kalerkantho

সোমবার । ২৮ নভেম্বর ২০২২ । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে নজর দিতে হবে

ডা. কামরুল হাসান খান

৬ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে নজর দিতে হবে

২০২০ সালের আগে গোটা বিশ্বের নজরটা ছিল অসংক্রামক রোগের দিকে। মনে হচ্ছিল বিশ্ব যেন সংক্রামক রোগ থেকে নিস্তার পেল। কিন্তু ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে করোনাভাইরাস উৎপন্ন হয়ে গোটা বিশ্বকে গত প্রায় আড়াই বছরে তছনছ করে দিয়েছে এবং এখনো এর তাণ্ডব চলছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের দৃষ্টি অবশ্য পরিবেশ ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দিকেও আছে।

বিজ্ঞাপন

যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এ দুটো বিষয়কে প্রাধান্য না দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারব তত দিন পৃথিবীতে নতুন নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং রোগ-বালাই আসতেই থাকবে। বাংলাদেশে এখন একই সঙ্গে চলছে করোনা, ডেঙ্গু সংক্রমণ এবং সঙ্গে আছে চোখ ওঠা।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি : দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। গত ১ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রেকর্ড ৬৩৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা চলতি বছর ওই দিন পর্যন্ত এক দিনে হাসপাতালে সর্বোচ্চ রোগী ভর্তির রেকর্ড।

প্রাথমিক পর্যায়ে হাসপাতালে না আসা এবং শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় ডেঙ্গুতে শিশু বেশি মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া শিশুর ডেঙ্গুর উপসর্গ দেরিতে প্রকাশ পাচ্ছে। যখন উপসর্গের দেখা মিলছে তখন অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে এ পর্যন্ত যত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, তার ৩৩ শতাংশই শিশু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, সারা দেশে ১৮টি এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের রোগী বেশি পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত ঢাকায় সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে মুগদা এলাকায়। সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে। দেশের ৫০টি জেলায় এ বছর ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা কক্সবাজারে।

করোনা পরিস্থিতি : গত ১ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ছিল ১৫.২৮। আগের দিন এ হার ছিল ১৪.৬৬। এখন পর্যন্ত দেশে ২০ লাখ ২৫ হাজার ৬৭৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত মারা গেছে ২৯ হাজার ৩৬৮ জন। কিছুদিন ধরে বৈশ্বিকভাবে করোনার সংক্রমণ কমছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে বিশ্বের সব দেশে বা অঞ্চলে তা কমেনি। কোনো কোনো দেশ বা অঞ্চলে সংক্রমণ বেড়েছে। সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে কয়েক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ বাড়ছে।

দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৮ মার্চ। এর পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে সংক্রমণের চিত্রে কয়েক দফা ওঠানামা দেখা গেছে। গত বছরের শেষ দিক থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি করোনার ওমিক্রন ধরনের দাপট চলে। পরে ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে।

কনজাংটিভাইটিস বা চোখ ওঠা রোগ : গরমে, বর্ষায় ও ঋতু পরিবর্তনের সময় চোখ ওঠা রোগের প্রকোপ বাড়ে। একে বলা হয় কনজাংটিভাইটিস বা চোখের আবরণ কনজাংটিভার প্রদাহ। সমস্যাটি চোখ ওঠা নামেই পরিচিত। রোগটি ছোঁয়াচে। ফলে দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে গোটা বাংলাদেশে বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে চোখ ওঠা রোগের প্রকোপ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।

কনজাংটিভাইটিসের লক্ষণ হলো চোখের নিচের অংশ লাল হয়ে যাওয়া, চোখে ব্যথা বা অস্বস্তি। প্রথমে এক চোখ আক্রান্ত হয়। পরে অন্য চোখে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগে চোখ থেকে পানি পড়তে থাকে। চোখের নিচের অংশ ফুলে ও লাল হয়ে যায়। আলোয় চোখে অস্বস্তি বাড়ে।

এটি এক ধরনের ভাইরাসজনিত রোগ। এক সপ্তাহের মধ্যে তা সেরে যায়। রোগটি আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে ছড়ায়। রোগীর ব্যবহারের রুমাল, তোয়ালে, বালিশ অন্যরা ব্যবহার করলে এতে আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া এটি বাতাসের মাধ্যমেও ছড়ায়।

আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাবান পানি দিয়ে কিছুক্ষণ পর পরই হাত পরিষ্কার করতে হবে। কোনো কারণে চোখ ভেজা থাকলে চোখ টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে নিতে হবে। ব্যবহারের পর টিস্যু পেপারটি অবশ্যই ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিতে হবে। এ ছাড়া চোখ উঠলে কালো চশমা ব্যবহার করা ভালো। এতে চোখে স্পর্শ করা কমবে এবং ধুলাবালি, ধোঁয়া থেকে চোখ রক্ষা পাবে। আলোয় অস্বস্তিও কমবে। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শে ড্রপ ও ওষুধ ব্যবহার করা যায়।

করোনার এ সময় চোখ ওঠা নিয়ে আরো সতর্ক হতে হবে। কারণ করোনার সংক্রমণে কারো কারো চোখে প্রদাহ হতে দেখা যাচ্ছে। কাজেই এ সময় চোখ উঠলে করোনার অন্য উপসর্গ রয়েছে কি না তা খেয়াল করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনে করোনার পরীক্ষা করাতে হবে।

করণীয়

আড়াই বছরের লকডাউন, কোয়ারেন্টিন এবং মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতার পর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। কিন্তু মহামারি-পরবর্তী স্বাভাবিক জীবনের এ নতুন উপলব্ধি নানাভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। কভিড-১৯ মহামারিকে হারিয়ে দেওয়াটাকে আমাদের বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিতিশীল যুগের সমাপ্তিচিহ্ন হিসেবে দেখা যাবে না, বরং সেটিকে সেই যুগের সূচনাপর্বের উপসংহার হিসেবে দেখতে হবে।

অবশ্যই এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াই এখনো শেষ হয়নি। আগের দুই বছরে মোট যত মানুষ কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছিল, ২০২২ সালে তার চেয়ে বেশি সংক্রমিত হয়েছে এবং ভ্যাকসিন মৃত্যুর হার কমিয়ে আনলেও এই বছর বিশ্বব্যাপী ১০ লাখের বেশি মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। যেহেতু সরকারগুলো হালনাগাদ করা টিকার বুস্টার শট দেওয়ার কার্যক্রম গোটাচ্ছে, সেহেতু বিশ্বকে অবশ্যই একটি বড় পতনের ঢেউ ও করোনাভাইরাসের বিপজ্জনক নতুন ধরনের সম্ভাব্য উত্থানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

কভিড-১৯ শিগগির নির্মূল হয়ে গেলেও আমাদের লক্ষ্য স্থিতাবস্থার দিকে ফিরিয়ে নেওয়া উচিত হবে না। প্রাক-মহামারি বিশ্বে সরকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো দুর্ভাগ্যজনকভাবে শুধু যে একটি মারাত্মক রোগজীবাণুর জন্য প্রস্তুত ছিল না, তা নয়; বরং তারা এখনকার চলমান এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের বিস্ফোরণ মোকাবেলারও ন্যূনতম ধারণা আগেভাগে দিতে পারেনি। যদি আমরা এই মহামারির পরিসমাপ্তি ঘটানোকেই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে দেখতে থাকি, তবে নতুন স্বাভাবিক অবস্থাটি পুরনোটির মতোই ভঙ্গুর হবে।

মহামারি এখন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। এই মহামারির সময় আমরা দেখেছি সাম্যের ভিত্তিতে একটি ন্যায়সংগত আগাম বৈশ্বিক প্রস্তুতি নেওয়ার বদলে ভ্যাকসিন বিতরণে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে এবং দরিদ্র দেশগুলোর ভ্যাকসিন পাওয়া নিশ্চিত করতে নেতাদের গড়িমসি করতে দেখা গেছে। তবে পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও কভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যাকসেস ফ্যাসিলিটি (কোভ্যাক্স) উল্লেখযোগ্যভাবে সফল হয়েছে। কিন্তু এরপর যখন আমরা এ ধরনের একটি বৈশ্বিক সংকটের মুখোমুখি হব, তখন যাতে অধিকতর দ্রুততায় সিদ্ধান্তমূলকভাবে কাজ করতে পারি, তা আগে থেকেই নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যেকোনো সম্ভাব্য সুরক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ তহবিল ও অর্থায়ন নিশ্চিত করে রাখতে হবে অথবা নিদেনপক্ষে প্রাক-অনুমোদিত একটি কন্টিনজেন্ট তহবিল থাকতে হবে, যাতে নিম্ন আয়ের দেশগুলো অবিলম্বে জীবন রক্ষাকারী প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলোর সুবিধা পায়।

অবশ্য কোভ্যাক্স মডেল ভবিষ্যতের সব ধরনের বিপর্যয়ের জন্য ‘ওয়ান সাইজ ফিটস অল’ বা একের ভেতরে সব সমস্যার সমাধান নয়। তবে এটি আমাদের এমন দরকারি পাঠ দেয়, যা জনস্বাস্থ্যের বাইরের সংকটগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ স্ট্রাইপ, অ্যালফাবেট, শপিফাই, মেটা এবং ম্যাককিন্সির নেতৃত্বে চলা বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো কোভ্যাক্সের উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে ক্লাইমেট অ্যাডভান্স মার্কেট কমিটমেন্ট শীর্ষক একটি জলবায়ুসংকট সমাধান প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এখানে আগাম বিনিয়োগ করার জন্য তারা বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় নিজেদের প্রস্তুত করার জন্য আমরা যে নীতিই রাখি না কেন, আমাদের অবশ্যই তা দ্রুত নির্ধারণ করতে হবে। আমরা পছন্দ করি বা না করি, পরবর্তী দুর্যোগ সময়ের ব্যাপার মাত্র। এর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখাটাকে অবশ্য আমাদের নতুন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করতে হবে।

সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের কিছু সাধারণ নিয়ম আছে, যার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং প্রস্তুত রাখতে হবে। করোনা নিয়ন্ত্রণ সেখানে অবশ্যই একটি রোল মডেল। আমাদের যে ঘাটতি লক্ষ করা যায় তা হলো সমন্বয়হীনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া। আশা করা যায়, আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা সবাই মিলে বাস্তবায়ন করে আগামী দিনের সব সংক্রামক রোগ বা মহামারি প্রতিরোধ করতে পারব। পাশাপাশি পরিবেশ ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে কঠোর কর্মসূচি নিতে হবে।

 লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা