kalerkantho

সোমবার ।  ১৬ মে ২০২২ । ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৪ শাওয়াল ১৪৪৩  

দিল্লির চিঠি

পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তানীতি এবং উপমহাদেশ

জয়ন্ত ঘোষাল

২৪ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তানীতি এবং উপমহাদেশ

পাকিস্তান জাতীয় নিরাপত্তানীতির ওপর একটি নথি সম্প্রতি গ্রহণ করেছে। গত ১৪ জানুয়ারি ইসলামাবাদে ইমরান খান এই নীতি ঘোষণা করেছেন। মূল রিপোর্টটির ৬২ পাতা  unclassified। ২০২১-এর ২৮ ডিসেম্বর ইসলামাবাদের ফেডারেল ক্যাবিনেট এই জাতীয় নিরাপত্তা দলিলটি গ্রহণ করেছে।

বিজ্ঞাপন

এই নথিতে বলা হয়েছে যে ২০২২ থেকে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছর এটি অবিচল থাকবে। প্রয়োজনে ক্যাবিনেট এটির সংশোধন করতে পারে। যদি সে রকম পরিস্থিতির দাবি ওঠে। এই উপমহাদেশে এই নথি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শুধু এই উপমহাদেশে নয়, আমেরিকা এবং চীনেও এ নিয়ে বিশেষ আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ পাকিস্তান অতীতে কখনোই এ ধরনের কোনো জাতীয় নিরাপত্তানীতি গ্রহণ করেনি। এই নথিতে যা বলা হয়েছে অর্থাৎ যেটুকু প্রকাশিত হয়েছে তার ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্যক্ত করেনি। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে কোনো কথা বলেনি।

এটা খুব ভালো করে জানা প্রয়োজন যে ভারত এই নথি নিয়ে কী ভাবছে। ভারতের সাধারণ মানুষ এটা নিয়ে যতটা না আলোচনা করছে তার চেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের নর্থ ব্লক, সাউথ ব্লকের অলিন্দে অলিন্দে। কূটনীতিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিঃসন্দেহে বিচার-বিশ্লেষণ করছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের নেতৃত্বে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজারি বোর্ড বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছে। এই রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা হলো, সেখানে কিন্তু পাকিস্তান ভারত সম্পর্কে কী বলছে। ভারতের সম্পর্কে পাকিস্তানের বিরোধ সুবিদিত। কারগিল যুদ্ধ ধরলে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের চার-চারবার যুদ্ধ হয়েছে। সুতরাং কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের যে অবস্থান তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও এ রকম একটা নথিতে পাকিস্তান কিন্তু লিখেছে যে পাকিস্তানের ইচ্ছা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতি সাধন করা। এই একটিমাত্র বাক্য কিন্তু  এই নথিতে রাখার একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে বলে অনেকেই মনে করছেন। তার কারণ ভারতের উল্লেখ এই নথির পঞ্চম অধ্যায় রয়েছে। সেখানে ১৪ বার ভারতের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ মন্তব্যই যথেষ্ট নেতিবাচক।

ভারত কখনো প্রত্যাশাও করে না যে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা নথিতে পাকিস্তান ভালো ভালো কথা বলবে। ভারতের বেশ কিছু কূটনীতিক, এমনকি পাকিস্তানে কাজ করেছেন ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে, ভারতের ডিপ্লোম্যাট টি সি এ রাঘবন বলেছেন, এটাও কিন্তু লক্ষ করার বিষয় যে পাকিস্তান যে নিরাপত্তানীতি ঘোষণা করেছে সেটা শুধু ভারতকেন্দ্রিক নয়। অর্থাৎ ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করা তার সঙ্গে একটা সম্পর্ক সেটা কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে বা না হবে সেটা নিয়ে কিন্তু আলোচনা করার জন্য এই নথিটা তৈরি হয়নি। পাকিস্তান গোটা বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে কী সম্পর্ক স্থাপন করবে এই নথিতে সেটা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করেছে। যেহেতু গোটা পৃথিবী এখন নানা রকমের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আর এই করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক বিপন্নতা পৃথিবীকে নতুন করে ভাবাচ্ছে, সেখানে এই রাঘবনের মন্তব্য কিন্তু যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব শোচনীয় সেটা কিন্তু এই নথিতে বারবার স্বীকার করা হয়েছে। এই নথিতে আরো বলা হয়েছে যে গোটা দেশের মধ্যে একটা ভার্টিক্যাল এবং হরাইজন্টাল অসাম্য দেখা দিয়েছে। সোজা কথায় ধনী আরো ধনী হচ্ছে, গরিব আরো গরিব হচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে পাকিস্তানের ইকোনমিক গ্রোথ রেট খুব খারাপ। বাংলাদেশ জিডিপি উন্নতির দিকে নিয়ে গেছে। ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের আর্থিক উন্নতির হার বেশি। সেখানে পাকিস্তানের অর্থনীতি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। একজন পাকিস্তানের কূটনীতিক আমাকে বলেছিলেন যে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মধ্যেও এটা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা হচ্ছে যে পাকিস্তানের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে না পারলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে না। কেননা অর্থনীতি উন্নত হলে প্রতিরক্ষা খাতেও খরচাটা বাড়ানো যাবে। এখন প্রতিরক্ষা খাতে খরচ বাড়ানো মানে দেশের সাধারণ অর্থনীতিকে আরো বিপন্ন করা। প্রতিরক্ষার জন্য শুধু চীন কিংবা আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র কেনা, ঋণ নেওয়া সেটা কোনো কাজের কথা নয়।

এমনিতেই আইএমএফের কাছে পাকিস্তান বেশ কয়েকবার ব্ল্যাকলিস্টেড হয়েছে। আইএমএফের শর্ত ভঙ্গ করার দায়ে পাকিস্তান অভিযুক্ত হয়েছে। চীন বারবার পাকিস্তানকে এই আইএমএফের কলঙ্ক থেকে বাঁচিয়েছে সমর্থন জানিয়ে। সৌদি আরবও আইএমএফের হাত থেকে পাকিস্তানকে একাধিকবার বাঁচিয়েছে।

ভারত মনে করে যে বাণিজ্যের ব্যাপারে পাকিস্তান আগ্রহ প্রকাশ করলেও ভারতের সঙ্গে তারা বাণিজ্য করতে চায়—এ কথা সরাসরি তারা বলেনি। কিন্তু তারা বলেছে, পাকিস্তানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের দ্বার প্রসারিত করতে চায়। কিন্তু ভারতের কূটনীতিকদের বক্তব্য হলো, এটা ভারতের কাছে খুব একটা অগ্রাধিকার নয়। বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশকে ভারতের অনেক বেশি প্রয়োজন। পাকিস্তানের সঙ্গে যদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি না হয়, তাহলেও ভারতের এই মুহূর্তে খুব একটা বেশি কিছু যায়-আসে না। এখন এই নথি প্রকাশের পর সম্পর্ক ভালো করতে ভারত কি পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যাক চ্যানেল ডিপ্লোমেসি বাড়াবে? ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যে আলোচনা শুরু করেছে। ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার অজিত ডোভালের সঙ্গে সেটা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর একাংশের সরাসরি কথাবার্তা চলছে। আফগানিস্তানে তালেবান সরকার গঠনের পর ভারতের দিক থেকেও পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলাটা জরুরি ছিল। সরাসরি পাকিস্তানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে ভারত যদি তালেবানের ঝামেলাটা সামলাতে পারে, তবে কি সেটা বুদ্ধিমানের পরিচয় হবে না?

চীন পাকিস্তানের পেছনে খুব শক্তিশালীভাবে আছে। তারা পাকিস্তানকে সব সময় সঙ্গে পায়। পাকিস্তানি নথিতে দেখা গেছে যে আমেরিকার সঙ্গে তাদের যে সম্পর্কটা ছিল ঠাণ্ডাযুদ্ধের সময় সেটা তখন ছিল সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধ। পাকিস্তানের সাহায্য নিয়ে আমেরিকা লড়েছিল। তারপর তাতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে এই নথিতে কটাক্ষ আছে, চিন্তা আছে, উদ্বেগ আছে। আর সেই কারণে এমনকি আমেরিকার সঙ্গে ভারতের পরমাণু চুক্তি নিয়ে অতীতে শঙ্কা আছে। তার জন্য পাকিস্তান আরো বেশি করে চীনের দিকে ঝুঁকেছে এমনটা পাকিস্তানি বিশ্লেষণ। এর পাশাপাশি আবার তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কে কিছুটা অবনতি দেখা যাচ্ছে। সীমান্তে বেড়া দিয়ে তালেবানি অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে চায় পাকিস্তান। তালেবান সরকার এই ফেন্সিংয়ের বিরোধিতা করছে।

ভারতে কূটনীতিকদের একটা বড় অংশ মনে করছে যে পাকিস্তান এখন খুব দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।   চীনের ওপর পাকিস্তান নির্ভরশীল। চীন পাকিস্তানকে ব্যবহার করে। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য আছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ না করে একটা আলোচনা বা বোঝাপড়ার বিকল্প তারাও চাইছে। চীনও এটা চায় না যে আমেরিকা ও ভারতের সম্পর্ক এতটাই হয়ে যাক, যেখানে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক একেবারে মাটিতে মিশে যাবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পাকিস্তান সম্পর্কে কী অবস্থান নেবে সেটাও একটা দেখার বিষয়।

বাংলাদেশ এই ব্যাপারে কোনো কথা প্রকাশ্যে বলছে না। কিন্তু ইমরান খান শেখ হাসিনার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চাইছেন। একাধিকবার শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। শেখ হাসিনাকে পাকিস্তানের আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পাকিস্তানের যে হাইকমিশনার ঢাকায় আছেন তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন। শেখ হাসিনা যদি পাকিস্তানে যান, তাহলে সেটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা হবে, তার কারণ একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের পর এখনো বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রনেতা পাকিস্তানে যাননি। পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভূমিকা নিয়ে এখনো ক্ষমা চায়নি। পাকিস্তান যদি তাদের কৃতকর্মের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চায়, সেই পরিস্থিতি যদি আগামী দিনে উদ্ভূত হয়, সেখানে এ ব্যাপারে পাকিস্তানের ওপর চাপ দিতে পারে চীন। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চাইছে। চীন বাংলাদেশকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে আগ্রহী।

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে সেটাও একটা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক জানার বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশ দেখতে চাইছে যে ভারত পাকিস্তানের সম্পর্কটা কোন দিকে যায়।     

এখন বলা যেতে পারে পরিস্থিতিটা এককথায় বেশ একটু ফ্লুইড অবস্থার মধ্যে রয়েছে। পাকিস্তানের ভূমিকার ওপর কড়া নজর রেখেছেন নরেন্দ্র মোদি। শুধু এই নথির ভিত্তিতে পাকিস্তানের সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে আলোচনা করতে যাবে এমনটা নয়। বোধ হয় একটা ব্যাক চ্যানেল ডিপ্লোমেসি অথবা একটা ট্র্যাক ডিপ্লোমেসির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ইমরানের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক কোন দিকে যায় সেটার দিকে ভারত নজর রেখেছে। কারণ ভারত এটা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে যে পাকিস্তান আসলে চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। আরেকটা ইমরান খান জন্ম নিতে পারে; কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভূমিকা সব সময় থাকবে। সুতরাং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ব্যাক চ্যানেল ডিপ্লোমেসি করাটা অনেক ভালো। কিন্তু পাকিস্তান ভারতের কাছে ৩৭০ ধারার অবলুপ্তির অনুরোধ করছে। সেটা প্রত্যাহার করা হয়তো নরেন্দ্র মোদির পক্ষে সম্ভব নয়। সেটা পাকিস্তানও হয়তো জানে। কিন্তু কাশ্মীর নিয়ে ভারত যদি কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পাকিস্তান কিছুটা নরম হবে বলে বার্তা দেওয়া হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন যে সমাধান সূত্র কী হবে সেটা পরের কথা। কিন্তু এই যে আলোচনায় বসার আগ্রহ পাকিস্তানের আছে, সেটা ভারতের জন্য মন্দ নয়। তার কারণ ভারত কিন্তু চীন এবং পাকিস্তান এই দুটি ফ্রন্টের আগামী দিনের লড়াই করার জন্য তৈরি নয়। ভারতের একজন নাগরিক হিসেবে আমার মনে হয়, আজ যে করোনা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেখানে একটা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ করার চেয়ে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান এগুলো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং যদি শুভবুদ্ধির উদয় হয়, তাহলে আর যা-ই হোক রাজনৈতিক কারণে কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করে বেশি আস্ফাালন দেখিয়ে ভোটব্যাংকে সুড়সুড়ি দেওয়ার চেয়ে এই মুহূর্তে অনেক বেশি জরুরি এই উপমহাদেশের শান্তি ও সংহতি। কিন্তু পাকিস্তান হিন্দুত্ববাদী শক্তির উত্থান, তার জন্য যে তাদের পারসেপশন সে কথাও উল্লেখ করতে ভোলেনি।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি

 



সাতদিনের সেরা