kalerkantho

শুক্রবার । ১ জুলাই ২০২২ । ১৭ আষাঢ় ১৪২৯ । ১ জিলহজ ১৪৪৩

করোনার নতুন ঢেউ : সতর্ক হতেই হবে

ডা. কামরুল হাসান খান

২১ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনার নতুন ঢেউ : সতর্ক হতেই হবে

দুই-তিন মাস ধরে বিশ্বব্যাপী ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে করোনার নতুন ঢেউ দেখা যাচ্ছে। অনেক দেশ এরই মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। কিন্তু নতুন করে আবার সংক্রমণ বেড়ে চলেছে বাংলাদেশে এবং পাশের দেশ ভারতে।

বাংলাদেশে গত ২০ জুন সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৮৭৩ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং এ সময় দেশে আট হাজার ২৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এ সময় করোনায় কারো মৃত্যু হয়নি। পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ১০.৮৭ শতাংশ।

এর আগে সর্বশেষ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি করোনা শনাক্তের হার ছিল ৫.৪৮। এরপর ক্রমাগত এই হার নিচের দিকে নামতে থাকে। কমতে থাকে শনাক্তের সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারণ করা মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো দেশে রোগী শনাক্তের হার টানা দুই সপ্তাহের বেশি ৫ শতাংশের নিচে থাকলে করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরা হয়। এ হিসাবে বাংলাদেশে পুরোপুরি করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ছিল।

গত শনিবার ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে ২০, রাজশাহী ও সিলেটে একজন করে করোনা শনাক্ত হয় এ সময়। অন্য বিভাগগুলোতে কোনো সংক্রমণ দেখা যায়নি। সংক্রমণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ১৯ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছে ১৯ লাখ পাঁচ হাজার ৭৫৮ জন। আর মৃত্যু হয়েছে ২৯ হাজার ১৩১ জনের।

বাংলাদেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৮ মার্চ। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে করোনার সংক্রমণের চিত্রে কয়েক দফা ওঠানামা করতে দেখা গেছে। করোনা পরিস্থিতি প্রায় সাড়ে তিন মাস নিয়ন্ত্রণে থাকার পর গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের প্রভাবে দ্রুত বাড়তে থাকে রোগী শনাক্ত ও শনাক্তের হার।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে নিয়মিতভাবে রোগী শনাক্ত ও শনাক্তের হার কমেছে। দেশে সংক্রমণ কমে আসায় আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে। তুলে নেওয়া হয়েছে করোনাকালীন বিধি-নিষেধ। গত ২৫ মার্চ থেকে ১২ জুন পর্যন্ত দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১০০-এর নিচে ছিল।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ অনেকটা সীমিত আকারে আছে। সে কারণে সবাইকে সতর্ক হয়ে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। গত দুই বছরে বিশ্বব্যাপী করোনার তাণ্ডবে জীবন, অর্থনীতি, শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা পুনরায় করতে দেওয়া যাবে না। তাহলে আমরা নতুন করে কোনো বিপর্যয় পুষিয়ে নিতে পারব না। বিগত দুই বছরে আমরা অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, মানুষ সচেতন হয়েছে। তাই আমাদের সবার দায়িত্ব হবে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথ মেনে চলে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবনযাপন পরিচালিত করা। অন্যদিকে আগাম বন্যার ভয়াবহতায় দেশের বিরাট অংশের জনজীবন বিপর্যস্ত। বিগত দুই বছরে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে গিয়ে মানুষ অনেকটাই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। এ সময় যদি আবার নতুন করে করোনা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে তাহলে মানুষের আর দুঃখের সীমা থাকবে না। সে কারণে সময় থাকতে সবাই মিলে সতর্কতা অবলম্বন করে করোনা সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে। পাশাপাশি পাশের দেশ ভারতেও করোনা সংক্রমণ নতুন করে বেড়ে চলেছে। গত শনিবার নতুন সংক্রমণ হয়েছে ১৩ হাজার ২১৬ জনের এবং মৃত্যুবরণ করেছে ২৩ জন। যেহেতু করোনাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে, দেশ থেকে দেশে সংক্রমণ ছড়ায়, তাই আমাদের সব দিক বিবেচনায় রাখতে হবে। আবার সামনেই আছে কোরবানির ঈদ, সেটি বিবেচনায় রেখে এখন থেকে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।  

এ সময়ের করণীয়

১. স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা : সব ক্ষেত্রে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা। ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ নীতি প্রয়োগসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য জনসাধারণকে আবারও উদ্বুদ্ধ করার জন্য সব গণমাধ্যমকে যুক্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সক্রিয় করা। প্রয়োজনে হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। ধর্মীয় প্রার্থনার স্থানে (যেমন—মসজিদ, মন্দির, গির্জা ইত্যাদি) সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

২. করোনা পরীক্ষা : করোনা পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোকে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে পর্যাপ্ত পরীক্ষা করা যায়। এ সময় বাংলাদেশে যেহেতু জ্বর, সর্দি-কাশি সাধারণত লেগে থাকে, সেহেতু মানুষের মধ্যে করোনা পরীক্ষা না করার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এ ধরনের উপসর্গ যাদের আছে তাদের সবাইকে করোনা পরীক্ষা করতে হবে। করোনা কিন্তু অগোচরে মৃত্যুর দিকে টেনে নেয়।

৩. বন্দর নিয়ন্ত্রণ : করোনা আক্রান্ত দেশের যাত্রীদের অবশ্যই সব বিমান, নৌ, স্থলবন্দরে নজরদারিতে রাখতে হবে। প্রয়োজনে পরীক্ষা করে আলাদা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।

৪. হাসপাতালের প্রস্তুতি : অক্সিজেন, আইসিইউসহ হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখতে হবে, যাতে রোগী বেড়ে গেলে তাত্ক্ষণিক ভর্তির ব্যবস্থা করা যায়।

৫. করোনার টিকা গ্রহণ : যারা এখনো টিকা গ্রহণ করেনি তারা যেন দ্রুত টিকা গ্রহণ করে। বিনা মূল্যে সরকারের টিকা প্রদানের সুযোগকে যেন আমরা নিজের জীবন রক্ষা করতে সদ্ব্যবহার করি।

৬. সমন্বয় : সরকারের সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় স্থাপন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে।

৭. কোরবানির ঈদ : সামনেই রয়েছে কোরবানির ঈদ। যাত্রীদের ঘরে ফেরা, পশুর হাট, শপিং মল, বাজার সবই করোনা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার মধ্যে থাকতে হবে, যাতে করোনা সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে না পড়তে পারে।

বাংলাদেশে গত তিন দিন করোনা সংক্রমণ টানা ৫ শতাংশের ওপরে রয়েছে। তার মানে হচ্ছে সংক্রমণের নতুন ঢেউ শুরু হয়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, যুক্তরাষ্ট্রের করোনা নিয়ন্ত্রণের প্রধান পরামর্শক অ্যান্থনি ফাউচিসহ অনেক বিশ্বনেতাই নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তার মানে হচ্ছে করোনা দ্রুতই  আমাদের ছেড়ে যাবে না। কিন্তু আমরা বিশ্ববাসী গত দুই বছরে করোনা নিয়ন্ত্রণের যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে নিশ্চয়ই আমরা করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব, নির্মূল করতে পারব। সব যুদ্ধেই অবশেষে মানুষেরই জয় হয়—করোনাযুদ্ধেও তাই হবে। আমরা আর করোনা শৃঙ্খলিত জীবনে ফিরে যেতে চাই না, আর তা যদি সত্যিই চাই তাহলে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই হচ্ছে মুক্তির একমাত্র পথ।

 

 লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়  

 



সাতদিনের সেরা