kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বিশেষ সাক্ষাৎকার

সঠিক তথ্যের অভাব হৃদরোগের চিকিৎসায় বাধা

আজ বিশ্ব হার্ট দিবস। দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে আলাপ করেছেন এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকার ডিরেক্টর, মেডিক্যাল সার্ভিসেস ডা. আরিফ মাহমুদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইদ শাহীন

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সঠিক তথ্যের অভাব হৃদরোগের চিকিৎসায় বাধা

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশে হৃদরোগের চিকিৎসাব্যবস্থা কতটুকু উন্নত হয়েছে?

ডা. আরিফ মাহমুদ : বাংলাদেশ গত দুই দশকে হৃদরোগ চিকিৎসায় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি  হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী হৃদরোগীদের সেবা প্রদান করছেন। বর্তমানে হৃদরোগের বিভিন্ন চিকিৎসা যেমন—হার্ট অ্যাটাক, এনজিওগ্রাফি, এনজিওপ্লাস্টি, পেসমেকার প্রতিস্থাপন, হার্ট ফেইলিওর, অ্যারিদমিয়া, ইলেকট্রোফিজিওলজি, শিশুদের কার্ডিয়াক সার্জারি, ভালভের সার্জারি এবং অন্যান্য জটিল সার্জারি নিয়মিত করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, শিশুদের হার্টের জটিল রোগের চিকিৎসা অস্ত্রোপচার ছাড়াই ডিভাইসের মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগের চিকিৎসকরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া বড়দের বিনা অস্ত্রোপচারে হার্টের ভালভ প্রতিস্থাপন  (TAVR) করা হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতালে হৃদরোগের সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য আন্তর্জাতিক মানের ডায়াগনস্টিক সেটআপ [ইকো, ট্রান্সসোফেজিয়াল ইকো, ইকোকার্ডিওগ্রাম, ইকো কালার ডপলার, ডিএসি (ডবুটামিন স্ট্রেস ইকো),  স্ট্রেস টেস্ট  (TMT), হল্টার মনিটর, ২৪ ঘণ্টা আম্বুলেটির ব্লাড প্রেসার মনিটর, ইপিএস—ইলেকট্রোফিজিওলজিক্যাল স্টাডি ও আবলেশন টিল্ট টেবিল টেস্ট, অ্যাংকল ব্র্যাকিয়াল ইনডেক্স, সিটি করোনারি এনজিওগ্রাফি, সিটি পেরিফেরাল এনজিওগ্রাফি, নিউক্লিয়ার কার্ডিওলজি—নিউক্লিয়ার স্ক্যান,  PET, MPI] বিদ্যমান। এসব রোগের চিকিৎসার জন্য স্টেট অব দি আর্ট ডায়াগনস্টিক ফ্যাসিলিটি, ক্যাথ ল্যাব, সিসিইউ আছে। সুতরাং এখন হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য রোগীদের দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

 

কালের কণ্ঠ : দেশে হৃদরোগে আক্রান্তের হার কেন বাড়ছে?

ডা. আরিফ মাহমুদ : বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ মানুষ কার্ডিওভাসকুলার রোগে মারা যায়, যা বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ। আর এই মৃত্যুর ৬০ শতাংশ হয় হার্ট অ্যাটাকের কারণে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে করোনারি হৃদরোগের কারণে তিন-চতুর্থাংশ মৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশে হৃদরোগের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১৪.৩১ শতাংশ। গত ১০ বছরে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর হার পুরুষের ক্ষেত্রে ৩৫ এবং নারীর ক্ষেত্রে ৪৮ গুণ বেড়েছে। তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।

হার্ট অ্যাটাক কী বা কেন হয়, সেটা হয়তো অনেকেই জানে না। হার্ট অ্যাটাক আসলে মায়োকার্ডিয়াল ইনফারকশন, এটি একটি রক্তপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতাজনিত মেডিক্যাল জটিলতা। কোনো প্রতিবন্ধকতার কারণে হার্টে রক্ত চলাচল হঠাৎ থেমে গেলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে। সাধারণত রক্তনালিতে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমে প্ল্যাক গঠিত হয়, যাকে আমরা ব্লক বলে থাকি। এটি হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম কারণ। সহজভাবে বলা যায়, ব্লক হয়ে যাওয়া ধমনি হৃদযন্ত্রের একাংশে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক হয়। ব্লক হয়ে যাওয়া ধমনি যদি দ্রুত আবার চালু করা না যায়, তাহলে সেই ধমনি দ্বারা চালিত হৃদযন্ত্রের অংশটি কাজ করা বন্ধ করে দেয় আর তখন রোগীর মৃত্যু হয়।

আমাদের দেশে দিন দিন হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষ এখন ফাস্ট ফুড যেমন—বার্গার, পিত্জা, চিকেন ফ্রাই, চর্বিজাতীয় খাবার ইত্যাদি বেশি খাচ্ছে, ফলে খাদ্য হজমে সমস্যা হচ্ছে। সঠিকভাবে এনজাইম নিঃসরণ হচ্ছে না। খাদ্যাভ্যাস নিয়মিত হচ্ছে না, ফলে হৃিপণ্ডের ক্ষতি হচ্ছে। দেশে হৃদরোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ তামাকের ব্যবহার, হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়া, ওজন বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি।

এ ছাড়া তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক বেশি হওয়ার কারণ হলো ধূমপান, জাংক ফুড, পর্যাপ্ত না ঘুমানো, অলস জীবনযাত্রা, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়া, ব্যায়াম না করা, বংশগত কারণ ইত্যাদি।

দেশে হৃদরোগের চিকিৎসাব্যবস্থা রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রান্তিক এলাকার মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, এর ফলে হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। অনেকেই আবার এই রোগ সম্পর্কে সচেতন নয়।

 

কালের কণ্ঠ : হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যয় তো অনেক বেশি।

ডা. আরিফ মাহমুদ : বাংলাদেশে হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যয় বেশি বলে যে কথা শোনা যায়, বিষয়টা আসলে তেমন নয়। এটা ভ্রান্ত ধারণা মাত্র। বংলাদেশে বেসরকারি হাসপাতালে এনজিওগ্রাম করাতে খরচ হয় ১৭ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা। এনজিওপ্লাস্টি করাতে খরচ হয় ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা আর এনজিওপ্লাস্টির সময় যে রিং পরানো হয় তার খরচ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সমান। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে স্টেন্টের দাম বাংলাদেশের সব হাসপাতালের জন্য সমান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল বা চিকিৎসকদের পক্ষে এর চেয়ে বেশি দাম রাখা সম্ভব নয়। যেমন—ওপেন হার্ট সার্জারি করার খরচ দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা। এই চিকিৎসা সুবিধাগুলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে নিতে গেলে বাংলাদেশের খরচের চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি হয়, থাইল্যান্ডে এই খরচ বাংলাদেশের চেয়ে চার-পাঁচ গুণ এবং সিঙ্গাপুরে আট থেকে ১০ গুণ বেশি। এ ছাড়া রোগী, রোগীর স্বজনদের যাতায়াত এবং থাকার খরচ তো আছেই। আবার অনেক সময় দেখা যায়, হার্ট অ্যাটাক হলে রোগী বুঝতে পারে না, বিভিন্ন হাসপাতালে যেতে হয় এবং পরিশেষে একটা পূর্ণাঙ্গ কার্ডিয়াক সেন্টারে পৌঁছতে দেরি হয়ে যায়। এ ছাড়া এসব হৃদরোগীর অন্যান্য কোমরবিডিটিজ থাকে, যেমন—ডায়াবেটিস, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, স্ট্রোক। তখন সব মিলিয়ে রোগীর চিকিৎসা খরচ বেড়ে যায়।

 

কালের কণ্ঠ : বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের নির্ভরতা কেমন?

ডা. আরিফ মাহমুদ : বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থা বিশ্বের অনেক দেশেই অনুকরণীয়। আমাদের দেশে সরকার বিনা পয়সায় রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের জন্য গ্রামসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জেলা হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল/বিশেষায়িত হাসপাতালের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ১৭ কোটি মানুষের একটি জনবহুল দেশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ জন্যই বেসরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা গড়ে উঠেছে। বর্তমানে বেসরকারি হাসপাতালগুলো সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে, এমনকি কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট, বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট, আইভিএফসহ সব ধরনের চিকিৎসা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের রোগীরা সরকারি স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ রোগীকে বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে।

 

কালের কণ্ঠ : স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা ফেরাতে এভারকেয়ার হাসপাতালের বৈশিষ্ট্য কী?

ডা. আরিফ মাহমুদ : হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রোগীদের আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য ২৪/৭ সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট দ্বারা পরিচালিত অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া রোগীর সেবায় পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি সম্পন্ন করা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ২৪/৭ রোগীর সেবা নিশ্চিত করে থাকেন। হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবার মান নির্ণয়ের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে তাদের নিজস্ব অ্যাক্রেডিটেশন (মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা) বডি আছে। স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুরুতেই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান জেসিআই  (JCI)-এ আবেদন করে। পরবর্তী সময়ে জেসিআই অডিটের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র হাসপাতাল হিসেবে আন্তর্জাতিক সনদ লাভ করে এবং এখন পর্যন্ত পাঁচবার সনদপ্রাপ্ত হাসপাতাল হচ্ছে এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা। সুতরাং আমাদের হাসপাতালে আন্তর্জাতিক গাইডলাইন/প্রটোকল অনুযায়ী সব রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়ে থাকে। এ ছাড়া রোগীর সন্তুষ্টির জন্য স্যাটিসফ্যাকশন সার্ভে প্রতিনিয়ত করা হয়ে থাকে। ডাক্তার, নার্সসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে, যাতে আমরা রোগীদের উন্নত থেকে উন্নততর সেবা প্রদান করতে পারি।

 

কালের কণ্ঠ : রোগীরা দেশে কেন চিকিৎসা নিতে আস্থা পাচ্ছে না?

ডা. আরিফ মাহমুদ : আমাদের দেশের ডাক্তার ও নার্সরা বিশ্বমানের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা যদি দীর্ঘ আড়াই বছরের কভিড মহামারির সময়টা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাব, বাংলাদেশের কোনো রোগী এই সময়ে বিদেশে যেতে পারেনি। সবাই বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ও ডাক্তারের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে কভিডে মৃত্যুর হার আমেরিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক ভালো (২ শতাংশেরও কম)। এই দীর্ঘ সময়ে ডাক্তার, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে নিরলসভাবে রোগীদের সেবায় কাজ করেছেন। এ জন্য আমি বাংলাদেশের চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। রোগীদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ থাকবে, একটু ধৈর্য ধরুন এবং বাংলাদেশের চিকিৎসকদের প্রতি আস্থা রাখুন, আমরা আপনাদের সুচিকিৎসায় নিয়োজিত আছি।

 

কালের কণ্ঠ : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ডা. আরিফ মাহমুদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।

 



সাতদিনের সেরা