kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

এই পরিবারগুলোকে আমরা কী সান্ত্বনা দেব

রাজন ভট্টাচার্য

৩ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এই পরিবারগুলোকে আমরা কী সান্ত্বনা দেব

নিরাপদ সড়ক নিয়ে যখন এত কথা, আলোচনা চলছে, তখনো দুর্ঘটনা থেমে নেই। প্রতিদিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে রাস্তার প্রাণনাশ ও পঙ্গুত্বের খবর। স্বজনহারা পরিবারগুলোর নিঃস্ব হওয়ার সংবাদ। সরকারি-বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক একটি পরিসংখ্যানও বলছে না দেশে সড়ক নিরাপদ হয়েছে বা দুর্ঘটনা হ্রাস পাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তবে কি এই সড়ক দুর্যোগ থেকে আমাদের মুক্তি নেই? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে সরকারের আন্তরিকতা ও কার্যক্রম কতটুকু। যদিও এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

ত্রিশালে দুর্ঘটনায় নিহত গর্ভবতী মা রাস্তায়ই সন্তান জন্ম দিয়েছেন। গত ২৪ জুলাই বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছবিসহ সড়ক দুর্ঘটনার একটি ভয়াবহ মর্মান্তিক খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ট্রাকচাপায় রাস্তায় সন্তানের ছিন্নভিন্ন নিথর দেহ পড়ে আছে। পাশে বসে আহাজারি করছেন বাবা। দুর্ঘটনায় মেয়েটির মাথা ও মুখমণ্ডল থেঁতলে গেছে।

এই দৃশ্য দেখে কোনো বাবা কী স্বাভাবিক থাকতে পারেন? থাকা সম্ভবও নয়। দুর্ঘটনার পর বাবা গাড়ির নিচে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। তাঁকে পথচারীরা রক্ষা করেছে।

দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে মেয়েকে নিয়ে বাবা-মায়ের দেখা সব স্বপ্নই মাটির সঙ্গে মিশে গেল। ফাতেহা জাহান জেবা আর কখনো বাবা বলে ডাকবে না। কখনোই তার বড় হওয়ার স্বপ্নের কথা জানাবে না। কখনো হাসিমুখে বাবাকে এসে জড়িয়ে ধরবে না। বাবা ঘরে ফিরতে দেরি হলে দুশ্চিন্তায় পায়চারী করে রাত জাগবে না, বারবার ফোন দেবে না। একটি দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে ঘরের আলোটাই নিভে গেছে পরিবারটির।

সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো, মেয়েটি তো একটু আগেও মোটরসাইকেলের পেছনে বসে বাবার সঙ্গে গল্প করতে করতে যাচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যে এত বড় সর্বনাশ ফারুকের জন্য অপেক্ষা করছে কে জানত?

তাই বাবা এই মর্মান্তিক মৃত্যু কিভাবে মেনে নেবেন? কোনোভাবেই তা মেনে নেওয়া যায় না। হয়তো ফারুক দম্পতি শোক কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াবেন, কিন্তু সন্তান হারানোর যন্ত্রণা তো আমৃত্যু তাঁদের বয়ে বেড়াতে হবে। যতবার ঘরে জেবার ছবির দিকে চোখ যাবে, ততবার জলে বুক ভিজবে। হাহাকার করে উঠবে বুক।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, গত ২৩ জুলাই চট্টগ্রামে লরির ধাক্কায় বাবার মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে কলেজছাত্রী ফাতেহা জাহান জেবার মৃত্যু হয়। সীতাকুণ্ডে ফৌজদারহাট-বায়েজিদ লিংক রোডের ৩ নম্বর ব্রিজের পাশে এ দুর্ঘটনা ঘটে। জেবা নগরীর এনায়েত বাজার মহিলা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। মেয়েকে মোটরসাইকেলে করে কলেজে পৌঁছে দিতে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন ফারুক। পথে একটি লরি মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। ছিটকে পড়ে যায় জেবা। তখন লরিটি তাকে পিষ্ট করে চলে যায়।

ত্রিশালে সড়ক দুর্ঘটনায় রাস্তায় যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয়েছে সে তো কোনো দিন ‘মা’ বলে ডাকতে পারবে না। মা-ও তো বুকের ধনকে একবার দেখে যেতে পারেননি। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে বাড়ি যাওয়ার পথে রাস্তা পার হওয়ার সময় ঘাতক ট্রাক একসঙ্গে বাবা-মাকে কেড়ে নিয়েছে। দুর্ঘটনায় শিশুটির হাতের আঙুল, ঘাড়ের হাড় ভেঙেছে। পরিবারে অভাব থাকায় আরো দুই বোনের সঙ্গে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুটির দেখা হবে কি না কেউ জানে না। এ রকম ভয়াবহ দুর্ঘটনা কয়টি দেশে হয়? জানা নেই।

তেমনি ফাতেহার পরিবারে সন্তান হারানোর মাতম থেমে যাওয়ার নয়। অথচ চালকদের মনে এসব বিষয় কখনো কষ্টের রেখাপাত সৃষ্টি করে না।

এর পরও কারো যেন টনক নড়ে না। সবাই যেন এক ধরনের নির্বিকার অবস্থায় আছি। দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ অনেক কম, এ কথা সরকার কখনোই স্বীকার করতে নারাজ। তেমনি রাষ্ট্রীয় পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিআরটিএ হুংকার দেওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারে না।

হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় নেই। দুর্ঘটনা রোধে দ্রুত দৃশ্যমান কাজ শুরু করা উচিত। নিয়ম অনুসরণ করে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিশ্চিত করার পাশাপাশি চালকদের মানবিক বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। তাহলে তারা আরো সচেতন হবে। দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু হলে সেই পরিবারে কী ধরনের অমানিশা নেমে আসতে পারে তা কোনো চালকেই ভাবেন না।

দুর্ঘটনার পর চালকরা যুগের পর যুগ গুরু পাপে লঘু দণ্ড দেখে অভ্যস্ত। শত অন্যায় আর নৈরাজ্যের পরও গাড়ির চাকা ঘুরবে, দুর্ঘটনা ঘটবে, মানুষের মৃত্যু হবে, তারপর জামিনে তাঁদের দ্রুত সময়ের মধ্যে মুক্তি মিলবে। তাই পুরো বিষয়টি চালকরা হয়তো স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই দেখেন। মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক আইন কার্যকর করা যাচ্ছে না।

তাই সড়ক আইন প্রয়োগ করে দুর্ঘটনায় অভিযুক্ত অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। গণপরিবহন সেক্টরকে প্রভাবশালীদের ছায়ামুক্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার সম্ভব না হলে চালকদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসবে না। মালিকরাও যেন অপরাধের দায়মুক্তি না পান।

 

 লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

 

 



সাতদিনের সেরা