kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

নতুন শিক্ষাক্রম ও শিক্ষকের ভূমিকা

সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক

২৪ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নতুন শিক্ষাক্রম ও শিক্ষকের ভূমিকা

২০২৩ সালে যে নতুন শিক্ষাক্রম আসছে তাতে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন দেখব বলে আমরা আশা করছি সেটা হলো শিক্ষার কেন্দ্র পরিবর্তন। আমাদের বর্তমান শিক্ষককেন্দ্রিক শিখন-শেখানো পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়ে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পদ্ধতিতে পরিণত হবে। যেহেতু দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভেঙে এই কেন্দ্র পরিবর্তনের কাজটি করতে হবে, কাজটা অসাধ্য না হলেও দুঃসাধ্য। কেন এই কঠিন কাজটা আমাদের করতেই হবে, তার বহু তাত্ত্বিক কারণ আছে, তবে ক্ষুদ্রায়তনের এই লেখায় আমরা শুধু চমস্কির তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করব।

বিজ্ঞাপন

তার আগে আচরণবাদ নিয়ে একটু আলোচনা করা প্রয়োজন। কারণ বিখ্যাত আচরণবাদী বি এফ স্কিনারের বই ‘ভার্বাল বিহেভিয়ার’-এর রিভিউ লিখতে গিয়েই নোম চমস্কি ইনেটিজমের কথা বলেছিলেন।

আচরণবাদীরা মনে করেন, মানুষ যেহেতু জন লকের ‘ট্যাবুলা রাসা’ বা শূন্য মন নিয়ে জন্মায়, তাকে সব কিছু অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই শিখতে হয়। সে যদি কোনো বিষয় বারবার শুনতে থাকে, বলতে থাকে, পড়তে থাকে, করতে থাকে, দেখতে থাকে, শুঁকতে থাকে, স্বাদ নিতে থাকে এবং স্পর্শ করতে থাকে, তাহলে একসময় সেটা তার মনে স্থায়ী একটা জায়গা করে নেয় এবং তখনই বলা যায় যে সে বিষয়টা শিখেছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষককে অবশ্যই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে হয়, কারণ তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি, যিনি নিশ্চিত করতে পারেন যে তাঁর শিক্ষার্থী যা বারবার শুনছে, বলছে, পড়ছে, করছে, দেখছে, তা নির্ভুল। এখানে শোনা, বলা, পড়া, করা ও দেখার বিষয়টা নির্ভুল হওয়াটা জরুরি, কারণ বিষয়গুলো ভুল হলে শিক্ষার্থী ভুলই শিখবে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী শিক্ষার্থী তার মস্তিষ্কে বা মনে এমন কোনো ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় না যা দিয়ে সে ভুল/শুদ্ধ নির্ণয় করতে পারে। অর্থাৎ আচরণবাদ অনুযায়ী যেহেতু কেবল অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই মানুষ শেখে, শিক্ষক যেভাবে যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাবেন, শিক্ষার্থী ঠিক সেভাবে এবং ঠিক তাই শিখবে। এই বিষয়ে আচরণবাদের স্রষ্টা ওয়াটসনের বহুল আলোচিত দাবিটা ছিল এমন যে তিনি যে কাউকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ পেলে তাকে যেকোনো রূপে রূপান্তর করতে পারবেন; বার্নার্ড শর হিগিনস যেমন বস্তির মেয়ে ইলাইজাকে ডাচেসের মতো কথা বলতে শিখিয়েছিলেন তেমন।

অর্থাৎ আচরণবাদে মানুষের মেধা, মনন, সামর্থ্য, বিশ্বাস, আদর্শ, আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি ইত্যাদির ভূমিকা নেই। কারণ এগুলো বিষয়গত; এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বাহ্যিক আচরণ এবং তার নিয়ন্ত্রণ। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন শিক্ষার্থীর কাঙ্ক্ষিত আচরণ তৈরি এবং তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষকের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আমাদের এখন যে মুখস্থনির্ভর শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা সেটা মূলত আচরণবাদ দ্বারাই প্রভাবিত। ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে আচরণবাদী তত্ত্বকে প্রধান আঘাতটি করেন নোম চমস্কি। তিনি বললেন, মানুষ কেবল অভিজ্ঞতা দিয়ে শেখে না। তার প্রমাণ হচ্ছে শিশুরা এমন অনেক শব্দ/বাক্য গঠন করে, যা কখনো কোথাও অন্য কোনো মানুষ গঠন করেনি। যেমন—অনেক শিশু ইংরেজি ‘স্লিপ’ শব্দের অতীত কাল হিসেবে ‘স্লেপ্ট’ ব্যবহার না করে নিজে নিজে ‘স্লিপ্ট’ শব্দটি ব্যবহার করে, যা সে আগে কখনো শোনেনি। শুধু শব্দ/বাক্য নয়, মানুষ তার মস্তিষ্কের কম্বিনেটরিয়াল প্রগ্রাম দিয়ে সীমিতসংখ্যক অভিজ্ঞতার পারমুটেশন কম্বিনেশন করে অসংখ্য ধরনের আচরণ করতে পারে। সেই বাক্য বা আচরণ অর্থহীন হতে পারে, কিন্তু একটা প্যাটার্নের বাইরে যায় না। যেমন—এ ধরনের বাক্যের ক্ষেত্রে চমস্কির বিখ্যাত উদাহরণ হচ্ছে, ‘কালারলেস গ্রিন আইডিয়াজ স্লিপ ফিউরিয়াসলি’। বাক্যটি অর্থহীন কিন্তু ব্যাকরণসম্মত। মানুষ ব্যাকরণের বাইরে যেতে পারে না, কারণ পৃথিবীর সব মানুষ ব্যাকরণের কিছু বিশ্বজনীন ধারণা নিয়েই জন্মায়। অর্থাৎ ব্যাকরণের একটা অংশের ধারণা মানুষ জন্মগতভাবেই পায় এবং তা দ্বারাই পরিচালিত হয়। ব্যাকরণের মতো জিনবাহিত আরো অনেক বিষয় আছে, যা মানুষের জন্মগত অর্জন।

চমস্কির এই তত্ত্বটি এখনকার কগনিটিভ ও জিন বিজ্ঞান আরো ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে এটা এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য মানুষ জন্মের সময় শূন্য মন নিয়ে জন্মায় না। সে অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু সরাসরি শেখে বটে; কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত অনেক উপাত্তের ওপর তার নিজের কম্বিনেটরিয়াল প্রগ্রামিং প্রয়োগ করে সে অনেক নতুন জ্ঞান, ধারণা ও বাস্তবতা তৈরি করে। হয়তো এ জন্যই পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক সক্রেটিস প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে তাঁর প্রবল বোধশক্তি দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন যে একজন শিক্ষক আসলে শিক্ষার্থীকে কিছু শেখাতে পারেন না, কারণ শিক্ষার্থী আগেভাগেই সব জেনে বসে আছে, সে কেবল জানে না যে সে জানে। শিক্ষকের দায়িত্ব হচ্ছে তাকে জানানো যে সে জানে।

এ কারণেই শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা এখন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক। শিক্ষার যে তিনটি মূল উৎস—অভিজ্ঞতা, জিন এবং কম্বিনেটরিয়াল প্রগ্রাম, তার ভেতর মূলত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে শিক্ষক শিক্ষার্থীকে কিছুটা সাহায্য করেন। তবে গুগল ও সোশ্যাল মিডিয়ার দাপট বাড়ায় ওই ক্ষেত্রটাও সীমিত হয়ে আসছে। তাহলে কি শিক্ষক শেষ পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবেন? তিনি যদি জ্ঞানদান করার কাজেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন, তাহলে যাবেন। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবার হাতের নাগালে চলে এলে মানুষকে জ্ঞানের জন্য আর কারো কাছে যেতে হবে না।

কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক হয়ে গেলেও এমন কিছু বিষয় আছে যেখানে শিক্ষকের ভূমিকা বাড়বে। শিক্ষার যে তিনটি মূল উৎসর কথা বলা হলো—অভিজ্ঞতা, জিন ও কম্বিনেটরিয়াল প্রগ্রাম, সেখানে শিক্ষকের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে শিক্ষার্থী যেন সঠিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় সেই ব্যবস্থা করে দেওয়া; এ ক্ষেত্রে ভুল হলে শিক্ষার্থীর বিপথে চলে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা আছে। শিক্ষকের দ্বিতীয় দায়িত্ব হচ্ছে, শিক্ষার্থীর জিনবাহিত সহজাত ক্ষমতাকে চিহ্নিত করা; বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর জন্মসূত্রে পাওয়া এই সহজাত ক্ষমতা চিহ্নিত হয় না বলেই তাদের মেধা শেষ পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত ও অবিকশিত থেকে যায়। শিক্ষকের তৃতীয় দায়িত্ব হচ্ছে শিক্ষার্থীকে তার মস্তিষ্কের কম্বিনেটরিয়াল প্রগ্রামের কথা বারবার মনে করিয়ে দেওয়া; সে যে চাইলে সেই প্রগ্রাম ব্যবহার করে সৃষ্টিশীলতা, সূক্ষ্মচিন্তনদক্ষতা ও নৈতিকতার মতো আরো নানা ধরনের সফট স্কিল নিজেই আয়ত্ত করতে পারে, তার ভেতর সেই আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দেওয়া।

মোটকথা, ২০২৩ সাল থেকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক হওয়া শুরু হলেও শিক্ষকদের ভূমিকা কিন্তু কমছে না, বরং বাড়ছে। শিক্ষকরা যদি শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ার কেন্দ্র থেকে নিজেদের সরিয়ে এনে শিক্ষার্থীদের সেখানে স্থাপন করতে পারেন এবং ওপরে যে দায়িত্বগুলোর কথা উল্লেখ করা হলো সেগুলো যদি সঠিকভাবে পালন করতে পারেন, কেবল তাহলেই আমরা শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে পারব। সেটাই গুণগত শিক্ষা অর্জনের একমাত্র পথ।

 লেখক : মাউশি ও নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক



সাতদিনের সেরা