kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যনীতি প্রয়োজন

নূরে আলম সিদ্দিকী

২৪ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যনীতি প্রয়োজন

বর্তমান বিশ্বে পরিবেশদূষণ, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ, প্লাস্টিক বর্জ্য অত্যন্ত আলোচিত বিষয়। বিষয়গুলো পরিবেশসচেতন মানুষ ও বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের কারণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা যেসব উদ্বেগের কথা অনেক আগে থেকে বলে এসেছেন, সেসবই আজ বাস্তব হয়ে ধরা দিচ্ছে। হঠাৎ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ঋতু পরিবর্তন, অগ্নিকাণ্ডে বনভূমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে চলে এসেছে। অনেক প্রজাতির পশু-পাখি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে। এ সবই এক ভয়াবহ আগামীর ইঙ্গিত করছে।

শিল্প বিপ্লব-পূর্ব যুগে মানুষের ভোগের চাহিদা এতটা ব্যাপক, সর্বজনীন আর বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল না। তখন বেশির ভাগ মানুষ অতি বিলাসদ্রব্যের চাহিদা পূরণের চেয়ে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণকেই প্রাধান্য দিত এবং এই চাহিদাগুলোর বেশির ভাগই স্থানীয় উৎস থেকে পূরণ করার চেষ্টা করা হতো। এর পরও অনেক পণ্য ও খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ছিল, যা বর্তমান সময়ের মতো এতটা ব্যাপক ছিল না। কিন্তু শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী যুগে নিত্যনতুন ভোগ্যপণ্য আর বিলাসদ্রব্যের উদ্ভাবন, উৎপাদন ও উন্নয়ন মানুষকে বৈচিত্র্যময় ভোগবাদিতার দিকে ঠেলে দেয়, যার ব্যাপ্তি প্রতিনিয়তই সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে নিত্যনতুন কলকারখানা তৈরি হয়েছে এবং এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণও বেড়ে চলেছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রধান কারণই হচ্ছে কার্বন নিঃসরণ। সেই কার্বনের প্রধান উৎস হচ্ছে কলকারখানার ধোঁয়া। বিশ্বের মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ বেশির ভাগ কলকারখানার মালিক অথবা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। কলকারখানাগুলোতে একদিকে যেমন অতিপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে, একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে অতি উচ্চমূল্যের বিলাসদ্রব্য, যেগুলোর ভোক্তা পৃথিবীর খুব অল্পসংখ্যক মানুষ। কাজেই এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে বাণিজ্য-বিনিয়োগনীতির মৌলিক কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশদূষণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগনীতিতে কিছু পরিবর্তন বৈশ্বিক উষ্ণতাজনিত পরিবেশ বিপর্যয় অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে। এই নীতি বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও বেসরকারি খাতের যেমন ভূমিকা আছে, তেমনি সরকারেরও ভূমিকা আছে। সরকারগুলো তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কলকারখানা প্রভৃতিতে জ্বালানির উৎস হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রাধান্য দেবে এবং সেই সঙ্গে হ্রাসকৃত শুল্কে, প্রণোদনার মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান করতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ, সৌরশক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত পরিবেশবান্ধব সোলার প্যানেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত সব ধরনের কাঁচামাল আমদাদিতে শুল্ক ও বাণিজ্যিক বাধা দূর করে বাণিজ্যিক উদারীকরণের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারে উৎসাহ সৃষ্টি করা যায়। এ লক্ষ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে।

অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের কারণে মহাসমুদ্রের জীববৈচিত্র্য আর কোরাল রিফ আজ হুমকির সম্মুখীন। সারা বিশ্বে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার বা তার সমপরিমাণ অর্থ সরকারিভাবে ব্যয় করা হয়, যেগুলো অতিরিক্ত মৎস্য আহরণকে উৎসাহ কিংবা সহায়তা প্রদান করে এবং যা ওশেনিক ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করছে।

জি-টোয়েন্টিভুক্ত দেশগুলো বিশ্ব জিডিপির শতকরা ৮৫ ভাগ ধারণ করে এবং বিশ্বের কার্বন নিঃসরণ এর শতকরা ৮০ ভাগ এই দেশগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। আর এ কারণেই নৈতিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এবং আন্তর্জাতিক আইনেও সেসব দেশ পরিবেশ রক্ষায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ড গঠনে বাধ্য। তবে বর্তমানে যা করা হচ্ছে তা ক্ষতির তুলনায় খুবই সামান্য।

গবেষণা আর ইনোভেশনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে নতুন ধরনের গ্রিন এনার্জি আবিষ্কৃত হয়। একই সঙ্গে এমন প্রযুক্তি আবিষ্কার করা হয় যেখানে কলকারখানাগুলো অপেক্ষাকৃত কম জ্বালানিনির্ভর হয়। এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি কার্বন নিঃসরণের শতকরা ২ ভাগের জন্য দায়ী। এগুলোও ইনোভেশনের মাধ্যমে তা কমিয়ে আনতে হবে।

বিদ্যুৎ, বায়ু ফুয়েল ও হাইড্রোজেনচালিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে টেসলা, বিএমডাব্লিউ, ফোকসভাগেন আর হোন্ডার মতো অন্য কম্পানিগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বেশির ভাগ গাড়ি হবে বিদ্যুৎ ও হাইড্রোজেনচালিত। আর এভাবেই নতুন প্রযুক্তির উৎকর্ষের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বনের পরিমাণ অনেকটা কমে যাবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংরক্ষণের আরো নতুন ও কার্যকর কৌশল আবিষ্কার করতে হবে।

প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় পরিবেশদূষণের কারণে। আর পরিবেশদূষণের প্রধান কারণ হচ্ছে মানহীন শিল্পায়ন আর অপরিকল্পিত নগরায়ণ। কাজেই পরিকল্পিত নগরায়ণ, দূষণমুক্ত কলকারখানা স্থাপন আর নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। সীমাহীন ভোগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মানবজাতির অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া যাবে না। আর এ জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আর কঠোর পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যনীতির বাস্তবায়ন।

 লেখক : পরিবেশবিষয়ক লেখক



সাতদিনের সেরা