kalerkantho

শুক্রবার । ৭ অক্টোবর ২০২২ । ২২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

ইউক্রেন ও তাইওয়ান : বিপর্যয় নিয়ে খেলছে পশ্চিম

সাইমন জেনকিন্স

৮ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইউক্রেন ও তাইওয়ান : বিপর্যয় নিয়ে খেলছে পশ্চিম

যুদ্ধের পথে যুক্তি সব সময় একই রকম থাকে। যারা যুদ্ধের পক্ষে, তারা গলা উঁচিয়ে কথা বলবে, নিজেদের জাহির করতে বুকে আঘাত করবে। তারা চায় ট্যাংকগুলো ঘড়ঘড় করে উঠুক, বিমানগুলো গর্জে উঠুক। আর যারা যুদ্ধের বিপক্ষে, তারা ননির পুতুল, তোষণকারী কিংবা পরাজিত বলে গণ্য হবে।

বিজ্ঞাপন

তাই যুদ্ধের দামামা যখন বেজে ওঠে, বাতাসে যখন রণনিনাদ ভেসে আসে, তখন যুক্তি লুকানোর পথ খোঁজে।

মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফর যতই উসকানিকমূলক মনে হোক, এটি যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটি ভোটের চালের চেয়ে বেশি কিছু নয়। পেলোসি বলেছেন, ‘আমেরিকা ও তার মিত্রদের এটি পরিষ্কার করে দেওয়া জরুরি যে আমরা কখনোই কর্তৃত্ববাদীদের কাছে মাথা নত করব না। ’ এর বিপরীতে চীনের অত্যধিক স্থূল প্রতিক্রিয়া হঠকারী উত্তেজনার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ। দেখা গেল, জো বাইডেন যখন জোর দিয়ে সামরিকভাবে তাইওয়ানকে রক্ষা করবে বলে ঘোষণা দেন, তখন তাত্ক্ষণিকভাবে প্রেসিডেন্টের দপ্তর বক্তব্য সংশোধন করে তাইওয়ানকেন্দ্রিক ‘কৌশলগত অস্পষ্টতার’ নীতিই পুনর্ব্যক্ত করে।

একই রকম অস্পষ্টতা ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার প্রতি পশ্চিমাদের মনে প্রোথিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন আবারও বলেছে, ইউক্রেনে রাশিয়াকে অবশ্যই ব্যর্থ হতে হবে; কিন্তু এতে কিভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় যে বড় ধরনের কিছু ঘটা ছাড়া রাশিয়া তার অস্ত্রশস্ত্রের বিপুল ধ্বংস মেনে নেবে? পশ্চিমারা নিজেদের হিসাব-নিকাশের খেলায় ইউক্রেনকে ধরে রাখতে চায়। তারা এই আশায় বসে আছে যে ভয়ংকর পেনাল্টি শ্যুট-আউট স্থগিত হবে; কিন্তু রাশিয়া যা করতে পারে, তা হলো তার দলকে খেলায় ধরে রাখতে আরো বেশি নৃশংস হতে পারে। ধরে নিন, তারা কোনো একটি বিষয়কে বড় করে তুলছে।

শীতল যুদ্ধে পূর্ব-পশ্চিমের দুই পারমাণবিক সংকটের সময়, তথা ১৯৬২ সালের কিউবার ঘটনা এবং ১৯৮৩ সালের ভুল ক্ষেপণাস্ত্র সংকেতের সময়, ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে অনানুষ্ঠানিক লাইন অব কমিউনিকেশনের মাধ্যমে বিপর্যয় এড়ানো গিয়েছিল। যোগাযোগের চ্যানেলগুলো তখন কাজ করেছে; কিন্তু সেই লাইনগুলো আজ নেই বলে জানা গেছে। এখন প্রাচ্য ব্লক দুই কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় চলছে। তারা অভ্যন্তরীণভাবে নিরাপদ; কিন্তু সীমানা নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত।

দুর্বল ও ব্যর্থ নেতৃত্বের কারণে পশ্চিমের ক্ষয় হচ্ছে। এর কারণ তারা বিদেশে সংঘাত বাড়িয়ে নিজেদের রেটিং বাড়ানোর চেষ্টায় লিপ্ত। এই প্রক্রিয়ায় যা নতুন, তা হলো পুরনো পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদকে পশ্চিমা ‘স্বার্থ ও মূল্যবোধের’ একটি নয়া ব্যবস্থা হিসেবে কায়েম করা।

এই পদক্ষেপ নির্বিচারী হয়ে উঠেছে এবং কোনো সীমানা মানছে না। তাই পেলোসি যা-ই বলুক, পশ্চিম তার নিজের সুবিধামতোই ‘আত্মসমর্পণ’ করে, সেটা হস্তক্ষেপ করে হোক কিংবা ব্যর্থ হয়ে। এ কারণেই ইরান, সিরিয়া, লিবিয়া, রুয়ান্ডা, মিয়ানমার, ইয়েমেন, সৌদি আরব ও অন্যদের প্রতি পশ্চিমের খেয়ালি নীতি। ব্রিটেন হংকংকে চীনের কাছে ছেড়ে দেয়, আফগানিস্তানকে তালেবানের কাছে তুলে দেয় এবং সর্বশেষ গত সপ্তাহে তার অসাড়তা দেখা যায় কাবুলে আল-কায়েদার নেতাকে ড্রোনের সাহায্যে হত্যার ঘটনায়।

আমার জীবদ্দশায় কখনোই ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে দূরবর্তী প্রকৃত বিদেশি হুমকি থেকে আমাদের দেশকে রক্ষা করতে হয়নি, অন্তত রাশিয়া বা চীন থেকে অবশ্যই নয়। এর পরিবর্তে ‘স্বার্থ ও মূল্যবোধের’ কথা বলে আমাদের নামে অবর্ণনীয়ভাবে হাজার হাজার বিদেশিকে হত্যা করেছে এবং যাতে কার্যত কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

এখন একটি গুরুতর পূর্ব-পশ্চিম সংঘাতের হুমকির মুখে বিশ্ব। এই সময়ে ব্রিটেনের সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের কাছ থেকে আমাদের অন্তত এটুকু আশা করা উচিত যে তিনি গতানুগতিকতা থেকে বেরিয়ে আসবেন এবং ইউক্রেন ও তাইওয়ানে ব্রিটেনের লক্ষ্য হিসেবে তিনি যা স্থির করবেন, তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবেন।

কোনো দেশই ব্রিটেনের আনুষ্ঠানিক মিত্র নয়, বা তার প্রতিরক্ষার জন্য প্রতিকূলও নয়। রুশ আগ্রাসনের ভয়াবহতা কিয়েভের প্রতি সামরিক সহায়তাকে যৌক্তিতা দিয়েছিল; কিন্তু এটি কৌশলগত প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে মানবিক বিষয় ছিল। সম্ভবত ইউক্রেনের জন্য আমরা যে সবচেয়ে বড় সহায়ক হতে পারি তা হলো তার নির্বাসিত শ্রমশক্তির চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন এবং তার ভেঙে পড়া শহরগুলো পুনর্নির্মাণে সহায়তা করা। চীনের সঙ্গে সংঘাতের কারণে তাইওয়ানও একইভাবে সহানুভূতির যোগ্য, কিন্তু দেশটির অবস্থান ব্রিটেনের জন্য কোনো সামরিক হুমকি নয়। এর জনগণ দীর্ঘ সময় ধরে চীনের সঙ্গে একটি অস্পষ্ট সম্পর্ক নিয়ে সন্তুষ্ট, কারণ তারা জানে যে এটি চীনের দীর্ঘমেয়াদি করুণার মধ্যে রয়েছে। তাই গত বছর বরিস জনসন যখন বিমানবাহী রণতরি রানি এলিজাবেথকে দক্ষিণ চীন সাগরে পাঠান, তখন বিষয়টি অর্থহীন অহংকার প্রদর্শনে রূপ নেয়।

রাশিয়া ও চীন দুটি দেশকেই বিশ্বের বেশির ভাগ কোণে ঘটে যাওয়া সীমান্ত সংঘাত মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বাইরের লোকজন খুব কমই তাদের অভিপ্রায়ে সহায়তা করে। পশ্চিমা শক্তিগুলো চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোকে নিজেদের কাজে লাগাতে পারার সেই দিনগুলো ঠিকই শেষ হয়ে গেছে, যেমনটা ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় স্বীকার করা হয়েছিল। সেই সংঘাত শেষ হওয়ার পর থেকে পশ্চিমাদের বৈশ্বিক হস্তক্ষেপগুলো রাজকীয় প্রচারের প্যারোডিতে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বজুড়ে। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া চীন বা রাশিয়া কেউই বিশ্বকে ধারণ করার জন্য একটি তুলনা করার মতো আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেনি। তারা শুধু চেয়েছিল, যা-ই হোক না কেন, পৈতৃক প্রতিবেশীদের পুনর্দখল করা।

ইউক্রেন ও তাইওয়ানের ভাগ্য প্রতিটি কূটনৈতিক সমর্থন লাভ করতে পারে, কিন্তু তাদের কোনোভাবেই বিশ্বযুদ্ধ বা পারমাণবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া যায় না। এটি পারমাণবিক প্রতিরোধের সর্বদা অতিরঞ্জিত প্রভাবকে কমিয়ে দিতে পারে এবং তাদের ব্ল্যাকমেইল করার কাজটি দুর্বল করতে পারে; কিন্তু নিজেকে ‘লালের চেয়ে মৃত’ (কমিউনিস্ট হওয়ার চেয়ে পারমাণু যুদ্ধ ভালো) ঘোষণা করা এক জিনিস, আর অন্যের ওপর সেই সিদ্ধান্তটি চাপিয়ে দেওয়া অন্য জিনিস।

হতে পারে একদিন বৈশ্বিক উষ্ণতার মতো একটি বৈশ্বিক যুদ্ধ বিশ্বকে এমন এক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাবে, যা তাকে মোকাবেলা করতেই হবে। আপাতত উদার গণতন্ত্র অবশ্যই মানবতার কাছে ঋণী এই কারণে যে সে সেই ঝুঁকিকে উসকে দেওয়ার পরিবর্তে প্রতিহত করবে; কিন্তু এই মুহূর্তে দুই পক্ষই বিপর্যয় নিয়ে খেলছে। পশ্চিমের উচিত, তাকে পিছু হটতে প্রস্তুত থাকতে হবে এবং এটাকে পরাজয় বলা উচিত নয়।

 

লেখক :  গার্ডিয়ানের কলামিস্ট

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

 



সাতদিনের সেরা