kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

দিল্লির চিঠি

কংগ্রেস গান্ধী পরিবারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হবে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই

জয়ন্ত ঘোষাল

৩ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কংগ্রেস গান্ধী পরিবারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হবে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই

ভারতবর্ষের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। সেই কংগ্রেস দলটাই বেশ কিছুদিন ধরে কেমন নির্জীব হয়ে পড়েছিল। এই দলের সাংগঠনিক শক্তি ক্রমেই ক্ষয় পাচ্ছে। যেখানেই ভোট হচ্ছে, সেখানেই কংগ্রেসের শতকরা ভোটের পরিমাণ কমছে।

বিজ্ঞাপন

কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দিচ্ছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। এমনকি খোদ বিজেপিও সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে তোপ দেগেছে। এনফোর্সমেন্ট ও সিবিআই গান্ধী পরিবারকে এখন আর ছাড়ছে না। ন্যাশনাল হেরাল্ডের তহবিল এবং অন্য কিছু বিষয় নিয়ে গান্ধী পরিবারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীকে এনফোর্সমেন্ট ও সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত করেছে।

এই পরিস্থিতিতে রাহুল গান্ধী সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি কংগ্রেস দলের সভাপতি আর হবেন না। যদি রাহুল গান্ধী শেষ পর্যন্ত আর সভাপতি না হন, তাহলে এই প্রথম গান্ধী পরিবারের একজন সদস্য স্বেচ্ছায় নেতৃত্বের চেয়ার পেয়েও সেটা না নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন।

মল্লিকার্জুন খাড়গে কংগ্রেসের রাজ্যসভার নেতা। তাঁর বয়স ৮০ বছরের ওপর। তিনি গান্ধী পরিবারের অত্যন্ত অনুগত দলিত নেতা। তিনি দক্ষিণ ভারতের একজন নেতা। এই মল্লিকার্জুন খাড়গে কংগ্রেস দলের সভাপতি পদে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে লড়ছেন শশী থারুর। মল্লিকার্জুন খাড়গে অবশ্য গান্ধী পরিবারের প্রথম চয়েস ছিল না।

প্রথম ঠিক হয়েছিল রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গহলৌতকে কংগ্রেস দলের সভাপতি করা হবে। অশোক গহলৌত প্রাথমিকভাবে রাজি হলেও তিনি সঙ্গে সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর পদটা ছাড়তে রাজি ছিলেন না। তাঁর প্রস্তাব ছিল, কিছুদিনের জন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রী এবং দলের সভাপতি—এই দুটি পদেরই দায়িত্বভার সামলাবেন। কিছুদিন পর অন্য কাউকে মুখ্যমন্ত্রী করা হবে।

শচীন পাইলট, তিনি অশোক গহলৌতের বিরুদ্ধে রাজনীতি করছেন অনেক দিন থেকেই। অনেক দিন থেকে রাজেশ পাইলটের পুত্র শচীন পাইলট মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। অশোক গহলৌত কংগ্রেসের সভাপতি হলে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যেতে পারেন—এই আশায় জাঠ-নেতা শচীন পাইলট বুক বেঁধেছিলেন। এদিকে অশোক গহলৌতের অনুগামীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। শচীন পাইলট মুখ্যমন্ত্রী হলে তারা দল ভেঙে যাবে বলে হুমকি দেয়।

কংগ্রেস হাইকমান্ড বুঝতে পারে, এখন যদি রাজস্থান নিয়ে খুব বেশি অ্যাডভেঞ্চারিজমে যাওয়া হয়, তাহলে রাজস্থানেও মহারাষ্ট্রের মতো পরিস্থিতি হতে পারে। এর ফলে সরকারটাই ভেঙে গিয়ে বিক্ষুব্ধ কংগ্রেস বিধায়কদের সমর্থন নিয়ে বিজেপি ওখানে একটা সরকার বানিয়ে ফেলতে পারে। শচীন পাইলট যে শেষ পর্যন্ত বিজেপিতে চলে গিয়ে বিজেপির সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রীর পদ দখল করে ফেলবেন না, তার এমন কী গ্যারান্টি আছে। নানা আশঙ্কা, নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে দলের অন্দরে।

রাজস্থানকে কেন্দ্র করে এই কয়েক দিন ধরে যখন জটিলতা তৈরি হয় তখন এই সিদ্ধান্তটাই চূড়ান্ত হয় যে অশোক গহলৌতকেই তাহলে মুখ্যমন্ত্রীর পদে রাখা হোক। তাঁর আর দলের সভাপতি পদে নির্বাচনে লড়ার দরকার নেই। কেননা শচীন পাইলটকে মুখ্যমন্ত্রী করতে অশোক গহলৌত প্রস্তুত ছিলেন না। অশোক গহলৌত এসে সোনিয়া গান্ধীকে জানিয়ে দিলেন, তিনি দলের সভাপতি পদে লড়বেন না। তাহলে আর কোনো সমস্যা রইল না। তখন মল্লিকার্জুন খাড়গেকে বাছা হলো।

এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে, গান্ধী পরিবার সরে দাঁড়ালেও মল্লিকার্জুন খাড়গেও যদি কংগ্রেস সভাপতি হন, তাহলেও কি এটা গান্ধী পরিবারের প্রভাব ও প্রতিপত্তিহীন কংগ্রেস দল হবে, নাকি মল্লিকার্জুন খাড়গে আসলে রাহুল গান্ধীর কথা শুনেই গান্ধী পরিবারের অনুগত নেতা হিসেবেই দলটা চালাবেন? রাহুল গান্ধী সে ক্ষেত্রে দলের সভাপতি থাকবেন না। তিনি কার্যত দলের অদৃশ্য চালিকাশক্তি হবেন এবং ভবিষ্যতে তিনি কংগ্রেস দলের ইমিরেটাস চেয়ারম্যান পর্যন্ত হতে পারেন।

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে কেন রাহুল গান্ধী এটা করছেন?

প্রথমত, রাহুল গান্ধী অত্যন্ত আধুনিক এবং খুব হৃদয়বান মানুষ। চলতি রাজনীতির যে ঘরানা, সেই ঘরানায়ও বোধ হয় তিনি থাকেন না। তিনি বিশ্বাস করছেন, তাঁর এই পদ ছেড়ে দেওয়াই কাম্য। এককথায় বলা যায়, প্রথম থেকেই তিনি যেন কিছুটা রিল্যাকটেন্ট পলিটিশিয়ান। আবার পাকেচক্রে তিনি এখন রাজনীতির মধ্যেই ঢুকে পড়েছেন। তার ফলে দলের সভাপতি না থেকেও সারাক্ষণ টুইট করা, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেওয়া এবং দলকে পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দেশ দেওয়া—এগুলো তিনি করছেন। এখন ভারত ‘জোড়ো কর্মসূচি’ নিয়েও তিনি সক্রিয় হয়ে মাঠে নেমেছেন।

‘ভারত জোড়ো’ কর্মসূচির পাশাপাশি এইবার কংগ্রেস দলের ভোটকে কেন্দ্র করে চব্বিশ নম্বর আকবর রোডে, কংগ্রেসের সদর দপ্তরে কংগ্রেস কর্মীদের যে উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে এত লোক দেখা যায়নি। দলের সভাপতি যে-ই হন না কেন, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস দলের মধ্যে একটা প্রাণ এসেছে। রাহুল গান্ধীর এই সরে দাঁড়ানোর পেছনে যে একটা কৌশল থাকতে পারে সেটা হচ্ছে, যেহেতু মোদি ও অমিত শাহর নেতৃত্বে বিজেপি রাহুল গান্ধীকেই প্রধান টার্গেট করেছে, সেহেতু রাহুল গান্ধী সরে গেলে তখন টার্গেটটা তাদের সামনে থেকে সরে যায়। আর আক্রমণের নিশানা সরে গেলে তাদের আক্রমণাত্মক যে রণকৌশল এবং তারা যেভাবে এজেন্সিকে পর্যন্ত লাগিয়ে দিয়েছে সেই বিরোধিতার রাজনীতিও কিছুটা লঘু হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, রাহুল গান্ধী সরে গেলেও গান্ধী পরিবারের নিয়ন্ত্রণ কিন্তু থাকবে। সে ক্ষেত্রে একেবারে রথের রশিটা গান্ধী পরিবারের হাত থেকেও আবার বেরিয়ে যাচ্ছে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি কী হবে, সেটা দেখার জন্য বিজেপিও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। বিজেপিও কিন্তু দেখবে যে এই ভবিষ্যৎ কোনদিকে যায়।

কংগ্রেস প্রায় দুই শ বছরের সুপ্রাচীন একটি দল। সেই দলে নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধী—তাঁরা যৌথভাবে ২৮ বছর ধরে দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তারপর অবশ্য পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। ইন্দিরা গান্ধী সাতটি বছর একটানা দলের সভাপতি ছিলেন। তারপর তাঁর ছেলে রাজীব গান্ধী ছয় বছর ধরে কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। রাজীব গান্ধী দুঃখজনকভাবে ১৯৯১ সালে নিহত হন। তারপর নরসিমা রাও পাঁচ বছর দলের সভাপতি ছিলেন। তারপরে সীতারাম কেশরী কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন মাত্র ১৮ মাসের জন্য। তারপর সোনিয়া গান্ধী এসেছেন। সোনিয়া গান্ধীও দীর্ঘদিন কংগ্রেসের সভানেত্রী ছিলেন। তারপর তাঁর পুত্র এই পদে আসীন  হয়েছেন। সুতরাং কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে ২৩ বছর সোনিয়া গান্ধী ছিলেন। তাঁর সময় দেখা গেছে, দল ক্রমেই অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। গড় শক্তির শতকরা ৩১.০৬ ভাগ কংগ্রেসের অবনমন হয়েছে। ভোট-শেয়ার শতকরা ৩১.০৬ ভাগ কমে গেছে। লোকসভায় আসনসংখ্যা কমেছে প্রায় শতকরা ৫০.০২ ভাগ।

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে কংগ্রেস দলটা কার্যত একটা মৃতকল্প দলে পরিণত হয়েছে। এই মুহূর্তে ছত্তিশগড় বা রাজস্থান ছাড়া কোথাও কংগ্রেসের সরকারই নেই। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ১০ বছর ধরে কংগ্রেসমুক্ত ভারতের যে ডাক তিনি দিয়েছিলেন, সে কাজে তিনি অনেকটা সফল হয়েছেন। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস কোনোভাবেই ভালো ফল করতে পারেনি। উত্তর প্রদেশে কংগ্রেস ব্যর্থ হয়েছে। উত্তর প্রদেশে, যেখানে গান্ধী পরিবারের গড় বলে মানা হতো, সেখানে রাহুল গান্ধী হেরে গেছেন এবং স্মৃতি ইরানি জিতেছেন।

এই পরিস্থিতিতে রাহুল গান্ধী দায়িত্ব নিয়ে সরে দাঁড়াতে চাইছেন। এটা একটা অত্যন্ত ভালো দৃষ্টান্ত। কংগ্রেসের এখন যে লড়াই, তাতে একজন তৃতীয় ব্যক্তি কে এন ত্রিপাঠী ঝাড়খণ্ড থেকে এসে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি খুব একটা শক্তিশালী প্রার্থী নন। কংগ্রেসে যে একটা গণতন্ত্রের হাওয়া বইছে, এই চিত্রকল্পটিও কংগ্রেস হাইকমান্ড জনসমক্ষে তুলে ধরতে চাইছে। সব মিলিয়ে একটা সাজ সাজ রব। ভোটের ফল যা-ই হোক না কেন, গান্ধী পরিবার সরাসরি যদি দলের সভাপতিত্বে নাও থাকে, তাহলেও কংগ্রেস গান্ধী পরিবারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে যাবে—এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠের

বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা