kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

নজরুলের রাজনৈতিক সচেতনতা

সৌমিত্র শেখর

২৫ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নজরুলের রাজনৈতিক সচেতনতা

পরিচয় আর বন্ধুত্বই সব, রাজনৈতিক সচেতনতা বলে কিছু নেই, এটি মানতেন না কাজী নজরুল ইসলাম। একসময় রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই সংযুক্তির কারণে বিভিন্ন জায়গায় তিনি ছুটে গেছেন। কিন্তু খুব বেশিদিন তিনি রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ কর্মী বা সদস্য হিসেবে সংযুক্ত ছিলেন না। যত দিন স্বাভাবিকভাবে বেঁচে ছিলেন, তত দিন তিনি আমাদের সামনে একজন উন্নত শির রাজনীতিসচেতন ‘যুগপুরুষ’ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে এসেছেন।

বিজ্ঞাপন

যৌবনের একেবারে সূচনায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এক পক্ষ মিত্রবাহিনী, তার সদস্য ব্রিটিশদের সেনাবাহিনীতে নজরুল যে যোগ দিলেন এবং করাচিতে পৌঁছলেন, তার পেছনে কারণ আছে। অনেকে মনে করেন, ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণ আর নিশ্চিন্ত কিছু দিনযাপনের জন্য অনিকেত নজরুল হাবিলদার নজরুল হয়েছিলেন। আদতে তা নয়। শুধু পেটের ভাত জোগাড় করার জন্য তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেননি। এখানেও ছিল তাঁর রাজনৈতিক মনস্কতা। সেই সময়টিই ছিল রাজনীতির। ১৯০১ সালে তরুণ বিপিনচন্দ্র পাল ইংল্যান্ড থেকে ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন আর রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যান। বিলেতফেরত বিপিন পালের রাজনীতিতে সংযুক্ত হওয়া ওই সময় তরুণদের ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৯০২ সালে ব্রিটিশবিরোধী ‘অনুশীলন’ দলের প্রতিষ্ঠা হয় আর সেখানে যুবকরা শরীরচর্চার নামে স্বদেশমুক্তির স্বপ্ন দেখতে থাকে। ‘অনুশীলন’ দলের কার্যক্রম এতটাই বিস্তৃতি পেয়েছিল যে তরুণ ছাত্র-ছাত্রীরা এই সংগঠনের ছায়াতলে খুব দ্রুতই সংযুক্ত হয়েছিল। ১৯০৫ সালে হয় বঙ্গভঙ্গ। বঙ্গভঙ্গের আগে বাংলার রাজনীতি খুবই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমানের পারস্পরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকে না। জন্ম হয় অবিশ্বাসের। পরের বছরই প্রতিষ্ঠা পায় মুসলিম লীগ এবং তারা বঙ্গভঙ্গ যাতে টিকে থাকে, সে জন্য সোচ্চার হয়। অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গবিরোধী শক্তি জোটবদ্ধ হতে থাকে আর তাদের আন্দোলন হয়ে ওঠে তীব্রতর।

‘অনুশীলন’-এর মতো আরেকটি দল ‘যুগান্তর’ প্রতিষ্ঠা পায় ১৯০৬ সালে। বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ ১৯০৭ সালে বন্দে মাতরম্ নামে পত্রিকা বের করে স্বাদেশিকতার বাণী প্রচার করতে থাকেন। পরের বছর বোমা মামলায় অরবিন্দ ঘোষকে দণ্ড প্রদান করেন ইংরেজদের আদালত। বঙ্গভঙ্গবিরোধীদের আন্দোলন আর চাপে ১৯১১ সালে রদ হয় বঙ্গভঙ্গ। ১৯১২ সালে ব্রিটিশরা ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে নিয়ে যায় দিল্লিতে। এমন রাজনৈতিক উত্তেজনাকালে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ সালে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় ১৯১৮ সালের নভেম্বরে। এ সময় কাজী নজরুল ইসলাম তরুণ থেকে সদ্য যৌবনে পা রাখছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নজরুলের মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল এবং তিনি এই বোধে জারিত হয়েছিলেন যে যুদ্ধ ও হানাহানি দিয়ে মানবমুক্তি সম্ভব নয়। তিনি এটিও মনে করেছেন, ধর্মীয় বিভেদ বজায় রেখে সামনে অগ্রসর হওয়া যায় না।

নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নি-বীণা’ প্রকাশ পায় ১৯২২ সালে। এই গ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেছেন বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে। মানুষের প্রথম কাব্যগ্রন্থ বা প্রথম প্রকাশিত বই সাধারণত যেখানে তারা উৎসর্গ করে মা-বাবা বা প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা নিকটাত্মীয়দের, সেখানে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেন অগ্নিযুগের বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে, যাঁর নামে ব্রিটিশরা নানা ধরনের মামলা দিয়ে রেখেছে এবং যিনি মূলত ওয়ান্টেড পারসন হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। এটিও কাজী নজরুল ইসলামের সাহস ও রাজনৈতিক সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি প্রথম জীবনে খুব বেশি করে ইংরেজবিরোধী কবিতা ও গদ্য রচনা করেছেন।

আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা লেখার দায়ে তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছে। তিনি জেলখানায় বসে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’র মতো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। সেই ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’তে প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি প্রয়োগ করে নিজের রাজনৈতিক সচেতনতা প্রকাশ করেছেন এবং জানিয়ে দিয়েছেন দেশমাতৃকার জন্য তিনি লড়াই করছেন আর দেশমাতৃকার জন্য লড়াই করতে গিয়ে সারা পৃথিবীতে অনেকেই নির্যাতিত হয়েছেন। ফলে তিনিও নির্যাতনকে ভয় করেন না। ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যগ্রন্থে কামাল পাশা বলে একটি কবিতা আছে, যেখানে কামাল আতাতুর্ককে নায়ক করে তাঁর অনুসারীদের বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এ থেকে  বোঝা যায়, যে কামাল আতাতুর্ক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করেছেন, সেই আদর্শকে নজরুল ধারণ করতেন। ধর্মনিরপেক্ষতা যে মানবজাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার, নজরুল সেটি বুঝেছিলেন। ভারতবর্ষের মানুষ যেখানে ধর্মের নামে বিভক্ত, সেখানে তিনি ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া’ বলেছেন। এই উচ্চারণ করতে পারার ফলে বোঝাই যায়, কাজী নজরুল ইসলাম কতটা অগ্রবর্তী চিন্তার মানুষ ছিলেন, যে মানুষ মূলত রাজনৈতিক সচেতনতা ও তার ওপর আস্থা রেখে সমাজ প্রগতির কথা ভেবেছেন।

করাচি থেকে ফিরে এসে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বন্ধু কমিউনিস্ট মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস করেছেন। মানুষে-মানুষের মিলন, ধনী-গরিবের সমতা আনয়ন, নারী-পুরুষের অধিকার সমান করার চেষ্টা—এসবই নজরুলের মনে প্রথম থেকেই ছিল। কমিউনিস্টরা এ কথাগুলোই বলেন। তার পরও কাজী নজরুল ইসলাম কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য হননি।

এমন হতে পারত, তিনি আবেগের বশে অল্পদিনের জন্য বন্ধুর অনুরোধে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছেন, কিন্তু তিনি তা হননি। তাহলেই বোঝা যায়, রাজনৈতিক ব্যাপারটি শুধুই আবেগের বিষয় নয়, সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তিনি নিজে সাম্যবাদ চেয়েছেন বটে, কিন্তু তা মার্ক্সীয় সাম্যবাদ নয়। মার্ক্সীয় সাম্যবাদ থেকে নজরুলের সাম্যবাদী চিন্তা অনেকটাই পৃথক। এই পৃথকতা নজরুল ভালো করে বুঝতেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি সচেতন ছিলেন বলেই এই সূক্ষ্ম পার্থক্য তাঁকে আলাদা করে বুঝিয়ে দেওয়ার দরকার ছিল না। তাই বন্ধু মুজফ্ফর আহমদের অনুরোধ অথবা আবেগ অথবা অল্প কয়েক দিনের জন্য ইত্যাদি কারণের পরিপ্রেক্ষিতে নজরুল কমিউনিস্ট পার্টিতে অল্পদিনের জন্য হলেও যোগদান করেছেন—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। নজরুল বরং যোগদান করেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ দলে, যে দলের মূলকথাই ছিল নিজের দেশের, বিশেষ করে নিজের দেশের বাঙালি জাতির যা কিছু ঐশ্বর্য ও সম্পদ, সেগুলোর ওপর ভিত্তি করেই দেশে স্বরাজ বা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা।

কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালির ওপর খুব বেশি করে আস্থাশীল ছিলেন এবং তিনি চাইতেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পাশাপাশি বাঙালির মুক্তি ত্বরান্বিত হোক। কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধটিতে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা তিনি কামনা করেন। সেই প্রবন্ধে তিনি এটিও বলেছেন, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যদি এসে যায়, তাহলে বাঙালিদের কি খুব বেশি সুবিধা হবে? তিনি দেখিয়েছেন ভারতবর্ষের মধ্যেও বাঙালিরা রামা অর্থাৎ রামভক্ত মাড়োয়ারি এবং গামা অর্থাৎ পাঞ্জাবিদের শোষণের পাত্র হয়ে আছে। মূলত অবাঙালিদের দ্বারা ভারতবর্ষের মধ্যেও শোষিত হয়ে আসছে বাঙালিরা। তাই নজরুল বলেছেন, ধনঞ্জয়ের মতো পিটুনি দিয়ে বাঙালির বাসস্থান থেকে বা বাংলা অঞ্চল থেকে অবাঙালিদের তাড়িয়ে দিতে হবে। এ কথাগুলো নজরুল যখন বলছিলেন, তার অল্প কিছুদিন পরেই তিনি মূলত অসুস্থ হয়ে যান এবং এরপর তিনি আর স্বাভাবিক হননি। এটি মূলত স্বাধীনতার স্বপ্ন। ১৯৪২ সালে কাজী নজরুল ইসলাম যে স্বাধীনতার স্বপ্নটুকু দেখেছিলেন, এটি তাঁর রাজনৈতিক সচেতন ও তার বহিঃপ্রকাশ। নজরুল যে পত্রিকাগুলো সম্পাদনা করতেন বা যেগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন, সেগুলোর নামও রাজনৈতিক সচেতনতা থেকেই নির্ধারিত হয়েছিল। নবযুগ, যুগবাণী, লাঙল কী অসাধারণ নাম! প্রতিটি নামের সঙ্গেই বিপ্লবী মানসিকতা বা মেহনতি মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা বাঙ্ময় হয়ে আছে। নজরুল জীবনের কখনো তরুণদের আহ্বানকে অবহেলা করেননি। যখনই তরুণরা তাঁকে তরুণদের সভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছে, নজরুল নির্দ্বিধায় সেসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন এবং তরুণদের উদ্দেশে চমৎকার উপদেশমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের এমন একটি ছেলে দাও যে বলবে আমি ঘরের নই আমি পরের, আমি আমার নই আমি দেশের। ’ এই কথাটির মধ্যেই বোঝা যায়, তৎকালীন দেশমাতৃকা এমন সন্তানদের চাইছে, যে সন্তানরা সম্পূর্ণভাবে দেশের জন্য উৎসর্গকৃত হবে, যারা নিজের স্বার্থের চেয়ে দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থকেই বড় করে ভাববে। তিনি তরুণদের উদ্দেশে যে অভিভাষণগুলো দিয়েছেন, সেসব অভিভাষণেও তরুণদের আত্মজাগরণের কথা আছে, দেশমুক্তির লক্ষ্যে নিজেকে উৎসর্গ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম দলীয় রাজনীতি নয়, রাজনৈতিকভাবে সচেতনতার কথা বলেছেন। তিনি মনে করতেন, রাজনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অনাগ্রহী থাকলে সেটি কোনো কাজের কথা হতে পারে না। নজরুলের একটি প্রবন্ধ আছে ‘বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য’ নামে। সেই প্রবন্ধেও নজরুল লিখেছেন, তিনি শিল্পের জন্য শিল্প এই তত্ত্বে বিশ্বাসী নন, তিনি জীবনের জন্য শিল্প এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। বলাই বাহুল্য, নজরুলের এই বিশ্বাস উঠে এসেছে তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা থেকে।

 

 লেখক : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 



সাতদিনের সেরা