kalerkantho

মঙ্গলবার ।  ২৪ মে ২০২২ । ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২২ শাওয়াল ১৪৪৩  

এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেন

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

২৭ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেন

মাত্র কয়েক দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকাকে নৃশংসভাবে হত্যার রেশ না কাটতেই একজন অভিনেত্রীকে একইভাবে হত্যা করা হয়। লাশ দুই টুকরা করে ঢাকার কাছে এক ব্রিজের নিচে ফেলে রাখা হয়। প্রথম হত্যাকাণ্ডে আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে এবং বাসা তৈরির কাজে নিয়োজিত কাঠমিস্ত্রি শিক্ষিকার হাতে থাকা টাকা জোর করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁকে হত্যা করে পাশের ঝোপে ফেলে রাখেন। সামান্য কিছু টাকার জন্য একজন শিক্ষিত মানুষকে হত্যা করতে একটুও বুক কাপল না হত্যাকারীর।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ উঠেছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাঠমিস্ত্রি মাদকাসক্ত ছিলেন এবং ঠিক একই কারণে তাঁর প্রথম স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। আর অভিনেত্রীকে হত্যার দায়ে এরই মধ্যে তাঁর স্বামী ও তাঁর এক বন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ কিছু আলামতও সংগ্রহ করেছে। এখানেও অভিযোগের তীর মাদকের দিকে। নিহতের এক আত্মীয়র দাবি, নিহতের স্বামী মাদকাসক্ত ছিলেন এবং স্ত্রীকে মারধর করতেন। অবশ্য অভিনেত্রীর স্বামী স্বীকার করেছেন দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহের জেরে তাঁকে হত্যা করেছেন।

দুটি ঘটনায় মাদকাসক্তের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আমাদের বলে দেয় নৃশংসতার সঙ্গে মাদকের সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের হয়তো মনে আছে, কয়েক বছর আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে কুড়িল বিশ্বরোড়ের কাছে এক মাদকাসক্ত ধর্ষণ করেছিলেন। ঘটনাটি আমাদের দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিল। কী এক নৃশংস সমাজে আমরা বসবাস করছি যেখানে তুচ্ছ ঘটনা, সামান্য কিছু টাকা, রাগের বসে, প্রতিহিংসা চরিতার্থ, মতের অমিলে আমরা একজন অন্যজনকে হত্যা করছি। যাঁরা এ কাজ করছেন তাঁদের অতীতে কোনো অপরাধের রেকর্ডও হয়তো নেই, কিন্তু তাঁদের মধ্যে হত্যা করার মতো কি মনস্তত্ত্ব কাজ করছে। অপরাধ করার পর শাস্তির পরিণতিও কী তাঁদের জানা নেই। কোনো কিছুর বাছ-বিচার নেই, কাজ শুধু নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিকৃত মনোবৃত্তি চরিতার্থ করা। আমাদের কাছে এ প্রশ্নগুলো এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। কেন সমাজে নৃশংস হত্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং কিভাবে আমরা এমন হত্যাকাণ্ড কমাতে পারি। সমাজকে নিয়ে যাঁরা ভাবেন তাঁদের মতামত দিতে হবে, আইন প্রণেতার চিন্তা করতে হবে আইনের কোনো ঘাটতি আছে কি না, আইন বাস্তবায়নকারীদের সজাগ থাকতে হবে তাঁদের কোনো দুর্বলতার কারণে নৃশংসতা বাড়ছে কি না। সমাজে বসবাসরত প্রতিটি পরিবারের সদস্যদেরও ভাবতে হবে তাদের কারণে সমাজে নৃশংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না। দায় আমাদের সবার, তবে কারো বেশি এবং কারো হয়তো কম।   

সমাজের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা শুধু একত্রে বসবাস কিংবা সংঘবদ্ধতাকে বোঝাতে চাননি। এটি সমাজের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যাও নয়। সমাজ হতে হলে সহযোগিতা, অনুভূতিক্ষম জীব, সহমর্ির্মতা ইত্যাদি থাকাকে জোর দিয়েছেন। আজকে বলতে দ্বিধা নেই যে আমাদের মধ্য থেকে উপরোক্ত গুণাবলি শুধু কমেই যাচ্ছে না, ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার প্রভাব এবং পুঁজিবাদী ধ্যান-ধারণা আমাদের মধ্যে এক ভোগবাদী মনমানসিকতা তৈরি করেছে। সমাজে নীতিহীনতা যখন প্রকটভাবে দেখা দেয় তখন মানুষের মধ্য থেকে আদর্শগুলো আস্তে আস্তে লোপ পায়। নিয়ম-কানুনগুলো মেনে চলার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যায়। এগুলো মোকাবেলা করার জন্য অন্যান্য সিস্টেম যখন যথাযথভাবে কাজ না করে তখন সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। কাজেই সমন্বিত উদ্যোগ যেমন দরকার, তেমনি মানুষের গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটিকে অধিক গুরুত্ব দিতে হয়।

সমাজের নিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষণ কতগুলো কাঠামোবদ্ধ সংস্থা ও নিয়ম-কানুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং তা সঠিকও ছিল বলে মনে হয়। অধুনা সামাজিক পরিবর্তনের ফলে সমাজের নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষণ বহুমাত্রিকতায় রূপ নেওয়ায় শিশু-কিশোররা হেলায় হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবার ও সমাজ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং লাগামহীন অবস্থা মাদকের অবাধ বিচরণের জন্য দায়ী। আর মাদক আমাদের অনেক নৃশংসতার জন্ম দিচ্ছে। নির্ভরতা ও আসক্তিভিত্তিক এমন একটি দ্রব্য, যা সেবন না করতে পারলে শরীরের মধ্যে এক অস্থির পরিস্থিতির জন্ম দেয়। সহজলভ্য এ পণ্যটি ক্রয়ে সঙ্গে না থাকলেও পূরণ করতে হয়। তখন বেছে নিতে হয় অন্য পথ। অর্থ সংগ্রহের জন্য হত্যারও আশ্রয় নিতে হয়।

কারো কারো মনে এমন এক মনস্তত্ত্ব কাজ করে, যা বিকৃত আচরণ করতে উৎসাহিত করে। ব্যক্তির নিজস্ব কতগুলো শারীরিক ও মানসিক গুণাবলির কারণে অন্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানে ব্যর্থতা এবং সমাজ থেকে সৃষ্ট রীতিনীতির সঙ্গে মানিয়ে না চলতে পারা ব্যক্তির মনে এমন এক মানসিকতা তৈরি করে, যা তাকে নৃশংস হতে সাহায্য করে। এখানে ব্যক্তি নিজে যেমন দায়ী, তেমনি সমাজের অবস্থা ও ব্যবস্থাও সমানভাবে দায়ী। ব্যক্তির দায় তার পরিবারের ওপর বর্তায়। কেননা পরিবারই সামাজিকীকরণের প্রাথমিক মাধ্যম। কিন্তু আস্তে আস্তে সে যখন সমাজের বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে মিশতে থাকে তখন তার মধ্যে দ্বৈত মনোভাবের জন্ম দেয়। ব্যক্তি ও সমাজ কর্তৃক সঠিক নির্দেশনা না পাওয়া তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কিশোর বলি আর বয়স্ক বলি—কেউই সমাজের দ্বৈত মনোভাবে পিষ্ট হওয়া থেকে দূরে নয়।

সমাজকে যদি নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত করতে পারি এবং সবাইকে নিয়ম-কানুন মানতে বাধ্য করতে পারি, তাহলে অপরাধ ও অনিয়ম এমনিতেই কমে আসবে। মনোজগতের মনস্তত্ত্ব ঠিক করার জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। এখানে পরিবারের ভূমিকা মুখ্য। আর এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যা অন্যের জন্য শিক্ষণীয় হিসেবে কাজ করে। সমাজে বিরাজমান সামাজিক সমস্যাগুলো দূরীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আজকের রূঢ় বাস্তবতা শুধু আইন দিয়ে সমাজের অপরাধ নির্মূল করা যাবে না। আমাদের নজর দিতে হবে সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবেলার ওপর, পরিবারের ভূমিকাকে কার্যকর করার এবং এমন একটি সমাজ তৈরি করার, যেখানে শুধু একত্রে বসবাসই নয়, প্রত্যেক সদস্যের মধ্যে থাকবে সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থান। শুধু শারীরিক কাঠামো ও সংখ্যাতাত্ত্বিক মান যেমন শিক্ষার হার ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি দিয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিবেচনা করলে চলবে না বরং মনের গুণাবলি ও একটি গুণগত মানসম্পন্ন উন্নত সমাজ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। তাহলে আমরা নৃশংস আচরণ ও সামাজিক অপরাধকে কমাতে পারব।  

 লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা