kalerkantho

শনিবার ।  ২৮ মে ২০২২ । ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৬ শাওয়াল ১৪৪

শ্রীলঙ্কা : নতুন প্রধানমন্ত্রীর সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ

অনলাইন থেকে

১৫ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শ্রীলঙ্কার ইউনাইটেড ন্যাশনালিস্ট পার্টির (ইউএনপি) নেতা রনিল বিক্রমাসিংহে রাজনৈতিক পলায়নবিদ্যায় যে পারদর্শিতা দেখিয়ে এসেছেন, তাতে তাঁর নামের মধ্যবর্তী অংশ ‘বিক্রমের’ মতো তাঁকে মার্কিন ম্যাজিশিয়ান ‘হুডিনি’ নামেই ডাকা উচিত। ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল এবং তিনি নিজে যেভাবে একটি জঘন্য পরাজয়ের মুখে পড়েছিলেন, তাতে তাঁর রাজনীতির মৃত্যু ঘটে গেছে বলেই তাঁর সমালোচকরা ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস পর দেখা গেল তিনি ঠিকই পার্লামেন্টে হাজির। তখন তাঁর আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দেখে মনে হয়েছিল যেন কিছুই ঘটেনি।

বিজ্ঞাপন

সেই তিনিই এখন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন টেম্পল ট্রিজে ফিরে এসেছেন।

বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের হতাশার পরিচয় বহন করে। পদত্যাগের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্টের যেন আর কিছুই করার নেই। প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষেকে তীব্র জনরোষের মুখে পদত্যাগ করতে হয়েছে। অথচ তিনি প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত একজন এমপি এবং নিজ দল এসএলপিপির প্রতিনিধিত্বকারী, যে দলটি ১৪৫টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এর বিপরীতে মাহিন্দার স্থলাভিষিক্ত হওয়া রনিল বিক্রমাসিংহে পার্লামেন্ট নির্বাচনে একজন পরাজিত প্রার্থী, যিনি পরে জাতীয় তালিকার (দলীয় ভোটের আনুপাতিক হারে মনোনয়ন) মাধ্যমে সংসদে প্রবেশ করেন।

বলা হচ্ছে, বিক্রমাসিংহের এই নিয়োগ সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। কিন্তু যা সাংবিধানিক তা অবশ্যই নৈতিক বা ন্যায়সংগত না-ও হতে পারে। তাই এটা এমন একটা বিষয়, যা রাজনীতিতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিতে হয়।

গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী রাজাপক্ষের পদত্যাগের কারণে দেশটি কয়েক দিন সরকার ছাড়াই চলে। ফলে দ্রুততম সময়ে একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী ও একটি মন্ত্রিসভা নিয়োগ দিতেই হতো। বিরোধী দল এসজেবি প্রাথমিকভাবে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনে যোগ দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিল। এর পরিবর্তে দলটি প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করতে হবে বলে শর্ত দেয়। আরেক বিরোধী দল জেভিপি জানিয়ে দেয় যে প্রেসিডেন্ট যদি অবিলম্বে পদত্যাগ করেন এবং স্পিকারকে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করা হয়, তাহলেই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে রাজি হবে।

এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন জোর দিয়ে বলেছে, এই সংকটময় মুহূর্তে কোনো নির্বাচন করা উচিত হবে না এবং অর্থনৈতিক সংকট সমাধান ও সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনই এখন সময়ের দাবি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, দ্রুত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা না গেলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের অভিমত হচ্ছে, এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক ভেল্কি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এসজেবির খেলোয়াড়রা অবরুদ্ধ রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে এ ধরনের কৌশলের প্রত্যাশা করেছিলেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিরোধীদলীয় ও এসজেবি নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা তাঁর অবস্থান নরম করেন এবং প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি হয়তো তাঁর কয়েকজন এমপিকে দলত্যাগ করা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়।

এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিক্রমাসিংহের নিয়োগ এসজেবি দলের ওপর বিধ্বংসী প্রভাব ফেলবে, যার মধ্য দিয়ে ইউএনপিতে তার কিছু সংসদ সদস্য চলে যেতে পারেন। ক্ষমতা রাজনীতিবিদদের জন্য একটি চুম্বক হিসেবে কাজ করে। রাজনীতিবিদরা তাঁদের আনুগত্য পরিবর্তন করতে দ্বিধাবোধ করেন না এবং এমনকি শয়তানের কাছে তাঁদের আত্মা বিক্রি করতেও প্রস্তুত। এখন দলত্যাগ ঠেকাতে প্রেমাদাসা তাঁর কাজ করে যাবেন।

কৌতূহলের বিষয় হলো, প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের প্রতি সমর্থনের শর্ত হিসেবে প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষের পদত্যাগ দাবি করার সময় এসজেবি ১৯তম সংশোধনী ১৯এ ধারা পুনর্বহালের আহবান জানিয়েছিল। যদি ১৯এ ধারা পুনর্বহাল করা হয়, তাহলে তা প্রেসিডেন্টকে একজন ক্ষমতাহীন অভিভাবকের পর্যায়ে নামিয়ে আনবে; যিনি কোনো মন্ত্রী পদ ধরে রাখতে পারবেন না এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যত রাষ্ট্রপ্রধান হবেন, যেমনটি আমরা ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেখেছি। যদিও তখন অন্তর্বর্তীকালীন বিধান হিসেবে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাইত্রিপালা সিরিসেনার হাতেও কিছু নির্বাহী ক্ষমতা ছিল এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ারও সুযোগ ছিল।  

এখন প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি স্থানীয় প্রবাদকে ভুল প্রমাণ করা। প্রবাদটি হচ্ছে, ‘মোলে থিয়ানকোটা বেল নে, বেল থিয়ানকোটা মোলে নে’ অর্থাৎ ‘যখন মাথা কাজ করে তখন ক্ষমতা থাকে না এবং যখন ক্ষমতা থাকে তখন মাথা কাজ করে না। এ কথা বলার কারণ, তিনি কয়েকজন এমপির একজন, যাঁরা বর্তমান পার্লামেন্টে বিচক্ষণতার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং কাজ করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তাঁর ওই বিচক্ষণ বচনগুলো অব্যাহত রাখবেন কি না এবং উপরোক্ত প্রবাদটি অস্বীকার করবেন কি না তা দেখার বিষয়।

বিক্রমাসিংহের নিয়োগের বিরুদ্ধে এর মধ্যেই কিছু মহল থেকে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। কিন্তু এখন যুদ্ধলিপ্ত দলগুলোকে যা ভুলে যাওয়া উচিত নয় সেটা হচ্ছে দ্রুত অর্থনৈতিক পতনের বিষয়টি। তাদের অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞদের কথা শুনতে হবে, যাঁরা অর্থনীতিকে বাঁচাতে সংগ্রাম করছেন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানিয়েছেন। রুপির পতন অব্যাহতভাবে চলছে। গতকাল প্রতি মার্কিন ডলারের দাম সর্বনিম্ন ৩৮০-তে নেমে এসেছে। তার মানে অর্থনীতিতে চাপ এবং মানুষে দুর্ভোগ; দ্রব্যমূল্য, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়তে বাধ্য। সুতরাং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দ্রুত পুনরুদ্ধার না করা পর্যন্ত পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে।

এই পরিস্থিতিতে রাজনীতিবিদ, ট্রেড ইউনিয়ন নেতাকর্মী এবং অন্য লোকজন, যাঁরা আন্দোলনে অনড় অবস্থানে রয়েছেন তাঁদের সবাইকে একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার এবং অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করার জন্য আহবান জানানো হোক।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য আইল্যান্ড (শ্রীলঙ্কা)

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা