• ই-পেপার

বইমেলা নিয়ে কিছু প্রস্তাব

  • রামেন্দু মজুমদার

সমাজের সুস্থতা নিয়ে ভাবতে হবে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সমাজের সুস্থতা নিয়ে ভাবতে হবে

মোদ্দাকথা হচ্ছে, সমাজ মোটেই সুস্থ অবস্থায় নেই। ৩ জুনের সব কটি জাতীয় দৈনিকে একটি খবর খুব গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে, যেটির মূল ঘটনা উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত তিন পুত্র ও এক কন্যার জননী নূরজাহান বেগমের অপমৃত্যু। না, কেউ তাঁকে খুন করেনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫, ঢাকার মিরপুর এলাকায় একাকী থাকতেন একটি কামরায়, সেই কামরায়ই শয্যাশায়ী অবস্থায় মারা গেছেন। পাশের কামরায়ই থাকেন তাঁর কন্যা, যিনি উচ্চশিক্ষিতা, সাত বছর আগে যিনি তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন, বিধবা এবং নিঃসন্তান অবস্থায় তিনি তাঁর মাকে নিজের ফ্ল্যাটে এনে রেখেছেন, খাবার পৌঁছে দিতেন মায়ের কামরায়, কিন্তু মায়ের স্বাস্থ্যের তেমন একটা খবর রাখতেন না, মা যে বেঁচে নেই, সেটিও তিনি টের পেয়েছেন নাকি দিন দুয়েক পরে, মায়ের ঘরে কোনো সাড়াশব্দ নেই দেখে। মেয়ে ভেবেছিলেন মা বুঝি অসুস্থ, তাই নার্সিং হোম থেকে একজন নার্সকে ডেকে এনেছিলেন; নার্সটি কামরার ভেতর ঢুকে দেখেন নূরজাহান বেগম অসুস্থ নন, মৃত; শুধু মৃত নন, তাঁর দেহে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ৯৯৯ নম্বরে খবর দিলে পুলিশের লোকজন এসে মৃত দেহটি উদ্ধার করে। প্রতিবেশীদের বক্তব্য, নূরজাহান বেগমকে তাঁরা দেখেননি এবং তাঁর কন্যা মহিলাটিও, যিনি একটি স্কুলের শিক্ষিকা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিশতেন না; কারো কারো ধারণা, মানসিকভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। একটি পত্রিকা শিরোনাম দিয়েছে এই ভাবে, ‘সন্তানের অবহেলায় রত্নগর্ভা মাতার মৃত্যু’। তা অনেক প্রকার মন্তব্যই করা যাবে বৈকি, কিন্তু মূল সত্যটি হলো এই যে ঘটনাটি সত্যি সত্যি ঘটেছে এবং সবকিছুর আগে সেটি এই বাস্তবিকতাকেই তুলে ধরে যে আমাদের এই ‘উন্নত’ সমাজে ঘনিষ্ঠতম মানবিক সম্পর্কগুলোও এখন আর অক্ষত নেই। অনেক ক্ষেত্রেই ভেঙে পড়েছে। অসুস্থ সমাজে মানুষের পক্ষে সুস্থ থাকা তো অবশ্যই, টিকে থাকাটাও চ্যালেঞ্জের মুখে গিয়ে পড়েছে। আট বছরের শিশু রামিসা তাই ৩০ উত্তীর্ণ বিবাহিত প্রতিবেশী পশুকেও-ছাড়িয়ে যাওয়া যুবকের নৃশংসতার শিকার হয়; ৭৫ বছরের বৃদ্ধা মা নূরজাহান বেগমের খোঁজ রাখতে ব্যর্থ হন তাঁরই আদর-যত্নে মানুষ হওয়া সমাজে সম্মানিত সন্তানরা।

সমাজের সুস্থতা নিয়ে ভাবতে হবেএকই দিনের আরেকটি খবর, রাজধানীর উত্তর মুগদাপাড়ার একটি ভাড়া বাসা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর হোসেন শুভর (৪৫) অর্ধগলিত ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের। কোনো কোনো পত্রিকা এই খবরটিকে নূরজাহান বেগমের খবরকে পাশাপাশি রেখেছে—নূরজাহান বেগমের খবরকে বড় করে দিয়ে, তানভীর হোসেন শুভর খবরটি কিছুটা ছোট আকারে সাজিয়ে। শুভর তো বস্তুগত কোনো কিছুর অভাব ছিল না। ব্যাংকে উচ্চপদে চাকরি করতেন, রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পৈতৃক গৃহে থাকার কথা নিরাপদ আশ্রয়ে, কিন্তু তিনি একাকী থাকতেন একটি ভাড়া বাসায়। বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল বছর দশেক আগে। মরণের সাধ তো মানুষের এমনি এমনি হয় না, নিশ্চয়ই অত্যন্ত নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন হতাশায়। হতাশাও একটি রোগ বটে; জীবনের ওপর সে ছায়া ফেলে এবং মৃত্যুকে সুযোগ করে দেয় ওত পেতে থাকতে, সুযোগের অপেক্ষায়।

এক পাষণ্ডের হাতে শিশু রামিসার মৃত্যু, সচ্ছল সন্তানদের উপেক্ষায় নূরজাহান বেগমের গলিত লাশে পরিণত হওয়া, নিঃসঙ্গতার বোঝা বহন করতে অসমর্থ হয়ে তানভীর হোসেন শুভর আত্মহত্যা—ঘটনাগুলো আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন অবশ্যই, কিন্তু আরো বহু মর্মন্তুদ ঘটনার সঙ্গে এই তিনটিও একই বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত, সেটি হলো পুঁজিবাদী সমাজে উন্নতির গভীরে মানবিক বিপর্যয়।

কন্যাশিশু ধর্ষণের নিত্যনতুন খবর এড়ানোর উপায় থাকে না, প্রত্যহ পাওয়া যায়। ২৫ মের একটি দৈনিকের খবর, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে সাতটি শিশু ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির শিকার’। সাত শিশু ধর্ষণের ওই ঘটনাগুলোর মধ্যে তিনটির বিবরণ অন্য একটি পত্রিকায় এসেছে এই ভাবে—১. গাজীপুরে শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা এক যুবকের গ্রেপ্তার হওয়ার। ২. রাজধানীর ভাসানটেকে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা, কারাগারে রিকশাচালক; শিশুটি নিজেদের বাড়ির কাছে খেলছিল, রিকশাচালক তাকে অপহরণ ও ধর্ষণ করে। ৩. ছয় বছরের শিশুকে নিপীড়নের অভিযোগ, লাকসামে। এলাকাবাসীর ভাষ্য মতে, ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছিল প্রভাবশালী রাজনৈতিকমহল থেকে। থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিটিকে (বয়স তাঁর ৭৩) গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। খবর তিনটি পড়লে মনে হবে তিনটি শিশু পাশাপাশি শায়িত রয়েছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার হাতে চরম নৃশংসতায় নিপীড়িত হয়ে। সব ঘটনাই যে প্রকাশ পায় তা তো নয়, সামাজিক সম্ভ্রম হারানোর আতঙ্কে পারতপক্ষে মা-বাবা থানায় যান না। তা ছাড়া থানা নিরাপদও নয়, সেখানে গেলে অপমানিত হওয়ার শঙ্কাও থাকে।

ওই দিনের শিশু ধর্ষণের অপর একটি ঘটনার বিবরণ এই রকমের—নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় নিজেদের বাড়ির কাছেই বিকেলবেলায় শিশুটি খেলছিল, হিরো ও সোহেল নামের দুই যুবক কৌশলে তাকে ডেকে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ করে। আর্তনাদ শুনে স্থানীয় লোকজন শিশুটিকে উদ্ধার করে; সোহেল পালিয়ে যায়, জনতা হিরোকে আটক করে এবং পিটুনি দেয়। শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মুন্সীগঞ্জ হাসপাতালে, অবস্থার অবনতি ঘটলে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যালে। জনতার হাত থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় হিরোকে উদ্ধার করার জন্য অতিরিক্ত পুলিশের প্রয়োজন পড়ে। থানায় গিয়ে রাতেই মামলা করেন শিশুটির মা। ওই একই অপরাধে জনতার হাতে ধরা পড়েছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় মসজিদের এক ইমাম এবং জনতা যথারীতি তাঁকে গণপিটুনি দিয়েছে।

জনতা যে অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে শায়েস্তা করে তার কারণ দুটি। প্রথমত, তাদের ক্রোধ; দ্বিতীয়ত, পুলিশের ওপর তাদের অনাস্থা। জনতা মনে করে, পুলিশ এসে অপরাধীকে উদ্ধার করবে এবং থানায় গিয়ে সে উকিল লাগিয়ে আইনের মারপ্যাঁচে এবং অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যাবে। শাস্তিটা তাই নগদানগদি মিটিয়ে ফেলাই ভালো।

লিখতে লিখতেই পত্রিকায় পড়লাম কন্যাশিশু ধর্ষণের আরেক খবর। সেটি একটু ভিন্ন মাত্রার। শিরোনামটি এই রকমের—‘শিশু ধর্ষণের শাস্তি একটি থাপ্পড় ও ক্ষমা প্রার্থনা’। ভেতরের খবর বলছে, লক্ষ্মীপুরের রামগতি থানায় ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত বিএনপি নেতা বেলালকে একটি থাপ্পড় দিয়ে ভুক্তভোগীর বাবার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে এবং পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারকে থানায় করা মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। রায়টি এসেছে পৌর বিএনপির সেক্রেটারির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সালিশি বৈঠক থেকে। বেলালের বিরুদ্ধে অভিযোগ চকোলেটের লোভ দেখিয়ে সাড়ে তিন বছরের একটি কন্যাশিশুকে ধর্ষণের। অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই ধরনের কাজে নাকি অনভ্যস্ত নন; এর আগে তিনি নিজের ভাবিকে, এমনকি পুত্রবধূকেও আক্রমণ করেছিলেন। ওদিকে ভুক্তভোগী পরিবার অপরাধীকে ক্ষমা করবে কী, ভয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বলে জানা গেছে। একই দিনে ঘটা আরেকটি খবর, পাবনার সদর উপজেলায় এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যা করার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়ার। মেয়েটি নবম শ্রেণিতে পড়ত। এ ক্ষেত্রে ধর্ষক ও হত্যাকারী অন্য কেউ নয়, মেয়েটির আপন চাচাতো ভাই। তাদের ভেতর নাকি প্রেমের সম্পর্ক ছিল; তবে মেয়েটির সঙ্গে ছেলেটির কথা-কাটাকাটি হয় এবং তারই পরিণতিতে চাচাতো ভাইটি তাকে প্রথমে ধর্ষণ, পরে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে। অবশেষে বস্তাবন্দি অবস্থায় লাশটিকে নদীতে ফেলে দিয়ে আসে। সকালবেলা কয়েকজন কৃষক কাজে যাওয়ার সময় একটি ভাসমান বস্তা দেখতে পান; খুলে দেখেন ভেতরে একটি মৃতদেহ। প্রধান অভিযুক্তসহ তিনজন তরুণকে এবং তাদের ব্যবহৃত মোটরগাড়িটিকে যে আটক করা হয়েছে, পুলিশের সেই সাফল্যের কথাও অবশ্য সংবাদ বিবরণীটিতে রয়েছে। একটি গবেষণা প্রতিবেদন জানাচ্ছে যে মে মাসে ৮৩টি ধর্ষণের খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে ৫৭ জনই শিশু।

শিশুরা নিরাপদে নেই এমনকি তাদের স্কুলেও। ঢাকারই এক স্কুলে—ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজ তার নাম, আত্মহত্যা করেছে দশম শ্রেণির ছাত্রী সাবিকুননাহার। আত্মহত্যার কারণ স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তাকে শুধু নয়, তার মাকেও স্কুলে ডেকে এনে ভীষণ রকমের অপমান করেছেন। সাবিকুনের অপরাধ, প্রস্তুতির অভাবে মডেল টেস্ট পরীক্ষার খাতায় সে কিছু লিখতে পারছিল না, বসে বসে আঁকাজোখা করছিল। সেটি দেখতে পেয়ে এক শিক্ষিকা তাকে তার খাতাসহ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যান। চেয়ারম্যান ছাত্রীটিকে গালমন্দ তো করেনই, তার মাকে ডেকে এনে তার সামনেই মেয়েটিকে কান ধরে স্কুল ক্যাম্পাসে ঘোরানোর ব্যবস্থা নেন। নিজের এবং মায়ের অপমানে বিদ্ধ হয়ে সাবিকুননাহার বাসায় ফিরে আত্মহত্যা করেছে।

 

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রাজধানী ঢাকায় সুপেয় পানির সংকট

ড. হারুন রশীদ

রাজধানী ঢাকায় সুপেয় পানির সংকট

ভোর ৫টা। অ্যালার্মে নয়, কলের শব্দে ঘুম ভাঙে ঢাকার অনেক পরিবারে। কারণ কখন পানি আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই পানি এলেই বালতি, ড্রাম, বোতল, যা আছে সব ভরে রাখতে হয়। কোনো কোনো বাসায় রাত ২টায় মোটর চালু করা হয়। কারণ ওই সময়ই নাকি একটু বেশি চাপ পাওয়া যায়। যে শহরে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে, সেই শহরের হাজারো মানুষ আজও পানির অপেক্ষায় দিন শুরু করে। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।

পানি ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া আর মৌলিক নাগরিক অধিকার নয়, বরং ভাগ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে শহর আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে মেট্রো রেল, এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা উঁচু ভবনের গর্ব করে, সেই শহরের বহু মানুষ প্রতিদিন পানির জন্য সংগ্রাম করে। উন্নয়নের এই বৈপরীত্য আমাদের নগর পরিকল্পনার গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে।

ঢাকার পানিসংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অব্যবস্থাপনা এবং অদূরদর্শিতার ফল। রাজধানীর জনসংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সেভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। একদিকে নতুন নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠছে, অন্যদিকে একই পুরনো পাইপলাইন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে লাখো মানুষকে।

সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের পরিস্থিতি এই সংকটকে আরো স্পষ্ট করেছে। মেট্রো রেল চালুর পর এলাকাটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। নতুন বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে, বেড়েছে জনসংখ্যা। কিন্তু পানির উৎপাদন ও সরবরাহ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে উন্নত যোগাযোগের সুবিধা ভোগ করতে গিয়ে মানুষ পড়েছে আরেক মৌলিক সংকটে।

এই ঘটনাটি শুধু মিরপুরের নয়, এটি পুরো ঢাকার উন্নয়ন দর্শনের এক প্রতিচ্ছবি। আমরা প্রায়ই অবকাঠামো নির্মাণকে উন্নয়নের সমার্থক মনে করি। কিন্তু একটি শহর শুধু রাস্তা, সেতু বা রেলপথ দিয়ে টিকে থাকে না। একটি শহর টিকে থাকে পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর। এই মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত হলে চকচকে উন্নয়নও খুব দ্রুত ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

বিশ্বের বেশির ভাগ মহানগর এখন পানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। কারণ জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের অন্যতম বড় সংকট হবে নিরাপদ পানির সংকট। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়ণের কারণে এই চাপ আরো বাড়বে।

ঢাকার ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ আরো গভীর। রাজধানীর পানির বড় অংশ এখনো ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। যে পানি হাজার বছর ধরে মাটির নিচে জমা হয়েছে, তা আমরা কয়েক দশকেই শেষ করে ফেলছি। প্রকৃতি যে গতিতে সেই ভাণ্ডার পূরণ করতে পারে, আমরা তার চেয়ে বহুগুণ দ্রুত তা খালি করছি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলাধার ধ্বংসের প্রবণতা। একসময় ঢাকার চারপাশে অসংখ্য খাল, বিল ও জলাভূমি ছিল। এগুলো শুধু বৃষ্টির পানি ধারণ করত না, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। আজ সেই জলাধারের বড় অংশই ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাছে, মাটির নিচে পৌঁছতে পারছে না।

পানিসংকটের আরেকটি দিক খুব কম আলোচিত হয়। সেটি হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা গভীর নলকূপ বসায়, জারজাত পানি কেনে কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা করে। কিন্তু নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সামনে সেই সুযোগ থাকে না। ফলে একই শহরে কেউ দিনে ২৪ ঘণ্টা পানি পায়, আবার কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও এক বালতি পানি সংগ্রহ করতে পারে না। এটি শুধু সেবার বৈষম্য নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।

বিশ্বের অনেক শহর এই সংকট মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সিঙ্গাপুর চারটি উেসর ওপর নির্ভর করে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে—বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহৃত পানি, আমদানি করা পানি এবং সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে ব্যবহার। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে নতুন ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ কার্যত বাধ্যতামূলক। জাপানের টোকিওতে পাইপলাইনের পানির অপচয় পৃথিবীর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, সংকটের সমাধান প্রযুক্তিতে যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সুশাসনেও।

বাংলাদেশের জন্যও এখন নতুন চিন্তার সময় এসেছে। শুধু নতুন পানি শোধনাগার নির্মাণ করলেই হবে না। সমন্বিত নগর জলনীতি প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি নতুন আবাসিক প্রকল্প অনুমোদনের আগে পানি সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। বড় ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা আইনগতভাবে নিশ্চিত করা দরকার। পাইপলাইনের লিকেজ কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নদীর পানি শোধনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

একই সঙ্গে নগর উন্নয়নের দর্শনেও পরিবর্তন জরুরি। ঢাকার ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমানো ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিকল্প নগর, পরিকল্পিত উপশহর এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। দেশের সব সুযোগ-সুবিধা যদি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক থাকে, তাহলে পানি থেকে শুরু করে প্রতিটি নাগরিক সেবার সংকট আরো তীব্র হবে।

নাগরিকদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা প্রায়ই পানি অপচয় করি, কল খোলা রেখে দিই, লিকেজ মেরামত করি না, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কথা ভাবি না। অথচ পানি সাশ্রয় এখন শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

ঢাকার পানিসংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে। উন্নয়ন মানে শুধু দৃশ্যমান স্থাপনা নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা। একটি শহরের সাফল্য মাপা উচিত তার উঁচু ভবনের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষ কত সহজে নিরাপদ পানি, নির্মল বাতাস এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবন পাচ্ছে, তা দিয়ে।

আমরা যদি আজও এই সংকটকে সাময়িক সমস্যা ভেবে পাশ কাটিয়ে যাই, তাহলে ভবিষ্যতের ঢাকা আরো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। তখন হয়তো পানির জন্য সামাজিক সংঘাতও সৃষ্টি হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পানি হবে সবচেয়ে কৌশলগত সম্পদ। সেই বাস্তবতায় এখনই পরিকল্পনা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

একটি সভ্য শহর তার নাগরিককে আকাশছোঁয়া ভবনের প্রতিশ্রুতি দেয় না, দেয় নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। সেই নিশ্চয়তার প্রথম শর্তই হলো বিশুদ্ধ ও পর্যাপ্ত পানি। ঢাকার উন্নয়নের গল্প তখনই পূর্ণ হবে, যখন কোনো নাগরিককে ভোররাতে কলের সামনে দাঁড়িয়ে পানির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। উন্নয়নের প্রকৃত পরিচয় সেখানেই।

 

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

মেসি থেকে ইয়ামাল : বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রজন্মের মহারণ

আবু সাঈদ মো. নাজমুল হায়দার

মেসি থেকে ইয়ামাল : বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রজন্মের মহারণ

বিশ্বকাপের ফাইনাল কখনোই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক স্মৃতি, জাতিগত পরিচয়, অর্থনীতি, কূটনীতি ও জাতীয় আকাঙ্ক্ষা। ২০ জুন রবিবার রাত ১টায় নিউজার্সিতে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে স্পেনের। বিশ্বের শীর্ষ দুই দলের এই লড়াইয়ে একদিকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণ, অন্যদিকে সবচেয়ে দুর্ভেদ্য রক্ষণ। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা করেছে ১৯ গোল, আর স্পেন হজম করেছে মাত্র একটি গোল। লিওনেল মেসির প্রতিষ্ঠিত যুগের সামনে এখন লামিন ইয়ামালের নতুন প্রজন্ম।

আর্জেন্টিনা নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। সেমিফাইনালে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে ইংল্যান্ড এগিয়ে গেলেও ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান। অতিরিক্ত সময়ে লাউতারো মার্তিনেজ করেন জয়সূচক গোল। দুটি গোলই তৈরি করে দেন মেসি। প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করেন একক নৈপুণ্য দেখানো পুরনো মেসি নন, বরং বুদ্ধিমত্তা, সময়জ্ঞান ও নেতৃত্ব দিয়ে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়া এক অভিজ্ঞ অধিনায়ক।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসিকে ৮.০ রেটিং দিয়েছে সোফাস্কোর। তিনি ৯৪ বার বল স্পর্শ করেছেন, চারটি গুরুত্বপূর্ণ পাস দিয়েছেন এবং দুটি বড় সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। ৩৯ বছর বয়সে নিজে গোল না করেও তিনিই সেমিফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন। বিশ্বকাপে তাঁর অ্যাসিস্ট এখন রেকর্ড ১২টি, সঙ্গে রয়েছে ২১ গোল। শ্রেষ্ঠত্ব শুধু দ্রুতগতির নয়, অনেক সময় তা অন্যদের আগে সুযোগটি দেখতে পাওয়ার ক্ষমতা। তবে এটি নিশ্চিত করে বলা যায়, স্পেন মেসির বিদায়ি সংবর্ধনায় অংশ নিতে ফাইনালে নামছে না। ফ্রান্সের বিপক্ষে তাদের ২-০ গোলের সেমিফাইনাল জয় ছিল নিয়ন্ত্রিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নিখুঁত। রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমো মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করেছেন, আর ইয়ামাল তারুণ্যের সাহস ও সৃষ্টিশীলতা যোগ করেছেন।

স্পেন টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত। এবারের বিশ্বকাপে তাদের ছয় জয় ও এক ড্র। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সাত ম্যাচের সব কটিতে জয়ী এবং বিশ্বকাপে টানা ১৩ ম্যাচ অপরাজিত। ফলে এটি শুধু ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার লড়াই নয়, এটি সংগঠিত দলীয় কাঠামোর বিপরীতে আবেগ ও প্রতিরোধের শক্তি। একই সঙ্গে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী তারকার সঙ্গে আগামী দিনের সম্ভাব্য মহাতারকার দ্বৈরথ।

এই বিশ্বকাপ ফুটবলের বৈশ্বিক পরিসরকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি শহরে প্রথমবারের মতো ৪৮ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১০৪ ম্যাচের বিশ্বকাপ। গ্রুপ পর্বে দর্শকসংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪৬ লাখ, আর প্রথম ৯৬ ম্যাচে তা ৬২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি হয়েছে। গড়ে প্রতি ম্যাচে ৬৫ হাজারের বেশি দর্শক উপস্থিত ছিল।

বৃহৎ আয়োজন সব সময় উন্নত আয়োজনের নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এটি আরো বেশি দেশ, গল্প ও বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ফিফা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, টুর্নামেন্টটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ৮০.১ বিলিয়ন ডলারের উৎপাদন সৃষ্টি করতে পারে, বিশ্ব জিডিপিতে যোগ করতে পারে ৪০.৯ বিলিয়ন ডলার এবং প্রায় আট লাখ ২৪ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।

বিমান সংস্থা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, সম্প্রচারমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারকরা এর সুবিধা পেয়েছে। তবে উচ্চ টিকিটমূল্য, যানজট, নিরাপত্তা ব্যয় ও সুবিধার অসম বণ্টন মনে করিয়ে দেয়—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সব সময় অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করে না। প্রশ্ন শুধু কত অর্থ আয় হয়েছে, তা নয়; কারা লাভবান হয়েছে এবং টুর্নামেন্ট শেষে কী স্থায়ী অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান থেকে যাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বরাজনীতিও ফুটবলের সঙ্গে মিশে গেছে। তিন আয়োজক দেশকে সীমান্ত, ভিসা ও নিরাপত্তা নিয়ে সমন্বয় করতে হয়েছে। ইরান দলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রবেশ বিধি-নিষেধ এবং ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচে ফকল্যান্ডস বা মালভিনাস সংঘাতের স্মৃতি দেখিয়েছে, ফুটবল উত্তেজনা কমাতে পারলেও ইতিহাস মুছে দিতে পারে না। প্রকৃত ঐক্যের জন্য প্রয়োজন সমান আচরণ, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা।

এই বিশ্বকাপ এক অসাধারণ প্রজন্মের ফুটবল মহারথীদের বিদায়ের বার্তাও বহন করছে। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, লুকা মদরিচ, ম্যানুয়েল নয়্যার ও গিলের্মো ওচোয়ার মতো খেলোয়াড়রা ক্যারিয়ারকে এমন দীর্ঘতায় নিয়ে গেছেন, যা একসময় অকল্পনীয় ছিল। তাঁদের ক্যারিয়ার ও ক্রীড়ানৈপুণ্য  ব্যক্তিগত শৃঙ্খলার পাশাপাশি আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞান, পুষ্টি ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নতির ফল। অন্যদিকে ইয়ামাল, জুড বেলিংহাম, কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও আর্লিং হালান্ড সগর্বে জানিয়ে দিচ্ছেন—এক প্রজন্ম বিদায় নিলে ফুটবল থেমে থাকে না।

বাংলাদেশ বিশ্বকাপে নেই, কিন্তু আবেগে দেশটি বিশ্বকাপের অংশ। ছাদে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা, চায়ের দোকান, মাঠে-ঘাটে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফুটবলের কৌশল বিশ্লেষণ এবং পরিবারে ফুটবল নিয়ে তর্কবিতর্ক খেলার প্রতি আমাদের গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। অথচ ২০২৬ সালের জুনে ফিফা র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম। এই ব্যবধান প্রতিভার অভাব নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।

বাংলাদেশের প্রয়োজন স্কুল ফুটবলে বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতামূলক জেলা লীগ, দক্ষ প্রশিক্ষক, উন্নত মাঠ, ক্রীড়াবিজ্ঞানের আধুনিক সুবিধা, নারী ফুটবলের প্রসার, স্বচ্ছ ফেডারেশন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ। বিশ্বকাপ যেন শুধু জার্সি বিক্রি ও রাত জাগার উপলক্ষ না হয়—এটি একটি কার্যকর জাতীয় ফুটবল কাঠামো গড়ার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠুক।

আর্জেন্টিনা চাইবে চতুর্থ শিরোপা এবং স্পেন চাইছে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ও নতুন সোনালি যুগের স্বীকৃতি। তবে ফলাফল যা-ই হোক, এই ফাইনালের শিক্ষা স্পষ্ট—যখন প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ, নেতৃত্ব ও জন-আস্থা একসঙ্গে কাজ করে, প্রতিভা তখনই ইতিহাসে পরিণত হয়। এই শিক্ষা বুয়েনস এইরেস ও মাদ্রিদের মতো বাংলাদেশের ঢাকার জন্যও সমান প্রাসঙ্গিক।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বান্দরবানে বন্যা ও পাহাড়ধস : একটি সতর্কবার্তা

সুমিত বণিক

বান্দরবানে বন্যা ও পাহাড়ধস : একটি সতর্কবার্তা

বান্দরবান পার্বত্য জেলায় পাহাড়, নদী ও বন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ধস আবারও দেখিয়ে দিয়েছেএই অনন্য ভূ-প্রকৃতি আজ গভীর পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে। টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে বান্দরবানের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সদর, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা ও থানচির মতো উপজেলার বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ, কৃষি, শিক্ষা ও স্থানীয় অর্থনীতি। অনেক পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়েছে।

সম্প্রতি কালের কণ্ঠে বান্দরবান পার্বত্য জেলার বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বন্যা পাহাড়ধস বিচ্ছিন্ন যোগাযোগে জনজীবন বিপর্যস্ত শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী পানিবন্দি প্রায় ৫০ হাজার মানুষ, কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা! পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আরো প্রায় ৩০ হাজার বাসিন্দা। সর্বোপরি এই পরিস্থিতিকে শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে বড় একটি সত্য আড়ালে থেকে যাবে। বান্দরবানের বন্যা ও পাহাড়ধস আসলে প্রকৃতি ও মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতার একটি বড় সতর্কসংকেত। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পাহাড় ও বন ধ্বংস এবং প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের বাধাগ্রস্ত হওয়াসবকিছু মিলেই এই সংকটকে আরো জটিল করে তুলছে।

প্রথমত, ভারি বৃষ্টিপাত এখন আগের তুলনায় বেশি অনিয়মিত ও তীব্র হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে। পাহাড়ি এলাকায় এই ধরনের বৃষ্টিপাতের প্রভাব আরো ভয়াবহ হয়। কারণ পাহাড় থেকে দ্রুত পানি নিচের দিকে নেমে আসে। ফলে মানুষ প্রস্তুতি নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায় না এবং আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়।

বান্দরবানের ক্ষেত্রে উজানের পাহাড়ি অঞ্চল, বিশেষ করে মায়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকার বৃষ্টিপাতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর মতো নদীগুলোর পানি শুধু স্থানীয় বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে না; আন্ত সীমান্ত পাহাড়ি পানিপ্রবাহও নদীর পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই আধুনিক বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থায় শুধু দেশের অভ্যন্তরের বৃষ্টিপাত নয়, উজানের আবহাওয়া ও পানিপ্রবাহের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, নদী ও পানিপ্রবাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বছরের পর বছর পলি জমে নদীর নাব্যতা কমে গেলে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। একইভাবে খাল, ছড়া ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ দখল, ভরাট বা সংকুচিত হয়ে গেলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের হতে পারে না। ফলে স্বাভাবিক বৃষ্টিও অনেক সময় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যার রূপ নেয়।

তৃতীয়ত, পাহাড় কাটা ও বন উজাড় বান্দরবানের পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য বড় হুমকি। পাহাড়ের মাটি ধরে রাখার ক্ষেত্রে গাছের শিকড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বন উজাড় হলে মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি পায় এবং পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার ফলে প্রাকৃতিক ঢালের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। ভারি বৃষ্টির সময় এসব এলাকা সহজেই পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে পড়ে।

পাহাড়ধস শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, অনেক ক্ষেত্রে এটি মানুষের তৈরি ঝুঁকির ফলও। পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা উপেক্ষা করে বসবাস মানুষের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই সাধারণত এসব ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার হয়। কারণ নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ ও সম্পদ তাদের সীমিত।

এই বাস্তবতায় বান্দরবানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে শুধু জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিকল্পনা ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন। প্রথমত, সাঙ্গু, মাতামুহুরীসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ নদী, খাল ও ছড়ার নিয়মিত জরিপ, খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। তবে নদী ব্যবস্থাপনায় শুধু খনন নয়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্যও বিবেচনায় নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাহাড় রক্ষাকে শুধু পরিবেশগত বিষয় হিসেবে নয়, মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসতি ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতিমালা প্রয়োজন। যারা দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় বসবাস করছে, তাদের জন্য নিরাপদ পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু উচ্ছেদ নয়, মানুষের জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সমাধান তৈরি করতে হবে।

চতুর্থত, প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ, নদীর পানি বৃদ্ধির তথ্য, পাহাড়ধসের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।

বান্দরবানের বন্যা ও পাহাড়ধস আমাদের মনে করিয়ে দেয়প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত করে উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। পাহাড়, নদী ও বন শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এগুলো মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার ভিত্তি।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন উন্নয়ন দর্শন, যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তা একসঙ্গে বিবেচিত হবে। বান্দরবানের সংকট তাই শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়, এটি পুরো দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতের দুর্যোগকে পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও এর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

লেখক : জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক

বইমেলা নিয়ে কিছু প্রস্তাব | কালের কণ্ঠ