• ই-পেপার

বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীর চ্যালেঞ্জ

  • মো. জাকির হোসেন

ফুটবলপ্রেমী জাতির স্বপ্ন অপূর্ণ কেন

আরিফুর রহমান খাদেম

ফুটবলপ্রেমী জাতির স্বপ্ন অপূর্ণ কেন

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ যেন রঙিন এক ফুটবলের রাজ্যে পরিণত হয়। অজপাড়াগাঁ থেকে শহর, অলিগলি থেকে ক্যাম্পাস, আকাশে-বাতাসে সর্বত্রই ফুটবল নিয়ে মাতামাতি চোখে পড়ে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন কিংবা পর্তুগালের পতাকায় ছেয়ে যায় ছাদ, বারান্দা। রাত জেগে মানুষ খেলা দেখার পর সামাজিক মাধ্যমে চলে দিনভর তর্কবিতর্ক। এমনকি আমার ক্লাসে নিয়মিত অধ্যয়নরত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মানি, মেক্সিকো ও কলম্বিয়ার বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যেও এতটা উন্মাদনা আমি দেখি না। ফলে কিছু প্রশ্ন বারবার আমাদের আহত করেযে দেশে ফুটবল এত জনপ্রিয়, যেখানে এই খেলা নিয়ে বন্ধুত্বে ধরে ফাটল, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও হয় সিরিয়াস ঝগড়া-বিবাদ, সেই দেশের ফিফা র‌্যাংকিং ১৮১তম কেন? বিশ্বকাপ তো অনেক দূরের কথা, এশিয়ান কাপেও কেন এখনো নাম লেখাতে পারছে না বাংলাদেশ? কেন আমাদের ভাবতে হয়, মালদ্বীপ, ভুটান বা নেপালের সঙ্গে জয়লাভ করতে পারব কি পারব না?

বাংলাদেশের ফুটবলের সংকটের মূল কারণ প্রতিভার অভাব নয়, বরং প্রতিভা বিকাশের কার্যকর উদ্যোগ ও ব্যবস্থার অভাব। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল উন্নয়নের ধারাবাহিক পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি। স্কুল ফুটবল, জেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়েছে। ফলে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করে ধাপে ধাপে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার যে কাঠামো প্রয়োজন, তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় একটি কারণ। দেশের বহু এলাকায় এখনো মানসম্মত খেলার মাঠ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং আধুনিক ফুটবল একাডেমির অভাব রয়েছে। একসময় কিছু মাঠে অনিয়মিত খেলাধুলা হলেও সেখানে এখন নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করে মাঠ সংকুচিত করা হয়েছে। অনেক প্রতিভাবান তরুণ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সঠিক কোচিং কিংবা প্রয়োজনীয় সুযোগ না পাওয়ায় মাঝপথেই ঝরে পড়ে। আবার কিছু প্রতিভা ঝরে যায় শুধু স্বজনপ্রীতির বেড়াজালে আটকে পড়ে।

আমার স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা ছিল করুণ। তখন অনেক ক্ষেত্রেই খেলাধুলাকে এক ধরনের অপরাধ বা সময়ের অপচয় বলে মনে করা হতো। ফলে লুকিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার কাটা কিংবা ভলিবল খেলতাম। জাপানিজ কারাতে শিখতাম অনেকটা চুরি করে। এসব করতে গিয়ে মা-বাবা ও শিক্ষকদের কাছ থেকে যে কত গালি হজম করেছি এবং মার খেয়েছি, তার হিসাব নেই। অথচ উন্নত বিশ্বে প্রায়ই এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। অনেক মা-বাবা সন্তানদের পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল, ক্রিকেট, সুইমিং বা মার্শাল আর্ট ক্লাবে ভর্তি করান। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের জোরজবরদস্তি করেও ভর্তি করাতে হয়। কারণ সচেতন মা-বাবা খেলাধুলাকে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। এমন সুযোগ স্কুলজীবনে আমি বা আমার মতো আরো অনেকেই পেলে হয়তো এখন আমরাও পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, নেইমার, রোনালদো বা ইমরান খান, টেন্ডুলকার হয়ে যেতাম।

ফুটবল উন্নয়ন কোনো এক বা দুই বছরের প্রকল্প নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সফল দেশগুলো সাধারণত ১০ থেকে ২০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকটাই ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এর পেছনে আরো একটি বড় কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। ক্ষমতার পালাবদল হলে আগের সরকারের রেখে যাওয়া অনেক ভালো উদ্যোগও হারিয়ে যায়। ঘরোয়া ফুটবলের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্বের সফল ফুটবল দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, শক্তিশালী জাতীয় দলের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রতিযোগিতামূলক ঘরোয়া লীগের ওপর। বাংলাদেশের প্রিমিয়ার লীগে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও দর্শকসংখ্যা, বাণিজ্যিক আকর্ষণ এবং প্রতিযোগিতার গভীরতায় এখনো ঘাটতি রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে আফ্রিকার ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের কুরাসাও। জনসংখ্যার দিক থেকে এই দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় অত্যন্ত ছোট। যে দেশগুলোর নাম কয়েক সপ্তাহ আগেও পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ জানত না, সেই কেপ ভার্দে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দারুণ লড়াকু মানসিকতা দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মুহূর্তেই দেশটির পরিচিতি ও আত্মপরিচয়কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। দু-চার দিন আগেও যেসব খেলোয়াড়ের অনুসারী সংখ্যা ছিল গড়ে ১০ থেকে ২০ হাজার, রাতারাতি তা হয়ে দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন। মাত্র পাঁচ লাখের মতো জনসংখ্যার (বাংলাদেশের বেশির ভাগ জেলার চেয়েও কম) পশ্চিম আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশ ফুটবল বিশ্বের বড় বড় শক্তির বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের উত্থান ও সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো দেশপ্রেম, ফুটবল অবকাঠামো, জাতীয় দল পরিচালনা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ। একই সঙ্গে প্রবাসী ফুটবলারদের জাতীয় দলের সঙ্গে সংগঠিত ও দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা, অভিজ্ঞ স্কাউটিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুসরণ করা এবং সরকার পরিবর্তন হলেও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোকে অব্যাহত রাখা। কেপ ভার্দে তাদের বৃহৎ প্রবাসী সম্প্রদায়ের ফুটবলারদের ব্যবহার করে জাতীয় দলকে শক্তিশালী করেছে, আর কুরাসাও নেদারল্যান্ডসে বেড়ে ওঠা নিজেদের বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের সফলভাবে জাতীয় দলের অংশ করেছে। বিলম্বে হলেও বাংলাদেশ সম্প্রতি এই বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। তবে বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যেন দেশের নিজস্ব প্রতিভা বিকাশ বাধাগ্রস্ত না হয়। একই সঙ্গে স্বজনপ্রীতি বা ঘুষের লেনদেনকে নিরুৎসাহ করতে বাছাই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়াও জরুরি।

যেহেতু ১৮ কোটির বেশি মানুষের এই দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ আজও প্রবল, তাই প্রতিভার সংকট থাকার কথা নয়। প্রয়োজন সেই প্রতিভাকে খুঁজে বের করার কার্যকর ব্যবস্থা এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তার নিয়মিত তদারকি। স্কুল ও জেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা চালু করা, তৃণমূল উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, স্থানীয় ক্লাব সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করা, প্রতিটি স্কুল ও কলেজে একটি খেলার মাঠ নিশ্চিত করা, বয়সভিত্তিক একাডেমি সম্প্রসারণ, আধুনিক কোচ তৈরিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ফিটনেস ব্যবস্থাপনা ও উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

ফুটবলের উন্নয়নে করপোরেট বিনিয়োগও জরুরি। শুধু ফেডারেশনের ওপর নির্ভর করে একটি দেশের ফুটবলকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন। এ ক্ষেত্রে মা-বাবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাঠ্যপুস্তক থেকে অকার্যকর কিছু বিষয় কমিয়ে শরীরচর্চা ও খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সচিত্র বিশদ অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করাও সময়ের দাবি। বর্তমান যুবসমাজের একাংশ শরীরচর্চা বাদ দিয়ে জুয়া ও মাদক চর্চায় বেশি আসক্ত। খেলাধুলাই পারে তাদের সুস্থ জীবনের পথে ফিরিয়ে আনতে।

স্বপ্ন সঠিকভাবে দেখলে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে, কেপ ভার্দে বা কুরাসাওয়ের মতো অপরিচিত উন্নয়নশীল দেশ যদি ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে জায়গা করে নিতে পারে, বাংলাদেশের মতো সুপরিচিত দেশ কেন পারবে না? আমরাও দেখতে চাই, একদিন পুরো বিশ্ব বাংলাদেশকে টিভিতে দেখুক, প্রিয় দেশ টক অব দ্য ওয়ার্ল্ডে পরিণত হোক।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

রথযাত্রা

তারাপদ আচার্য্য

রথযাত্রা

রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,

ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।

পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি,

মূর্তি ভাবে আমি দেবহাসেন অন্তর্যামী।

রথযাত্রা ঘিরে উৎসবে মাতোয়ারা সবাই। ভক্তরা ফুল, বাতাসা, নকুলদানা ও কাঁদি কাঁদি কলা নিয়ে সকাল থেকে উপস্থিত রথযাত্রায় অংশ নিতে। হাজার হাজার ভক্ত রথের রশি টেনে নিয়ে যাবেন। রথটানা শুরুর আগেই আকাশে ঘন কালো মেঘ জমে। রথটানা শুরু মাত্রই আশ্চর্যভাবে অনেকটা ভারাক্রান্ত ও বেদনাচ্ছন্ন হয়ে এসব ঘন মেঘ দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে মাটির পৃথিবীতে ঝরে পড়ে। সেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে নেচে-গেয়ে মতোয়ারা হন সবাই। সেই সঙ্গে সমান তালে বাজতে থাকে ঘণ্টাবাদ্যি। একদিকে পুরুষরা শঙ্খ, ঘণ্টা, কাঁসা, ঢাক, ঢোল বাজিয়ে পরিবেশমুখর করে তোলেন, অন্যদিকে নারীরা উলুধ্বনি ও মঙ্গলধ্বনির মাধ্যমে রথটানায় আনন্দচিত্তে শামিল হন। রথ থেকে রাস্তায় দাঁড়ানো দর্শনার্থীদের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয় কলা আর ধানের খই। শাস্ত্রে রয়েছে, রথে চ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যাতে অর্থাৎ রথে চড়ে বামন জগন্নাথকে দেখতে পেলে জীবের আর পুনর্জন্ম হয় না। এ বিশ্বাস বুকে ধারণ করেই আজ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এ মহা উৎসবের আয়োজন।

শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী প্রাণের উৎসব। মিলনের এক মহামেলা। আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে বর্ষা ঋতুর আগমনের শুরুতেই রথযাত্রা উৎসব গ্রামে-গঞ্জে, নগরে বিপুলভাবে সর্বজনীন রূপ নেয়। এ মহা উৎসবকে কেন্দ্র করে বর্ষাবিধুর আবহাওয়ার মধ্যেও মেলা বসে। রথযাত্রা উপলক্ষে জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষে সবারই পদচারণে মুখরিত থাকে বিভিন্ন সড়ক। শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ সবাই রথযাত্রায় সারথি হতে পথে নেমে পড়ে। ভক্তকুলের ব্যাপক অংশগ্রহণে রথযাত্রা উৎসব মহা উৎসবে রূপ নেয়। বিশ্বের কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর হৃদয়ে শ্রীশ্রী জগন্নাথ প্রত্যক্ষ দেবতা হিসেবে পূজিত হয়ে আসছেন।

পদ্মপুরাণে উল্লিখিত রথযাত্রায় শ্রী বিষ্ণুর মূর্তিকে রথারোহণ করানোর কথা বলা হয়েছে। আর পুরীর জগন্নাথ দেবের মূর্তি যে শ্রীকৃষ্ণ তথা শ্রী বিষ্ণুরই আরেকটি রূপ, তা সবাই স্বীকার করে। স্কন্দপুরাণে কিন্তু প্রায় সরাসরিভাবে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার কথা রয়েছে। সেখানে পুরুষোত্তম ক্ষেত্র মাহাত্ম্য কথাটি উল্লেখ করে মহর্ষী জৈমিনি রথের আকার, সাজসজ্জা, পরিমাপ ইত্যাদির বর্ণনা দিয়েছেন। পুরুষোত্তম ক্ষেত্র বা শ্রীক্ষেত্র বলতে পুরীকেই বোঝায়। তাই দেখা যাচ্ছে যে সেই পুরাণের যুগেও এই রথযাত্রার প্রচলন ছিল।

উৎকলখণ্ড এবং দেউল তোলা নামক ওড়িশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল সত্যযুগে। সে সময় আজকের ওড়িশার নাম ছিল মালবদেশ। সেই মালবদেশের অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন, যিনি ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীর এই জগন্নাথমন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন।

জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা উৎসব অন্যান্য দেশের মতো আমাদের বাংলাদেশেও সাড়ম্বরে পালিত হয়। ঢাকা শহরের অদূরে ধামরাইয়ের এ উৎসব বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম। ধামরাই রথযাত্রার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। জানা যায়, ১০৭৯ বাংলা সন থেকে দীর্ঘ ৩৪০ বছর ধরে ধামরাইয়ের রথযাত্রা ও রথমেলা উৎসব পালিত হয়ে আসছে। কিভাবে এই বাঁশের রথটি কাঠের রথে পরিণত হয়, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। ১২০৪ থেকে ১৩৪৪ বাংলা সন পর্যন্ত মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া থানার বালিয়াটির জমিদাররা বংশানুক্রমে এখানে পর পর চারটি রথ তৈরি করেন। ১৩৪৪ বাংলা সনের রথের ঠিকাদার ছিলেন নারায়ণগঞ্জের সূর্য নারায়ণ সাহা। এই রথটি তৈরি করতে সময় লাগে এক বছর। ধামরাই, কালিয়াকৈর, সাটুরিয়া ও সিংগাইর থানার বিভিন্ন কাঠশিল্পী যৌথভাবে নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করে ৬০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন রথটি তৈরি করেন। এই রথটি ছিল ত্রিতলাবিশিষ্ট, যার প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় চার কোণে চারটি এবং তৃতীয় তলায় একটি প্রকোষ্ঠ ছিল। এর নাম নবরত্ন। রথটি টানার জন্য প্রায় ২৭ মণ পাটের কাছি দরকার হতো, যদিও আজ সেই বড় রথটি আর নেই। কিন্তু এখন ছোট আকারের ৩০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন রথ তৈরি করে উৎসব পালন করা হচ্ছে এবং রথ টানার সময় একই আনন্দের সৃষ্টি হয়ে থাকে।

রাজধানী ঢাকার সূত্রাপুরে রামসীতা মন্দির কমিটির আয়োজনে ৫০০ বছরের পুরনো রথযাত্রার অনুষ্ঠান চলে আসছে। পুরান ঢাকায় শ্রীশ্রী রাধামাধব জিউ দেববিগ্রহ মন্দির, ঠাটারীবাজার শিবমন্দির ও রাধাগোবিন্দ জিউ ঠাকুর মন্দিরেও রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকায় সবচেয়ে বড় রথযাত্রার উৎসব অনুষ্ঠিত হয় ইসকন মন্দিরে। শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেব, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ সুসজ্জিত রথ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে ইসকন মন্দির থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়, আবার অষ্টম দিবসে উল্টো রথযাত্রা হিসেবে রথ তিনটিকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, বানিয়াজুরী, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, যশোরের কেশবপুর, নড়াইলের লোহাগড়া, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, হবিগঞ্জ এবং সিলেট অঞ্চলে উৎসবের উচ্ছ্বাসটা অন্য এলাকার চেয়ে একটু বেশিই।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ

বন্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন

ড. কানন পুরকায়স্থ

বন্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন

বন্যা বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। এ দেশে একসময় বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত বাঁধ ছিল। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা যখন এ দেশ দখলে নেয়, তখন তারা হাজার হাজার কিলোমিটার বাঁধ দেখেছিল, যা মোগল আমলে তৈরি হয়েছিল। এই বাঁধ বড় আকারের বন্যার হাত থেকে জনগণকে রক্ষা করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। স্থানীয় কর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই বাঁধের  রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো। এই বাঁধগুলোর পুরকৌশল ও অবস্থান আধুনিক পানি বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা ভুলে যান। এরপর নগরায়ণ ও অন্যান্য ভৌগোলিক কারণে নতুন নতুন বাঁধ নির্মিত হয়েছে, যা কখনো সাময়িকভাবে কাজে লেগেছে, আবার পরিত্যক্ত হয়েছে ।

বাংলাদেশে বন্যার স্বরূপ একটু ভিন্ন। এক হিসাবে দেখা যায়, সাধারণত জুন-সেপ্টেম্বর মাসে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের শতকরা ৮০ ভাগ হয় গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায়। এ সময় নদীগুলো প্রায় ১১০১২ বা এক লক্ষ কোটি কিউবিক মিটার পানি এবং প্রায় ৫০০ থেকে এক হাজার ৫০০ মিলিয়ন টন পলিমাটি বহন করে নিয়ে আসে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বৃষ্টিপাতের জন্য আরো ০.১২১০১২ কিউবিক মিটার পানি। পানির প্রবাহ আর পলিমাটির প্রভাবে প্রতিবছর নদীগুলো কোথাও কোথাও কয়েক শ মিটার পর্যন্ত সরে যায়। বিশেষজ্ঞরা এই দ্রুত পরিবর্তনশীল নদীকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা বলে মনে করেন। তাই অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে নির্মিত বাঁধও পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

বন্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজননদীর গতি পরিবর্তন, পানিপ্রবাহ এবং পলিমাটির সমস্যা নিয়ে নানা তত্ত্ব রয়েছে। কেউ মনে করেন, হিমালয়ে বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে ভূমিক্ষয় হচ্ছে বেশি এবং সেই সঙ্গে ওই অঞ্চলের পানি ধারণ ক্ষমতাও কমে গেছে। ফলে সমতলে বন্যার তীব্রতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। আবার কারো মতে, হিমালয় অঞ্চলে সাধারণত প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং ওই অঞ্চলের ভূমি অধিকতর ঢালু হওয়া এবং শিলাচ্যুতির কারণে ভূমির ক্ষয় হচ্ছে বেশি। তা ছাড়া ভূকম্পনের ফলেও সেখানে বড় বড় ভূমিধস হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, হিমালয় অঞ্চলে শুধু বনায়ন করলেই ভূমিক্ষয় হ্রাস করা যাবে না এবং নিম্নাঞ্চলে পলিমাটির সমস্যা ঠেকানো যাবে না।

এই বন্যা প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে কিছুই করা হচ্ছে না, তা নয়। ১৯৬২ সাল থেকে শুরু করে এই অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পানি পরিকল্পনার নীতি প্রণীত হয়েছে। কখনো এসব পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যার সমস্যা নিরসন, আবার কখনো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যার পর ১৯৯১ সালে বন্যা কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। এ নিয়ে সে সময় নিউ সায়েন্টিস্ট পত্রিকায় সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে নানা পুরকৌশল প্রকল্প বাস্তবায়ন করার যে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ইস্টার্ন ওয়াটার স্টাডি কমিশন বলেছিল, প্রকৌশলীরা সম্পদের ব্যাপক অপচয় করতে যাচ্ছেন। আমার জানা মতে, নানা জায়গায় বড় বড় বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, আবার যমুনার তীব্র স্রোতের তোড়ে সেসব বাঁধ ভেঙে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতেও দেখেছি। ১৯৯৪ সালে নিউ সায়েন্টিস্টে প্রকাশিত আরো একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা শহর রক্ষাকল্পে বাঁধ নির্মাণের জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব করেছেন। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক এবং যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন্যাকে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। একে প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। গত শতাব্দীর শেষের দিকে ইন্টারন্যাশনাল রিভার নেটওয়ার্কের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের বন্যা কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করে এর ত্রুটিবিচ্যুতি তুলে ধরেন।

বন্যা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইউরোপেও ভাবনার শেষ নেই। গত কয়েক বছরে সেন্ট্রাল ইউরোপে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক বেশি। তা ছাড়া যে অবকাঠামো বন্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হয়েছিল, তা যেন অনেক ক্ষেত্রে বন্যা সৃষ্টিতে সহায়তা করছে। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশেও রয়েছে। যেমনএকটি জায়গায় নির্মিত বাঁধ অন্য জায়গায় বন্যার সৃষ্টি করছে। সমগ্র যুক্তরাজ্যে ২৪ হাজার মাইল বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে এবং প্রতিবছর এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যয় হয় প্রচুর অর্থ। টেমস ব্যারিয়ার এ ধরনের একটি ব্যবস্থা, যা লন্ডন শহরকে বন্যার হাত থেকে রক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে এই বাঁধ অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে পরিবেশ সংস্থাগুলো সফট প্রকৌশল-এর দিকে যাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে উপকূল রেখা ব্যবস্থাপনা এবং জলাধার বন্যা ব্যবস্থাপনা। বন্যা সতর্কীকরণের জন্য ট্রাফিক সিগন্যালের মতো সতর্কীকরণ ব্যবস্থাপনা যুক্তরাজ্যে চালু আছে। শুধু বাঁধ নির্মাণ করে বন্যা প্রতিরোধ করা যাবে না। তাই বন্যা প্রতিরোধের পরিবর্তে বন্যা ব্যবস্থাপনার কথা ভাবতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সাধারণ বন্যা বাংলাদেশের কৃষি খাতে এবং মৎস্য খাতে অনেক সুফল বয়ে আনে। আমাদের প্রকৌশলীরা বিভিন্ন সফট প্রকৌশলের কথা ভাবতে পারেন। তা ছাড়া বিদ্যমান বাঁধগুলোর ওপর ঝুঁকি পর্যালোচনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ফল্ট ট্রি পদ্ধতি প্রয়োগ করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা যায়। বন্যা ব্যবস্থাপনাকে জোরদার করার জন্য বাংলাদেশের উপযোগী বন্যার পূর্বাভাস মডেল তৈরি করা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় সাধন জরুরি। ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বন্যার পানি অতি দ্রুত সাগরের দিকে নিয়ে যাওয়ার যে পুরকৌশল ইউরোপ গ্রহণ করেছিল, তা বস্তুত ব্যর্থ হয়েছে। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হরিজন্টাল ডেভেলপমেন্ট বা আনুভূমিক তলে উন্নয়ন এবং ভার্টিক্যাল ডেভেলপমেন্ট বা শীর্ষদেশীয় তলে উন্নয়নের মধ্যে সাযুজ্য বিধান জরুরি। বাংলাদেশের প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পরিবেশের প্রভাব সমীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্যা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নানা গবেষণা পরিচালনা করতে পারে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার এবং বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রয়োজন প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা।

বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। স্থানীয় সমস্যা; যেমনপলিমাটি ও অতিবৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হবে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় আরো ৪০ শতাংশের মতো বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে যুক্ত হবে অন্যান্য সমস্যা; যেমননদীগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতা ও গতিবিধি। তাই বন্যা সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি গ্রহণ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের নদীগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য হয় নদী খাতের ক্ষমতা বাড়ানো অথবা পার্শ্ববর্তী অববাহিকায় প্রাকৃতিক পানি সঞ্চয় ব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি কোনটি হবে, তা নির্ভর করে লক্ষ্যের ওপর; বন্যা প্রতিরোধ করা, নাকি খরা ও সেচের জন্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, তার ওপর। নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর পদ্ধতিগুলোকে সাধারণত কাঠামোগত প্রকৌশল এবং প্রকৃতিভিত্তিক কৌশলএই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। নদীর তলদেশ থেকে অতিরিক্ত পলি ও আবর্জনা অপসারণ করা গেলে নদী খাত গভীর হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে এর পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল এবং সামগ্রিক ধারণক্ষমতা বেড়ে যায়। সুতরাং নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য ড্রেজিংয়ের বিকল্প নেই। তা ছাড়া জলাভূমি ও জলাশয়গুলোকে পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন।

পরিশেষে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করতে হলে পানি এবং বন্যার সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কাজ করাই একটি দেশের সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। অতীতে আমরা লক্ষ করেছি, বন্যা এলেই নানা রাজনৈতিক অভীপ্সা পূরণের লক্ষ্যে নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে; যেমনজনগোষ্ঠীর মধ্যে খাদ্য বিতরণ, নানা ধরনের স্বল্পমেয়াদি বাঁধ নির্মাণ, অপরিকল্পিতভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা স্থাপন ইত্যাদি। এসব কর্মসূচি দিয়ে বন্যার প্রকোপ থেকে সাময়িকভাবে কিছুটা রক্ষা পাওয়া গেলেও কোনো দীর্ঘমেয়াদি ফল লাভ হয় না। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধ নয়, তাকে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই বদ্বীপ অঞ্চলের বন্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খোঁজা জরুরি।

লেখক : পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক, যুক্তরাজ্য

গ্লোবাল সাউথের উত্থান ও বৈশ্বিক মেরুকরণের নতুন বাস্তবতা

ড. সুজিত কুমার দত্ত

গ্লোবাল সাউথের উত্থান ও বৈশ্বিক মেরুকরণের নতুন বাস্তবতা

বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকেন্দ্রিক পশ্চিমা নেতৃত্ব প্রাধান্য বিস্তার করলেও একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে সেই বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলো যাদের সম্মিলিতভাবে গ্লোবাল সাউথ বলা হয় ক্রমশ বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি নতুন ধরনের মেরুকরণ বা বহুমেরু শক্তি-ভারসাম্যের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপকেও প্রভাবিত করছে।

গ্লোবাল সাউথের উত্থানের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। গত দুই দশকে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশই এই উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলো থেকে আসছে। একসময় বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ মূলত জি৭-ভুক্ত উন্নত দেশগুলোর হাতে থাকলেও এখন উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক উৎপাদন, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে পূর্ব ও দক্ষিণের দিকে সরে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিকল্প আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিকাশ। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ মনে করে, এসব প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পর্যাপ্ত নয়। ফলে ব্রিকস, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মতো বিকল্প আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সহযোগিতামূলক কাঠামো গুরুত্ব অর্জন করছে। এসব উদ্যোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন ও উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য আনার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গ্লোবাল সাউথের উত্থানের দ্বিতীয় প্রধান চালিকাশক্তি হলো ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ আর কোনো একক শক্তির সঙ্গে নিঃশর্তভাবে অবস্থান নিতে আগ্রহী নয়। বরং তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি বা কৌশলগত স্বাধীনতার ধারণাকে আরো শক্তিশালী করেছে। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পক্ষ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে বহুমাত্রিক অংশীদারির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের চেষ্টা করছে।

এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্ম নতুন গুরুত্ব অর্জন করেছে। এসব জোট পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প নয়, বরং একটি অধিক ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমেরু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে। ফলে বিশ্বরাজনীতি আর একক পরাশক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে না; বরং একাধিক আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সমন্বয়ে নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো ঐতিহাসিক রূপান্তর এবং ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের দাবি। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী ফোরামে অধিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি হলো, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কার এনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে আরো কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারজনিত বৈষম্য দূর করার প্রশ্নেও সোচ্চার। জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর, খাদ্য নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে তারা ন্যায্য হিস্যার দাবি করছে। উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্নও এখন গ্লোবাল সাউথের কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তবে গ্লোবাল সাউথের এই উত্থান চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। এর অন্যতম কারণ হলো অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। গ্লোবাল সাউথ কোনো একক রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক জোট নয়; বরং এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অগ্রাধিকারসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলোর একটি বিস্তৃত সমষ্টি। ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে ভারত, চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে মতপার্থক্য ও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। একই সঙ্গে অনেক দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ভিন্নতা থাকায় অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ সব সময় সহজ হয় না।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বৈষম্য, প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা এবং জলবায়ু ঝুঁকি এখনো গ্লোবাল সাউথের বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক দেশ এখনো উচ্চ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় উন্নত অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর আরো গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই নিয়ে এসেছে। একদিকে বহুমুখী কূটনীতি, আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য বৈচিত্র্য এবং উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে; অন্যদিকে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন করতে পারে।

সব মিলিয়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো আজ আর শুধু আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় নয়; তারা বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বরাজনীতি ধীরে ধীরে এক মেরু থেকে বহু মেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা, প্রভাব ও নেতৃত্ব আরো বিস্তৃতভাবে বণ্টিত হবে। এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের ভূমিকা শুধু সংখ্যাগত নয়; বরং ন্যায্যতা, অন্তর্ভুক্তি এবং ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তা ক্রমেই আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-বাংলাদেশ সেন্টার

বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীর চ্যালেঞ্জ | কালের কণ্ঠ