kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১১ আগস্ট ২০২২ । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১২ মহররম ১৪৪৪

যে যুদ্ধের কোনো মীমাংসা নেই

ড. ফরিদুল আলম

১ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



যে যুদ্ধের কোনো মীমাংসা নেই

গত ২৫ জুন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে জানালেন যে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের লুহানস্কের গুরুত্বপূর্ণ শহর সেভেরোদনেত্স্ক এখন পুরোপুরি রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। আর এর মধ্য দিয়ে পুরো ইউক্রেন দখলের চেষ্টা থেকে সরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিনের ইউক্রেনের পূর্বমুখী দনবাস অঞ্চলের লুহানস্ক ও দনেস্ক দখলের যে পরিকল্পনা সেটা অনেকটাই সফল হয়েছে; যদিও পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতে সরে গিয়ে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী রাশিয়ার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রবল প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে। এদিকে গত ২৬ জুন জার্মানিতে যখন জি৭ সম্মেলনের প্রথম দিনে সদস্য রাষ্ট্রের নেতারা সমবেত, এমন সময় রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে একের পর এক মিসাইল নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে জি৭ নেতাদের নতুন করে রাশিয়া এই যুদ্ধে তাদের সরব অবস্থানের বার্তা দিয়ে দিল। তারা বোঝাতে চাইল যে এই যুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে পশ্চিমা শক্তির মদদ সত্ত্বেও রাশিয়া খুব ভালো অবস্থানে রয়েছে এবং কিয়েভেও তারা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ইউক্রেন সরকারের অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

যদিও রাশিয়া পূর্বাঞ্চলের দিক থেকে এই মুহূর্তে তাদের মনোযোগ সরিয়ে কিয়েভমুখী হবে কি না সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে গেছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মুখ থেকে উচ্চারিত কথাগুলোর মধ্য দিয়ে ইউক্রেনের এক ধরনের অসহায়ত্বের চিত্রই ফুটে ওঠে। জি৭ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সহায়তা চেয়েছেন, যেন বছর শেষ হওয়ার আগেই যুদ্ধটি শেষ করা যায়, না হলে শীতে তাদের পক্ষে রাশিয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরো অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।

এই যুদ্ধ পরিস্থিতি আসলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে নানা ধরনের ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। এক পক্ষ মনে করছে, রাশিয়া চাচ্ছে প্রথমত গোটা ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে সেখানে একটি রুশপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা করে ভবিষ্যতে ন্যাটো ও ইইউ থেকে ইউক্রেনকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখতে। আবার কেউ কেউ এটাও মনে করছেন যে বাস্তব অবস্থা অর্থাৎ পশ্চিমা সহায়তাপুষ্ট ইউক্রেনকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ বা দখল করা সম্ভব নয় এবং সেটা অনেক সময়সাপেক্ষ, যা এই যুদ্ধকে রাশিয়ার জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও দুঃসাধ্য করে তুলবে। এমনটা বিবেচনায় নিয়ে রাশিয়া আপাতত তাদের প্রাথমিক লক্ষ্যস্থল দনবাস অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াটাই যথোপযুক্ত মনে করছে। আর সম্ভবত সে কারণেই তারা তাদের যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করে পূর্বমুখী আক্রমণ ত্বরান্বিত করেছে এবং এরই মধ্যে এর ভালো ফলও পেয়েছে।  

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই দুই পক্ষের মধ্যে একাধিক যুদ্ধবিরতি আলোচনা হয়েছে। ইউক্রেন রাশিয়ার দাবির প্রতি কিছুটা নমনীয় অবস্থানে থাকলেও মূলত পশ্চিমা চাপের মুখে তারা এই যুদ্ধ থেকে সরে আসতে পারেনি। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়াকে ঘায়েল করার কৌশল হিসেবে প্রথমে তাদের ওপর সর্বাত্মক বাণিজ্যিক অবরোধ, বিদেশে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো ফ্রিজ করা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে যে চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছে; চীন, ভারতসহ কিছু রাষ্ট্র সেখানে সহায়তা না করার ফলে এবং ইউরোপীয় কিছু দেশ বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের মতো বিষয়ে রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়া নিজের অবস্থান অনেকটাই সুসংহত করতে সক্ষম হয় এবং রাশিয়া এরই মধ্যে যতটুকু আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, সেটা না হওয়ায় এই যুদ্ধের মোড় অনেকটাই নতুন করে রাশিয়ার অনুকূলে আসতে শুরু করে। পশ্চিমা দেশগুলো যা চেয়েছিল, অর্থাৎ রাশিয়াকে দুর্বল করে এবং চাপের মধ্যে ফেলে একটি ভালো অবস্থান তৈরি করা, সেটা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না বিবেচনা করে এবং তারাও (পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো) নিজ থেকে কোনো আপস ফর্মুলার মধ্য দিয়ে কার্যত রাশিয়ার কাছে নতিস্বীকারে যাবে না বুঝতে পেরেই সম্ভবত ন্যাটো মহাসচিব এই যুদ্ধটি ‘বছরের পর বছর চলবে’ বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়া আক্রমণ শুরু হওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য পদের জন্য আবেদন জানায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমে ছয়টি দেশ নিয়ে শুরু করে বর্তমানে ইইউ সদস্যসংখ্যা ২৭। ইউক্রেনের বাইরে সার্বিয়া, মন্টিনেগ্রো, আলবেনিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, মলদোভা ও জর্জিয়াও অনেক দিন ধরে ইইউ সদস্য পদের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য, ইইউ সদস্য পদ প্রাপ্তি একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্য হওয়ার আগে এই পদের প্রার্থী হিসেবে নিজেদের যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে হয় এবং এটি কয়েক বছর পর্যন্ত গড়ায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই আবেদনকারী রাষ্ট্র এই যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, যেমনটা সার্বিয়াসহ উল্লিখিত রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে সবাইকে অবাক করে দিয়ে গত ২৩ জুন ইউরোপীয় কমিশনের সুপারিশের আলোকে ইইউ পার্লামেন্টে ইউক্রেনকে ইইউ সদস্য পদের প্রার্থী হিসেবে যোগ্য বিবেচনা করা হয়, অর্থাৎ তারা এই সদস্য পদ লাভের ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে গেল, যদিও পূর্ণ সদস্য পদ পেতে গেলে আরো কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে, যেমন—তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং ইইউয়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো যোগ্যতা ইত্যাদি। নিঃসন্দেহে এই প্রক্রিয়া বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে এটি আসলে ইইউয়ের পক্ষ থেকে রাশিয়ার জন্য একটি বার্তা, যার মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হলো রাশিয়া পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে যতই হাঁকডাক বা হুমকি দিয়ে আসুক না কেন, তারা ইউক্রেনের সঙ্গেই আছে এবং থাকবে।

ইইউ সদস্য দেশগুলো এমন একসময় এসে অনেকটা তাড়াহুড়া করে, যা ইইউ সদস্য পদে প্রার্থী করার ক্ষেত্রে অতীতে কখনোই এমনটি হয়নি, যেটি ইউক্রেনের পক্ষে করা হয়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে এটাই ধারণা করা যায়, তারা সম্ভবত নিজেরাও এই যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য পরিণতি আঁচ করতে পারছে। আর এই পরিণতি এমন হতে পারে যে রাশিয়া যদি পুরো দনবাস অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে, তাহলে তারা হয়তো কিছুটা বিরতি দিয়ে ধীরে ধীরে কিয়েভসহ ইউক্রেনের অন্য শহরগুলোতে একের পর এক নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে। এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষই কার্যকর কোনো যুদ্ধবিরতিতে যেতে চাইবে না। আর যেহেতু একবার পশ্চিমা দেশগুলো এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের পক্ষে যুদ্ধবিরতি চাওয়া মানে রাশিয়ার কাছে নতিস্বীকার করার শামিল। সে ক্ষেত্রে তারা চাইবে রাশিয়াকে দীর্ঘ সময় এই যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে। আর রাশিয়া এই যুদ্ধে এখন তেমনভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন না হলেও সমন্বিত পশ্চিমা শক্তির প্রচেষ্টার কাছে তারা খুব বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে না। এরই মধ্যে জার্মানিতে জড়ো হওয়া জি৭ নেতারা ভবিষ্যৎ বিশ্বের জন্য নতুন করণীয় নির্ধারণে ৬০০ বিলিয়ন ডলারের এক সহায়তা প্যাকেজ নিয়ে কাজ করছেন, যেখানে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ২০০ বিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়েছে। তারা চাইছে, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য বিমোচনসহ বৈশ্বিক বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে আর্থিক প্রণোদনার বিনিময়ে নিজেদের পক্ষে টানতে। এ ক্ষেত্রে যদিও তাদের মূল লক্ষ্য চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত দেশগুলোকে চীনের বলয় থেকে বের করে এনে নিজেদের দিকে টেনে আনা। কার্যত এ ধরনের উদ্যোগ যদি কার্যকর হয়, তাহলে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও একটি শক্তিশালী জোট দাঁড়িয়ে যাবে।  

রাশিয়া যে সার্বিক পরিস্থিতি উপলব্ধি করছে না, তা নয়। পুতিন খুব ভালোভাবেই জানেন যে এই যুদ্ধকে খুব বেশি দিন টেনে নিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষেও সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে তাঁর সেনাবাহিনীর মনোবল যেন অটুট থাকে, সেই দিকটি নজরে রেখে সম্ভবত আপাতত দনবাস অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করে হয়তো তিনি নিজেই এই যুদ্ধ থেকে সরে আসতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তিনি হয়তো লুহানস্ক ও দনেস্ক এই দুটি অঞ্চল দখল করে সেখানে রুশপন্থী সরকার বসিয়ে দেবেন অথবা অঞ্চল দুটিকে ক্রিমিয়ার মতো নিজের ভূখণ্ডের অংশও করে নিতে পারেন। তবে পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, যে ক্ষতি ইউক্রেনের হয়েছে সেটা কোনোভাবেই পূরণ করা পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষে সম্ভব নয়, এমনকি একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন পুনর্গঠনের প্রশ্ন যখন আসবে তখনো হয়তো ইউক্রেনকে অনেকটা একাই চলতে হবে, কারণ রাশিয়ার প্রভাববলয় থেকে বের করতে না পারলে এবং একটি অমীমাংসিত যুদ্ধে ইউক্রেনের উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে কেউ আগ্রহী হয়ে উঠবে না।

 

 লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

[email protected]



সাতদিনের সেরা