kalerkantho

মঙ্গলবার ।  ১৭ মে ২০২২ । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩  

সাধারণ মানুষ কি বিরক্ত হচ্ছে!

এ কে এম আতিকুর রহমান

২১ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সাধারণ মানুষ কি বিরক্ত হচ্ছে!

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস। একে একে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা শত্রুমুক্ত হচ্ছে। তখনো পাকিস্তানের জেলে আটক বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হলো, পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করল।

বিজ্ঞাপন

২০ ডিসেম্বর ক্ষমতার পরিবর্তনে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হলেন। নানা হিসাব-নিকাশ করে তিনি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

৭ জানুয়ারি ১৯৭২। প্রেসিডেন্ট ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে এক নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানালেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের অতিথি ভবনে। সেখানেই ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে তাঁঁর মুক্তির বিষয়টি জানালেন এবং বাংলাদেশ আর পাকিস্তান মিলে একটি কনফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব দিলেন। বঙ্গবন্ধুর সোজা উত্তর, তিনি তাঁর জনগণের সঙ্গে প্রথমে দেখা করবেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করবেন, তার পরই তিনি ভুট্টোকে জানাতে সক্ষম হবেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনগণ অন্তপ্রাণ। যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে সেদিন তিনি ওই কথা বলেছিলেন তা থেকেই বোঝা যায় জনগণকে বঙ্গবন্ধু কতটা গুরুত্ব দিতেন, আর ভালোবাসতেন।

দেশে ফিরে এসেই একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ার কাজে লেগে গেলেন, অন্যদিকে রচনা করলেন দেশের সংবিধান। সেই পবিত্র সংবিধানেও সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হলো জনগণের অধিকার, সম্মান, ন্যায়বিচার এবং সুরক্ষাকে। তাই জনগণের অবস্থান নিশ্চিত করতে সংবিধানের ৭(১) ধারায় বলা হয়েছে যে ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে। ’ ধারা ২১(২)-এ আরো বলা হয়েছে যে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। ’ অবশ্য দেশের প্রতি জনগণের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথাও সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, বিশেষ করে সামরিক সরকারের শাসনের বছরগুলো বাদ দিলে বাকি সময়ে সংবিধানের ওই ধারাগুলো রক্ষা করার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়।

গত দুই বছর ধরে করোনার ভয়াবহতা আমাদের বলতে গেলে গৃহবন্দিই করে রেখেছে। অতীব প্রয়োজন না হলে ঘরের বাইরে যাওয়াই হয় না। সম্প্রতি একটি বিশেষ কাজে বাইরে যেতে হয়েছিল। দুপুরের দিকে বাসায় ফিরছিলাম। মগবাজার চৌরাস্তা পার হয়ে যখন হাতিরঝিলের সড়কে পড়েছি তখন আমাদের গাড়ির সামনে একটা মাইক্রোবাস, তার সামনে রয়েছে বিশেষ নম্বর প্লেটের একটি গাড়ি এবং তার সামনে একটি পুলিশের গাড়ি। অর্থাৎ তিনটি গাড়ির বহরের পেছনে রয়েছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের গাড়িগুলো, যারা গুলশানের দিকে যাবে। কিন্তু আমাদের যে যাওয়ার উপায় নেই। বর্ণিত ওই গাড়িগুলোকে অতিক্রম করতে দেওয়া হচ্ছিল না। আমার গাড়ির চালক (পেছনে থাকা অন্যদের মতোই) কয়েকবার চেষ্টা করেও এগোতে পারছিল না। মাইক্রোবাসে অবস্থানরত ব্যক্তিরা (সম্ভবত নিরাপত্তায় নিয়োজিত) বিশেষ লাঠির সাহায্যে অতিক্রম করতে নিষেধ করছিল। আমার যেহেতু খুবই তাড়া ছিল তাই কিছুটা পথ পেছন পেছন এগোনোর পর ডান দিকের বাড্ডা যাওয়ার সড়ক ধরে ঘুরে গুলশান-২ নম্বরে অবস্থিত আমার বাসায় ফিরে আসি। আসতে আসতে ভাবি—হায়রে জনগণ, আমরা নাকি এ দেশের মালিক! অথচ একটি সড়কে নির্বিঘ্নে যাতায়াতের অধিকারটুকুও আমাদের নেই। অন্যদিকে জনগণের সেবক একজন সরকারি চাকুরে কিভাবে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে জনগণের চলাচল বন্ধ করে রাজার হালে চলে গেলেন। জনগণকে দেখিয়ে দিলেন কে মালিক, আর কে সেবক।   

বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর, বিশেষ করে ঢাকার সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচলে ভিআইপি ব্যক্তিদের প্রাধান্য, যেমন—মন্ত্রীদের গাড়ি, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানদের গাড়ি, কিছু ব্যবসায়ীর গাড়ি যেমনভাবে লক্ষ করা যায় তাতে মনে হয় ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই সড়ক রাজত্বে। ’ আমরা জানি বঙ্গবন্ধুর কন্যা হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তার ইস্যুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর প্রতি দেশি-বিদেশি নানা হুমকি রয়েছে এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। কিন্তু অন্যান্য যাঁরা সড়কে চলাচলের সময় সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটান, তাঁদের ওই কর্মটি করা মোটেই শোভনীয় এবং মানবিক নয়। জনগণকে কম কষ্ট দিয়ে সীমিত ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে চলাচলে তেমন ক্ষতি বা অসম্মানজনক কিছু রয়েছে বলে মনে হয় না। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের কথা আলাদা।  

পুলিশের প্রহরায় এ দেশে কর্মরত বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা চলাফেরা করে থাকেন। আমার কূটনৈতিক জীবনে পুলিশ পাহারায় রাষ্ট্রদূতদের এমন করে চলতে দেখিনি। এমনকি দূতাবাসেও সার্বক্ষণিক পুলিশের পাহারা বসাতে দেখিনি। হয়তো বাংলাদেশের মতো এ ধরনের ব্যবস্থা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা দু-একটি দেশে থাকতেও পারে। এ কথা ঠিক যে বাংলাদেশে একসময় ঘটে যাওয়া একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তখন রাষ্ট্রদূতদের নিরাপত্তার বিষয়টি এসেছিল। জানা মতে, বর্তমান সরকার দেশের নিরাপত্তা বিধানে যথেষ্ট আন্তরিক এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে আসছে। আমার বিশ্বাস, আমাদের দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা এমন নাজুক হয়ে যায়নি যে এ দেশে কর্মরত রাষ্ট্রদূতরা এ ধরনের নিরাপত্তা হুমকির কথা ভাবতে পারেন।

বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ এ দেশে পুরোপুরি নিরাপদে বসবাস করছে, চলাফেরা করছে। সবাই যদি দেশটিকে নিরাপদ মনে করে, তাহলে গুটিকয়েক লোকের অনিরাপদ মনে হওয়ার কি সত্যিই কোনো যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে? একই দেশে বাস করা কয়েকজন ব্যক্তির একান্তই ব্যক্তিগত অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়ে সামান্য হলেও আন্তর্জাতিক মহলে যে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, সে বিষয়টি আমাদের বিবেচনা করতে হবে। তাই অহেতুক এসব উদাহরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিরাপত্তা অবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো অর্থ হয় না। কেন যে ওই সব ব্যক্তি এমন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তা-ও সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে।

ক্ষমতাবানরা যদি সড়কে পুলিশের গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করেন, তা কি দৃষ্টিকটু মনে হয় না? এ কাজটিতে কি তাঁদের সম্মান বাড়ছে, নাকি জনগণ বিরক্ত হচ্ছে? একজন মন্ত্রী বা সরকারি চাকুরে, তাঁরা তো জনগণের আর দেশের সেবায় নিয়োজিত থাকেন। তাঁদের চলাফেরায় যদি এত ভয়ভীতি, তাহলে জনগণকে তাঁরা প্রত্যাশিত সেবা দেবেন কিভাবে? তাঁদের তো ঘরে আর অফিসে বন্দি হয়ে থাকলে চলে না। জীবনের এত ভয় নিয়ে কি চলাফেরা করা যায়, না বাঁচা যায়? হয় জনসেবার মনোভাবটা জীবন থেকে নির্বাসনে পাঠিয়ে নিরাপদ জীবন যাপন করুন অথবা জনগণের সঙ্গে একই কাতারে চলুন। এসব ঝামেলায় না গিয়ে নিজে নিরাপদে থাকুন আর রাস্তাঘাটে চলার সময় অন্যদের শান্তিতে চলতে দিন।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রথমবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর মন্ত্রিপরিষদে আবদুস সামাদ আজাদকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় (এর আগে ১৯৭১ সালের ২৯ ডিসেম্বর তাঁকে প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল)। আমি ওই সময় মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরের পরিচালক ছিলাম। যদিও মন্ত্রণালয়ের বাইরের, বিশেষ করে রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে তাঁর একান্ত সচিব, সহকারী একান্ত সচিব বা জনসংযোগ কর্মকর্তা মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গী হতেন, তবে আমাকেও যে মাঝেমধ্যে যেতে হয়নি তেমন নয়। তখন আমাদের গাড়ির সামনে বা পেছনে কোনো পুলিশের গাড়ি থাকত না। এমনকি সড়কে হুইসেল আর অদ্ভুত আওয়াজের ভেঁপু বাজিয়ে চলমান কোনো যানবাহনকে থামিয়ে পার হওয়ার বা আগে যাওয়ার প্রবণতা ছিল না। নিরাপত্তার দায়িত্বে ড্রাইভারের পাশের আসনে বসা থাকতেন একজন গানম্যান। ওই আয়োজনেই তখনকার মন্ত্রীরা তৃপ্ত থাকতেন বলে মনে হয়। সে সময় সরকারের অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রের কোনো সচিব বা ওই পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তাকে গানম্যান বা সামনে-পেছনে পুলিশের গাড়ির বহর যুক্ত থাকার কথা শুনিনি।

আমাদের দেশটা আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যার হিসাবে পৃথিবীর অনেক বৃহৎ আকারের দেশের চেয়েও বড়। সীমিত সম্পদের মধ্যে আমরা দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে আমাদের উন্নয়ন বিশ্ববাসীর কাছে একটি ‘রোল মডেল’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। আর একটি দেশের উন্নয়নের জন্য যেসব মৌলিক কাঠামো প্রয়োজন তার মধ্যে নিরাপত্তাব্যবস্থা অন্যতম। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করা সরকারের দায়িত্ব। সে ক্ষেত্রে সরকারের খুব একটা ত্রুটি আছে বলে মনে হয় না। বলার অপেক্ষা রাখে না যে বর্তমানের বাংলাদেশ বিশ্বের নিরাপদ দেশগুলোর মধ্যে একটি। আন্তর্জাতিক বা স্থানীয়ভাবে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো তেমন কোনো হুমকিতে বাংলাদেশ রয়েছে বলেও মনে হয় না। তাই বাংলাদেশের সড়কগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকা শহরের সড়কগুলোতে সব যানবাহন সুনির্দিষ্ট ট্রাফিক আইন মেনেই চলাচল করুক।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

 



সাতদিনের সেরা