kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

টেকসই উন্নয়নে গবেষণাই একমাত্র সমাধান

ড. মো. শফিকুল ইসলাম

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টেকসই উন্নয়নে গবেষণাই একমাত্র সমাধান

গবেষণা একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থনৈতিক ও শিল্প কাঠামো, বিজ্ঞান, ব্যাবসায়িক বা অন্যান্য গবেষণার স্তরকে প্রভাবিত করে। সরকার গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য প্রণোদনা হিসেবে ক্রমবর্ধমানসংখ্যক বিশেষ আর্থিক সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। মূলত গবেষণা ও উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনকে উৎপাদনশীলতার চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

দেশের সার্বিক উন্নয়নে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। গবেষণা ছাড়া উন্নয়নকে টেকসই করা কঠিন হয়ে পড়ে।

উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা এবং সামাজিক অর্জনে গবেষণা ও উন্নয়নের অবদান থাকায় সরকার গবেষণাকে উৎসাহিত করে যাচ্ছে। গবেষণার জন্য সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ এবং প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ দিচ্ছে। কিন্তু এগুলো কতটুকু কার্যকর, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। কারণ এগুলোতে বেশির ভাগই সরকারি আমলারা যাচ্ছেন। অন্যদের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ সীমিত। সরকার গবেষণার জন্য প্রচুর টাকা খরচ করছে। কিন্তু দেশের উন্নয়নের জন্য কাজে আসছে কি না সেটা খতিয়ে দেখা দরকার।

গবেষণার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা একান্ত জরুরি। কারণ ফেলোশিপের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে ডিগ্রি অর্জন করে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। অনেকেই সরকারি টাকায় বিদেশে গিয়ে মাস্টার্স বা পিএইচডি করে থাকে, পরে দেখা যায় সে আর গবেষণার কাজ চলমান রাখে না। তাহলে এ ধরনের ফেলোশিপ দিয়ে দেশের উপকার কী হবে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সাধারণত বেশি গবেষণায় লিপ্ত থাকেন। তাই তাঁদেরকে আরো কিভাবে গবেষণায় সংযুক্ত করা যায় সে জন্য গবেষণাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। শুনেছি শিক্ষকদের জন্য কর্মঘণ্টা নীতিমালা হতে যাচ্ছে। এটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলমান। আমার মতে, কর্মঘণ্টা দিয়ে শিক্ষকদের গবেষণায় বেশি আগ্রহী করা যাবে না। গবেষণায় সময় দেওয়া এবং মানসম্মত গবেষণা করার লক্ষ্যে শিক্ষকদের প্রণোদনা জরুরি। যেমন—হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বছরে কমপক্ষে ইনডেক্সধারী জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশ করতে হবে, যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে। আবার যদি কোনো শিক্ষক খুব উচ্চ মানের ইনডেক্সধারী জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে তাঁকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।

এ ছাড়া শিক্ষকদের প্রমোশনের জন্য নিয়ম করা যেতে পারে। প্রতিটি লেভেলে প্রমোশনের জন্য ইনডেক্সধারী একটি বা দুটি গবেষণা প্রবন্ধ থাকতে হবে। ফলে গবেষণার মান বাড়বে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণায় আগ্রহী হবেন। কর্মঘণ্টা বেঁধে দিয়ে গবেষণার উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ শিক্ষকরা অফিসে বসে থাকবেন, আর হিসাব করবেন কর্মঘণ্টা কখন শেষ হয়। শিক্ষকদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেললে সমাধান মিলবে না। প্রত্যেক শিক্ষককে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কোর্স নিতে হয়। যার জন্য পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা, ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষার হলে ডিউটি পালন করা, অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়ন করা, থিসিস সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করা এবং থিসিস মূল্যায়ন করা ইত্যাদি। এ ছাড়া বিভাগের অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে শিক্ষকরা কর্মঘণ্টায় আছেন।

তবে গবেষণা বৃদ্ধি করার জন্য কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। ভালো মানের জার্নালে যেসব শিক্ষকের গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হবে, তাঁরা এই কর রেয়াত সুবিধা পাবেন। তবে জার্নালের নাম এবং গবেষণার মানের বিষয়ে একটি নির্দেশিকা থাকতে হবে। গবেষণাকে ত্বরান্বিত করার জন্য শিক্ষকদের আন্ডারে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকা দরকার। উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীকে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। যেখানে শিক্ষার্থীরা ভাতাও পেয়ে থাকে, যা সম্প্রতি বুয়েট চালু করেছে। তাই এটা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর করা জরুরি। অর্থাৎ এ জন্য শিক্ষা খাতে গবেষণায় বরাদ্দ আরো বেশি করার জন্য সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

আমাদের দেশে ঢালাওভাবে মাস্টার ডিগ্রি দেওয়া হয়। এগুলো বন্ধ করা দরকার। মাস্টার ডিগ্রিকে গবেষণাভিত্তিক করা একান্ত বাঞ্ছনীয়। স্বীকৃতির উদ্দেশ্যে সব অনুষদ সদস্যকে একাডেমিক ও পেশাগতভাবে যোগ্য মর্যাদা বজায় রক্ষার জন্য কাজ করা একান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরি ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে বেশি গবেষণা করা সময়ের দাবি। কিভাবে এ বিষয়ে গবেষণা বাড়ানো যায় সে জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কৃষিতে গবেষণা হয় বলে সারা বছর একই ফল পাওয়া যায়। কারিগরি ক্ষেত্রে গবেষণার ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে হবে। সে অনুযায়ী গবেষণার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।

গবেষণার জন্য বিভিন্ন ধরনের নতুন গবেষণা প্রণালী সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। মাঠ পর্যায়ের শিক্ষকদের গবেষণাকাজে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে পলিসি নিতে হবে এবং সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে। দেশের সার্বিক উন্নয়ন অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। এই উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে চিকিৎসা, কৃষি ও কারিগরি ক্ষেত্রে গবেষণার সংখ্যা বাড়াতে হবে। শিল্প-কারখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লিংকেজ বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ শিল্প-কারখানায় বাস্তব কিছু বিষয়ে প্রশিক্ষণ করা সম্ভব, যা গবেষণায় প্রয়োগ করা যায়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অনেক উন্নত মানের প্রযুক্তি রয়েছে, যা গবেষণাকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

কারিগরি ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত গবেষণা পরিচালনার জন্য গবেষণা কমিটি থাকতে হবে। কিন্তু এই কমিটির সদস্য অবশ্যই নিজ নিজ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং  বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই বিষয়ের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মানের বিষয়ে ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। লবিং ও স্বজনপ্রীতির কারণে অনেক অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ হয়ে যায়, এটাও এক ধরনের বাস্তবতা।

লেখক : সাবেক সভাপতি, শিক্ষক সমিতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মেনসিংহ



সাতদিনের সেরা