kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

স্মরণ

শামসুর রাহমান : কবিতার রাজমুকুট তাঁর অর্জন ছিল

শফিক আশরাফ

১৭ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শামসুর রাহমান : কবিতার রাজমুকুট তাঁর অর্জন ছিল

শামসুর রাহমানের জন্ম ঢাকায়। সোনার চামচ মুখে নিয়ে তাঁর জন্ম হয়নি, ররীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও তিনি বেড়ে ওঠেননি। এখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সামনে বিস্ময়ের জিজ্ঞাসা চিহ্ন ভেসে ওঠে, তাহলে কিভাবে বাংলাদেশের কবিতার রাজমুকুট তিনি অর্জন করলেন! এ প্রশ্নের সহজ উত্তর, তিনি ছিলেন জন্ম কবি, আরো সহজ করে বললে অসাধারণ কাব্য প্রতিভা নিয়েই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ফলে কাব্যহীন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি বাংলা কবিদের সেরা একজন হয়ে উঠেছেন।

বিজ্ঞাপন

এ সম্পর্কে তাঁর এক জীবনীকারের ভাষ্য, ‘সাহিত্যচর্চার বালাই নেই এমন এক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন তিনি। পরিবারের কারো সংগীত, চিত্রকলা ও সাহিত্যে তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে পুরান ঢাকার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ কাওয়ালি ও মেরাসিনের গানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল অতি শৈশবেই। পরিবারের লোকজন উপলক্ষ পেলেই কাওয়ালির আয়োজন করত। ফলে ঐশ্বরিক প্রদত্ত কবিত্ব শক্তিই তাঁকে কবি করেছিল, কবিতা লেখাই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ’

শামসুর রাহমান অক্টোপাস নামের উপন্যাস লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন। কিন্তু তিনি ঔপন্যাসিক বা গল্পকার হিসেবে পরিচিতি পাননি, তিনি হয়ে উঠেছেন শুধুই কবি। এই কবি শব্দের আগে নাগরিক শব্দটি বসিয়ে তাঁকে নাগরিক কবি হিসেবেও অভিহিত করেছেন অনেকে। বাংলা কবিতায় তিরিশের পঞ্চপাণ্ডব যখন মহাপরাক্রমে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, রবীন্দ্রকাব্যের বলয় ভেঙে বাংলা কবিতাকে অতি আধুনিকতার স্তরে উত্তরণের প্রচেষ্টায় প্রাণ পণ করছিলেন, তখনো বাংলাদেশের মুসলমান কবিরা মধ্যযুগের পুঁথির আদলে কারবালা কিংবা কোনো আরব্য কাহিনিকে ধারণ করায় ব্যতিব্যস্ত ছিলেন, অর্থাৎ তাঁরা তখনো তিরিশের কবিদের সঙ্গে নিজেদের কাব্যের সংযোগ ঘটাতে পারেননি। শামসুর রাহমান সেই মুসলমান কবিদের একজন, যিনি মধ্যযুগের পুঁথি সাহিত্যের ধ্যান-ধারণাকে পাশ কাটিয়ে তিরিশের যুগের কল্লোলের কবিদের সঙ্গে সমতালে বাংলাদেশের কবিতার উত্তরণ ঘটান। বলা যায়, শামসুর রাহমানের হাত ধরেই সেই ষাটের দশকে বাংলাদেশের আধুনিক কাব্যের যাত্রা শুরু। আর এটা শুরু হয়েছিল প্রথম গান ‘দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০) নামের কাব্যগ্রন্থ দিয়ে। এরপর তো কতই লিখেলেন, ‘বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৭), ‘নিরালোকে দিব্যরথ’ (১৯৬৮), ‘নিজ বাসভূমে’ (১৯৭০), ‘বন্দি শিবির থেকে’ (১৯৭২), ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ (১৯৭৪) ইত্যাদি। তিনি নগরে বাস করেছেন, তাঁর কবিতায় গভীরভাবে নগরজীবন স্পন্দিত হয়েছে এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্যটা হলো এই সব নগরে বসে যেসব শাসক রাজ্য শাসন করেন তাঁদের অনাচার-অবিচার তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে, ফলে সময়ের প্রবহমানতার ভেতর বাস করে সেটাকে তিনি কবিতায় ধারণ করেছেন। যেমন—তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের অত্যাচার-অনাচার যখন মাত্রা ছাড়িয়েছে, তখন সেটা শামসুর রাহমানের ভেতর অস্থিরতা তৈরি করেছে। দেশভাগের পরেই তারা প্রথম আক্রমণ করে আমাদের ভাষার ওপর। এই ভাষা আক্রমণের বিরুদ্ধে শামসুর রাহমান কলম তুলে নেন, তিনি লেখেন—‘এখন তোমাকে ঘিরে ইতর বেলেল্লাপনা চলছে বেদম/এখন তোমাকে নিয়ে খেংরার নোংরামি/এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষ মাস/তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো/বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা। ’

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে শামসুর রাহমানের চোখে পড়ে একটি রক্তাক্ত শার্টকে পতাকা বানিয়ে ঢাকায় গুলিস্তানে মিছিল হচ্ছে, সেই দৃশ্য শামসুর রাহমানকে আর ঘুমাতে দেয় না, দিন-রাত চোখের সামনে ভাসতে থাকে একটি রক্তাক্ত শার্ট, যেটা পতাকা আকারে পতপত করে উড়ছে, এরপর কবি কলম তুলে নেন, তৈরি করেন এক মহান কবিতা, কবিতার নাম ‘আসাদের শার্ট’। কবিতাটি লেখার পর কবি খানিকটা শান্ত হন, কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো—তিনি কালো অক্ষরগুলোর মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছেন আসাদের শার্ট, যে রক্তাক্ত শার্ট পতপত করে উড়ছে, যে রক্তাক্ত শার্ট বাংলাদেশের প্রথম পতাকা। শামসুর রাহমান সেই কবি, যিনি বাঙালি জাতির জাগরণে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। শুধু জাগরণ কেন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস; যখনই কোনো দুর্বিপাক আমাদের ঘিরে ধরেছে সেটা কবিকেও নাড়া দিয়েছে। ১৯৭০ সালের জলোচ্ছ্বাসে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে লাখ লাখ মানুষের যে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ, তার পরিপ্রেক্ষিতে কবি লেখেন ‘আসুন আমরা আজও একজন জেলে’ নামের কবিতা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শামসুর রাহমানের মতো আর কারো কবিতা এত বেশি আলোড়িত করেনি বাঙালি জাতিকে। কলম যে একটা মারাত্মক যুদ্ধাস্ত্র হতে পারে, কবিতা দিয়ে যে যুদ্ধ হয়, শামসুর রাহমান সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,/তোমাকে পাওয়ার জন্যে/আর কতকার ভাসতে হবে রক্ত গঙ্গায়?/আর কতকার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?। ’ কিংবা ‘স্বাধীনতা তুমি/রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান। ’ এখন স্বাধীনতার কবিতা মানেই শামসুর রাহমান, বিজয়ের মাসে শামসুর রাহমানের কবিতা ছাড়া এখন আর কোনো অনুষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ হয় না।

একটি অতি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে শামসুর রাহমান বাংলা কবিতার যে রাজমুকুট নিজ শিরে উঠিয়েছেন, সেটা তাঁর মেধা, যোগ্যতা, ভাষা, সর্বোপরি দেশপ্রেমের কারণেই সম্ভব হয়েছে। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট এই মহান কবি চিরবিদায় গ্রহণ করেন। কিন্তু কালোত্তীর্ণ কবিদের কোনো বিদায় হয় না, কারণ স্রষ্টা বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টির ভেতর। কবি শামসুর রাহমান আরো শত বছর বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডে বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির ভেতর।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

 

 



সাতদিনের সেরা