kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

জীববৈচিত্র্যের মানবসৃষ্ট মহাবিলুপ্তি রোখা প্রয়োজন

বিধান চন্দ্র দাস

২২ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জীববৈচিত্র্যের মানবসৃষ্ট মহাবিলুপ্তি রোখা প্রয়োজন

পৃথিবীতে এ পর্যন্ত মোট পাঁচবার জীববৈচিত্র্যের মহাবিলুপ্তি সংঘটিত হয়েছে। সমগ্র জীবকুলের তিন-চতুর্থাংশ অপেক্ষাকৃত কম সময়ের মধ্যে বিলুপ্ত হলে জীবাশ্মবিদরা তাকে মহাবিলুপ্তি বলে অভিহিত করেন। পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তি হয়েছিল সাড়ে ৩০০ কোটি বছর আগে। এর মধ্যে বিগত ৫০ কোটি বছরে জীববৈচিত্র্যের মহাবিলুপ্তি পাঁচবার সংঘটিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রথমটি (অর্ডোভিসিয়ানুসিলুরিয়ান) সংঘটিত হয়েছিল ৪৪-৪৫ কোটি বছর আগে। দ্বিতীয় (লেট ডিভোনিয়ান), তৃতীয় (পারমিয়ানুট্রায়াসিক), চতুর্থ (ট্রায়াসিকুজুরাসিক) ও পঞ্চম (ক্রিটেসিয়াস-পেলিওজিন) মহাবিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছিল যথাক্রমে ৩৬-৩৭.৫, ২৫.২, ২০.১৩ ও ৬.৬ কোটি বছর আগে। জীববৈচিত্র্যের এই পাঁচটি মহাবিলুপ্তি প্রাকৃতিক কারণেই ঘটেছে।

বিজ্ঞানীরা এখন একমত যে জীববৈচিত্র্য বর্তমানে আরেকটি মহাবিলুপ্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পঞ্চম মহাবিলুপ্তির পর বর্তমানে যে মহাবিলুপ্তির ঘটনা ঘটছে তাকে বিজ্ঞানীরা ‘হলোসিন মহাবিলুপ্তি’ (১১ হাজার ৭০০ বছর আগে শেষ বরফযুগের পর থেকে শুরু) বলে অভিহিত করেছেন। তবে বন উজাড় ও কৃষি অভিঘাতজনিত জীববৈচিত্র্য ধ্বংস পাঁচ হাজার বছর আগে অপেক্ষাকৃত অধিক জনসংখ্যাবেষ্টিত অঞ্চলে (ভূমধ্যসাগর, চীন) শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়। ভারতবর্ষে এ সমস্যা শুরু হলে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মৌর্যযুগের উদ্ভব পর্বে চন্দ্রগুপ্তের সময় জীববৈচিত্র্য তথা পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এটি এখন প্রমাণিত, মানুষের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে কৃষি ও শিল্পের বিস্তার; বন, তৃণভূমি, জলাশয় ও জীবের আবাসস্থল ধ্বংস; জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার; দূষণ, বাস্তুতন্ত্রবিরোধী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ইত্যাদির কারণে জীববৈচিত্র্য প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতেও জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে মানবসৃষ্ট এসব কারণের জন্যই জীববৈচিত্র্য ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তির দিকে ধাবমান। এ জন্য ষষ্ঠ এই মহাবিলুপ্তিকে ‘মানবসৃষ্ট মহাবিলুপ্তি’ বা ‘অ্যানথ্রোপোসিন এক্সটিংশন’ বলা হচ্ছে। অষ্টাদশ শতকে শিল্প সভ্যতা শুরু হওয়ার পর থেকে এই বিলুপ্তি নতুন মাত্রা লাভ করে। তখন থেকেই পরিবেশ সংকটও প্রকট হতে শুরু করে।

উনিশ শতকের শেষভাগে জীববৈচিত্র্য তথা পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়। তবে এগুলো ছিল অঞ্চলভিত্তিক। আন্তর্জাতিকভাবে জীববৈচিত্র্য তথা প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বিভিন্ন সংস্থা তৈরিসহ নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস (আইইউসিএন-১৯৪৮) গঠন, ওয়ার্ল্ডওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (ডাব্লিউডাব্লিউএফ-১৯৬১) প্রতিষ্ঠা, কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এনডেঞ্জারড স্পিসিস অব ওয়াইল্ড ফনা অ্যান্ড ফ্লোরা (সিআইটিইএস-১৯৭৩) তৈরি, কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি (সিবিডি-১৯৯২) তৈরি এবং জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য দশক (২০১০-২০২০) ঘোষণা।

২০১০ সালের অক্টোবর মাসে জাপানের নাগইয়া শহরে (আইচি প্রিফেকচার) সিবিডি-২০ দফা লক্ষ্যবিশিষ্ট দশক মেয়াদি (২০১০-২০২০) এক কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এটি ‘আইচি জীববৈচিত্র্য লক্ষ্যসমূহ’ হিসেবে পরিচিত। এই লক্ষ্য পূরণে সিবিডির সদস্য দেশগুলো তাদের জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে।

জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলসের ২, ১৪ ও ১৫ নম্বর উন্নয়ন অভীষ্টের মধ্যেও প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত ‘বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার দশক’ (২০২০-২০৩০) কর্মসূচির মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। উল্লেখ্য, পৃথিবীতে এখনো ৮০ লাখ থেকে এক কোটি জীব প্রজাতি বেঁচে আছে।

বিগত কয়েকটি দশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণমূলক উপরোক্ত নানা ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, এসবের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তির হার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমানো সম্ভব হয়নি, বরং জীববৈচিত্র্য ক্রমাগতভাবে সংকুচিত হয়ে চলেছে। এ বছরের শুরুতে (জানুয়ারি ২০২২) প্রভাবশালী বিজ্ঞান জার্নাল নেচারের সম্পাদকীয়তে প্রথম বাক্যটি লেখা হয়েছে এভাবে : ‘এখন যে হারে জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হচ্ছে, তা তাদের সর্বশেষ অর্থাৎ পঞ্চম মহাবিলুপ্তির পর থেকে দেখা যায়নি। ’

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিবিডি ২০২০ উত্তর বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা বিষয়ক কর্মকাঠামো (গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক—জিবিএফ) তৈরি করছে। গত জুলাই মাসে (২০২১) এর একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এ বছরের মাঝামাঝি এটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এর প্রধান লক্ষ্য ২০৩০-এর মধ্যে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের গতি হ্রাস করা এবং ২০৫০-এর মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার, হিসাবি ব্যবহার, বাস্তুতান্ত্রিক সেবা বজায় রাখাপূর্বক সুস্থায়ী পৃথিবী গঠনের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্যের উপকারগুলো সবার জন্য সরবরাহ করা।

সে কারণে এ বছর (২২ মে ২০২২) আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসের প্রতিপাদ্যে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবার দায়িত্বপূর্ণ অংশগ্রহণের আহবান জানানো হয়েছে (বিল্ডিং এ শেয়ারড ফিউচার ফর অল লাইফ)। বিশেষ করে ২০২০ উত্তর জিবিএফ বাস্তবায়নই এবারের প্রতিপাদ্যের প্রধান উদ্দেশ্য। জীববৈচিত্র্য হচ্ছে ভিত, যার ওপর আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ আরো ভালোভাবে নির্মাণ করতে পারি। এই ভিত ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমরা বাঁচতে পারব না।  

২০২০ উত্তর জিবিএফ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য অতীত অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অতীতের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য অনেক কারণ দায়ী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে সঠিক মানুষদের কাজে লাগানো হয়নি। অনেক দেশে মাঠ পর্যায়ে জীববৈচিত্র্যের প্রকৃত চিত্র না জেনেই এগুলো তৈরি করা হয়েছিল। অনেক দেশের সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো; যেমন—জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জলাশয় ইত্যাদির মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব ও অগ্রাধিকার নির্বাচনের ব্যর্থতা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বাধা হিসেবে কাজ করেছে। এ সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা দরকার। জীববৈচিত্র্যের মানবসৃষ্ট মহাবিলুপ্তি রুখতে হলে আমাদের বাস্তবসম্মত কার্যক্রম প্রয়োজন।

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্যের হালনাগাদ সঠিক কোনো চিত্র নেই। এই চিত্র তৈরি ও নিয়মিত তা হালনাগাদ করার জন্য দেশে কোনো প্রতিষ্ঠানও নেই। দেশের ৮০ শতাংশ জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে জরিপ তথা অধ্যয়ন ছাড়া প্রায় ১০০ বছর আগের করা তালিকাকে ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’ করে আমরা তা হালনাগাদ তালিকা বলে চালিয়ে দিচ্ছি। এ বছর ‘সিআইটিইএস’ কর্তৃক ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ডে’ (৩ এপ্রিল ২০২২)-কে বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস হিসেবে পালন করেছি। কেউ একবার ভাবছি না যে দিবসটি ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইল্ড এনিম্যাল ডে’ নয়।

জাতিসংঘের সিদ্ধান্তক্রমে মৌমাছিজাতীয় পতঙ্গদের রক্ষায় গত ২০১৮ থেকে ‘বিশ্ব মৌমাছি দিবস’ (ওয়ার্ল্ড বি ডে : ২০ মে) পালিত হলেও বাংলাদেশে তা হয় না। জাতিসংঘ বলছে, মৌমাছিজাতীয় ২০ হাজার পতঙ্গ প্রজাতি (অ্যাপোক্রিটা উপবর্গের ছয়টি পরিবারভুক্ত) আমাদের ৭০ শতাংশ শস্যের পরাগায়ণ তথা শস্য উৎপাদনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এজাতীয় পতঙ্গের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে এদের প্রকৃত চিত্র আমাদের অজানা। অথচ এরাই, বিশেষ করে এদের বন্য প্রজাতিগুলো বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ফসল তথা উদ্ভিদের পরাগায়ণ সংঘটিত করে থাকে।

উপরোক্ত তথ্যগুলো প্রমাণ করছে, বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য অধ্যয়নে আমাদের অবহেলা আছে। আছে অসম্পূর্ণতা। দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে এসংক্রান্ত পৃথক প্রতিষ্ঠান তৈরির কোনো বিকল্প নেই। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে প্রজাতি শনাক্তকরণ ও জরিপ; তাদের আচরণ, জীবনবৃত্তান্ত এবং পপুলেশন অধ্যয়নসহ তাদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের অভিঘাত পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। বেছে বেছে বিভাময় বড় কিছু প্রজাতিভিত্তিক জনসচেতনতা তৈরির পরিবর্তে জীবজগেক সামগ্রিক বিবেচনায় নিয়ে তার সংরক্ষণের জন্য জনসচেতনতা তৈরি করা দরকার।

জীববৈচিত্র্যের মহাবিলুপ্তি রুখতে হলে প্রতিটি দেশকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা