kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

ভিন্নমত

ডলার সংকট : সাশ্রয়ে মনোযোগী হতে হবে

আবু আহমেদ

২২ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ডলার সংকট : সাশ্রয়ে মনোযোগী হতে হবে

বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিতে আমাদের অতিরিক্ত ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। এ ছাড়া মহামারি-উত্তর সময়ে শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিও বেড়ে গেছে। তাতে বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া অর্থনীতিতে গতি আসায় বিদেশে ব্যক্তিগত ভ্রমণ বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

ফলে দেশে ডলারের ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়েছে। এ অবস্থায় সরকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সম্প্রতি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধাসরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ঠিক একই কারণে বেসরকারি বা ব্যক্তিগত পর্যায়েও বিদেশ সফরে লাগাম টানা উচিত। চিকিৎসা ও শিক্ষার উদ্দেশ্য ছাড়া সব ধরনের বিদেশ ভ্রমণে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা দরকার। সংকট কাটিয়ে না ওঠা পর্যন্ত উপযুক্ত কারণ ছাড়া কাউকে বছরে একবারের বেশি বিদেশে যেতে না দেওয়া উচিত হবে।

আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ার আশঙ্কা কমবেশি সবার মধ্যে কাজ করছে। তবে নীতিগত কিছু বিষয় আমাদের রক্ষা করতে পারে। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত রিজার্ভ একটি স্বস্তিকর পর্যায়ে না আসে, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ের সব উপায় কাজে লাগাতে হবে। এই রিজার্ভ এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় শক্তি। যত দিন এটা ধরে রাখা যাবে, তত দিন বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে না। কিছু ব্যয় যেহেতু অবধারিত, তাই মুদ্রা সাশ্রয়ে মনোযোগী হতেই হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমাদের আমদানি করতে হবে এবং এর বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতেই হবে। এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণের দেনার বিপরীতেও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে। ফলে সরকার বিলাসদ্রব্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ও আধাসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ সফরের ওপর যে বিধি-নিষেধ জারি করেছে, সেটা সময়োপযোগী ও যথাপোযুক্ত হয়েছে।

কয়েক দিন আগে দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে তথা কার্ব মার্কেটে প্রতি ডলারের দাম ১০৪ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের মুদ্রা বাজারের যা অবস্থা, তাতে এতটা দাম বাড়ার কথা নয়। মূলত ক্রান্তিকালের সুযোগ নিয়ে একটি শ্রেণি গুজব ছড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধি করেছে। সামনে ডলার পাওয়া যাবে না, ডলারের দাম আরো বাড়বে, সামনে লাগতে পারে, তাই এখনই কম দামে মুজদ করে রাখা দরকার—এসব কথা বাজারে ছড়িয়ে দামটা ওপরে তোলা হয়েছে। কিন্তু সপ্তাহ শেষে কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম ছয় টাকা কমে যায়। দেশে ডলারের চাহিদা-সরবরাহ প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব সাবধানতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।

ডলার ধরে রাখলে লাভবান হবে—এ জন্য কিছু লোক ডলার কেনা শুরু করে। আবার এসব ডলার যে বাংলাদেশের বাইরে চলে যাচ্ছে তা-ও নয়। দেশে থেকেই তারা ডলার ধারণ করতে শুরু করে। এটা ব্যাবসায়িক বা নৈতিক কোনো দিক থেকেই ঠিক নয়। আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটা বেআইনি। কারণ ডলার বাংলাদেশের জন্য কোনো লিগ্যাল কারেন্সি নয়। মানুষ শুধু সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই ডলার সংগ্রহ করতে পারে।  

হঠাৎ করে ডলারের দাম বৃদ্ধির আরেকটা খারাপ ফল রয়েছে। প্রবাসীরা যখনই দেখেন যে টাকা মূল্য হারাচ্ছে এবং দ্রুত ডলারের দাম বেড়ে যাচ্ছে, তখন তাঁরা যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠানোর কথা, তা পাঠান না। তাঁদের অনেকে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করে দেন। তখন ডলার সংকটটা আরো বেশি হয়। সাধারণ হিসাব মতো, তখন প্রবাসীরা দেশে বেশি দাম পাবেন বলে বেশি করে রেমিট্যান্স পাঠানোর কথা। তাঁরা ভাবতে থাকেন যে ভবিষ্যতে ডলারের দাম আরো বাড়তে পারে। সুতরাং এখনই দেশে রেমিট্যান্স পাঠাব না। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতিও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি কারণ।

এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংককে সরবরাহ-চাহিদা প্রক্রিয়ায় সমন্বয় নীতি গ্রহণের পাশাপাশি মানুষকে অযথা ডলার ধরে রাখা থেকে বিরত রাখতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের এখানে সমস্যা হলো, মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রগুলো যে কেউ চাইলে ডলার দিয়ে দেয়। তারা প্রয়োজন দেখতে চায় না। এ ক্ষেত্রে যদি নজরদারি বাড়ানো যায়, তাহলে ঠিকই বাড়তি চাহিদা কমে আসবে। তখন প্রয়োজন ছাড়া কেউ ডলার ধরে রাখবে না।

আমাদের চাল, গম, সয়াবিন তেল, জ্বালানি তেল, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতেই হবে। আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এসব অপরিহার্য আমদানি পণ্যের জন্য যে পরিমাণ ডলার প্রয়োজন, সেটা আমাদের রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় থেকে পাওয়া সম্ভব। এর বাইরে আমরা যদি ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় বন্ধ করে দিতে পারি, তাহলে সংকট আমাদের স্পর্শ করবে না। এ জন্যই সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সফরগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিদেশে শপিং করার জন্য, অবকাশযাপনের জন্য, ছোটখাটো চিকিৎসার জন্য যাওয়া বন্ধ করতে হবে। আমার বিশ্বাস, তাতে চাহিদায় টান পড়বে এবং ডলারের দাম কমে আসবে এবং বাড়লেও তখন ধীরে বাড়বে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বৈদেশিক মুদ্রার যে ব্যয় হয়, তার কমপক্ষে ২০ শতাংশ এসব খাতে ব্যয় হয়। সাময়িকভাবে অবকাশমূলক ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্বস্তিকর পর্যায়ে ধরে রাখাটাই এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল মনোযোগ হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে চাহিদার সঙ্গে ডলার সরবরাহের সামান্য সমন্বয় করা যেতে পারে। তবে সেটা অবশ্যই সামান্য পরিমাণে। আর ব্যাংকিং চ্যানেল ও কার্ব মার্কেটের মধ্যে ডলারের দাম তিন থেকে চার টাকার বেশি হওয়া অবশ্যই উচিত নয়। যখনই এর চেয়ে বেশি বেড়ে যাবে, তখনই জল্পনাকারীরা ডলার ধরে রাখতে শুরু করে। এটা যাতে করতে না পারে সে জন্য নজরদারি দরকার।

যেহেতু বৈশ্বিকভাবেই অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতেও ডলারের দাম বাড়ছে, তাই ডলারের দাম সামান্য সমন্বয় করাই যেতে পারে। আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম-ফেডের এখনকার মূল পলিসিই হচ্ছে সুদের হার বাড়ানো। সুদের হার বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বাড়বে এবং বৈশ্বিকভাবে ডলার কম পাওয়া যাবে। সমস্যা হচ্ছে, এটা তাদের রিজার্ভ কারেন্সি, আবার আন্তর্জাতিক লেনদেনের শীর্ষ মাধ্যমও। এখন ডলারের দাম বাড়ানো যদি আমেরিকান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি হয়, সে ক্ষেত্রে টাকার দামের সমন্বয় অস্বাভাবিক নয়। যেহেতু ভারতসহ অন্যান্য দেশেও তা-ই হচ্ছে। তবে ভারত বা আমাদের মতো দেশে ডলারের দামের বিষয়টি চাহিদা-সরবরাহ তত্ত্বের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় না। এখানে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়। তাই দু-এক টাকা করে সমন্বয় করা যেতে পারে।

গুজব বন্ধ করা সহজ নয়। কারণ ডলারের চাহিদা বা দাম বেশি বাড়লে গুজবের পরিবেশ তৈরি হয়। তাই দাম সমন্বয় করা যেতে পারে, যাতে অস্থিরতা তৈরি না হয়। ডলারের দাম যেদিন ১০৪ টাকা হলো তখনই গুজবটা বেশি ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যখনই বললেন যে ডলারের দাম এত বেশি বাড়ার কথা নয়, তখন সেটা কাজে দিয়েছে।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই মুহূর্তে আমাদের চারটা বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা বিনিময় হার, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ—এই চারটি বিষয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এগুলোকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে যাতে অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। খাদ্য ঘাটতি এখন বৈশ্বিক প্রবণতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এ জন্য এখন যত উৎস থেকে খাদ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেসব উৎস থেকে বেশি পরিমাণে আমদানি করে মজুদ করতে হবে। জাতিসংঘ থেকেও বলা হচ্ছে যে বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। আবার খাদ্যসংকট বাড়লে দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে, যা অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। তখন কোনো উপায় কাজ করবে না। তাই আগেভাগেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের

সাবেক অধ্যাপক



সাতদিনের সেরা