kalerkantho

মঙ্গলবার ।  ২৪ মে ২০২২ । ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২২ শাওয়াল ১৪৪৩  

ইউক্রেন সংকট : ‘বাইপাসড ইউরোপে’ সাহসী পুতিন

অনলাইন থেকে

২৭ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গত সপ্তাহের শেষের দিকে জেনেভায় অনুষ্ঠিত রুশ-মার্কিন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের ইউক্রেন সংকট নিয়ে আলোচনা অন্তত এই মুহূর্তের জন্য উত্তেজনা কমাতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে। ইউক্রেনের স্থল ও জল সীমান্তে মস্কো যেভাবে সৈন্য ও শক্তিশালী সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করেছে, তা এখনো বিপজ্জনক। তবে সহসাই বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটবে—আতঙ্ক সৃষ্টিকারীদের এমন ভবিষ্যদ্বাণীগুলো একেবারেই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

ইউক্রেনকে ঘিরে পশ্চিমা জোটের তৎপরতা নিয়ে রাশিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জেনেভার বৈঠকে এ উদ্বেগ দূর করার জন্য কূটনৈতিক উপায় অনুসরণে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন জোর আহ্বান জানিয়েছেন। এর প্রভাব স্পষ্টতই তাঁর একরোখা প্রতিপক্ষ রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের ওপর পড়েছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায়ও এটা স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বলেছেন, দুই পক্ষের আলোচনা ‘গঠনমূলক ও কার্যকর’ হয়েছে এবং এ সপ্তাহেও তাঁরা তা অব্যাহত রাখতে একমত হয়েছেন।

এই আলোচনা সম্ভবত একটি সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে এই সংকটকে এগিয়ে নেওয়ার পেছনে যেসব বিষাক্ত উপাদানগুলো ছিল তা এখনো সক্রিয় আছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সার্বিক লক্ষ্য হলো সোভিয়েত-পরবর্তী ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়া এবং পুনরায় রাশিয়ার সীমানার বাইরে তার প্রভাববলয় তৈরি করা। তিনি একটি সফল, সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পশ্চিমাপন্থী গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ইউক্রেনের রূপান্তর রুখে দিতে মরিয়া। কারণ ইউক্রেনের উদাহরণ তাঁর দুর্নীতিগ্রস্ত ও দমনমূলক শাসনব্যবস্থাকে লজ্জায় ফেলে দেয়।

সুতরাং নিজের লক্ষ্য হাসিলে পুতিন চান যে রাশিয়ার পশ্চিম দিকে অবস্থিত দেশগুলো থেকে ন্যাটো সরে যাক, যে দেশগুলো সোভিয়েত পতনের পরে পশ্চিমা জোটে যোগ দিয়েছিল। তাঁর এই তালিকা বড় হতে হতে এখন রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার পাশাপাশি এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ড অন্তর্ভুক্ত করেছে। তিনি লিখিত প্রতিশ্রুতিও দাবি করছেন, যাতে ন্যাটো কখনো ইউক্রেন, জর্জিয়া বা মলদোভাকে যোগদানের আহ্বান না জানায় এবং পূর্ব ইউরোপ থেকে সেনা ও প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে।

পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে তারা এ ধরনের ব্ল্যাকমেইল মেনে নেবে না। তারপর দুঃখজনকভাবে নিজেদের মধ্যে ঐকমত্যের অভাবও রয়েছে। যেমন—রাশিয়া যদি ইউক্রেন আক্রমণ করে; সেটা স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথেই হোক কিংবা অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধ পদ্ধতি (অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার মেথড) ব্যবহার করুক—যাতে গোপন অভিযান, বিশেষ বাহিনী ব্যবহার ও ‘প্রযুক্তিগত’ ব্যবস্থা গ্রহণ করে; তাহলে কী করা উচিত সে সম্পর্কে প্রকৃত অর্থে কোনো ঐক্য পশ্চিমের নেই, বরং বিরোধ রয়েছে।

ইউরোপীয় নেতারা যৌথভাবে এই দুঃখজনক পরিস্থিতির জন্য দায়ী, যা পুতিনকে উৎসাহিত করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের তৎপরতা একেবারেই আকর্ষণীয় নয়। গত সপ্তাহে তিনি রাশিয়ার ‘মাইনর আক্রমণ’ সহ্য করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করে একটি বিপজ্জনক ভুল করেছিলেন। তবে সামগ্রিকভাবে তিনি রাশিয়ার চাপ প্রতিহত করতে এবং উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টায় প্রশংসনীয়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রয়েছেন।

অনৈক্যে ভরা ইউরোপীয় গণতন্ত্রগুলোর দ্রুত সাড়া দেওয়ার মতো কোনো যৌথ নীতি নেই। যেমন—রাশিয়া থেকে আসা নর্ড স্ট্রিম ২ গ্যাস পাইপলাইন বর্জন করা নিয়ে জার্মানির ক্ষমতাসীন জোট সরকারের মধ্যে গ্রিন ও মস্কোপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ফ্রান্সের ভেতরেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর সাহসী ধারণাকে কেন্দ্র করে অনেক ফাটল দেখা দিচ্ছে। গত সপ্তাহে স্ট্রসবুর্গে ইউরোপীয় সংসদের একটি বিশৃঙ্খল অধিবেশনে ম্যাখোঁর ধারণাগুলো উত্থাপিত করেছিল ফ্রান্স। বস্তুত ইইউ দ্বন্দ্বটা হচ্ছে দুর্বলতা ও অসামঞ্জস্যতার বাস্তবতা।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সম্প্রতি ইউরোপীয় নেতৃত্বকে একসূত্রে গাঁথা এবং পুতিনকে মোকাবেলার জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্টের দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। যেহেতু ইইউর অনেক দেশেই তাঁর প্রতি মারাত্মকভাবে আস্থাহীনতা এবং অপছন্দ রয়েছে, তাহলে তিনি কিভাবে কাজ করবেন? সন্দেহের বিষয় হচ্ছে, এই উদ্যোগ তাঁর সাম্প্রতিক ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারি থেকে মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার আরেকটি প্রচেষ্টার মতোই মনে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে আন্তর্জাতিক উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে জনসন এবং সংকটকালে অনুপস্থিত থাকা তাঁর থ্যাচার-অনুসারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস ইস্যুটির আরো অবনতি ঘটাতে পারেন।

পরিস্থিতি চরম সীমায় পৌঁছানোর পর ইউক্রেন অচলাবস্থার  দ্রুত সমাধানের সুযোগ নেই। যদিও কেউই চাইবে না, তবু দুর্ঘটনাক্রমে সেখানে একটি সংঘাত শুরু হতে পারে। এর মধ্যে আশা করা যায় যে মার্কিন কূটনীতি সফল হবে। কারণ রাশিয়া দ্বারা উপেক্ষিত ও আমেরিকা দ্বারা পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত একটি ‘বাইপাসড ইউরোপ’ নিজেকে সাহায্য করতে অক্ষম বলে মনে হচ্ছে। তাই পুতিন শেষ পর্যন্ত প্রস্থান বা যুদ্ধ যেদিকেই যান না কেন, ইউরোপ এরই মধ্যে পরাজিত হয়েছে।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দি অবজারভার (যুক্তরাজ্য)



সাতদিনের সেরা