kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ মাঘ ১৪২৮। ২০ জানুয়ারি ২০২২। ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ধারা আটকাতে হবে

ধরিত্রী সরকার সবুজ

১৪ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ধারা আটকাতে হবে

যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো শহরে গত বছরের ৩১ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হলো বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন, যা কপ-২৬ (কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ) নামে পরিচিত। সারা বিশ্বের পরিবেশসচেতন মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই সম্মেলন।

৩০ অক্টোবর সকাল ৯টায় গ্লাসগোতে পৌঁছি। পাহাড়, লেক আর সবুজে ঘেরা ছবির মতো সুন্দর ঝাঁ-চকচকে গ্লাসগো। সেই সঙ্গে প্রাচীনকে কিভাবে নতুনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, তারও অন্যতম উদাহরণ শহরটি। শত বছরের প্রাচীন প্রাসাদ আজও কী সুন্দর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। হিমেল হাওয়া আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় চোখে পড়বে পাহাড়ের ঢালে সাদা সাদা তুলার মতো কী যেন। একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায়, সেগুলো সাদা রঙের ভেড়া। হেমন্তের আবহাওয়ায় স্কটল্যান্ডের গাছের পাতার যে বিচিত্র রং, তা চোখে লেগে থাকবে অনেক দিন।

১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর সম্মেলন দিয়ে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের শুরু। তারপর চলে গেছে অনেক বছর। প্রতিবছর নভেম্বর বা ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় এই সম্মেলন। কপ-২৬ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। করোনা মহামারির কারণে তা স্থগিত করা হয়েছিল। অবশেষে শুরু হলো ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর।

২০১৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ-২১-এর পর এবারের কপ-২৬ নিয়ে মানুষের আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। ইনকামিং কপ প্রেসিডেন্সি যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী আলোক শর্মার প্রচেষ্টা আমাদের আশান্ব্বিত করেছিল আরো বেশি। কপ-২৬ সম্মেলনে বেশ কিছুু গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন তিনি। সেই লক্ষ্য পূরণে করোনা মহামারির মধ্যেও তিনি বিশ্বের অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। বিশ্বের ৪০টি দেশের মন্ত্রীদের নিয়ে জুলাই মাসে লন্ডনে দুই দিনের একটি সফল জুলাই মিনিস্টারিয়ালের আয়োজন করেছিলেন। আমরা আশা করেছিলাম, স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর কপ-২৬ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় এমন কিছু সিদ্ধান্ত আসবে, যা প্যারিসের কপ-২১-এর মতোই স্মরণীয় করে রাখবে গ্লাসগোর কপ-২৬ সম্মেলনকে। এটা ঠিক, যত বড় আশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। তবে যতটা হয়েছে, তা কিন্তু মোটেই কম নয়।

কপ-২৬ সম্মেলনের ওয়ার্ল্ড লিডারস সামিটে ১২০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশগ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন আলোচনায় অত্যন্ত জোরালো ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। লিডারস সামিটে প্রদত্ত ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ধনী দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর জোর দেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ, যেমন—বাংলাদেশের এনডিসি আপডেট, ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি বিনিয়োগে পরিকল্পনাধীন ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল এবং ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আমাদের শক্তির ৪০ শতাংশ অর্জনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় চারটি অর্জনযোগ্য লক্ষ্য উত্থাপন করেন। প্রথমত, প্রধান কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলোকে অবশ্যই জাতীয়ভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা (এনডিসি) জমা দিতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উন্নত দেশগুলোর উচিত অভিযোজন ও প্রশমনের মধ্যে ৫০ঃ৫০ ভারসাম্য রেখে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। তৃতীয়ত, উন্নত দেশগুলোর উচিত সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে সাশ্রয়ী মূল্যে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া এবং সিভিএফভুক্ত দেশগুলোর উন্নয়ন চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া। চতুর্থত, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, বন্যা ও খরার কারণে বাস্তুচ্যুত জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য বিশ্বব্যাপী দায়বদ্ধতা ভাগ করে নেওয়াসহ লোকসান ও ক্ষয়ক্ষতি, অর্থাৎ লস অ্যান্ড ড্যামেজের বিষয়ে যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণ।

২০১৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ-২১ সম্মেলনে স্বাক্ষরিত হয়েছিল ‘প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট’। তার পর থেকে প্রায় প্রতিটি সম্মেলনেরই মূল লক্ষ্য ছিল প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট ও প্যারিস রুল বুক পুরোপুরি বাস্তবায়নের সমন্ব্বিত সিদ্ধান্তে পৌঁছা। যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোয় অনুষ্ঠিত কপ-২৬ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল তা-ই। অর্থাৎ প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট বাস্তবায়নের অপূরণীয় অংশটুকু পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা।

আমরা একটু পেছনে ফিরে দেখতে পারি, কার্বন নির্গমনে বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টার সার্বিক অগ্রগতি কতটুকু। পোল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কাতোভিচে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৪। ১৯৬টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন ওই সম্মেলনে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলায় ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত কপ-২১-এর প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করা যায়, সেটাই ছিল কপ-২৪-এর টান টান উত্তেজনা আর দুশ্চিন্তার বিষয়। কিন্তু সফলতা তেমন পাওয়া যায়নি। ২০১৯ সালে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত কপ-২৫ সম্মেলন থেকে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন আসেনি। সেই হিসাবে কপ-২৬-এর অর্জন অনেক বেশি।

বৈশ্বিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এবারের জলবায়ু সম্মেলনের মূল আলোচনার বিষয় ছিল অভিযোজন কার্যক্রম প্রশমনের তুলনায় আনুপাতিক হারে বাড়ানো, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২১০০ সাল নাগাদ শিল্প বিপ্লব সময়ের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা, লস অ্যান্ড ড্যামেজের বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্যারিস রুল বুক চূড়ান্তকরণ এবং জলবায়ু অর্থায়ন।

কপ-২৬-এ আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী যথাযথ প্রাপ্তি না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে। এবারের সম্মেলনে প্রথমবারের মতো গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপ্টেশন সংক্রান্ত বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য গ্লাসগো শার্ম-এল-শেখ প্রগ্রাম অন দ্য গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপ্টেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ অ্যাডাপ্টেশন বা অভিযোজন কার্যক্রমকে নিঃসন্দেহে আরো বেগবান করবে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে অনুষ্ঠেয় কপ-২৭ মিসরের শহর শার্ম-এল-শেখে অনুষ্ঠিত হবে।

বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়া রোধ এবং বনভূমি সংরক্ষণের বিষয়ে এবারের সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। কপ-২৬ সম্মেলনে বাংলাদেশসহ ১৪১টি দেশ গ্লাসগো লিডারস ডিক্লারেশন অন ফরেস্ট অ্যান্ড ল্যান্ড ইউজ অনুমোদন করেছে। বিশ্বব্যাপী বনভূমি ধ্বংস রোধ এবং বনভূমি সংরক্ষণে এই সিদ্ধান্তটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কপ-২৬-এর সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার লক্ষ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসে সদস্য দেশগুলোকে উচ্চাভিলাষী ও শক্তিশালী পরিকল্পনা প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। কপ-২৬-এর একটি বড় অর্জন প্যারিস রুল বুক চূড়ান্তকরণ এবং ওই চুক্তির আওতায় আর্টিকল-৬-এর মার্কেট ও নন-মার্কেট মেকানিজমের গাইডলাইন চূড়ান্ত করা হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলো কর্তৃক অভিযোজন অর্থায়ন দ্বিগুণ করার পাশাপাশি কপ-২৬-এর বিভিন্ন সিদ্ধান্তে অভিযোজন ও প্রশমন অর্থায়নের মধ্যে ৫০ঃ৫০ অনুপাত নির্ধারণ করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উন্নত দেশগুলো কর্তৃক জলবায়ু অর্থায়নে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নিমিত্তে ২০২২-২৪ সময়ের জন্য একটি অ্যাডহক ওয়ার্ক প্রগ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে জলবায়ু তহবিলে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ অন্তত দ্বিগুণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে ধনী দেশগুলোকে।

শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বিশ্বের উষ্ণতা বাড়ছে। মূলত কলকারখানা, যানবাহনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ১০০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন সারা বিশ্বের চিন্তা, উদ্বেগ ও পরিকল্পনা এ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ধারাকে দেড় ডিগ্রি থেকে দুই ডিগ্রির মধ্যে আটকে রাখা। এই সংকল্প পূরণে অনেকটা পথ অগ্রসর হয়েছে কপ-২৬ এবং আগামী বছরে কপ-২৭-এ আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। আমরা আশা করি, এই পৃথিবীকে মানুষসহ সব প্রাণীর জন্য বাসযোগ্য রাখতে প্রতিটি জলবাযু সম্মেলনই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

লেখক : পরিবেশবিষয়ক লেখক ও গবেষক



সাতদিনের সেরা