kalerkantho

শনিবার ।  ২৮ মে ২০২২ । ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৬ শাওয়াল ১৪৪

টেকসই উন্নয়নের অনুষঙ্গ পিয়ার লার্নিং

দীপান্বিতা ঘোষ ও জিহাদ আল মেহেদী

২৯ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



টেকসই উন্নয়নের অনুষঙ্গ পিয়ার লার্নিং

একবিংশ শতাব্দীতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন মানুষের স্বপ্নকে তার হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। সৃষ্টি করেছে সম্ভাবনার নতুন নতুন ক্ষেত্র। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তাদের অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করে তুলছে। বাংলাদেশও চায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর স্বপ্নকে সত্যি করতে।

বিজ্ঞাপন

উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় যদি নারী ও পুরুষ সমানভাবে অংশ না নেয়, তাহলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, সম্ভব নয় ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া। তাই টেকসই উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে চাই নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ।

দক্ষ মানুষ গড়ে তুলতে সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই যুগের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন শিক্ষা সাশ্রয়ীভাবে দেওয়ার বিভিন্ন উপায় নিয়ে প্রশিক্ষকরা বিরামহীন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের অনেকেই মনে করেন, সতীর্থদের কাছ থেকে শেখা, ইংরেজিতে যাকে বলা হয়  ‘Peer Learning’ পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদান করলে প্রচলিত এবং অনলাইন দুই রকমের শিক্ষণেই ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। অনলাইন প্রশিক্ষণে পিয়ার লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করে এরই মধ্যে ভালো ফল পাওয়া গেছে। তাই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সরকারের লক্ষ্য পূরণে পিয়ার লার্নিং পদ্ধতির ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। কারণ এ দেশে রয়েছে বহু শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণী। ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশের পুরুষরা কিছুটা এগিয়ে গেলেও নারীর পেছনে পড়ে আছে। সম্প্রতি এক দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখায় পড়াশোনা করা নারীদের ৮৭ শতাংশ ওই খাতে তাঁদের পেশা বেছে নেন না। এ ছাড়া বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছেন প্রায় ছয় লাখ নারী, যা মোট নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সারদের মাত্র ৯ শতাংশ। বাংলাদেশে নারীদের কর্মসংস্থান মাত্র ১ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারলে তা মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ০.৩১ শতাংশ যোগ করবে। অর্থমূল্য যাচাই করলে যার মূল্যমান প্রায় ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। এ ক্ষেত্রে অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং একটা ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।  

এই সম্ভাবনা বিবেচনা করে বাংলাদেশে ‘ইভালুয়েশন অব দ্য ওমেনস স্কিলস ডেভেলপমেন্ট ফর ফ্রিল্যান্সিং মার্কেট প্লেসেস’ প্রকল্পের আওতায় এক হাজার নারীকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশ থেকে উঠে আসা এই নারীরা যাতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আয় করে নিজের ও দেশের উন্নয়ন ঘটাতে পারেন, সে উদ্দেশ্য নিয়েই এই প্রকল্পটি যাত্রা শুরু করে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)-এর কয়েকজন গবেষক এই প্রশিক্ষণ কতখানি কার্যকর সে বিষয়ে একটি গবেষণা করার সুযোগ পান। গবেষণায় দেখা গেছে যে ‘ইভালুয়েশন অব দ্য ওমেনস স্কিলস ডেভেলপমেন্ট ফর ফ্রিল্যান্সিং মার্কেট প্লেসেস’ প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী নারী প্রশিক্ষণার্থীদের একাংশ মনে করেন, উন্নয়নের অংশীদার হতে ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে ফ্রিল্যান্সিং শেখাটা তুলনামূলকভাবে বেশ সুবিধাজনক। কারণ ফ্রিল্যান্সিং সংসারের দায়িত্ব সামলে ঘরে বসে নারীদের উপার্জন করার সুযোগ এনে দেয়। ফ্রিল্যান্সিং নারীদের সহায়তা করে স্বামী বা পিতার ওপরে অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমাতে ও স্বনির্ভর হয়ে নিজ পরিবারকে সহায়তা করতে।  

আবারও ফিরে আসি মূল প্রসঙ্গে। ‘ইভালুয়েশন অব দ্য ওমেনস স্কিলস ডেভেলপমেন্ট ফর ফ্রিল্যান্সিং মার্কেট প্লেসেস’-এর প্রশিক্ষণার্থীরা জানতেন তাঁদের ক্লাস হবে ক্লাসরুমে বসে এবং শিক্ষকদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে তাঁদের প্রশিক্ষণসংক্রান্ত সব কার্যক্রম অনলাইনভিত্তিক হয়ে পড়ে। অনলাইনে ক্লাস করার প্রস্তুতি শিক্ষার্থীদের না থাকায় তাঁরা নানা রকম বাধার সম্মুখীন হন, যেমন—ইন্টারনেটের অপ্রাপ্যতা, উপযুক্ত ডিভাইসের অভাব, প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভিজ্ঞতা ইত্যাদি। এ ছাড়া সপ্তাহে তিন-দিন চার ঘণ্টা করে ক্লাস ও বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট করতে গিয়ে কিছু কিছু শিক্ষার্থী বুঝতে পারেন, তাঁরা তাঁদের পাঠ্য বিষয় ঠিকমতো বুঝতে পারছেন না। দেখা গেল প্রতি ক্লাসে আগের ক্লাসের সমস্যার সমাধান করতে করতে নতুন বিষয় শেখাটা কম হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ের মাঝে সিলেবাস সম্পন্ন করা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং শিক্ষণের পুরো ব্যাপারটি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে না। কেউ কেউ বেশ ভালো করছিলেন, তবে অনেকে একেবারেই তাল মেলাতে পারছিলেন না। মোটকথা শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে তাঁদের পাঠ্য, অ্যাসাইনমেন্ট ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের এই পুরো ব্যাপারটিকে বুঝে নিতে বারবার হোঁচট খাচ্ছিলেন। তাঁরা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে জানতে পারলেন এই সমস্যা আরো অনেকেরই হচ্ছে। এর সমাধান খুঁজতে গিয়ে তাঁরা আবিষ্কার করলেন পিয়ার লার্নিং পদ্ধতির।

শুরুতে কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে সহজাতভাবেই পিয়ার লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করে, অর্থাৎ আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করেন। প্রথমে তাঁরা নিজেরা আলোচনার মাধ্যমে একজন শ্রেণি প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। প্রশিক্ষকরাও এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেন। এরপর শ্রেণি প্রতিনিধি সবার সুবিধামতো সময়ে প্রতি সপ্তাহে একটি নির্ধারিত দিনে অনলাইনে সমস্যা সমাধানের জন্য ‘সমাধান ক্লাস’-এর আয়োজন করেন। যাঁরা অনলাইন ক্লাস করেও ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিষয়গুলো বুঝতে পারছিলেন না, তাঁরা এই সলিউশন ক্লাসে অপেক্ষাকৃত ভালো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সমাধান পাচ্ছিলেন। অর্থাৎ যে বিষয়গুলো আগে কঠিন ছিল, সবাই সবাইকে সাহায্য করায় তা ধীরে ধীরে সহজ থেকে সহজতর হয়ে যাচ্ছিল। লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, এই শিক্ষার্থীরা কিন্তু আগে থেকে পিয়ার লার্নিং সম্পর্কে জানতেন না। সমস্যার সমাধানকল্পে তাঁরা নিজেরাই দলগত শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী হয়েছেন এবং একে অন্যকে সাহায্য করেছেন। অর্থাৎ নিজের অজান্তেই তাঁরা পিয়ার লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

পিয়ার লার্নিং পদ্ধতিতে শিক্ষণ প্রক্রিয়া সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের ফ্রিল্যান্সিং শেখার ক্ষেত্রে যে বেশ কাজে দিয়েছে।

পিয়ার লার্নিং আমাদের শিক্ষাকাঠামোতে ব্যবহার করে শিক্ষার মান বাড়ানোর একটা সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেই সুযোগটি তৈরি হতে পারে যদি এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা যায়। সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পিয়ার লার্নিংয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলে অনেক কঠিন বিষয় তাঁরা সহজেই আত্মস্থ করতে সক্ষম হবেন। বিশেষত পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা এখান থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারেন। শিক্ষণের প্রতিটি ধাপে যদি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা পিয়ার লার্নিংয়ের মাধ্যমে সমাধান করা যায়, তাহলে অনলাইন ও প্রচলিত, উভয় মাধ্যমেই এটা সমানভাবে কাজে দেবে।

দেশের শিক্ষাকাঠামোতে পিয়ার লার্নিং পদ্ধতিকে গুরুত্বারোপ করলে শিক্ষার গুণগত মান বহুলাংশে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণের অভিজ্ঞতাও হতে পারে আনন্দময়। এসডিজি বাস্তবায়ন ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে এভাবেই রাখতে পারে একটা বড় ভূমিকা।

 

লেখকদ্বয় : প্রথমজন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)-এর রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট; দ্বিতীয়জন একই প্রতিষ্ঠানের কমিউনিকেশন্স অফিসার

 

 



সাতদিনের সেরা