই বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যে পৌঁছার চেষ্টা করে। সহযোগিতার জন্য পাশেই থাকেন শিক্ষকরা। ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে, সে বিষয়ে সাহায্য করা হয়। এককথায় বলতে গেলে, আনন্দ ও আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা রোবটিক, প্রগ্রামিং ও গণিত শেখে। এ বিষয়ে বিজয় জব্বার বলেন, ‘আমরা একটু আলাদাভাবে শেখানোর চেষ্টা করছি। আমাদের মূল লক্ষ্য কিন্তু রোবটিক প্রকৌশলী বা প্রগ্রামার তৈরি করা নয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো—এ বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। এ বিষয়গুলোর সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এগুলোতে তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করানো।’

 

টার্ম ও ভর্তি

প্রতি টার্মে প্রায় ছয় মাস করে সময় পায় একজন শিক্ষার্থী। যেমন—বর্তমান টার্মটি শুরু হয়েছে জুনের ১৫ তারিখে, শেষ হবে অক্টোবরের ৩০ তারিখে। প্রতি সপ্তাহে একটি করে মোট ২০টি ক্লাস নেওয়া হবে প্রতি টার্মে। চেষ্টা করা হয়, যাতে প্রতিটি ব্যাচে ছয়-সাতজনের বেশি শিক্ষার্থী না থাকে। এতে শেখানোর সময় প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে আরো বেশি সময় দিতে পারেন শিক্ষকরা, শিক্ষার্থীরাও স্বস্তিতে থাকে। পাঁচ হাজার টাকা করে কোর্স ফি নির্ধারণ করেছে স্টেমন-বিডি। আগ্রহীরা চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজ https://www.facebook.com/stemonbangladesh/ এবং ওয়েবসাইট  http://stemon.com.bd/ থেকে ঘুরে আসতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটির ফেইসবুক পেইজের ইনবক্সে কিছু জানতে চাইলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই উত্তর পেয়ে যাবেন প্রশ্নকারীরা।

 

ভবিষ্যৎ লক্ষ্য

স্টেমন-বিডির ভবিষ্যৎ লক্ষ্য প্রসঙ্গে বিজয় জব্বার বলেন, ‘দুটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, আমরা মাত্র কিছুদিন হলো পথচলা শুরু করেছি এবং দিন শেষে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িক, ফলে এটি মুনাফার ওপর নির্ভরশীল। ইচ্ছা রয়েছে মূল কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি একটি প্রকল্প শুরু করা। ওই প্রকল্পের অধীনে আমাদের সেবা নিয়ে ওইসব শিশুর কাছে যাব, যাদের হাতের কাছে কম্পিউটার নেই, যারা এই সুযোগ-সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত। এই শিশুগুলোর জন্য বিনা মূল্যে ক্লাসের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। এটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের মধ্যে একটি।’

মন্তব্য