kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

ক্রিকেট উন্নয়নে বিপিএল কাজে লাগুক

ইকরামউজ্জমান

২১ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ক্রিকেট উন্নয়নে বিপিএল কাজে লাগুক

দেশের ক্রিকেটে তাৎপর্যময় একটি সময়ে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের অংশগ্রহণে (কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স, সিলেট সানরাইজার্স, ফরচুন বরিশাল, মিনিস্টার ঢাকা, খুলনা টাইগার্স এবং চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স) অষ্টম বিপিএল (বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ) টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আজ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে আসরের যাঁরা আসল গায়েন তাঁদের অনুপস্থিতিতে ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। বিনোদন, রোমাঞ্চ অনিশ্চয়তায় মোড়ানো ২০+২০=৪০ ওভারের উত্তেজনায় ঠাসা সময়ের সেরা প্রতিনিধিত্বকারী এই টুর্নামেন্টের খেলা ঢাকা ছাড়াও সিলেট এবং চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হবে। রহস্যময়ী এই খেলার তিন-চার বলেই খেলার রং বদলে যায়। একটি-দুটি ভুল বা কিছু এদিক-সেদিক হলেই ম্যাচের ভাগ্য ঘুরে যায়।

বিজ্ঞাপন

এটা এই ক্রিকেট সংস্করণের অন্যতম একটি আকর্ষণ।

শুরুতেই উল্লেখ করেছি, তাৎপর্যময় সময়ে এর জন্য যে কিছুদিন আগে বাংলাদেশ জাতীয় দল নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনে টেস্ট সিরিজ (১-১) ড্র করেছে। যেকোনো সংস্করণে এবারই প্রথম জয়ের স্বাদ। আর এটি ক্রিকেটের সবচেয়ে শক্ত সংস্করণ টেস্ট ম্যাচে। বিশ্লেষক হিসেবে মনে করি, নিউজিল্যান্ডকে তাদের কন্ডিশনে পরাজিত করার পরিপ্রেক্ষিতে আত্মবিশ্বাস, সাহস, মানসিক শক্তি, নিজের খেলার প্রতি আস্থা এবং সবাই মিলে দলের জন্য দায়িত্বশীল অবদান, খেলা উপভোগ, চাপ সবাই মিলে ভাগাভাগি করে নির্ভার ক্রিকেটের উপলব্ধির জন্ম হয়েছে, এটি অনেক বড় বিষয়। অনেক বড় প্রাপ্তি। এবারের বিপিএলে এই বিষয়গুলো প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের স্থানীয়  রুকি ইন্টারমিডিয়েট এবং ভ্যাটারন খেলোয়াড়দের জন্য শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, অনুসরণের ম্যাট পয়েন্ট। এর আগে সাতবার জমজমাট আনন্দঘন এই টুর্নামেন্ট দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ক্রিকেটরসিকরা প্রাণভরে ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণের বর্ণিল উৎসব উপভোগ করেছেন। বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের হয়ে অংশগ্রহণ করেছেন বিশ্ব ক্রিকেটের চিত্তাকর্ষক সেরা ক্রিকেটাররা। তাঁদের উপস্থিতি তাঁদের মাঠের নৈপুণ্য এবং অবদান বিপিএলের প্রতিটি আসরকে নতুন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। স্থানীয় তরুণ এবং অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা বেশি সংখ্যায় খেলেছেন বিদেশি ভালো ক্রিকেটারদের সঙ্গে। তাঁদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম শেয়ার করেছেন। অনুশীলন করেছেন। এটিও অনেক বড় অভিজ্ঞতা। বিপিএল স্থানীয় তরুণ এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা নিজকে আত্মবিশ্বাস এবং সাহসের সঙ্গে তুলে ধরা এবং পরিচিত করার সবচেয়ে বড় কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। দেশে দেশে এই প্রিমিয়ার লিগ থেকেই তো নতুন নতুন খেলোয়াড় বেরিয়ে এসে বৃহত্তর ক্রিকেটে অবদান রাখছেন। ভারতের আইপিএল তো দেশের ক্রিকেটের রঙ্গ পাল্টিয়ে দিয়েছে। ভারতের ক্রিকেট এগিয়ে গেছে বিভিন্নভাবে।

অতীতে বিসিবি প্রতিবারই বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করে দেশে বিপিএলের আয়োজন করেছে, এর  পেছনে ছিল নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য। ছিল সুদূরপ্রসারী ক্রিকেটীয় চিন্তা-ভাবনা। গত সাত আসর থেকে বোর্ডের ক্রিকেট স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রাপ্তি কতটুকু? বোর্ডের তহবিলের লাভ-ক্ষতি নিয়ে কথা বলছি না। বলছি না স্থানীয় ক্রিকেটারদের প্রতি আসরে পারিশ্রমিকের অর্থের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এটা নিয়ে। আমাদের বক্তব্য হলো, দেশের ক্রিকেটর সার্বিক উন্নয়নে বিপিএল কতটুকু কার্যকর হয়েছে?

বিপিএলের আয়োজন এবং এর থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা কতটুকু কাজে লেগেছে? স্থানীয় খেলোয়াড়দের ভূমিকার মূল্যায়নের ছবিতে কী দেখতে পাওয়া গেছে। টি-টোয়েন্টির জন্য কতজন সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার পাওয়া গেছে গত সাত বছরে।

এত বছর পরও বাংলাদেশ নড়বড়ে জাতীয় দল নিয়ে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলছে। মোটামুটি সমীহ জাগানোর মতো দল হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। স্বপ্ন ও চিন্তার মধ্যে মিল তো থাকতে হবে। প্রচেষ্টার মধ্যে সংশয় আর গলদ থাকলে তো এগোনো সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে বোর্ডের যেমন দায়িত্ব আছে, খেলোয়াড় সমাজেরও দায়িত্ব আছে। আমরা চাইছি বিপিএল সত্যিকার অর্থে অর্থপূর্ণ হোক। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাসকে কাজে লাগানো হোক।

টি-টোয়েন্টি হলো ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করার জন্য ঠিক লোকটিকে বেছে নেওয়া আর তাকে কাজে লাগানো। সঠিক মানসিকতা আর চাপের মধ্যে পারফরম করাটাও জরুরি।

যেহেতু টি-টোয়েন্টি ‘ইন্টিলেজেন্ট’ ক্রিকেটারদের খেলা। মাথা না খাটালে ব্যাট ও বলে যা করা উচিত তা করা সম্ভব হবে না। বুঝতে হবে কিভাবে মনঃসংযোগের সঙ্গে মানসিক শক্তি নিয়ে খেলতে হয়। টি-টোয়েন্টি ধুমধাড়াক্কার ক্রিকেট নয়। এটা রীতিবদ্ধ ক্রিকেট।

মাঠে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটারদের শরীরের ভাষায়ই তো অন্য রকম। ‘স্পিনের’ সঙ্গে ‘পাওয়ারের’ প্রয়োজন আছে। টি-টোয়েন্টি ভালো করতে হলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে নিরলসভাবে কাজ করতে হবে—এগুলো ক্রিকেট উন্নয়নসংশ্লিষ্টদের অজানা নয়। দরকার কাজগুলো করা।

সব সময় বলি, দেশে ক্রিকেট প্রতিভার কমতি নেই। দরকার শুধু ক্রিকেটকে যথাযথভাবে পরিচর্যা এবং লালন-পালন। একটি সঠিক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হলে দেশের ক্রিকেট শুধু বিকশিত হবে না—স্বল্প সময়ের মধ্যে বিশ্ব ক্রিকেট চত্বরে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ছবি পাল্টে যাবে।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে না আমাদের দল। টি-টোয়েন্টিতে দ্রুতই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। সেটির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পরিকল্পনায়ও আনতে হয়। আমরা লক্ষ করছি, সাম্প্রতিক সময়ে জেতা ম্যাচেও লোয়ার অর্ডার থেকে খুব বেশি সাপোর্ট পাওয়া যায়নি। এখন আর সেই দিন নেই যে রান সব ওপরের ব্যাটসম্যানরা করবেন। দরকারের সময় নিচ থেকেও রান করতে হবে। আমরা টি-টোয়েন্টি খেলছি। আমাদের কী নির্ভরযোগ্য ‘ফিনিশার’ আছে। টি-টোয়েন্টি পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা প্রত্যেক খেলোয়াড়ের মধ্যে থাকতে হবে। টি-টোয়েন্টি খুব বেশি ঝুঁকির খেলা। এ ক্ষেত্রে আপসের সুযোগ কম। যেটা বোঝা যাচ্ছে আগামী দিনে বিশেষজ্ঞ ক্রিকেটার অনেক বেশি তৈরি হবে। বিশেষজ্ঞ পাওয়ারপ্লে ব্যাটসম্যান, বিশেষজ্ঞ বোলার, বিশেষজ্ঞ ফিনিশার, বিশেষজ্ঞ ফিল্ডার—আরো কত কী? ম্যাচ উইনার ব্যাটসম্যান আর বোলার তো আছেন। ক্রিকেট আমাদের অহংকার। এই খেলার বদৌলতে পুরো ক্রিকেট দুনিয়া বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে চিনতে, জানতে, সমীহ করতে। আমাদের ঠেকিয়ে রাখার শক্তি পৃথিবীতে নেই। আমরা এখন যে সময় পার করছি। এই সময়টা আগামী দিনে থাকবে না।

করোনা সংক্রমণের হার বেড়েই চলেছে। ম্যানেজড ইভেন্ট এনভায়রনমেন্ট (এমইই)-এর মধ্যে থেকে খেলবেন ক্রিকেটাররা। শুধু খেলোয়াড় নয়—খেলাসংশ্লিষ্ট পুরো মহল এমইই বলয়ের আওতায় আছেন। প্রথম উল্লেখ করেছি দর্শকবিহীন স্টেডিয়ামে খেলা হবে। টিভির পর্দা একমাত্র ভরসা। এ ক্ষেত্রে আবার অনেক বাড়িতে লক্ষণীয় হবে অন্য এক ধরনের আমেজ—আর সেটা হলো পরিবারের অনেকে মিলে খেলা দেখা। বিপিএলের বদৌলতে প্রায় এক মাস ধরে অনেক মানুষ একটি নির্দিষ্ট সময় ঘরবন্দি থাকবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক। বিসিবি এবারকার বিপিএল পরিচালনার ক্ষেত্রে দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে। আর সেটি হলো খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা এবং সুষ্ঠুভাবে অষ্টম আসরের আয়োজন। সব দেশেই পেশাদার লিগে অন্যতম আকর্ষণ বিদেশি ভালো খেলোয়াড়। তাঁদের কাউকে কাউকে বিনোদনের ফেরিওয়ালা বলা হয়। ছয়টি দলেই বিদেশি খেলোয়াড়রাই ফ্র্যাঞ্চাইজিদের বড় ভরসা। এরই মধ্যে খেলার বিভাগ সব দলের শক্তি, দুর্বলতা এবং সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে। ক্রিকেট হলো গ্লোরিয়াস আনসার্টেনিটি। টি-টোয়েন্টিতে আরো বেশি আনসার্টেনিটি। ঘরে থেকে নিরাপদে সবাই খেলা উপভোগ করুন। প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের জন্য শুভ কামনা।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক



সাতদিনের সেরা