kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৩০ সফর ১৪৪৪

নিরাপদ খাদ্য সুরক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

মোশারফ হোসেন

১৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিরাপদ খাদ্য সুরক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। সুস্বাস্থ্যের তথা মানুষেরই প্রয়োজন নিরাপদ খাদ্য সুরক্ষা তথা পুষ্টিকর খাদ্য।

প্রকৃত অর্থে খাবার হচ্ছে শরীরের জ্বালানি। মানুষের জীবনধারণের জন্য যত মৌলিক চাহিদা রয়েছে, খাদ্য হচ্ছে প্রধানতম মৌলিক চাহিদা।

বিজ্ঞাপন

ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, সচেতন-অসচেতন সবাইকে খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজন নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য। সুস্থ-সবল, মেধা-মননশীল, প্রত্যয়দীপ্ত সমৃদ্ধিশালী জাতি গঠনে নিরাপদ খাদ্য সুরক্ষা অপরিহার্য। বর্তমান সময়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়া রীতিমতো দুর্লভ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা ক্ষতিকর রাসায়নিক, অনিরাপদ, অস্বাস্থ্যকর ভেজাল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নিঃসন্দেহে তারা অমানবিক হত্যাকারীর মতোই সমান অপরাধে অপরাধী। অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরি, বাজারজাত করা ইত্যাদি থেকে শুরু করে যেকোনো স্তরে ক্ষতিকর জীবাণুযুক্ত, বিষাক্ত, দূষিত অনিরাপদ খাবার খেয়ে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকির, সেই সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্য ব্যয়।

খাদ্য ভেজালের পাশাপাশি ভেজাল ওষুধ দেশে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করছে। ভেজালের রাজত্বে জীবন বিপন্ন। স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কিডনি, লিভার, রক্তচাপ, রক্তশূন্যতা, ক্যান্সার, জন্ডিস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, জন্মগত ত্রুটি, প্যারালাইজড, ব্রেইন স্ট্রোকের মতো দুরারোগ্য অসুখবিসুখ হচ্ছে হরহামেশা। মেয়াদহীন খাবার, খাবারে বিষাক্ত অস্বাস্থ্যকর কৃত্রিম রং ও রাসায়নিক পদার্থ মানবদেহের জন্য নীরব ঘাতক। শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া অ্যালার্জি, অ্যাজমা, চর্মরোগ, মাথা ব্যথা, পেটের সমস্যা, খাবারে অরুচি ইত্যাদি সমস্যা হয়ে থাকে।

ফলমূল, শাক-সবজি, মাছ, মসলা, গুড়, মুড়িসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব খাবারে ভেজাল মিশিয়ে থাকে নীতি-নৈতিকতাহীন, অতিমুনাফালোভী এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি, সামান্যতম মুনাফার বশীভূত হয়ে, টাকার নেশায় মত্ত হয়ে। এ ক্ষেত্রে বলা খুব প্রাসঙ্গিক যে শিশু খাবারও এই ভয়াল থাবা থেকে মুক্ত নয়। জাতি হিসেবে অশনিসংকেত হচ্ছে, ভেজাল খাবার খেয়ে শিশু-কিশোর, যুবসমাজ মেধাহীন অসুস্থ ও শারীরিক-মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে দক্ষ মানবসম্পদ না হয়ে দেশের বোঝা হচ্ছে।

২০২০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটজনিত হৃদরোগে মৃত্যুর পরিসংখ্যান অনুযায়ী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ২০২৩ সালের মধ্যে ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ শুধু দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়। এ কারণে প্রতিবছর মারা যায় প্রায় চার লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এ ছাড়া পাঁচ বছরের চেয়ে কম বয়সী শিশুর ৪৩ শতাংশই খাবারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। ক্যান্সারের মতো ভয়ংকর এমন দুই শতাধিক রোগের জন্যও দায়ী অনিরাপদ খাবার। আমরা যে খাবার খেয়ে থাকি তা বিভিন্নভাবে দূষিত হয়ে থাকে উৎপাদনকালে এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সময়। এটি এখন মানবসভ্যতার বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ভেজাল নির্মূলের কথা উল্লেখ আছে। ২৫(গ)-এর ১(ঙ) ধারায় খাদ্যে ও ওষুধে ভেজাল মেশানো বা ভেজাল পণ্য বিক্রি করলে বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন করলে অপরাধী ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১৪ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

সর্বত্র ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যে সয়লাব। খাঁটি জিনিস মেলা ভার। উৎপাদন, আহরণ থেকে শুরু করে শেষ অবধি ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর প্রতিটি পর্যায়ে ভেজালের ছোঁয়া থাকে।

খাদ্যে ভেজালে সাধারণত প্রিজারভেটিভ, ইথালিন, ফরমালিন, বিভিন্ন রাসায়নিক কেমিক্যাল, কাঠের গুঁড়া, ইট-সিমেন্টের গুঁড়া, অ্যালকোহল, তেজস্ক্রিয় পদার্থ, ইউরিয়া সার, মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার পণ্য, ময়দা, সুজি, চাটনি, আচার, ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, মিল্ক পাউডার—এজাতীয় খাবার রং করতে ইয়েলো বা গ্রিন মেটালেন ব্যবহার করে থাকে।

এসব গর্হিত কর্মকাণ্ড ঘটানোর অনেক কারণ চিহ্নিত করা যেতে পারে। এর মধ্যে অধিক মুনাফা লাভের আশা, নীতি-নৈতিকতার ঘাটতি, যথাযথ তদারকির অভাব, সঠিক উপায়ে তরতাজা খাদ্য সংরক্ষণের সুযোগ-সুবিধা বা জুতসই প্রযুক্তির অভাব, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণকালীন অতিরিক্ত ব্যয় পুষিয়ে নেওয়া, ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণ ইত্যাদি। গভীর আত্মিক মনোবিশ্লেষণে ভোগী মনোবাসনা, বিবেকহীনতা, রাতারাতি সম্পত্তির পাহাড় গড়ার নিরন্তর প্রতিযোগিতা, যেকোনো মূল্যে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবে এসব করে থাকে।

নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন পাস হয়। ২০১৫ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়।

অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণে গর্ভবতী মায়ের শারীরিক-মানসিক বিভিন্ন জটিলতা এবং গর্ভজাত ও গর্ভ-পরবর্তীকালে স্বাস্থ্যগত সমস্যা, বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম পর্যন্ত হওয়ার মতো ভয়াবহতা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভেজালযুক্ত অনিরাপদ খাবার খেয়ে মানুষের গড় আয়ু কমে যাচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক মানসম্মত না হওয়ার ফলে রপ্তানিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সাধারণ মানুষ প্রকারান্তরে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বর্তমানে বিপুলসংখ্যক মানুষকে জীবন-জীবিকা, নিত্যদিনের কর্মকাণ্ডের জন্য ঘরের বাইরে থাকতে হয়। বাধ্য হয়ে বাইরের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, প্যাকেটজাত বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতে হয়। এ ছাড়া খাদ্য এখন শুধু জীবনরক্ষাকারী উপাদান নয়, আচার-অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে পড়েছে। উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, বিপণনে, প্যাকেটজাতকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে খাদ্য অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, খাদ্যসংশ্লিষ্ট রোগের কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার এবং রোগের চিকিৎসা ব্যয় এক হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

আয়তনে বাংলাদেশ বিশ্বের ৮৮তম দেশ হলেও জনসংখ্যায় সারা বিশ্বে অষ্টম। জনসংখ্যার বিভিন্ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে। গত ৬০ বছরে আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়তে দরকার সুস্থ দেহ-সুস্থ মন। কর্মব্যস্ত সুখী জীবন গড়তে নিরাপদ খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ সর্বাগ্রে জরুরি। এ ক্ষেত্রে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। জনস্বার্থে আইন সংশোধন, পরিমার্জন, সংরক্ষণ করে ভেজালকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয়ভাবে খাদ্যের মানমাত্রা নিশ্চিত করতে স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিউটটের জবাবদিহি, বিএসটিআইয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। জনবল বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ, দেশি-বিদেশি সংস্থার সঙ্গে পারস্পরিক জুতসই প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, গণমাধ্যম, সধীসমাজ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। মনিটরিং সেল গঠন, খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, পণ্য বাজারজাতকরণ—সর্বক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভেজালমুক্ত খাদ্যপণ্য উৎপাদন অনেকাংশেই পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। খাদ্যশস্যে রাসায়নিক দ্রব্যের অতিমাত্রায় ব্যবহার সুস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে ধর্মীয় বক্তব্য প্রদান, প্রচলিত আইনে শাস্তির বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার-প্রসার করে সচেতন করা। মোবাইল কোর্ট, জেল-জরিমানা, ভেজাল রোধে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষায়িত গবেষণাগার স্থাপন করা দরকার। প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন বন্ধ করা, বাজার সংস্কার, উন্নয়নের মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

 

 লেখক : প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

সরকারি ইস্পাহানী ডিগ্রি কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

 



সাতদিনের সেরা