kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ জুলাই ২০২২ । ২১ আষাঢ় ১৪২৯ । ৫ জিলহজ ১৪৪৩

নতুন শিক্ষাক্রম : প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা

সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক

২৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নতুন শিক্ষাক্রম : প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা

নতুন শিক্ষাক্রমে শিখন-শেখানোর বিষয় ও পদ্ধতি এমন হবে যেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা সহযোগিতার মনোভাব ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষায় উন্নত সব দেশেই এ বিষয়ে এখন বেশ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, কারণ বরেণ্য শিক্ষাবিদরা বেশ কয়েক দশক ধরে লক্ষ করছেন, শিক্ষাকে উন্নত করার অভিপ্রায়ে বেশির ভাগ অবিমৃশ্যকারী রাষ্ট্রে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থীতে, স্কুলে-স্কুলে প্রতিযোগিতার ভয়াবহ বীজ বপন করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে স্ট্যান্ডার্ডাইজড টেস্টের দাপটে এখন কে কাকে কতটা পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারবে, সবাই এই প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। এতে শুধু শিক্ষাবিদরা নন, প্রায় সব প্রগতিশীল চিন্তাবিদ উদ্বিগ্ন এই কারণে যে মানুষে-মানুষে যে সহযোগিতার কারণে মানবসভ্যতা এত দূর এগিয়েছে, স্কুলগুলোতে এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি হলে তা তো নস্যাৎ হবেই, এমনকি যে সভ্যতা নিয়ে আমাদের এত গর্ব তাও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষাবিদদের কথা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের প্রথমে যেটা বোঝাতে হবে সেটা হচ্ছে অন্য প্রাণীদের চেয়ে যে আমরা উন্নত সেটা যে শুধু আমাদের ‘হাত’ আর ‘বুদ্ধি’ আছে সে কারণে নয়। অন্য প্রাণীদের চেয়ে আমরা উন্নত, তার মূল কারণ হচ্ছে আমাদের পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করার মনোভাব ও ক্ষমতা। অন্য প্রাণীদেরও এই ক্ষমতা আছে, কিন্তু আমাদের চেয়ে অনেক কম। আমি যদি ইওভাল নোয়া হারারির কাল্পনিক উদাহরণটা দিই, তাহলে বিষয়টা আরো স্পষ্ট হবে। ধরুন, একটা নির্জন দ্বীপে আপনি একটা শিম্পাঞ্জি ও একজন মানুষকে রেখে এলেন। কয়েক দিন পর গিয়ে দেখবেন যে ওই শিম্পাঞ্জি মানুষটির চেয়ে অনেক ভালো আছে। কারণ সে মানুষটির চেয়ে অনেক ভালোভাবে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে। আপনি যদি এরপর ১০টি শিম্পাঞ্জি আর ১০ জন মানুষ ওই দ্বীপে রেখে আসেন, কিছুদিন পর গিয়ে আপনি সেই একই চিত্র দেখবেন, শিম্পাঞ্জিগুলো মানুষদের চেয়ে ভালো আছে। কিন্তু আপনি যদি এরপর ১০ হাজার শিম্পাঞ্জি আর ১০ হাজার মানুষ ওখানে রেখে আসেন, তাহলে দৃশ্যপট পাল্টে যাবে। দেখবেন এবার মানুষই সেখানে কর্তৃত্বের ভূমিকায়; শুধু শিপাঞ্জিরা নয়, পুরো দ্বীপটাই তাদের অধীন। এর কারণ হচ্ছে শিম্পাঞ্জিদের সহযোগিতা করার ক্ষমতা সীমিত আর মানুষের সেই ক্ষমতা অসীম। ১০টা শিম্পাঞ্জি হয়তো নিজেদের মধ্যে এই সহযোগিতার মনোভাব বজায় রাখতে পারে, কিন্তু সংখ্যাটা ১০ হাজার হয়ে গেলে তারা আর সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে না। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে সেটা ১০ হাজার কিংবা ১০ বিলিয়ন হোক, তাতে কিছু আসে-যায় না। এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

অবশ্য প্রতিযোগিতার সঙ্গে মানুষের বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার একটা সম্পর্ক আছে। কারণ বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা দিয়েই সে বোঝে প্রতিযোগিতা নয়, তার জন্য সহযোগিতাই মঙ্গল বয়ে আনে। যেমন—মানুষের বুদ্ধি বাড়ার কারণেই তার সহযোগিতা করার মনোভাব বেড়েছে এবং এ কারণেই পৃথিবীতে যুদ্ধের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেনের মতো ছোটখাটো দু-একটা যুদ্ধ যে হচ্ছে না তা নয়, কিন্তু বড় যুদ্ধ আর বহুদিন হয় না। মানুষ সামষ্টিকভাবে বোকা হলে যে তার সহযোগিতা করার মনোভাব কম থাকে, সেটা প্রিজনার্স ডিলেমা নামের একটা গেম ব্যবহার করে অর্থনীতিবিদ গ্যারেট জোনস প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। গেমটা এ রকম।

ধরা যাক, দুজন মিলে একটা অপরাধ করেছে। দুজনকে গ্রেপ্তার করে একটা জেলের একেবারে আলাদা দুটি সেলে রাখা হলো। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে খুব শক্ত প্রমাণ নেই। যদি তারা নিজেদের দোষ স্বীকার করে বা একে অন্যের বিরুদ্ধে বলে, তাহলে তাদের শাস্তি দেওয়া যায়। এ জন্য তাদের একটা প্রস্তাব দেওয়া হলো : যদি একজন অন্যজনের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয় এবং অন্যজন যদি তার বিরুদ্ধে কিছু না বলে, অর্থাৎ অন্যজন যদি প্রথমজনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায়, তাহলে প্রথমজনকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং দ্বিতীয়জনকে ১০ বছরের জেল খাটতে হবে। ঘটনাটা অন্যভাবেও ঘটতে পারে। দেখা গেল, দুজনই দুজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিল। সে ক্ষেত্রে দুজনেরই জেল হবে, তবে শাস্তির সময় কমে ছয় বছর হবে। কিন্তু যদি এমন হয় যে দুজনেরই সহযোগিতার মনোভাব আছে; কেউ কারো বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিল না। সে ক্ষেত্রে তাদের দুজনেরই মাত্র ছয় মাসের জেল হবে।

এ ক্ষেত্রে একেবারে সাধারণ বুদ্ধির একজন মানুষ অন্যের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে চাইবে। কারণ সে হিসাব করবে যদি সে অন্যের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়, তাহলে কম করে হলেও তার চার বছরের জেল মাফ হবে। আর যদি অন্যজন তাকে সহযোগিতা করতে চায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা, পুরো ১০ বছরই মাফ। অন্যপক্ষে সে যদি সহযোগিতা করে, তাহলে কমপক্ষে তাকে ছয় মাস জেল খাটতে হবে; আর যদি ভাগ্য খারাপ হয় এবং সেটা হওয়ার আশঙ্কাই বেশি, অর্থাৎ অন্যপক্ষ যদি তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়, তাহলে তাকে ১০ বছর জেল খাটতে হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত যেটা হবে সেটা হলো দুজনই দুজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে, কেউ কারো বিরুদ্ধে সহযোগিতা করবে না।

আমাদের ট্র্যাজেডি হচ্ছে, আমরা এখনো অনেকে মনে করছি একজন ব্যক্তির তখন সবচেয়ে বেশি লাভ হয় যখন সে অন্যকে ফাঁসিয়ে দেয়, আরেকজন ব্যক্তির সবচেয়ে ক্ষতি হয় তখন যখন সে অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায়। ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে বিষয়টা কিছুটা সত্যি হলেও বুদ্ধির ঘাটতি থাকার কারণে আমরা বুঝি না যে সামষ্টিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভ হয় তখন যখন দুজন দুজনকে সহযোগিতা করে এবং সামষ্টিকভাবে সবচেয়ে ক্ষতি হয় তখন যখন দুজন দুজনের বিরুদ্ধে কথা বলে। স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের সামষ্টিকভাবে চিন্তা করতে শেখানো হয় না বলেই তারা বড় হয়ে ব্যক্তিগত লাভের জন্য স্বার্থপরের মতো আচরণ করে সামষ্টিক ক্ষতি করে এবং এতে আখেরে তাদের নিজেদেরও ক্ষতি হয়।

তবে মানুষ বারবার এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেলে বিষয়টা নিশ্চয়ই বুঝবে। আর বুদ্ধি থাকলেও যে সে বোঝে সেটারও প্রমাণ জোনস তাঁর গবেষণায় পেয়েছেন। তিনি ১৯৫৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিচালিত প্রিজনার্স ডিলেমার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখলেন যে স্কুলের গড় আইকিউ যত ভালো সেই স্কুলের শিক্ষার্থীরা তত সহযোগিতামূলক মনোভাব পোষণ করে। এ রকম আরেকটা পরীক্ষা করেছিলেন আরেকজন অর্থনীতিবিদ স্টেফান বার্কস। সেখানেও দেখা গেল এক হাজার প্রশিক্ষণার্থী ট্রাক ড্রাইভারের মধ্যে যাদের আইকিউ ভালো তারা প্রায় সবাই প্রতিযোগিতা এড়িয়ে সহযোগিতা করতে চায়।

আশার কথা হচ্ছে, আমাদের নতুন শিক্ষাক্রম বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এখানে সহযোগিতার মতো সফট স্কিল শেখানোর জন্য প্রকল্পভিত্তিক অভিজ্ঞতামূলক শিখন-শেখানো কার্যক্রমের কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা চর্চা করার সুযোগ পাবে এবং সেই সব অভিজ্ঞতা দিয়ে সহযোগিতার গুরুত্ব উপলব্ধি করবে। একই সঙ্গে বিষয়টি তারা যেন তাদের সূক্ষ্মচিন্তন দক্ষতা দিয়েও বুঝতে পারে, নতুন শিক্ষাক্রমে নিশ্চয়ই সেই ব্যবস্থা থাকবে। এখন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এই বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দেবেন তার ওপর নির্ভর করবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানুষরা পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পিছিয়ে পড়বে, না পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করে এগিয়ে যাবে।

 

 লেখক : মাউশির সাবেক মহাপরিচালক

 



সাতদিনের সেরা