kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি প্রসঙ্গ

ড. মো. আনিসুজ্জামান

১২ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি প্রসঙ্গ

গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন ছুটি থাকে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। সময়ের প্রয়োজনে এই দুটি ছুটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, করোনার ক্ষতি। দ্বিতীয়ত, কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আত্মিক সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী বিদ্যুৎ কুমার প্রামাণিক। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘স্যার, বাড়ি যাচ্ছি। ধান কাটা শুরু হয়েছে। ’ কোনো নাড়ির টানে নয়। ঈদের আনন্দ বিদ্যুেক আলোড়িত করে না। শহরের নামিদামি তারকাযুক্ত হোটেলে খেয়ে ফেসবুকে ছবি আপলোড করার স্বপ্ন বিদ্যুতরা দেখে না। বিদ্যুৎ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।

বিদ্যুতের বাবা দেড় বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন। বিদ্যুতের বর্ণনা অনুসারে এবার ফলন কম, তাও ২৭-২৮ মণ ধান পাওয়া যাবে। দেড় বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা বর্গা জমি। বিদ্যুৎ বাবার জমির ধান কাটা শেষে অন্যের জমিতে ধান কাটছে। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ধান কাটলে পাওয়া যায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয় খুলে যাচ্ছে, বিদ্যুেক চলে আসতে হবে। তা ছাড়া টিউশনি আছে। টিকে থাকার জন্য বিদ্যুৎ একসময় মিষ্টির দোকানে কাজ করেছে। এখন টিউশনি করে। তার মতো হাজার হাজার বিদ্যুৎ অদম্য বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আলো ছড়াচ্ছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি ফসলের সঙ্গে সংগতি রেখে সমন্বয় করা উচিত। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের ফসল সম্পর্কে ধারণা হবে। দ্বিতীয়ত, দেশ ও দেশের মানুষের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠবে। ইরি-বোরো ধান মাড়াইয়ের মৌসুমকে উৎসবে পরিণত করার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন ছুটির সমন্বয় করা হলে শিক্ষার্থীরা সে সময় গ্রামের বাড়িতে থাকবে এবং ফসলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠবে। শহরকেন্দ্রিক বেশির ভাগ শিক্ষার্থী জানে না যে কোন জমিতে কখন কোন ফসল হয়। কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক না থাকার ফলে কেরানির মানসিকতা সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। উদ্যোক্তা হওয়ার পূর্বশর্ত হলো মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি করা। ফসলের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক সৃষ্টি হলে দেশের প্রতি তাদের মমত্ববোধ জাগবে এবং তাদের আত্মসম্মান বাড়বে।  

গ্রামের শিক্ষার্থীরা ফসল ওঠার মৌসুমে বাড়িতে থাকলে পারিবারিক কাজকর্মে সহযোগিতা হয়। বিশেষ করে ধান মাড়াই ও প্রক্রিয়াকরণে সহযোগিতা করতে পারে। বিদ্যুতের মতো হাজারো শিক্ষার্থী অন্যের জমিতে কাজ করে কিছু টাকা আয় করতে পারে। আমাদের দেশ থেকে বিদেশে যাঁরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য পাড়ি দেন তাঁদের একটা বড় অংশ হোটেল, রেস্তোরাঁ, নির্মাণ শ্রমিকের সহযোগী হিসেবে কাজ করে কিছু আয় করেন। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় অনেকে ফসলের মাঠেও কাজ করেছেন। দেশের মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য শিক্ষাজীবনের বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে একটি সেমিস্টার মাঠে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। শুধু পাঠ্য বই, গাইড বই, নোট মুখস্থ করার বিদ্যা নিয়ে না হয় জ্ঞান, না হয় শিক্ষা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘মুখস্থ করিয়া পাস করাই তো চৌর্যবৃত্তি। যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়, আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায়, সেই বা কম কী করিল?’ রবীন্দ্রনাথ না বুঝে মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করাকে চৌর্যবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘যারা বই মুখস্থ করিয়া পাস করে তারা অসভ্য রকমে চুরি করে। ’ মুখস্থ করে লেখা আর বই থেকে দেখে লেখার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মুখস্থ বিদ্যানির্ভর শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে অসৎ পথ অবলম্বনে দ্বিধা করে না। বাংলাদেশে ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি।

মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্যই পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে বাস্তবতার সম্পর্ক স্থাপন অপরিহার্য। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি কেন একের পর এক স্ত্রী হত্যা করেছিলেন, তা জানার চেয়ে কোন জমিতে কোন ফসল হয়, তা জানা জরুরি। যে চাল আমরা খাই তা কোন ধানের জানাটা কি জরুরি নয়? তার চেয়েও জরুরি মোমপলিশ করা ঝরঝরে চালের ভাতে শরীরের কী কী ক্ষতি হয়, তা জানা। বঙ্গবন্ধু গ্রামের মানুষের সঙ্গে ছাত্র-যুবকদের সম্পর্ক স্থাপনের ওপর বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, ‘আমার যুবক ভাইয়েরা, যে কো-অপারেটিভ করতে যাচ্ছি গ্রামে গ্রামে, এর ওপর বাংলার মানুষের বাঁচা নির্ভর করবে। আপনাদের ফুলপ্যান্টটা একটু হাফপ্যান্ট করতে হবে। পাজামা ছেড়ে একটু লুঙ্গি পরতে হবে। ’ শিক্ষার্থীদের গ্রামে গিয়ে কিছু সময় কাজ করার জন্য বঙ্গবন্ধুর অসংখ্য উদ্ধৃতি পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘বাবারা, একটু লেখাপড়া করো, ঠিকমতো লেখাপড়া না শিখলে কোনো লাভ নেই। আর লেখাপড়া শিখে যে সময়টুকু থাকে বাপ-মাকে সাহায্য কোরো। প্যান্ট পরা শিখেছ বলে বাবার সঙ্গে হাল ধরতে লজ্জা কোরো না। দুনিয়ার দিকে চেয়ে দেখো। কানাডায় দেখলাম ছাত্ররা ছুটির সময় লিফট চালায়। ছুটির সময় দুই পয়সা উপার্জন করতে চায়। আর আমাদের ছেলেরা বড় আরামে খান, আর তাস নিয়ে ফটাফট খেলতে বসে পড়েন। গ্রামে গ্রামে বাড়ির পাশে বেগুনগাছ লাগিও, কয়টা মরিচগাছ লাগিও, কয়টা লাউগাছ ও কয়টা নারিকেলের চারা লাগিও। বাপ-মারে একটু সাহায্য কোরো। কয়টা মুরগি পালো, কয়টা হাঁস পালো। জাতীয় সম্পদ বাড়বে। ’

পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়রা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্যই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রীষ্মকালীন ছুটি ইরি-বোরো মৌসুমের সঙ্গে সংগতি রেখে বিবেচনা করা উচিত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মুখস্থ বিদ্যার মতো বারবার উচ্চারণ করার চেয়ে বাস্তবায়ন করা জরুরি। উচ্চশিক্ষা জীবনের কমপক্ষে এক সেমিস্টার অথবা এক সেমিস্টারের কিছু অংশ মাঠে, হাসপাতালে অর্থাৎ সেবা সেক্টরের সার্ভিসের সঙ্গে থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্যই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

 



সাতদিনের সেরা