kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

কারা বলে গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা

আবদুল মান্নান

২ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



কারা বলে গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা

রাস্তায় ও মিডিয়ায় বিএনপি ও তাদের মিত্রদের মাতম, দৌড়ঝাঁপ, আহাজারি, লাঠির মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে মিছিল-সমাবেশ করা দেখে বোঝা যায় একটি জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। বাংলাদেশে নির্বাচন বিষয়টিই একটি আনন্দ উৎসবের মতো। এমনকি স্কুল-কলেজের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনেও যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়, তা অনেকটা নজিরবিহীন। আর জাতীয় নির্বাচন এলে তো কথাই নেই।

বিজ্ঞাপন

ব্যানার, ফেস্টুন, মিছিল, মাইকে অমুক মার্কায় ভোট দেওয়ার আহবানসহ বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের কাছে বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়া ছিল একটি রেওয়াজ আর যা ছিল সব সময় শান্তিপূর্ণ। এই শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ ধীরে ধীরে অশান্ত হওয়া শুরু হলো পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার পরপরই। আর এই কাজটি অত্যন্ত সুচারু আর দক্ষতার সঙ্গে করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। বক্তব্যটি কোনো রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য নয়, বরং কিছু ভুলে যাওয়া সত্য তুলে আনার জন্য।

১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর যখন জিয়ার কাছে এই খবর পৌঁছাল যে প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি খুব ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দিয়েছিলেন, ‘সো হোয়াট প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার, প্রেসিডেন্টের মৃত্যু হয়েছে তাতে কী, উপরাষ্ট্রপতি তো আছেন। ’ সাংবিধানিকভাবে এমনটিই হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে কী হলো? ঘাতকদের একজন মেজর শরিফুল হক ডালিম রেডিওতে ঘোষণা করলেন হত্যাকাণ্ডের কথা আর জানিয়ে দিলেন, ঘাতকদের শিরোমণি বঙ্গবন্ধুর একসময়ের রাজনৈতিক সতীর্থ আর তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য খন্দকার মোশতাক নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং দেশে সামরিক আইন ঘোষণা করেছেন। তখনো কিন্তু নির্বাচিত উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম জীবিত এবং দেশের সংবিধানও বহাল আছে। কয়েক দিন পর সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতাকে আটক করে নেওয়া হলো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে। ৩ নভেম্বর তাঁদের কারা অভ্যন্তরে হত্যা করা হলো। ৮১ দিনের মাথায় জিয়া মোশতাককে উত্খাত করে রাষ্ট্রপতি আর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এ এস এম সায়েমকে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণসহ পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে যত সংবিধানবিরোধী অপকর্ম হয়েছে, সব কিছুই জিয়ার গোচরে আর অনুমোদনে হয়েছে। কারণ এ সময় দেশে তাঁর চেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি কেউ ছিলেন না। ২৫ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে সেখানে জিয়া নিজেকে স্থলাভিষিক্ত করেন।

জিয়া ছিলেন চরম উচ্চাভিলাষী ও ধুরন্ধর। আড়ালে না থেকে তিনি ক্ষমতার সদর দরজায় দাঁড়ানোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ১৯৭৫ সালের ২৯ নভেম্বর বিচারপতি সায়েমের কাছ থেকে প্রধান সামরিক আইনের পদটি কেড়ে নিয়ে নিজে তাতে নিজেকে পদায়ন করেন। মনে থাকার কথা, জিয়ার শাসনামলের প্রায় প্রথম তিন বছর রাতের বেলায় কারফিউ দিয়ে তিনি দেশ শাসন করেছেন। তাঁর এত কিসের ভয়, তা বুঝতে কষ্ট হয়। সর্বশেষ সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করলেন যখন জিয়া ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েমের বিছানায় বুট পরা পা রেখে তাঁর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তাঁকে ইস্তফাপত্রে সই করতে বাধ্য করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। এসব কথা বিচারপতির আত্মজীবনীতে আছে। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে জিয়া এক অভিনব পদ্ধতিতে নিজের ক্ষমতা দখলের বৈধতা দেওয়ার ব্যবস্থা হিসেবে তাঁর প্রতি মানুষের সমর্থন আছে কি না, তা জানতে চেয়ে এক ‘হ্যাঁ’—‘না’ ভোটের তামাশা করলেন। তিনিই একমাত্র প্রার্থী। এ বিষয়ে জনগণের কোনো আগ্রহ না থাকলেও প্রায় শতভাগ ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যবস্থা করে তিনি তাঁর ক্ষমতা দখলকে হালাল করলেন। প্রায় অর্ধেক কেন্দ্রে ‘না’ ভোট দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

দেশের সংবিধান বহাল রেখে জিয়ার এমন কর্মকাণ্ড ছিল ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রতি চরম অবজ্ঞা। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মকর্তা নিজ দায়িত্বে থেকে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। এমনকি একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীও যদি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তাহলে তাঁকে তাঁর পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে, তা নিশ্চয় জিয়া জানতেন। জিয়া যা করেছেন, তা ছিল জিয়ার গণতন্ত্রের স্টাইল। ঘটনা আরো আছে। জিয়া যখন সেনাপ্রধান, তখন তিনি ঘোষণা করলেন, ১৯৭৮ সালের ৩ মে দেশে একটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে এবং তিনি সেনাপ্রধান ও স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে এই নির্বাচনে অংশ নেবেন। এবার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানী (অব.)। ওসমানীকে সমর্থন দিল আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সমমনা দল, নাগরিক সমাজ আর পেশাজীবী সংগঠনগুলো। জিয়ার পক্ষে মাঠে নামল পুরো সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন। সেই নির্বাচনে জিয়ার বিজয় না হয়ে কি যায়! জিয়া ক্ষমতায় থাকতে সেনাছাউনিতে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালে গঠিত হলো তাঁর নিজের রাজনৈতিক দল বিএনপি। ব্যবহার করা হলো পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। জিয়ার গণতন্ত্রের আরেক চমক।

আরো আছে। এরপর ১৯৭৮ সালেই তিনি দল গঠনের সব ব্যবস্থা সেরে সেনাবাহিনী থেকে ১ ডিসেম্বর মেজর জেনারেল হিসেবে অবসরে যান। এ প্রসঙ্গে সেনা সদর বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। প্রজ্ঞাপন এলো ১৯৭৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মেজর জেনারেল জিয়া বীর-উত্তমকে অস্থায়ীভাবে লে. জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে এবং তা প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকে কার্যকর হবে। ’ কী অদ্ভুত ব্যবস্থা! যেদিন জিয়া বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিচারের সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে সংবিধানে ‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে ১৫ই আগস্টের সব ঘাতকের সংঘটিত হত্যাকাণ্ড হালাল করে দিয়েছেন, সেদিন থেকে জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একজন বড়মাপের ভিলেন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। জিয়ার আমলে যেমনভাবে পদে পদে সংবিধান লঙ্ঘিত হয়েছে, তা আর কখনো হয়নি। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল মনে করেন, জিয়াপত্নী বেগম জিয়া ‘গণতন্ত্রের জননী’। তাহলে জিয়া কি গণতন্ত্রের জনক? হায়রে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে বিধৌত বাংলাদেশ! মির্জা ফখরুল আরো মনে করেন, আওয়ামী লীগ বেগম জিয়াকে মুক্তি দিচ্ছে না। কারণ তারা জানে, বেগম জিয়া মুক্ত হলে তাদের অস্তিত্ব থাকবে না। বেগম জিয়া তো এই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই ২০১৩, ’১৪ ও ’১৫ সালে যুদ্ধ ঘোষণা করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। কয়েক শ নিরপরাধ মানুষ হত্যা করা ছাড়া তো আর কিছুই হয়নি।

এখন আসি আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির মাতম প্রসঙ্গে। বিএনপি নামের দলটি নির্বাচন কমিশন মানে না, সংসদে আস্থা নেই, মানুষের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে, নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য কয়েক শ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করতে কসুর করে না, তারা এখন আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে মাতম করছে বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না, হতে দেওয়া হবে না। তারা নির্বাচন কমিশনকেও মানে না। তারা দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক বাতিল ঘোষিত ‘তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। এই মামলার (ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল মামলা) আদেশে বলা হয়েছে, নির্বাচনে এমন ব্যবস্থা বাতিলযোগ্য ও ভাবীসাপেক্ষ বাতিল ঘোষণা করা হলো। আরো বলা হয়েছে, এক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এক মিনিটের জন্যও দেশের শাসনব্যবস্থা কোন অনির্বাচিত গোষ্ঠী বা ব্যক্তির হাতে যাওয়া সম্পূর্ণ বেআইনী। ’ বিএনপির পণ্ডিতজনরা প্রায়ই বলে থাকেন, ১৯৯১ সালে এমন ব্যবস্থা তো সংবিধানে ছিল না, তখন হতে পারলে এখন কেন নয়? তাঁরা কি ওই মামলার আদেশটি পড়ে দেখেননি, যেখানে লেখা আছে, ‘The Constitution (Thirteenth Amendment) Act 1996 (Act 1 of 1996), is ultra vires the Constitution and herby declared void prospectively.’ (অতএব, সংবিধানের (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬, ২০১১ সালের ১০ই মে তারিখ হইতে ভাবীসাপেক্ষ ভাবে অসাংবিধানিক তথা অবৈধ ঘোষণা করা হইল)। এই আদেশের বিরুদ্ধে কেউ প্রয়োজন বোধ করলে ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ পিটিশন দায়ের করতে পারতেন, কিন্তু তা করা হয়নি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনকালীন সরকারও বিতর্কেও ঊর্ধ্বে ছিল না।

মামলার রায়ের এক জায়গায় বিজ্ঞ আদালত এও বলেছেন যে সংসদ যদি অনুমোদন করে, তাহলে পরবর্তী দুটি নির্বাচন এই ব্যবস্থামতো হতে পারে, তবে সেখানে আইন বিভাগের কোনো ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করা যাবে না। আইন বিভাগ রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পবিত্র প্রতিষ্ঠান। এটিকে বারবার বিএনপি নানাভাবে বিতর্কিত করেছে। আইন বিভাগ প্রয়োজনে সংবিধানকে ব্যাখ্যা করে তাকে যদি বারবার বিতর্কিত করা হয়, তাহলে দেশে আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। বদ মতলবে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়িয়ে এই বিতর্কের সূচনা করেছিল বিএনপি। ২০০৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন বিদ্যমান ব্যবস্থার সব কটি বিকল্প ব্যবহার না করে বেগম জিয়ার হুকুমে নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হয়ে গিয়েছিলেন। এর আগে কর্মরত বিচারপতি আবদুল আজিজকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে রাষ্ট্রের আইন ভঙ্গ করেছিল খালেদা জিয়ার সরকার, যা পরবর্তীকালে উচ্চ আদালত বেআইনি ঘোষণা করেছিলেন। এই কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার নামে এক কোটি ২১ লাখ ভুয়া ভোটার তালিকাভুক্ত করেছিল।

এখন চিন্তার বিষয় কারা হবেন বিএনপি আর তার মিত্রদের বেআইনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য। আইন সভা তো আইন করে বাদ দিয়েছে। তাহলে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে আসবেন এই ফেরেশতারা? এই মুহূর্তে এটা নিয়ে বিএনপিকে চিন্তায় ব্যস্ত থাকতে হবে। তবে তাদের বদ পরামর্শ দেওয়ার মানুষের অভাব নেই। নির্বাচন করবে নির্বাচন কমিশন। তারাই নির্বাচনকালীন সরকারের জরুরি দায়িত্ব পালন করবে। আর নির্বাচিত সরকার শুধু রুটিন দায়িত্ব পালন করবে। বিএনপি গত নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। আমার কেন্দ্রে তাদের প্রার্থী যোগ্য ছিলেন। কিন্তু নির্বাচন চলাকালে তাঁর কোনো কর্মীর দেখা পাওয়া যায়নি, এমনকি এজেন্টেরও না। এমন হলে বিএনপি কিভাবে আশা করে নির্বাচনে ভালো করবে। আর প্রার্থী বাণিজ্যের কথা বাদই দিলাম।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক



সাতদিনের সেরা