kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

ভিন্নমত

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি : পুনর্বিবেচনার অবকাশ আছে

আবু আহমেদ

১৪ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি : পুনর্বিবেচনার অবকাশ আছে

জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সামগ্রিক অর্থনীতি জড়িত। তাই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে অর্থনীতির সব খাত আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এতে মানুষের চলাফেরা বা কর্মতৎপরতা কমে যায়। চলাফেরা কমে গেলে অনিবার্যভাবেই মানুষের উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং অর্থনৈতিক তৎপরতায় শিথিলতা নেমে আসে।

বিজ্ঞাপন

এবার তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর এক মাননীয় মন্ত্রী বলেছেন জ্বালানি ব্যবহার কম করতে। কিন্তু জ্বালানির ব্যবহার কম করার মানে কী? জ্বালানি কম ব্যবহার মানেই অর্থনৈতিক তৎপরতা কমে যাওয়া, যার অর্থ হচ্ছে অর্থনীতির গতি হারানো।

প্রকৃতপক্ষে জ্বালানি বিষয়ে সরকারের যেটা করা উচিত ছিল সেটা হচ্ছে বিদ্যুেকন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থাটি বন্ধ করা এবং জ্বালানি খাতে সিস্টেম লস ও অনিয়ম বন্ধ করা। সেটা না করে সাধারণ মানুষকে বলা হচ্ছে জ্বালানি কম ব্যবহার করতে। এর মধ্যে এলাকাভিত্তিক কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তটিও নেতিবাচক প্রভাব  ফেলবে। তিন-চার বছর আগে যখন তেলের দাম ৬০ টাকা থেকে বাড়ানো হয়, তখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখনকার দামের সমান ছিল। এরপর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারের নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু দাম কমানো হয়নি। ফলে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিপুল লাভ করে। পরে সরকার উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে নেওয়ার একটি আইন করে বিপিসির মুনাফার সব টাকা নিয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমে আমরা এ খবর জানতে পারি।

এখন পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বলছে, বিশ্ববাজারে তেলের অতিরিক্ত দামের কারণে দেশের বর্তমান দরে পোষানো যাচ্ছে না। কিন্তু তারা যে আগে মুনাফা করল, অর্থাৎ যখন ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারে ক্রয় করে দেশের মানুষের কাছে ১০০ ডলারে বিক্রি করল, সেই মুনাফার সুবিধা কেন মানুষ পাবে না?

বিষয়টা হচ্ছে, তেলের মূল্য বিশ্ববাজারে মাত্র কয়েক দিনের জন্য ১৩০ ডলারের ওপরে ছিল। এরপর কমতে থাকে এবং এখনো কমার প্রবণতার মধ্যেই আছে। এমনকি রাশিয়া থেকে তেল আনতে পারলে আরো কম দামে আনা যেত। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমার অপেক্ষা না করে হঠাৎ করে তেলের দাম ৫০ শতাংশ বাড়ানোর কী কারণ? আদৌ কি ৫০ শতাংশ বাড়ানোর মতো কিছু হয়েছে? প্রকৃতপক্ষে এই হারে তেলের দাম বাড়ানোর কোনো যুক্তি নেই। আমি কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না। হ্যাঁ, সরকার বলতে পারত যে টাকা মূল্য হারিয়েছে। কিন্তু টাকা মূল্য হারিয়ে ৮৫ থেকে ৯৫ হয়েছে। বলা যেতে পারত যে যেহেতু ডলারের বিপরীতে টাকা মূল্য হারিয়েছে, তাই তেল আমদানিতে দাম বেশি পড়বে। সে হিসাবে বড়জোর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ানো যেতে পারত।

এটা ভাবাটা অস্বস্তিকর, তবু বলা দরকার যে সরকারের কিছু লোক সাধারণ মানুষকে বোকা মনে করেন। তাঁরা বিভিন্ন দেশের তুলনা করে বলছেন যে আমাদের দেশে তেল সস্তা। কিন্তু তাঁদের একই সঙ্গে ওই সব দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথাটাও বলা দরকার। আমাদের দেশের তুলনায় ওই সব দেশের মাথাপিছু আয় পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি। ক্রয়ক্ষমতা তাদের অনেক বেশি। ফলে মূল্যস্ফীতি ঘটলেও তাদের কাছে সহনীয় হয়। কিন্তু এটা না বলে দেশের মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি মনে করি, দেশের মানুষ এখন অতটা বোকা নয়।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যক্ষ প্রভাব হচ্ছে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, যার ফলে পণ্যমূল্য বেড়ে যায়। তাহলে কি এটা বলা যায় যে সরকারই মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে? অর্থনীতির লোক হিসেবে আমি মনে করি, অর্থনীতির কোথাও যদি সরকারের ভর্তুকি দিতে হয়, সেটা জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেই দেওয়া উচিত। কারণ জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দেওয়া হলে এর ক্ষতির চেয়ে উপকারই বেশি। আপনি যদি ভর্তুকি ১০০ টাকা দেন, এটা আপনাকে ৫০০ টাকার উপকারিতা দেবে। ভর্তুকি যদি কমাতেই হয়, তাহলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে কাদের স্বার্থে? লোকসানি কারখানাগুলোতে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে কেন? রেলওয়েতে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে লাভ কী?

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় অবাক করার বিষয় হচ্ছে, এ বিষয়ে কোনো গণবিতর্ক বা গণশুনানির ব্যবস্থা করা হয়নি। তা না করে রাতারাতি সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এটা হতে পারে না। এই মূল্যবৃদ্ধির আগে গণবিতর্ক হতে পারত। বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিআইআরসি) বলতে একটি সংস্থা আছে। এর কাজটা কী? এটি কি শুধু গ্যাসের দামের ব্যাপারেই শুনানি করবে? আমি মনে করি, পেট্রোলিয়াম পণ্যের ক্ষেত্রেও বিইআরসির ভূমিকা থাকা উচিত। কারণ এটি জ্বালানির অংশ।

সরকার তেলের দাম কতটা বাড়াতে পারে বা না পারে, একটি গণবিতর্ক হলে তার একটি যৌক্তিকতা হাজির করা যেত। তা না করে হঠাৎ এমনভাবে বাড়ানো হলো, যেন দেশের জনগণকে আঘাত করা দরকার ছিল। এটি ন্যায্য হয়নি। সরকার অনেক জায়গায় ভর্তুকি দিয়ে আসছে; কিন্তু কোনো উপকারেই আসছে না। অথচ এখানে ভর্তুকি দিলে অনেক উপকার হয়। কেউ কেউ বলেন, এর পেছনে আইএমএফের শর্ত জড়িত। কিন্তু আইএমএফ টাকা দেবে এটাই তো স্বীকার করেনি। সেটা হতো ভিন্ন আলোচনা। আর আইএমএফ যদি বলেই থাকে যে জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যহার কারতে, তাহলে বাংলাদেশ মানবেই বা কেন? মাত্র ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চায় সরকার। এই পরিমাণ অর্থের জন্য আইএমএফের শর্ত পৃথিবীর অনেক দেশই মানেনি। এ ছাড়া আমরা তো পানিতে পড়ে যাইনি যে আইএমএফের সব শর্তই মানতে হবে। আইএমএফের শর্তের মধ্যে পেট্রোলিয়াম খাতে সিস্টেম লস ও দুর্নীতি বন্ধের বিষয়গুলো থাকে। অথচ এগুলো নিয়ে কোনো কথা হচ্ছে না। ফলে এখানে কিছু লোককে টাকা বানানোর সুযোগ দিয়ে আপামর জনগণের ওপর ভীষণ বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো।  

তেলের মূল্যের সঙ্গে পুরো অর্থনীতির মূল্যস্তর জড়িত। মূল্যস্ফীতিটা হবে এ কারণেই। এর পরও কেউ যদি বলে যে আমাদের মূল্যস্ফীতি ৭-৮ শতাংশের মধ্যেই আছে, সেটা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য হবে? আর বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি কিভাবে হিসাব করা হচ্ছে?  দেখা যাচ্ছে, ভিত্তি বছর বদল করে করা হচ্ছে। মানে মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হচ্ছে ছয় মাস আগের সঙ্গে তুলনা করে। যেটা এক বা দুই বছর আগের সঙ্গে তুলনা করে করা উচিত ছিল। দুই বছর আগের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, মূল্যস্ফীতির পরিমাণ অনেক পণ্যেই প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক কারণেই মানুষকে এখন মূল্যস্ফীতির বোঝা মেনে নেওয়া উচিত। কিন্তু সরকারের যাঁরা তেল পোড়ান, তাঁরা কি তাঁদের বরাদ্দ করা ১০০ লিটার তেলের পরিবর্তে ৫০ লিটার নেবেন। মন্ত্রী মহোদয়রা, সচিব মহোদয়রা এমন নজির কি স্থাপন করতে পারবেন? তাহলে শুধু সাধারণ মানুষ কেন বোঝা বহন করবে? গণপরিবহনে বর্ধিত বাড়া দিতে মানুষের কষ্ট হচ্ছে, অন্য খরচ কমাতে হচ্ছে, এটা কে বুঝবে?

সবচেয়ে বড় আশঙ্কার ব্যাপারটি হচ্ছে, মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতিজনিত দুর্গতিটি দীর্ঘস্থায়ী হবে। অন্য অনেক কিছু সইতে পারলেও মানুষের পক্ষে এটা সহ্য করা দুঃসাধ্য হবে। যে রাতে তেলের দাম বাড়ানো হলো, এর পরের দিন যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, সবাই বলেছেন যে তাঁরা রাতে ঘুমাতে পারেননি দুশ্চিন্তায়। সুতরাং সরকারকে মানুষের এই সংবেদনশীলতাটি বুঝতে হবে। আর ৫০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার। বিশ্বে জ্বালানি তেলের মূল্য একসঙ্গে ৫০ শতাংশ বাড়ানোর একটি উদাহরণ কি কেউ দিতে পারবেন?

যে যুবকটি মোটরসাইকেল চালিয়ে পরিবার চালান, তাঁর আয় এখন কতটা নিচে নেমে আসবে ধারণা করা যায়? তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে এমন একটা বার্তা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা যে মনে হয় সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই, জবাবদিহি নেই।

সরকারের এটা অনুধাবন করা উচিত যে সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা মানেই সরকারের বিরোধিতা করা নয়। এখানে নীতি বা পদক্ষেপের ব্যাপারে কথা হচ্ছে। তাই সরকারকে এই বিরোধিতা ইতিবাচকভাবেই নেওয়া উচিত। এখানে দলীয় বিষয়ও আসা উচিত নয়। এখানে জনস্বার্থই গুরুত্বপূর্ণ।

আমি মনে করি একটি দেশে মানুষ কী বলতে চায়, সেটা অন্তত সরকারের শোনা উচিত। অর্থনীতির লোক হিসেবে বলব, তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অর্থনীতি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে লক্ষ্য নির্ধারণ করা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমে যাবে, জনমনে অসন্তোষ বাড়বে, মানুষের কর্মক্ষমতা কমবে, উৎপাদনশীলতা কমবে। তাই সরকারকে অনুরোধ করব তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার জন্য। এই পুনর্বিবেচনা হবে অর্থনীতির স্বার্থে, জনস্বার্থে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক



সাতদিনের সেরা