kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

প্রতারণামূলক অপরাধ ও প্রতিকার

নিয়াজ আহম্মেদ

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রতারণামূলক অপরাধ ও প্রতিকার

সমাজের সর্বত্র আজ প্রতারণামূলক অপরাধ লক্ষ করা যাচ্ছে। এই অপরাধগুলো অতীতে ছোটখাটো বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কেননা এ ধরনের অপরাধীদের মধ্যে ভয় বেশি কাজ করত। মানুষের আস্থা অর্জন করতে না পারলে কোনোভাবেই প্রতারণা করা যায় না।

বিজ্ঞাপন

অনেকে সহজে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে, আবার কারো পক্ষে তা করা কঠিন। কাজটি সহজ নয় বিধায় অপরাধীকে খুব ধূর্ত ও চতুর হতে হয়। মন জয় ও আস্থা অর্জনের জন্য জানতে হয় নানা রকম কৌশল; আশ্রয় নিতে হয় মিথ্যার।

একসময় আমাদের ধারণা ছিল, প্রতারণামূলক অপরাধীরা শুধু কম শিক্ষিত ও সহজ-সরল মানুষের সঙ্গেই প্রতারণা করতে পারে, কিন্তু অনেক ঘটনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিষয়টি সঠিক নয়। এখন অনেক শিক্ষিত মানুষও লোভে পড়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে খুব সহজেই প্রতারিত হচ্ছেন। কারো সরলতার সুযোগ নিয়ে, কাউকে প্রলোভনে ফেলে, আবার কারো দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সমাজে অপরাধ করছে এবং বীরদর্পে টিকে আছে। মোটাদাগে বলতে হয়, এ ধরনের অপরাধীরা আমাদের মধ্যে এমনভাবে আস্থা অর্জন করে, যখন আমরা অনেক সময় কষ্ট করে অর্থ উপার্জনের কথা ভুলে যাই; ঠিক একই কারণে আমাদের সচেতনতার মাত্রা কমে যায়, আমরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। মোটকথা, আমরা এতটাই লোভে পড়ি, নিজেকে দুর্বল মনে করি কিংবা দুর্বলচিত্তের মানুষ বনে যাই, যেখানে প্রতারকরা সহজে প্রতারণামূলক অপরাধ করতে সাহস পায়। প্রতিকারে আমাদের মধ্যে সচেতনতার মাত্রা বাড়ানো এবং হুজুগে কান না দিয়ে সত্যাসত্য যাচাই করা দরকার।

সমিতি কিংবা এনজিওর নামে গ্রামের সহজ-সরল গরিব মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা দেওয়ার নাম করে অর্থ আদায় এবং একসময় উধাও; জমি কিংবা গাড়ি বিক্রির নামে টাকা নিয়ে কোনোটাই না দেওয়ার মতো অপরাধ; কাউকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে অর্থ আদায় ইত্যাদি ধরনের প্রতারণামূলক ঘটনা সমাজে অহরহ ঘটছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থীকে ব্যাগে অবৈধ জিনিস আছে বলে পুলিশ পরিচয়ে প্রতারণা আমাদের চোখে পড়ে। এখানে সব কয়টির বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়, তবে অপরাধীদের ধরন ও কৌশলের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। নিজ নিজ পেশাগত কাজের অভিজ্ঞতা ব্যক্তিকে পরবর্তী সময়ে প্রতারণামূলক অপরাধ করতে সাহায্য করে। কেননা তাদের পক্ষে অপরাধের কৌশলগুলো আয়ত্ত করা সহজ হয়। কৌশলগুলো এতটাই পরিপক্ব যে আমাদের অবিশ্বাস করার উপায় থাকে না। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ ও সাবলীল করছে, তেমনি প্রতারকদের প্রতারণা করার কাজকেও সহজ করেছে। ধরুন, নাটোরের গুরুদাসপুরের পৌরসভার অডিট নিয়ে প্রতারণার ঘটনা। তিনজন লোক অফিশিয়াল চিঠির মাধ্যমে অডিট করা শুরু করে। অথচ কেউ কাগজপত্রের সত্যাসত্য যাচাই করেনি। আমরা সবাই জানি, সরকারি কি বেসরকারি—সবার ওয়েব পেজ রয়েছে, যেখানে যাবতীয় তথ্য পাওয়া যায়। যখন তারা ঘুষ দাবি করল, তখন আমাদের টনক নড়ল। এখানে অপরাধীদের সাহসের তারিফ করতে হয়। তারা হয়তো ধরেই নিয়েছে, তাদের কিছুই হবে না। ঢাবি শিক্ষার্থী পারত তার ব্যাগ খুলে পুলিশ পরিচয়কারী প্রতারককে দেখাতে, কিন্তু নিজের ওপর তার বিশ্বাসের অভাব ছিল কিংবা তাকে যখন দূরে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখনো বিষয়টি তার বোঝা উচিত ছিল।

সমাজে জীবিকার জন্য বৈধ ও অবৈধ উভয় পথই খোলা আছে। আইনগত, সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ পথই জীবিকা অর্জনের একমাত্র পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বৈধ পথে অর্থ উপার্জন করা যেকোনো সমাজের জন্যই পরিশ্রমের। কেননা অনেক মানুষ দিনের পর দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। হয়তো দুমুঠো খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছে। আবার অনেক মানুষ আছে, যারা অবৈধ পথে অনেক সম্পদের মালিক হচ্ছে। সমাজে বৈধ পথগুলো যদি কোনো কারণে সংকুচিত হয়ে আসে, তখন জীবিকা অর্জনের সুযোগ আরো কমে যায়। বৈধ পথে যেতে হলে কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্য ধারণ করতে হয়। কিন্তু আমি যখন কোনোটাই করতে রাজি নই, তখন আমাকে অবৈধ পথকেই বেছে নিতে হয় এবং এর ওপর আমার বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি হয়। প্রতারকরা তখন সুযোগের ভালো ব্যবহার করে। তবে প্রতারণামূলক অপরাধের অন্যতম কারণ সমাজের ভোগবাদিতা। যে বা যারা এ ধরনের অপরাধ করছে, তারা যে শুধু পেটের দায়ে করছে, তা কিন্তু নয়। ভোগবাদিতা একটি সমাজে থাকবে, তবে প্রতারণা করে অন্যের টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভোগবাদিতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সমাজে বৈধ পথে সম্মানজনক অর্থ উপার্জনের পথ যত বেশি সৃষ্টি হবে, ততই প্রতারণামূলক অপরাধের মাত্রা কমে আসবে। আমাদের কাজ হবে অবৈধ পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া। সমাজের সর্বত্র নিয়ম-নীতির প্রয়োগ ঘটানো। আমরা যদি জনগণকে পথ তৈরি করে না দিতে পারি কিংবা বৈধ পথগুলো অবারিত না হয়, তাহলে কেউ না কেউ আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। আর আমি আমার প্রয়োজনে বৈধ-অবৈধতার প্রশ্ন না তুলে তার কাছেই ঝুঁকব।

আমাদের মধ্যে কষ্ট করে সঠিক পথে অর্থ উপার্জন করার সুযোগ ও মানসিকতা থাকলে লোভ আমাদের পেয়ে বসত না। আমাদের সচেতনতাই পারে প্রতারণামূলক অপরাধ থেকে রক্ষা করতে। গণমাধ্যম এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পারেন মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও বিচারকদের কাজ হলো ভুয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে শনাক্ত করা এবং তাদের শাস্তির আওতায় আনা। প্রত্যেক মানুষকে আশপাশ সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। আর যিনি প্রতারণায় পড়তে যাচ্ছেন বলে মনে করবেন কিংবা সন্দেহ তৈরি হবে, তিনি যেন যাচাই না করে কোনো কাজ না করেন। যেখানে অর্থ বিনিয়োগে নিরাপত্তা নেই, সেখানে কোনোভাবেই বিনিয়োগ নয়। সচেতনতা একটি ছোট বিষয়, কিন্তু এর মাহাত্ম্য অনেক বড়। কিভাবে চাকরি পাওয়া যায়, কিভাবে বিদেশে লেখাপড়া ও চাকরির জন্য যাওয়া যায় ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের সঠিক পথ সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকার নামই সচেতনতা। একমাত্র সচেতনতা ও বৈধ পথ বেছে নেওয়ার মাধ্যমেই আমরা পারব প্রতারণামূলক অপরাধের মাত্রা কমাতে।       

 লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা