kalerkantho

রবিবার । ৪ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

দিল্লির চিঠি

মিয়ানমার পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি

জয়ন্ত ঘোষাল

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



মিয়ানমার পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত যে খুব বেশি বড় তা নয়, ৩০০ কিলোমিটারের চেয়েও কম। কিন্তু বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ চরম জায়গায় পৌঁছে গেছে। ২০১৭ সালের সেই নির্মম স্মৃতির পর, মিয়ানমারের দিক থেকে আবার এই আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ পরিস্থিতি খুব জটিল।

বিজ্ঞাপন

এর কারণ শুধু মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে কিছু রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের সীমান্তে আবার ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে তা নয়, গোলাগুলিও শুরু হয়েছে। এর ফলে অশান্ত হয়ে উঠছে সীমান্ত। আবার এর মধ্যে মিয়ানমারেরই সীমান্তবর্তী এলাকায় আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর একটা ‘যুদ্ধংদেহী’ পরিস্থিতি।

২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে সেই আরাকান আর্মির গোলমাল। বন্দরবানের থানচি, তুমব্রু—এসব জায়গায় পরিস্থিতি রীতিমতো অশান্ত হয়ে উঠেছে। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে। মিয়ানমারও তাদের বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত কী করছে?

রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও বাংলাদেশ যথোচিত জায়গায় প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এটা তো বাংলাদেশের জন্য একটা মস্ত বড় বোঝা। এখনই সমাধান-সূত্র না দিলে আগামী দিনে বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে। জাতিসংঘের সাধারণ সভায় যোগ দিতে গিয়েও শেখ হাসিনা সে কথাটা সোচ্চার হয়ে বলছেন। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন বা ওআইসির সব সদস্যের কাছে তিনি আবেদন জানাচ্ছেন, যাতে তাঁরা এই সমস্যার সমাধান করতে ব্রতী হন। সমস্যা হচ্ছে, এখানে ভারতের অবস্থানটা কী? ভারত কী চাইছে? রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভারতের অবস্থান সম্পর্কে বাংলাদেশের মনেও সংশয়ের জন্ম হয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নতুন-পুরনো মিলিয়ে এখন সাড়ে ১১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এই ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্রের জন্য এটা কঠিন সংকট। কিন্তু এর জন্য বাংলাদেশ কোনোভাবেই দায়ী নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সংকট নিরসনের লক্ষ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্ববিবেক ও ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসিকে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করেছেন। ওআইসির মধ্যে তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্র মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের উদ্যোগ নেয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রোহিঙ্গা জাতিগত নিধনের বিরুদ্ধে শক্ত হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেও তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র কিছু চাপ প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সমালোচনা করেছে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ত্রাণ পাঠিয়েছে ভারতও। কিন্তু ভারত, চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘ যদিও বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তবু এই বৃহৎ শক্তিগুলোর সহযোগিতা ছাড়া তার একার পক্ষে ফলপ্রসূ কিছু করা কঠিন।

রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে বড় দেশগুলোর অবস্থান মিয়ানমারের পক্ষে। এর কারণ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট। এই দুই বিবেচনায় তাদের কাছে মিয়ানমারের গুরুত্ব বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চেয়ে বেশি। ভারতের ভৌগোলিক অবস্থানের সীমাবদ্ধতার প্রধান সমস্যাগুলো বাংলাদেশ মিটিয়েছে। চীনের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহুদিনের। বর্তমান সরকার রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে ১০০ কোটি ডলারের সামরিক অস্ত্র ক্রয় ও পারমাণবিক শক্তিতে সহায়তার মতো বড় চুক্তি রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ও রাশিয়ার পূর্ণ সমর্থন ছিল। তা সত্ত্বেও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনের মতো নৃশংস আচরণের বিষয়ে তাদের অবস্থান এমন কেন, তা বুঝতে হলে মিয়ানমারকে ঘিরে এই তিন দেশের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অবস্থানের বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

দিল্লির পূর্ব নীতির প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারকে ঘিরে ভারতের বেশ কয়েকটি পরিকল্পিত প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে রাখাইন অঞ্চলের বঙ্গোপসাগরে চীনের বর্ধিত প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার বিষয়টি অন্যতম। এই অঞ্চলে চীনের অবস্থানের বিপক্ষে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম উদ্যোগের নাম হলো ‘কালাদান বহুমুখী যোগাযোগ প্রকল্প’, যার বাস্তবায়নে মোদি সরকার এ পর্যন্ত ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ছাড় দিয়েছে। কালাদান পরিকল্পনায় সিটওয়ে (পূর্বতন আকিয়াব) বন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ কালাদান নৌপথ চলাচলের উপযোগী করে উত্তর রাখাইন হয়ে চীন স্টেটের পালেটওয়া নদীবন্দর (যা বাংলাদেশের সীমানা নাসি-হুম মদক টং বা রেঞ্জ থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে) পর্যন্ত নদীপথ নেওয়া। তারপর ১১০ কিলোমিটার স্থলপথ পাড়ি দিয়ে ইন্দো-মিয়ানমার সীমানা পার করা। পরবর্তী সময়ে ভারত সীমানা থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার জরিনবই নামক জায়গা হয়ে মিজোরামের রাজধানী আইজল সাইথা জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে যোগ করা। কালাদান প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কলকাতার হলদিয়া থেকে সিটওয়ে পর্যন্ত মালপত্র বহনে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর ব্যবহৃত হবে। এখানে বর্তমানে চীনের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে।

ভারতের এই মহাযজ্ঞের প্রধানত দুটি ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ রয়েছে। প্রথমত, এই একই অঞ্চলে, বিশেষ করে সিটওয়ের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে ‘মেড’ দ্বীপে চীনের তেল টার্মিনাল, কিয়াকপিউ দ্বীপে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের মধ্য দিয়ে চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’-এর ওপর ভারতের নজরদারি করা। কালাদান প্রকল্প এবং একই সঙ্গে সিটওয়ে অঞ্চলে চীনের তৈরি গভীর সমুদ্রবন্দর কিসকেপিউয়ের অতি সন্নিকটে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমেও চীনের প্রভাবকে খর্ব করার প্রচেষ্টা। অন্যদিকে চীন গত ১৭ জুলাই প্রথমবারের মতো সৌদি অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন দিয়ে কুনমিং পর্যন্ত নিয়েছে। ভারতের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো, শিলিগুড়ি করিডর, যা ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘চিকেন নেক’ বলে পরিচিত, এর ওপর দিয়ে চলাচল হ্রাস করা এবং কৌশলগত বিকল্প পথ তৈরি করা।

চিকেন নেক বা শিলিগুড়ি করিডর, যা ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পথ, বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যবর্তী মাত্র ১৮ মাইল প্রশস্ত জায়গা। এটা চীন সীমান্তেরও খুব কাছে। স্মরণযোগ্য যে বাংলাদেশের ভৈরব হয়ে আখাউড়া-ত্রিপুরা সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে এবং রেল যোগাযোগ উন্নয়নের কাজ চলছে। এই যোগাযোগের মাধ্যমেও ভারত এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে কৌশলগত ও সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা হবে। আরো স্মরণযোগ্য যে চীনের সঙ্গে ভারতের বিরোধের অন্যতম বিষয় অরুণাচলের উত্তরাংশ ‘থোয়াং’ চীনের অংশ বলে তাদের পুরনো দাবি, যা থেকে চীন এখনো সরে আসেনি। মাত্র কয়েক মাস আগে ডোকলাম অঞ্চলের সীমান্ত বিরোধের কারণে চীন-ভারতের সেনাবাহিনী মুখোমুখি ছিল। ডোকলাম অঞ্চল ছিল করিডরের উত্তরে চীন-ভারত এবং ভুটান সীমান্তের সন্ধিস্থলে নিম্ন তিব্বত অঞ্চলে। অতি সম্প্রতি চীন তিব্বতের মধ্য দিয়ে তৈরি মহাসড়কের সঙ্গে নেপালকে যুক্ত করেছে। এসব সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে ভারতের এ ধরনের বিকল্প পথের প্রয়োজন। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবিত করিডরের বিকল্পও কালাদান প্রকল্প।

কালাদান প্রকল্প ছাড়াও ভারতের লগ্নির পরিকল্পনা রয়েছে দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে এবং ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড চার লেনবিশিষ্ট মহাসড়কের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন। এ মহাসড়ক মোড়েই, মণিপুর থেকে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চল হয়ে থাইল্যান্ডের ‘মায় থো থিনলু’ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, যার দৈর্ঘ্য হবে তিন হাজার ২০০ কিলোমিটার। এই মহাসড়কের প্রাথমিক কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ।

এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের বর্তমানের সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং আট দিনের সফরে ভারতে গিয়েছিলেন এবং যখন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বলছে সে সময়েই। ১৮ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল টিন আং সান ভারত সফর করেছেন এবং ভারতের সমর্থন পেয়েছেন। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ভারতের সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। ভারত মিয়ানমারের নৌবাহিনীর কাছে উপকূল টহলের নৌযান বিক্রি করার প্রস্তাব দিয়েছে। ভারত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। দিল্লির ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ সময় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর রোহিঙ্গা নিধনের ভূমিকা নিয়ে বিশ্ব যখন সোচ্চার, তখন ভারতের মিয়ানমারের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব মোকাবেলা করার কৌশলমাত্র।

যা হোক, ভারত নিজের জাতীয় স্বার্থেই রাখাইন অঞ্চলকে বিপদমুক্ত দেখতে আগ্রহী এবং রোহিঙ্গাদের এক বিপজ্জনক গোষ্ঠী মনে করে। রোহিঙ্গাদের এই বিপদের মধ্যেও ভারত সরকার ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাবে বলেছে। এতে আপাতত বাদ সেধেছে ভারতের বিচার বিভাগ। তবে ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কিছুদিনের মধ্যেই পরিষ্কার হবে।

চীনের সঙ্গে ভারতের প্রতিযোগিতায় এখন পর্যন্ত চীনের পাল্লা অনেক ভারী। চীন রাখাইন অঞ্চলে জ্বালানি তেলের টার্মিনাল স্থাপন ও কার্যকর করেছে। এই পাইপলাইন স্থাপন বঙ্গোপসাগরে চীনের ভূকৌশলগত উপস্থিতির বহুদিনের পরিকল্পনা। জ্বালানি তেলের পাইপলাইনের সমান্তরালে স্থাপিত হয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইপলাইন, যা ‘মেড’ দ্বীপের উত্তরে এবং সিটওয়ের কাছে ‘শয়ে’ গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস টার্মিনাল হয়ে কুনমিং পার হয়ে গোঞ্জেহ প্রদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গ্যাস পাইপলাইন দিয়ে বছরে ১২ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস সঞ্চালিত হচ্ছে, যার ২০ শতাংশ মিয়ানমার ব্যবহার করবে। শুধু এ প্রকল্পেই ব্যয় হয়েছে ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার। রাখাইন অঞ্চলেই সব মিলিয়ে এক হাজার ৮০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

চীনের পাইপলাইন স্থাপনের সময় প্রচুর বিরোধিতা হয়েছিল রাখাইন অঞ্চলে। জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশ বিপর্যয় এবং জেলেদের জীবন-জীবিকা বিঘ্ন হওয়ার কারণে। মিয়ানমার সরকার তা শক্ত হাতে মোকাবেলা করে এবং ওই অঞ্চলের রোহিঙ্গাদের সরিয়ে সিটওয়ের অদূরে দুটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। এই বাস্তুহারা রোহিঙ্গারা ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাহীন অবস্থায় এ দুটি ক্যাম্পে রয়েছে, যার উদ্ধৃতি অং সান সু চি তাঁর বক্তব্যে রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ না করে বলেছেন। এই পাইপলাইন তৈরির সময় চীন ও মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ শুধু রাখাইনেই নয়, যেসব জায়গা দিয়ে এই পাইপলাইন গেছে তার প্রায় সবখানেই সাধারণ নাগরিকদের চীন-মিয়ানমারের সরকারের বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ ছিল।

এই পাইপলাইনের নিরাপত্তায় শুধু রাখাইনেই নয়, সমগ্র অঞ্চলে গড়ে উঠেছে একাধিক সেনানিবাস। শুধু রাখাইন অঞ্চলেই আছে তিনটি আঞ্চলিক কমান্ড। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হালের ‘অপারেশন ক্লিয়ারেন্স’-এর দায়িত্বে আছে ১৬ লাইট ইনফেন্ট্রি ডিভিশনের ১০ পদাতিক ব্যাটালিয়ন। সার্বিক দায়িত্বে আছেন স্বয়ং সেনাপ্রধান। চীনের এই পাইপলাইন স্থাপন, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের টার্মিনাল তৈরির কারণ মালাক্কা প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া।

রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে ভারতের অবস্থানে কিন্তু বাংলাদেশ সরকার খুশি নয়। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক যেখানে এত মধুর, সেখানে আবেগ ও কূটনীতি মিলেমিশে একাকার। সেই ১৯৭১ সালের ভারত-বাংলাদেশের কূটনীতির যে যৌথ যাত্রা শুরু, তাতে কখনোই ছেদ পড়েনি। ভারত সব সময়ই পাশে থেকেছে। নরেন্দ্র মোদিও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশকে তিনি কতটা গুরুত্ব দেন। এবারও শেখ হাসিনার ভারত সফরে বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা পেয়েছে—এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। রোহিঙ্গাদের বিষয়টা শেখ হাসিনা বেশ জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। সেখানেও বাংলাদেশকে ভারত সব রকমের আশ্বাস দিয়েছে যে এ ব্যাপারে তারা যথোচিত ভূমিকা নেবে।

অতীতে কী হয়েছিল? অতীতে আমরা দেখেছি, জয়শঙ্কর বিদেশমন্ত্রী হিসেবে গিয়েছিলেন। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা যখন পররাষ্ট্রসচিব ছিলেন, তখন তিনিও ঢাকায় গিয়ে একই কথা বলেছিলেন। কথাটা কী? তিনি বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে একটা সেফ-প্যাসেজ তৈরি করতে হবে। আর আস্তে আস্তে আলোচনার মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে তাদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা ভারত করবে। অর্থাৎ ভারত একটা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেবে—এমনটাই আশ্বাস বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছিল। তার পরই ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। কভিডের জন্যও অনেক রকমের সমস্যা ছিল। এখন বাংলাদেশের ওপরে চাপ বাড়ছে। রোহিঙ্গাদের ইস্যু করে সেখানে যে কত রকমের আর্থ-সামাজিক সমস্যা হচ্ছে; শুধু তা-ই নয়, সেখানে অনেক রকমের অসামাজিক কার্যকলাপও শুরু হয়েছে। সেগুলোর জন্য বাংলাদেশ খুব চিন্তিত।  

একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে, চীন ও ভারত—দুই পক্ষেরই এ ব্যাপারে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় যতটা তৎপর হওয়া উচিত ছিল, ততটা তৎপরতা কিন্তু তারা দেখায়নি। এর জন্য বাংলাদেশ এখন সব রকমভাবে চাপ দিচ্ছে ভারতকে। ভারতের সমস্যাটা হচ্ছে, ভারতের পক্ষে মিয়ানমারকে সম্পূর্ণ চটিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এর কারণ আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে আবার মিয়ানমারের ওপরে চীনের প্রভাব বাড়ছে। মিয়ানমার সীমান্তে চীন অনেকটাই পরিকাঠামোগত কাজকর্ম নিয়ে এগিয়ে গেছে; যে কারণে ভারতও এখন মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথ প্রকল্প নিয়ে অনেক পরিকাঠামোগত কাজ করছে। এটা একটা ভারসাম্যের কূটনীতি বটে।

সুতরাং অতীতেও যখন জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে সু চির আন্দোলন চলছিল, তখনো কন্ডোলিৎসা রাইস বারবার তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী প্রণববাবুকে বলতেন, সু চির গণতন্ত্রের আন্দোলনকে যাতে সমর্থন করেন। তখনো কিন্তু প্রণববাবুরা বলতেন, ‘আমরা গণতন্ত্রের আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারি। জান্তা সরকার সামরিক শাসন হতে পারে, সেই সামরিক শাসনটাই বৈধ শাসন। সেখানকার সাংবিধানিক যে কর্তৃপক্ষ, তার সঙ্গেও সম্পর্ক আমরা বিনষ্ট করতে চাই না। ’

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে যদি ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ ডিপ্লোম্যাসি, যেখানে আমার ভারতের সার্বভৌম স্বার্থই প্রথমে রক্ষা করতে হবে। এই যদি কূটনীতি হয়, তাহলে সেখানে তো মিয়ানমারের যে কর্তৃপক্ষ, তাকে চটানোটাও ভারতের জন্য কোনো কাজের কাজ নয়। একইভাবে ভারত পুতিনের সঙ্গেও দেখা করছে। পুতিনের সঙ্গেও সাংঘাতিকভাবে সংঘাতে যাচ্ছে না ভারত। আবার ইউক্রেনের ওপরে রাশিয়ার যে হামলা, তাতে যে ভারতের কত ঝঞ্ঝাট হয়েছে, এবারের সাংহাই কো-অপারেশনের বৈঠকে মোদি সে কথাও পুতিনকে জানাতে ভোলেননি। এ কারণে চীনের সঙ্গে বৈঠক না হলেও, পাকিস্তানের সঙ্গে বৈঠক না হলেও রাশিয়ার সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন। সেখানেও তিনি তাঁর সমস্যার কথা জানিয়েছেন। সুতরাং ভারতের কূটনীতিটাই হচ্ছে সম্পর্ক নষ্ট না করে মিয়ানমারের ওপরে চাপ সৃষ্টি করা। মিয়ানমারকে বোঝানো, যাতে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সমাধানটা হয়।

মোদি এবার জাতিসংঘের বৈঠকের সাধারণ সভায় যোগ দিতে যাননি। তিনি জয়শঙ্করকে পাঠিয়েছেন। এর একটা মস্ত বড় কারণ হলো, সামনের বছরেই হয়তো মোদিকে আবার যেতে হবে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে। কেননা এবার ভারত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হয়ে যাচ্ছে দুই বছরের জন্য। প্রথা অনুযায়ী ভারত যখন দুই বছরের জন্য সদস্য হচ্ছে, তখন ভারত হবে নিরাপত্তা পরিষদের প্রেসিডেন্ট। এর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সেই দায়িত্বভার গ্রহণ করার কয়েক মাস আগে নিউ ইয়র্ক শহরে একটা আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে, যেখানে মোদিকে যেতে হবে। মোদি যদি দুই বছর নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য থাকেন, তাহলে ভারতের একটা মস্ত বড় ভূমিকা বা গুরুত্ব বাড়বে। সেই গুরুত্ববলে মিয়ানমারের ওপরে চাপ সৃষ্টি করা এবং মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে অবতীর্ণ হওয়ার একটা সুযোগ থাকবে ভারতের। কেননা এই বিষয়টা এখন শুধু রোহিঙ্গাদের সমস্যা নয়, সীমান্তে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সেটা আগামী দিনে শুধু মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশকে কেন্দ্র করেই একটা মস্ত বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ভারত এমনিতেই কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে যথেষ্ট অসুবিধার মধ্যে রয়েছে। এর কারণ জাতিসংঘে তুরস্ক কাশ্মীরের বিষয়টি উত্থাপন করেছে। আবার পাকিস্তানের সঙ্গে বৈঠক না হওয়ায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ। তিনি ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তব্য দিতে শুরু করেছেন। সামনের বছর এসসিওর বৈঠক হবে দিল্লিতে। সেখানে পাকিস্তান ও চীন—দুটি দেশই আসবে। সামনের বছর জি ২০-এরও বৈঠক হবে ভারতে, যেখানে বাংলাদেশ বিশেষভাবে আমন্ত্রিত সদস্য। সুতরাং আগামী বছরটা শুধুই বৈঠক আর বৈঠক। সেই বৈঠকগুলোতে এই রোহিঙ্গাদের ইস্যুটা নানা স্তরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের কাছেও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বিষয়টা নিষ্পত্তি করা খুব জরুরি। এর কারণ ২০২৩ সালে যে রকম শেখ হাসিনার নির্বাচন আছে, ২০২৪ সালে নরেন্দ্র মোদিরও লোকসভার নির্বাচন আসছে। কাজেই এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো এক স্থায়ী বন্ধুকে হারানো বা তাকে অসুবিধায় ফেলা কখনোই ভারতের কূটনীতির লক্ষ্য হতে পারে না।

 লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা