kalerkantho

শুক্রবার । ৭ অক্টোবর ২০২২ । ২২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর এবং রোহিঙ্গা ও তাইওয়ান প্রসঙ্গ

এ কে এম আতিকুর রহমান

৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর এবং রোহিঙ্গা ও তাইওয়ান প্রসঙ্গ

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই গত ৬ আগস্ট দুই দিনের এক দ্বিপক্ষীয় সফরে ঢাকায় এসেছিলেন। একই যাত্রায় তিনি এ অঞ্চলের আরো কয়েকটি দেশ সফর করছেন। প্রথম দিন তিনি ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান এবং সেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তিনি জাদুঘর ঘুরে দেখেন এবং পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ২০১৭ সালে ঢাকা সফরে এসেছিলেন। তবে এবারের সফরটি একটু ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত হলো, যখন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের প্রতিনিধি সভার স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফর নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কিছুটা অগ্রগতির আশা করা যাচ্ছে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৭ আগস্ট সকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন এবং সে সময় বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক ও দলিল স্বাক্ষরিত হয়। ওই বৈঠকের পরপরই তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে দুপুরের আগেই মঙ্গোলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন।

দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অর্থনৈতিক বিষয়াদি, বিশেষ করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরকালে সম্মত ২৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ও বাংলাদেশ উত্থাপন করে। বাংলাদেশে চীনের রপ্তানির তুলনায় চীনে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ওই বিরাট ব্যবধানকে কিছুটা কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে চীনে বাংলাদেশের সব পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশ চেয়েছে বাংলাদেশ। তবে চীন বর্তমানের ৯৭ থেকে বাড়িয়ে তা ৯৮ শতাংশে উন্নীত করতে সম্মত হয়।

রোহিঙ্গাদের তাদের নিজেদের ভিটামাটিতে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বিদ্যমান বিশ্বপরিস্থিতিতে চীনের কার্যকর সহযোগিতা কামনা করা হলে চীন সম্মতি প্রকাশ করে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাইওয়ান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। এ ছাড়া এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের প্রতি বাংলাদেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই)’ ও ‘গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই)’-এর মতো উদ্যোগে বাংলাদেশকে পাশে পাওয়ার আগ্রহ জানান। বাংলাদেশ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তার ‘এক চীন’ নীতির প্রতি পুনরায় সমর্থন ঘোষণা করায় চীন সন্তোষ প্রকাশ করে।      

দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত তিনটি সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক সহযোগিতা স্মারকের নবায়ন, দুর্যোগ প্রতিরোধ বিষয়ক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের ফার্স্ট ইনস্টিটিউট অব ওশেনোগ্রাফির মধ্যে মেরিন সায়েন্স বিষয়ক সহযোগিতা। এ ছাড়া চীনের আর্থিক সহায়তায় পিরোজপুরের কচা নদীর ওপর নির্মিত অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুটির সনদ হস্তান্তর করা হয়।

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরটি এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যার দুই সপ্তাহ আগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের অভিযোগে গাম্বিয়ার আনা মামলায় মিয়ানমারের প্রাথমিক আপত্তি খারিজ করে দিয়ে মামলাটি চলমান থাকার কথা বলেছেন।

আগের সপ্তাহে নমপেনে অনুষ্ঠিত আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের চার রাজনৈতিক কর্মীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনার তীব্র সমালোচনা করা হয় এবং আসিয়ানের এর আগে গৃহীত পাঁচ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জান্তা সরকারের প্রতিশ্রুতির অভাব পরিলক্ষিত হওয়ায় আসিয়ানের নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেলনের আগেই জান্তা প্রশাসনকে সংকট সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

আগের সপ্তাহে চীনের প্রবল আপত্তির মুখে মার্কিন প্রতিনিধিসভার স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফরে যান। চীন কঠোরভাবে এর বিরোধিতা করে এবং নিন্দা জানায়। তারা এটিকে ‘এক চীন’ নীতি এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি যৌথ ইশতেহারের গুরুতর লঙ্ঘন মনে করে।  

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ বলেছে, সে বিশ্বাস করে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নটি রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে এবং রোহিঙ্গাদের তাদের বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের আবাসে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি আস্থা সৃষ্টির পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণিত হবে। এই সিদ্ধান্ত রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি জোরালো করার জন্য বিশ্বকে একটি নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে বলে বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীদেরও ধারণা।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে কম্বোডিয়ার নমপেনে অনুষ্ঠিত ৫৫তম আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের চার রাজনৈতিক কর্মীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনার সমালোচনা করা হয়। তাঁরা মিয়ানমারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসিয়ানের এর আগে গৃহীত পাঁচ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জান্তা সরকারের কোনো অগ্রগতি নেই বলে উল্লেখ করেন। কিছু সদস্য দেশ আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেলনসহ অন্যান্য সভায় জান্তা সরকারের মন্ত্রীদের অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ও উত্থাপন করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের বৈঠকে যোগ দেন এবং তিনি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধের আহ্বান জানান। সে সময় তিনি পৃথকভাবে অন্যান্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করেন এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তাঁদের সমর্থন কামনা করেন।

আশা করা যায়, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এ বছর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় গতি ফিরে আসবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় মিয়ানমারের জান্তা সরকারের ওপর অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। মিয়ানমারের ওপর আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর চাপ অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য মিয়ানমার অনেকটাই এগিয়ে আসতে বাধ্য হতে পারে। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চাপ তো রয়েছেই। তবে এ ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন যদি সত্যিকারভাবে চায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া এখনই শুরু হোক এবং সে জন্য মিয়ানমারকে চাপ দেয়, তাহলে প্রত্যাবাসন অনেকটাই সহজ হয়ে আসবে। তবে চীন কী করবে সে সিদ্ধান্ত তো তারাই নেবে। আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে কম্বোডিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে যেমন বলেছিলেন যে একজন সুপারম্যানও মিয়ানমার সংকটের সমাধান করতে পারবে না; তেমনি মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজি করানো যাবে না, যদি না নানা চাপ ও কৌশলের মধ্যে ফেলে মিয়ানমারকে সম্মত করানো যায়। যা হোক, সার্বিক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশকেও এসব সুযোগের সদ্ব্যবহার করার যথাযথ কূটকৌশল অনুসরণ করতে হবে।

করোনা মহামারির ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা থেকে যখন বিশ্ববাসী বের হয়ে আসার প্রচেষ্টায় ঘাম ঝরাচ্ছে, তখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব উঠে আসার সেই প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। এর ফলে বিশ্বে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের প্রতিটি দেশ ভয়ানক দুর্ভোগের সম্মুখীন হচ্ছে। এর মাঝে যদি আবার তাইওয়ান উত্তেজনা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের উদ্ভব ঘটে, তা নিঃসন্দেহে মানবজাতির জন্য এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের নেতারা ধৈর্য ধারণ করবেন এবং এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না, যাতে তাঁদের দুই দেশ ছাড়াও অন্যান্য দেশের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা যেমন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধের দ্রুত অবসান চাই, তেমনি তাইওয়ানকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার একটি শান্তিপূর্ণ প্রশমন চাই। যুদ্ধ শুধু ধ্বংসই করে। ধ্বংস করা সহজ, ধ্বংস থেকে উত্তরণ বড়ই কঠিন কাজ, যার অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে।  

তাইওয়ান প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের কয়েক দিন আগে তাইওয়ান প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, “বাংলাদেশ সব সময় ‘এক চীন’ নীতিতে বিশ্বাস করে। আমরা চাই তাইওয়ান পরিস্থিতি যেন খারাপ না হয়। বিশ্ব এখন যথেষ্ট খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সব পক্ষ যেন সংযত থাকে, জাতিসংঘ সনদ মেনে চলে। বর্তমান বিশ্বে আরেকটা সংকট কারো জন্য ভালো হবে না। ” উল্লেখ্য, গত ২ আগস্ট আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতির মাধ্যমেও ‘এক চীন’ নীতির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছিল। ওই একই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি ছাড়া বাংলাদেশের অতিরিক্ত কিছু বলার অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। আর অন্যান্য আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বাংলাদেশ অবশ্যই নিজের স্বার্থ, সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে এবং সেই সক্ষমতা তার রয়েছে বলে মনে করি।

চীন সে দেশে বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা ১ শতাংশ বৃদ্ধি করতে সম্মত হয়েছে। এই শুল্ক সুবিধা চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়তো স্বল্প পরিমাণে বাড়াতে পারবে। কিন্তু চীন বাংলাদেশে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে তার তুলনায় আমাদের রপ্তানি খুবই সামান্য। তাই চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ব্যবধান কমাতে হলে পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা ছাড়াও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথা ভাবতে হবে।      

আমরা আশা করি, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ সফর বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে এবং দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো টেকসই, অর্থবহ ও শক্তিশালী হবে। পারস ্পেরিক আস্থা ও বিশ্বাস দৃঢ়তর হবে এবং এ অঞ্চলের শান্তি ও সমৃদ্ধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।  

   লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

 



সাতদিনের সেরা