kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

আমাদের আত্মশক্তির আরেক নাম পদ্মা সেতু

ড. আতিউর রহমান

২৫ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আমাদের আত্মশক্তির আরেক নাম পদ্মা সেতু

দুঃখ ও সুখের দিনে এক হওয়ার অনুভবই আসলে জাতীয়তাবাদের মূলকথা। একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে দুঃখের দিনে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশার মানুষ মুক্তির সংগ্রামে এক হয়েছিল। আবার ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতার স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তনের আনন্দের দিনেও বাঙালি এক হয়েছিল। শ্মশান বাংলাকে সোনার বাংলায় রূপান্তরের সেই মহিমান্বিত নেতৃত্বের পুনরাবৃত্তি আমরা স্বদেশের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে বঙ্গবন্ধুকন্যার উন্নয়ন অভিযাত্রায় দেখতে পেয়েছি।

বিজ্ঞাপন

শুরুতে তা ছিল দুঃখের আখ্যান। স্বদেশের কতিপয় স্বার্থান্বেষী মানুষের ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশ ও তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংকের অবিবেচক তৎকালীন নেতৃত্বের নির্দয় আক্রমণের সেই দিনগুলোর কথা ভোলার নয়। সেই আঘাতকে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে ঢাকার গণভবনে বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট কার্গিলকে যা বলেছিলেন তার সঙ্গে পদ্মা সেতু নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যার সিদ্ধান্ত মিলে যায়। পাকিস্তানের বিদেশি ঋণ ভাগাভাগি করে নেওয়ার চাপ দেওয়ার সময় কার্গিল বঙ্গবন্ধুকে খাদ্য সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিণতির কথা জানিয়েছিলেন। এর জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, প্রয়োজনে তাঁর দেশের মানুষ ঘাস খাবে, তবু বিশ্বব্যাংকের অন্যায় আবদার মেনে নেবে না। এরপর উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের দাবিমতোই এ প্রশ্নের মীমাংসা করতে বাধ্য হয়। বিশ্বব্যাংকের অন্যায় আক্রমণের জবাবে নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু গড়ার প্রত্যয় ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকন্যাও সেই একই রকম দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।

আত্মশক্তিতে বলীয়ান বঙ্গবন্ধুকন্যার বিচক্ষণ নেতৃত্বে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আজ শুভ দিন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত (বিশেষ করে অগ্রণী ব্যাংক) এই মেগাপ্রকল্পের পুরো বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করেছে। আর এই বিদেশি মুদ্রা মূলত আমাদের দেশপ্রেমিক পরিশ্রমী প্রবাসী ভাই-বোনরাই আয় করে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে পাঠিয়েছেন। পোশাকশিল্পে কর্মরত কৃষককন্যাদের পরিশ্রমের ফসল রপ্তানি আয়ও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সাড়ে সাত বছর ধরে প্রতিকূল প্রাকৃতিক ও কভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এই সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। আমাজন নদীর পরই খরস্রোতা পদ্মার ওপর ১২৮ মিটার দীর্ঘ গভীরতম পাইলিং করে পদ্মা সেতুর দ্বিতল কাঠামো স্থাপন করা হয়েছে। এই সেতুর ওপরের তলা দিয়ে যানবাহন এবং নিচের তলা দিয়ে রেল চলবে। একই সঙ্গে নিচের তলায় রয়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের লাইন। প্রযুক্তির বিস্ময়কর ব্যবহারে গড়ে ওঠা পদ্মা সেতুর জন্য সিমেন্ট, রড ও অন্যান্য উপকরণের বেশির ভাগই জুগিয়েছে বাংলাদেশের শিল্প খাত। আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের পাশাপাশি আব্দুল মোনেম গ্রুপের মতো স্বদেশি ঠিকাদাররাও অসাধারণ অবদান রেখেছেন এই সেতু নির্মাণে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগের সমন্বয় ও কর্মতৎপরতাও ছিল দেখার মতো। এই সেতুর কারিগরি কমিটির প্রধান প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী এক আলাপচারিতায় আমাকে জানিয়েছিলেন যে পদ্মা সেতু নির্মাণের অভিজ্ঞতায় পোক্ত হয়ে আমাদের প্রকৌশলীরা ভবিষ্যতে আরো বড় সেতু নিজেরাই নির্মাণ করতে পারবেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা পদ্মার ওপারের মানুষ। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিজের চোখে দেখেছেন। তাই পদ্মা সেতু নির্মাণে তিনি ছিলেন আপসহীন। এ কারণেই জনগণের মঙ্গল হবে—এমন প্রকল্প গ্রহণে তিনি এতটা মরিয়া। জেদি। অঙ্গীকারবদ্ধ। আমি পদ্মা সেতু উপাখ্যানের শুরুর দিনগুলোতে তাঁর খুব কাছে থেকেই দেখেছি তিনি কতটা সাহসী এবং আত্মসম্মানে বলীয়ান। ঠিকই তিনি অনুভব করেছিলেন এই সেতু শুধু দক্ষিণ বাংলা নয়, পুরো বাংলাদেশের উন্নয়নের ল্যান্ডস্কেপই বদলে দেবে।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের আগ দিয়ে জনমনে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেছে, তা মোটেও অনভিপ্রেত ছিল না। তাই যখন গণমাধ্যমে দেখতে পাই একজন জসিমউদ্দিন ১৬ হাজার টাকায় আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন অ্যাম্বুল্যান্সে করে তাঁর মুমূর্ষু সন্তানকে পদ্মা সেতু দেখাতে নিয়ে যান, তখন আর অবাক হই না। জানা গেছে, ফরিদপুরের কৃষকরা আশা করছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এ অঞ্চলে নতুন কলকারখানা তৈরি হবে। তাঁদের উৎপাদিত পাটের চাহিদা বাড়বে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গামছাপল্লীর তাঁতিরা মনে করছেন, তাঁদের কাঁচামাল সংগ্রহ সহজ হবে। উৎপাদিত পণ্যও দ্রুততম সময়ে ঢাকা ও অন্যান্য বাজারে নেওয়া যাবে।  

পত্রিকায় পড়েছি, জাজিরার নাওডোবা এলাকার খুদে দোকানদার ইব্রাহিম হাওলাদার পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর তাঁর মোটর মেকানিক সন্তানকে ঢাকা থেকে নিয়ে আসবেন গ্রামে। তাকে তিনি গ্যারেজ করে দেবেন। সুখে-দুঃখে স্বজনদের সঙ্গেই একসঙ্গে সেও থাকবে। জাজিরা কাজির হাট বাজারের ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, শিল্প-কারখানার জন্য উদ্যোক্তারা কোটি টাকা দিয়ে জমি কিনে ফেলছেন। স্থানীয় লোকজনও নানামুখী ব্যবসার উদ্যোগ নিচ্ছে। নড়িয়া উপজেলার মধ্যপ্রাচ্যফেরত আশরাফুল আর বিদেশে যাবেন না। দ্রুত গড়ে ওঠা হিমাগারের ম্যানেজারের কাজ পেয়ে গেছেন। শরীয়তপুরের তোসাই হাটে তৈরি হচ্ছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। জাজিরা উপজেলার নাওডোবায় দেশের সর্ববৃহৎ তাঁতশিল্প ‘শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী’ গড়ে উঠছে ১০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। আট হাজার ৬৪টি তাঁত শেড নির্মিত হতে যাচ্ছে তাঁতিদের আবাসনের জন্য। এই তাঁতপল্লীতে বছরে ৪.৩১ কোটি মিটার কাপড় তৈরি হবে। এ এলাকার কৃষক আলতাফ মিয়া যথার্থই বলেছেন, ‘হঠাৎ পুরো এলাকাই বদলে গেল। ...এখনই পদ্মা সেতু দেখতে পর্যটকরা ভিড় করছেন আমাদের এলাকায়। ’ এ এলাকায় গড়ে উঠছে আইটি পার্ক। ৭০ একর জায়গায় গড়ে উঠছে হাই-টেক পার্ক। আরো গড়ে উঠছে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শিশু পার্ক, নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজ, অলিম্পিক ভিলেজ, বিসিক শিল্প পার্ক, বিশাল হাউজিং প্রকল্প, যেখানে লাখখানেক মানুষের আবাসন হবে।

এসব টুকরা তথ্য থেকেই অনুমান করতে পারি, পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব কতটা হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা মডেলিং করে দেখিয়েছেন যে পদ্মা সেতু চালু হলে বছরে ১.২৬ শতাংশ জাতীয় জিডিপিতে যুক্ত হবে। ২১ জেলার আঞ্চলিক জিডিপিতে যুক্ত হবে ৩.৫০ শতাংশ। রেল চালু হলে জাতীয় জিডিপিতে আরো ১ শতাংশ যুক্ত হবে। ভুটান, নেপাল ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়বে। মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরের সচলতা বাড়বে। তাদের আশপাশে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে। খুলনা, বরিশালে জাহাজ ভাঙা ও নির্মাণ শিল্প গড়ে উঠবে। শুধু বরিশালেই এক হাজারের মতো খুদে ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগ গড়ে উঠবে। দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিবছর অন্তত দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। বছরে ১ শতাংশেরও বেশি দারিদ্র্য কমে আসবে।

আমরা চাইলেই পদ্মা সেতুর দক্ষিণাঞ্চলে কিছু সরকারি অফিস (যেমন—বিআরটিএ) নিয়ে যেতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিমানবন্দর, আন্তর্জাতিক কনভেনশন হল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিশ্চয়ই আমরা নিতে পারি। এর ফলে ঢাকার ওপর বাড়তি নগরায়ণের চাপ কমবে।

পদ্মা সেতু আমাদের অহংকার ও মর্যাদার প্রতীক। বিশ্বাসের আত্মশক্তির প্রতীক। ‘আমরাও পারি’ আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। এই সেতুর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বের ছোঁয়া লেগে আছে। এই বন্ধন যুগে যুগে আরো পোক্ত হবে। বিরাট হবে। বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের এই দুঃসময়ে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার এক নয়া বার্তা দেবে বিশ্বকে। এই সংকটকালেও বসে নেই বাংলাদেশ। চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করার ক্ষমতা সে রাখে। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুকন্যার নান্দনিক নেতৃত্বের পরম্পরায় গড়ে ওঠা পদ্মা সেতু অমর হোক।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও সাবেক গভর্নর,

বাংলাদেশ ব্যাংক

 



সাতদিনের সেরা