kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

অনলাইন থেকে

নতুন ভূমিকায় ন্যাটো কতটা সফল হবে

৩ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নতুন ভূমিকায় ন্যাটো কতটা সফল হবে

বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর থেকে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনকে (ন্যাটো) কখনো কখনো মনে হয়েছে উদ্দেশ্যের সন্ধানে থাকা একটি জোট। সম্প্রতি মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের পর সংস্থাটিকে আর এই অভিধায় আখ্যা দেওয়া যায় না। গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার বিনা প্ররোচনায় হামলার পর থেকে ইউক্রেনকে সমর্থন করতে গিয়ে ন্যাটো জরুরি পশ্চিমা সহায়তা প্রদান করে আসছে। চার মাস পর জোটটি এখন আরো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তার পদক্ষেপের মধ্যে বড় ধরনের আর্থিক, কৌশলগত ও আঞ্চলিক প্রভাবের মতো বিষয়গুলো রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তাগুলো এখনো বিদ্যমান।

ন্যাটোর এই উদ্দেশ্য পুনর্গঠনের চারটি উপাদান রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে কৌশলগত। এর মধ্য দিয়ে এটি স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে যে অদূরভবিষ্যতে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শেষ হয়ে গেছে এবং ইউক্রেনে অযৌক্তিক আক্রমণে পশ্চিমের সঙ্গে রাশিয়ার একটি বৃহত্তর বিরোধ সুস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, ১৯৮৯-পরবর্তী সময়ের প্রতিরক্ষা বাজেট হ্রাস যুগের পরিবর্তন। এখন ইউক্রেনকে সহায়তা, আগামী এক দশকের উচ্চতর সামরিক ব্যয় এবং উচ্চ সতর্কতায় নিয়োজিত ন্যাটোর সেনাসংখ্যা সাত গুণ বাড়িয়ে তিন লাখে উন্নীত করার মধ্য দিয়ে প্রতিরক্ষা বাজেট হ্রাসের যুগটি এখন এক বিস্তৃত প্রতিরোধব্যবস্থার যুগে পা ফেলেছে।

তৃতীয়ত, উপাদানটি হলো ইউরোপে মার্কিন সামরিক স্থাপনার বিষয়ে আংশিক ইউ টার্ন। চীনের উত্থান মোকাবেলায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন অক্ষ পরিত্যাগ না করেও শীতল যুদ্ধের পর প্রেসিডেন্ট বাইডেন এখন ইউরোপের ভেতরে বৃহত্তর আকারে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ নিচ্ছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, আমেরিকার এই তৎপরতা বৃদ্ধির বেশির ভাগই আমাদের মহাদেশের পূর্ব দিকে থাকবে, যার মধ্যে রয়েছে পোল্যান্ডকে নতুন কেন্দ্রস্থল বানানো, রোমানিয়ায় পাঁচ হাজার অতিরিক্ত সেনা এবং বাল্টিক দেশগুলোতে বড় আকারে আরো সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন।

চূড়ান্ত উপাদানটি হচ্ছে ন্যাটোর সদস্য পদ সম্প্রসারণ। জোটটি ফিনল্যান্ড ও রাশিয়ার সঙ্গে ৮০০ মাইল স্থল সীমান্ত থাকা সুইডেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজেকে বিস্তৃত করেছে। এর ফলে দুই নর্ডিক দেশের ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিরপেক্ষতার অবসান ঘটে। ইউক্রেন আক্রমণ রাশিয়ার প্রতি বৃহত্তর আস্থাকে কতটা সন্দেহাতীতভাবে ধ্বংস করেছে এটি তার একটি লক্ষণ। এর পরও বাল্টিক অঞ্চলে রাশিয়ার বিশাল সামরিক প্রভাব রয়েছে। বর্তমান সংঘাতের সময় ন্যাটোর অনন্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তুরস্ক ভেটো তুলে নেওয়ার পরই সম্প্রসারণের লক্ষ্য অর্জন করা গেছে। সম্ভবত তুরস্ককে শিগগিরই উন্নত এফ-১৬ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করার মার্কিন প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে এটা সম্ভব হয়েছে।

এ সবই বড় ধরনের পরিবর্তন। রাশিয়ার আগ্রাসন পশ্চিমাদের একটি বড় যুগান্তকারী নীতি গ্রহণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যেভাবেই হোক এটি এক দিক থেকে একসময়ের পরিচিত নিরাপত্তা মানচিত্রের প্রত্যাবর্তন। দেখা যাচ্ছে যে ন্যাটো প্রকৃতপক্ষে একটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধ মিশন শুরু করছে। এটি সম্ভবত রুশ শক্তির বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের সমষ্টিগত প্রতিরোধের একটি নতুন যুগের জন্মকে চিহ্নিত করছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাবকে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়; কিন্তু ২০২০-এর দশকের বিশ্ব ও ইউরোপ, ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিক থেকে অনেকটা আলাদা।

ন্যাটোর নতুন কৌশল অতীতের স্নায়ুযুদ্ধের মতোই সময়ের ব্যাপ্তি ও সাফল্যের দিক থেকে একইভাবে প্রকাশ পাবে কি না তা অজানা। কারণ আগামী মাসগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রে কী ঘটবে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। এ সময়ে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সবাই ব্যয় অগ্রাধিকার ও সামরিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বড় ধরনের দ্বিধাগ্রস্ততার মধ্যে পড়বে। আর ওয়াশিংটনে প্রশাসনের একটি পরিবর্তন তো পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দিতে পারে। তাতে ইউরোপকে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দেবে এবং রাশিয়াকে সংঘাতের বাইরে যেতে প্রলুব্ধ করবে।

আগেভাগে অতিরঞ্জিত না করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি ব্রিটেনের জন্য একটি স্থায়ী সমস্যা। পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, সামরিক সরঞ্জাম স্থাপন, প্রশিক্ষণ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে ঘোষণা প্রদান আর অঙ্গীকার একই জিনিস নয়। মাদ্রিদে যে সম্মতি দেওয়া হয়েছিল তার বেশির ভাগই কার্যকর করতে কয়েক বছর সময় লাগবে, যদি আদৌ করা হয়। বরিস জনসন এবং তাঁর স্থানটি নেওয়ার জন্য কৌশল অবলম্বনকারী মন্ত্রীরা স্রেফ লোক-দেখানো কাজ করছেন। তাঁদের যত হম্বিতম্বি সবই টরি পার্টিকে (নেতৃত্ব অর্জন) লক্ষ্য করে। গত সপ্তাহে লিজ ট্রাসের চীনের বিরুদ্ধে হুমকি তার একটি উদাহরণ। অথচ এখন ইউক্রেনকে রক্ষা ও রাশিয়াকে প্রতিহত করাই বেশি জরুরি।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য), ভাষান্তরিত



সাতদিনের সেরা