kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

কভিডের সঙ্গে বসবাস সহজ করতে হবে

দেবী শ্রীধর

২৫ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কভিডের সঙ্গে বসবাস সহজ করতে হবে

এখন পর্যন্ত কভিড সংক্রমণ যতটা সম্ভব বিলম্বিত ও প্রতিরোধ করতে পারাই ছিল এই মহামারি মোকাবেলার সার্থক কৌশল। ২০২০ সালের শুরুতে সামান্য চিকিৎসা ও সীমিত পরীক্ষা নিয়ে শুরু হয় কভিড মোকাবেলা। তখন এর কোনো টিকা ছিল না। এরপর লকডাউনগুলোর কারণে অনেক মূল্য দিতে হলেও সংক্রমণ বিলম্বিত করার জন্য সময় নেওয়ার চেষ্টা কাজে লেগেছে।

বিজ্ঞাপন

এই সময়ে বিজ্ঞান কভিডকে একটি প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে অনেক কম গুরুতর ভাইরাসে এবং এর সংক্রমণকে সামান্য রোগে রূপান্তরিত করেছে। এর ফলে প্রধানত টিকাপ্রাপ্ত লোকদের জন্য বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। মোট কথা, বিজ্ঞান এর ধ্বংস ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।

তবে যে সময় আমরা কভিডের জন্য দায়ী ‘সার্স-কোভ-২’ নামের ভাইরাসটির গুরুতর সংক্রমণের চিকিৎসা ও প্রতিরোধে সাফল্য পেয়েছি, ঠিক সে সময়েই ভাইরাসটি আরো বেশি সংক্রামক হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ পরিসংখ্যান অফিসের মতে, ইংল্যান্ডে প্রতি ১৫ জনের একজন কভিড পজিটিভ। একই হার আরো তিনটি দেশে দেখা গেছে। এর মধ্যে সুখবর হলো ওমিক্রন ভেরিয়েন্ট কম গুরুতর রোগ এবং বেশি সংক্রমণ ঘটানোর পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি সেবার লোকজন আইসোলেশনে যাওয়ায় অনেক সরকারই এখন আইসোলেশন নীতি (সময়সীমা কমিয়ে আনা) পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে। এটা অনেক বেশি যুক্তিসংগত।

আসলে নীতিনির্ধারকদের কাছে এটা অনেকটা বরফ আচ্ছাদিত রানওয়েতে বিমান অবতরণের মতো অবস্থা। অবতরণের অপেক্ষায় থাকা বিমানের মতোই জনসাধারণের ধৈর্যের জ্বালানি কমে আসছে। ফলে দুই বছর ধরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবচয়ও হোল্ডিং প্যাটার্নে (আকাশে বিমানের চক্কর খাওয়ায়) আটকে আছে। অবতরণ অবশ্যই দরকার এবং আমাদের কাছে এর সরঞ্জামও রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা সাবধানতার সঙ্গে করতে হবে।

এখন স্পষ্টতই বিজ্ঞানীদের তিনটি শিবির ভিন্ন মতামত প্রকাশ করছে। তাদের মতামত সাধারণ মানুষের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে। যেমন—প্রথম দলটি এখনো ভাইরাসটিকে ২০২০ সালের মার্চ মাসের মতোই মারাত্মক হিসেবে দেখছে। দ্বিতীয় পক্ষ তো এই গণসংক্রমণকে শুরু থেকেই অনিবার্য নিয়তি এবং বিনা বাধায় সব ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে। তৃতীয় দলটি গবেষণা এবং টিকা ও চিকিৎসা পদ্ধতির তথ্য হালনাগাদ হওয়ার সঙ্গে নিজেদের অবস্থানেরও পরিবর্তন আনতে চায়। এই দলটিতে আমিও রয়েছি। এই দলটি কভিড-১৯-কে অন্যান্য সংক্রামক রোগের মতোই একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগে পরিণত করতে গিয়ে নিজেদেরও এগিয়ে নিয়েছে।

এই অগ্রসর যাত্রায় প্রথমত আমাদের কাছে এখন নিরাপদ ও কার্যকর টিকা এসেছে, যা বেশির ভাগ মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যু থেকে রক্ষা করে। যেমন—ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সির সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, টিকাবিহীন ব্যক্তিদের কভিড-১৯ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আশঙ্কা তিন থেকে আট গুণ বেশি। নিউ ইয়র্কেও দেখা গেছে, ওমিক্রন সংক্রমণে টিকাবিহীন ব্যক্তির হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি আট গুণ বেশি।

এখন যেহেতু বিদ্যমান টিকাগুলো গুরুতর রোগ সৃষ্টি কমালেও আমাদের সংক্রমিত হওয়া আটকায় না, তাই পরবর্তী প্রজন্মের টিকা উৎপাদনের জন্য বড় বিনিয়োগ করা হচ্ছে। আর পরবর্তী প্রজন্মের টিকার লক্ষ্য হলো, এর মাধ্যমে স্টেরিলাইজিং ইমিউনিটি (শরীরে রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী জীবাণু বা প্যাথোজেন নিষ্ক্রিয়করণ ক্ষমতা) সরবরাহ করা, যাতে দুই ডোজ টিকা পাওয়া ব্যক্তিদের সংক্রমিত হওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

আমাদের আরো অগ্রগতি হচ্ছে, এরই মধ্যে আমরা কভিড-১৯-এর চিকিৎসায় চমক জাগানো দুটি হোম ট্রিটমেন্ট পেয়েছি। প্রথমটি ফাইজারের প্যাক্সলোভিড এবং দ্বিতীয়টি মার্কের মলনুপিরাভির। উভয়টিকেই বিজ্ঞানীরা যুগান্তকারী হিসেবে দেখেন। কারণ প্রাথমিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দুটি বড়িই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর আশঙ্কা তাৎপর্যপূর্ণভাবে হ্রাস করেছে। বড়িগুলো ওমিক্রনের মতো নতুন ভেরিয়েন্ট দ্বারাও প্রভাবিত হয় না। এখন দরকার হচ্ছে এই অ্যান্টিভাইরাল ওষুধগুলো একটি ভালো ডায়াগনস্টিক সিস্টেমের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া। এর কারণ কভিড শনাক্ত হওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বড়িগুলো গ্রহণ করা দরকার। অর্থাৎ দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন পাওয়াটা নিশ্চিত করা জরুরি।

কভিড-১৯-এর সঙ্গে বসবাস করতে হলে আমাদের এখন আরো টিকাদান ও ভুল তথ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করা দরকার এবং হোম ট্রিটমেন্ট সুযোগগুলো দ্রুত নিশ্চিত করা দরকার। অনেক লোক বলেন যে এটি মহামারি থেকে এনডেমিকে (স্থানীয় প্রাদুর্ভাব) রূপ নিচ্ছে। কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে এনডেমিক ক্ষতিকারক নয়। এনডেমিক মানে হলো কোনো রোগ নির্মূল করা কঠিন হলে এর সঞ্চালন বা সার্কুলেশনকে মেনে নেওয়া। যেমন—ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও হাম হচ্ছে বিশ্বের কোনো কোনো অংশের এনডেমিক। অথচ এগুলোর সবই গুরুতর রোগ।

সার্স-কোভ-২-এর বিস্তার ধীর করা, এমনকি নির্দিষ্ট কিছু দেশে এর বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ করা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছিল। এই ধীরগতি দুটি রূপান্তরকারী অ্যান্টিভাইরাল বড়ি ব্যবহার এবং এর ছড়িয়ে পড়া, ঝুঁকি সম্পর্কে আরো বেশি জানা ও বোঝার সুযোগ দিয়েছে।

দুই বছর পর আমাদের হাতে চিকিৎসা ও প্রতিরোধের যেসব উপায় এসেছে তা কাজে লাগিয়ে ভাইরাসটির সঙ্গে বসবাসের আরো ভালো উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আমরা কভিড-১৯-এর প্রভাব কমিয়ে আনার উপায় বের করেছি। এখন সময় এসেছে একটি সমাজ হিসেবে পুনরুদ্ধার ও নিরাময় শুরু করা এবং এগিয়ে যাওয়া। আমাদের উচিত, যেভাবে আমরা অন্যান্য সংক্রামক রোগের হুমকি মোকাবেলা করেছি এই ভাইরাসটিকেও সেভাবে বিবেচনা করা।

প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্কগুলোর বদলে যাওয়া আর কত দিন চলবে। মানুষ সামাজিক জীব। আমাদের আলিঙ্গন করা, নাচ-গান করা এবং একে অপরকে মুখ দেখে চেনা ও হাসি দেখার প্রয়োজন রয়েছে। জনস্বাস্থ্য কোনো রোগের বিষয় নয়, এটি ব্যাপক অর্থে সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য, প্রয়োজন অনুযায়ী খরচের সামর্থ্য, পরিবারের ভরণপোষণ, বিরূপ আবহাওয়ায় টিকে থাকা এবং সমাজে অর্থপূর্ণ ভূমিকা থাকার মতো বিষয়গুলো রয়েছে। এগুলো নিশ্চিত করতে ভাইরাসটির সঙ্গে বসবাসের উপায়গুলো সহজলভ্য করতে হবে।

 

লেখক : অধ্যাপক, এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য)



সাতদিনের সেরা